কৃশানু

স্মরণজিৎ চক্রবর্তী

মানে ফুটবলার কৃশানু দে-র কথাই বলছি আর কি। আমার ছোটবেলা থেকে বড়বেলায় প্রায় সবকিছু পালটে গেলেও যে গুটিকয় ব্যাপার এখনও একই রয়ে গিয়েছে তার মধ্যে একটা হল কৃশানু দে-র প্রতি আমার মুগ্ধতা আর ভালবাসা!

আমার অনেক ছোটবেলার কিছু ঘটনা এখনও মনে রয়েছে। যেমন প্রথম স্কুলে ভর্তির ইন্টারভিউ দিতে যাওয়ার দিন! ছোটদাদুর কোলে করে বাঞ্ছারামের বাগান সিনেমার মাঝখান থেকে ভয়ে পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাটা সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে আসা! ভাইপো, মানে সেজকাকার সঙ্গে অন্ধকার রাস্তায় ‘জীবন সাথী' টর্চের আলোয় দেখা পান্না রঙের চোখের শিয়াল! ভুটানকাকার বাড়ির কুয়োয় পড়ে যাওয়া কুকুরকে তোলার জন্য ঘটি তোলার লোকের কুয়োর মধ্যে নামা!

ঠিক এমনই মনে আছে আরেকটা দিন। তখন আমার বয়স চার কি সাড়ে চার। যে বাড়িতে ভাড়া থাকতাম, সেই বাড়িওয়ালা জেঠুর ছেলে শঙ্করদা ছিল আমার সেই বয়সের গডফাদার! শঙ্করদা আমার চেয়ে সাত-আট বছরের বড় ছিল।

ওদের বাড়িতে একটা ছোট ঘরে নিচু চৌকি পাতা থাকত। সেখানে বসে শঙ্করদা পড়াশুনো করত। সেই চৌকির পাশে কয়েকটা বল্লম দাঁড় করানো থাকত। সেগুলো যে কেন ওখানে থাকত কে জানে! তা, সেই বিকেলে আমি শঙ্করদার সঙ্গে বসেছিলাম। তার পরেরদিন ছিল বড় ম্যাচ। ইস্টবেঙ্গল ভার্সেস মোহনবাগানের খেলা। এখন সবাই এই ম্যাচকে ডার্বি বললেও আমরা সেই আশির দশকে একে বড় ম্যাচই বলতাম। এখনকার মতো এত নানান রকমের ইংরেজি শব্দ তখনও আমাদের মফস্সলি ভোকাবুলারিতে যোগ হয়নি।

শঙ্করদা আমায় জিজ্ঞেস করেছিল, ‘রাজা, তুই কোন দলের সাপোর্টার রে?” আমাদের বাড়ি হল ফুটবলের বাড়ি। আমার প্রপিতামহও শুনেছি ফুটবল খেলতেন। ঠাকুরদা, বাবা-কাকারা তো খেলতই! ফলে ফুটবল নিয়ে মাতামাতি জন্মের পর থেকেই দেখে আসছি। কিন্তু সেই ছোট্ট বয়সে সাপোর্টার যে হতে হয় সেই বোধটা তখনও তৈরি হয়নি! আসলে সেই বয়সে জীবন নির্মল থাকে অনেক। সে বোঝে না এই পৃথিবীতে বাঁচতে হলে কোনও না কোনও একটা দলের দিকে যেতেই হয়।

শঙ্করদা আমায় জিজ্ঞেস করল, আমি কোন দলের সাপোর্টার! মানে ইস্টবেঙ্গলের সাপোর্টার? না মোহনবাগানের সাপোর্টার! এই রে! আমি পড়লাম ফাঁপরে! এটা তো এখনও ঠিক হয়নি আমি কোনও দলের হয়ে গলা ফাটাবো!

আমি কী করব বুঝতে না পেরে শঙ্করদাকে পাল্টা জিজ্ঞেস করেছিলাম, “তুই কোন দলের সাপোর্টার?”

আসলে শঙ্করদাই তো আমাকে জীবনের নানান কিছু জানায়, শেখায়! সে হজমির সঙ্গে আরেকটু বিটনুন মিশিয়ে খাওয়া থেকে, ঘুড়ির কর বাঁধাই, কানের দু'পাশে হাত দিয়ে টেনে তুলে মামাবাড়ি দেখানো বা চ্যাটালো ঢিল দিয়ে পুকুরে ব্যাঙবাজি করা! এসবের গুরু তো শঙ্করদাই! তাই শঙ্করদা কোনও দলকে সমর্থন করছে সেটা জানা দরকার যে!

শঙ্করদা বাদাম ভেঙে আমার হাতে দিয়ে বলেছিল, ‘ইস্টবেঙ্গলের!’ আমিও আর দেরি করিনি। উত্তর দিয়েছিলাম, 'আমিও তা হলে ইস্টবেঙ্গলের সাপোর্টার!’

তারপর থেকে এই মধ্য চল্লিশে, ফুটবল মানে আমার কাছে আজও ইস্টবেঙ্গল। সে হারুক, জিতুক যাই হোক! ইস্টবেঙ্গল!

কিন্তু তা হলেও কোনওদিনই মোহনবাগানের সমর্থকদের প্রতি আমার কোনও বিরূপ বা বিদ্বেষমূলক মনোভাব তৈরি হয়নি। কারণ আমার ছোটবেলার প্রিয়বন্ধু সঞ্জয় চক্রবর্তী থেকে শোভন ব্যানার্জি সবাই যে মোহনবাগানের সমর্থক। আমার কলেজ-জীবনের প্রেমিকার বাড়ি ছিল ঘোর মোহনবাগান! এমনকী এখনও আমার পছন্দের প্রিয়তমা মেয়েটিও মোহনবাগানের দিকেই দাঁড়িয়ে! তাই আমি ইস্টবেঙ্গল হলেও মোহনবাগানের প্রতি আমার কোনওদিনই কোনও বিরূপ মনোভাব ছিল না। তবে খেলার সময়ে তর্ক, ইয়ার্কি, মান-অভিমান ইত্যাদি হতই! ,

আজ ভাবি সেদিন শঙ্করদা যদি বলত ও মোহনবাগানের সমর্থক তা হলে আমিও আজ আমার বাড়ির সবার বিপরীতে দাঁড়িয়ে মোহনবাগানের সমর্থকই হতাম!

সেটা ছিল একাশি সালের গোড়ার কথা। শঙ্করদাকে দেখে ইস্টবেঙ্গলের সাপোর্টার তো হওয়া গেল, কিন্তু সেটা নিয়ে ভিড়ে মিশে, বুঝে, না-বুঝে হইচই ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না আমার। কারণ ফুটবলের সঙ্গে, আমার বাকি জীবনের সঙ্গী এই খেলাটির সঙ্গে আমার নিজের আত্মিক যোগাযোগ তখনও ঠিকঠাক ঘটছিল না। আর এই যোগাযোগটাই যিনি ঘটিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর নাম কৃশানু দে!

একাশি থেকে পঁচাশি সাল অবধি আসতে আসতে আমি ফুটবলটা বুঝতে শিখেছি। স্কুলে বন্ধুদের সঙ্গে ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগান নিয়ে ঝগড়া করতে শিখেছি। কিন্তু মনের গভীরে তখনও খেলাটার সঙ্গে সেই যোগাযোগ আমার গড়ে ওঠেনি! যে ঝগড়া, খারাপ লাগা আসছিল সবটাই ব্যক্তিগত 'ইগো' থেকে। পরাজয়ের পর দুয়োর মধ্যেকার অপমান থেকে। ফুটবল না হয়ে সেটা যদি হকি হত তা হলেও ওই ব্যক্তিগত জায়গার খারাপ লাগাটা যেমন হত, সেরকমই আর কি ।

তারপর এল পঁচাশি সালের লিগের সেই খেলাটা। ইস্টবেঙ্গল বনাম মহামেডান স্পোর্টিংয়ের ম্যাচ৷ আমার মনে আছে সেই ম্যাচে মহামেডানে ছিলেন সদ্য কলকাতায় খেলতে আসা এক নাইজেরিয়ান! নাম চিমা ওকেরি! ছিলেন প্রসূন ব্যানার্জি! গোলে অতনু ভট্টাচার্য! আর এদিকে ইস্টবেঙ্গলে জামসিদ নাসিরি, অলোক মুখার্জি, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য-সহ আরও অন্যদের সঙ্গে ছিলেন দু'জন সদ্য ইস্টবেঙ্গলে সই করা ফুটবলার। বিকাশ পাঁজি ও কৃশানু দে!

তখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি আমি। আমাদের বাড়িতে পাড়ার অনেকে আসত খেলা দেখতে। বিশেষ করে আসত আমাদের পাড়ার ক্লাব অরুণাচল সঙ্ঘের থেকে অনেক কাকুরা!

মনে আছে খেলা খুব উত্তেজনাপূর্ণ হচ্ছিল। আর তার মধ্যেই ইস্টবেঙ্গল একটা গোল খেয়ে যায়! আর ব্যাস সেই ক্লাবের কাকুরা আমার পেছনে লাগতে শুরু করে! মানে যেমন হয় আর কি! একটা বাচ্চা ছেলে, তাকে খেপানোর সুযোগ পাওয়া গিয়েছে! কে আর ছাড়ে!

আমাদের সেই সময়ে এমন কাণ্ড প্রায়ই হত। মানুষের সেন্স অব মরালিটি খুব একটা এসব ব্যাপারে কাজ করত না। এফিমিনেট পুরুষদের ‘বউদি’, ‘লেডিজ' বলে খেপানো হত। বয়স্ক রগচটা মানুষদের নানান রকম নাম ধরে ডেকে আরও রাগিয়ে গালাগালি দেবার জন্য উস্কানো হত! তোতলা বা যাদের কথা বলতে আটকাত তাদের ভেঙানো হত ক্রমাগত! আর তার সঙ্গে ছিল ছোট ছেলেমেয়েদের কোনও একটা ছুতো পেলে খেপানো! রাস্তার ভাষায় বলা হত ‘প্যাঁক দেওয়া’!

সেই ছোট বয়সে হেরে যাওয়াটা, অনেকের মতো আমার কাছেও একটা মস্ত অপমানের ব্যাপার ছিল। এখন হারটায় স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে বলে আর সেভাবে কিছু মনে হয় না। কিন্তু ছোটবেলায় মানুষের তো আশা-আকাঙ্ক্ষা বেশি থাকে। পৃথিবীকে অনেক ভাল মনে হয়! নিজেকেও মনে হয় বড় কেউকেটা! তাই ছোটবেলায় হার মেনে নেওয়াটা সহজ হয় না। সেদিন আমারও হয়নি!

ইস্টবেঙ্গল এক গোলে হারছে! পাড়ার কাকুরা আমায় দুয়ো দিচ্ছে! পরেরদিন স্কুল গেলে অন্য দলের সমর্থক যারা তারাও যা তা বলবে! এইসব মিলিয়ে সেদিন খুব উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলাম!

এরই মধ্যে ইস্টবেঙ্গল একটা পেনাল্টি পেল! আমিও ভরসা পেলাম। এবার নিশ্চয়ই গোল পাব আমরা। কিন্তু পেনাল্টি মিস! এতদিন পরে স্মৃতি থেকে লিখছি সব। তাই যতদূর মনে পড়ে জামসিদ নাসিরি হয়ত পেনাল্টি মিস করেছিলেন। তখন বুঝতাম না তাই খুব রেগে চিৎকার-চেঁচামেচি করেছিলাম। পরে জেনেছি, দেখেছি যে বিশ্বের তাবড় তাবড় প্লেয়াররা পেনাল্টি মিস করেছেন! এটা খেলার অঙ্গ মাত্র! কিন্তু অল্প বয়সে কে এত বোঝে! বুঝতে চায়!

এমন করে হাফ টাইম হয়ে গেল। আর এর পরে কাকুরা আরও বেশি করে খেপাতে লাগল আমায়! আমি প্রথমে কথার মাধ্যমে, তারপর রাগ দেখিয়ে আর সবশেষে কেঁদেকেটে প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ করতে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু অতজনের সঙ্গে পারিনি! শেষে মা এসে সবাইকে চুপ করিয়ে আমাকে অন্য ঘরে নিয়ে গিয়েছিল। আমি কাঁদতে কাঁদতে প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাচ্ছিলাম মাটিতে, সবকিছু আবছা হয়ে গিয়েছিল। মা আমার জামাকাপড় পালটিয়ে মুখ-চোখ ধুইয়ে দিয়েছিল। তারপর নীচের থেকে গলা তুলে ডেকেছিল শঙ্করদাকে। বলেছিল, 'বাবুইকে নিয়ে যা তো তোর কাছে!

শঙ্করদা আমায় নিয়ে গিয়ে বসিয়েছিল নিজের কাছে। বলেছিল, ‘বোকা এমন করে কাঁদছিস কেন? এখনও একটা হাফ বাকি আছে! দেখ না কী হয়! যতক্ষণ না শেষ বাঁশি বাজছে ততক্ষণ আশা আছে জানবি।’

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কিন্তু শঙ্করদা আমরা যে পারছি না!”

শঙ্করদা আমার মুখটা ওদের ‘নেলকো' টিভির দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে বলেছিল, 'এবার পারব।’

আর আমি দেখেছিলাম ইস্টবেঙ্গলের হয়ে দ্বিতীয়ার্ধে নামছেন বেঁটে-খাটো, পাতলা চেহারার একজন প্লেয়ার! ঢেউখেলানো কানঢাকা চুল। সামান্য ঝোলা গোঁফ! জানলাম এই প্লেয়ারটার নাম কৃশানু দে!

তারপর শুধুই কৃশানু! মাঠময় কৃশানু! কেউ আটকাতেই পারছে না! আর পায়ের কী কাজ! যেন কার্পেট সেলাই করছে! মাঠে ফুটে উঠছে নকশা! আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতে লাগলাম! এ কী হচ্ছে আমার সামনে! আমার মনের মধ্যে ইস্টবেঙ্গলের সমর্থক হয়ে ওঠার জন্য যেন সত্যিকারের একটা কারণ ফুটে উঠল! আমি ইস্টবেঙ্গলের সমর্থক কারণ ইস্টবেঙ্গলে কৃশানু দে খেলেন!

ম্যাচটা দুই-এক গোলে জিতেছিল ইস্টবেঙ্গল। ফুটবল দলগত খেলা! তাই দ্বিতীয়ার্ধে গোটা ইস্টবেঙ্গল টিমই ভাল খেলেছিল। কিন্তু তাও তার মধ্যেও রাজা ছিলেন কৃশানু! কারণ একজন রাজা থাকেনই! তাই পেলে থাকেন! ক্রুয়েফ থাকেন! মারাদোনা থাকেন! রোনাল্ডিনহো থাকেন! থাকেন লিওনেল মেসি! আমাদের সেই আশির দশকে যেমন ছিলেন কৃশানু দে! লোকে বলত ভারতের মারাদোনা!

ছোটখাটো চেহারা! কিন্তু বল পেলে শরীরে ঈশ্বর ভর করেন! মাঠে, মাঠের বাইরে দলমতনির্বিশেষে সবাই কৃশানু দে-র ভক্ত! সবার আদরের রন্টু। ভালবাসার, সম্মানের রন্টুদা!

আজ এত বছর পরেও মনে আছে সেই সময়ের খেলার কথা! কলকাতা লিগ তখন হত পঁয়ত্রিশ মিনিট করে দুই অর্ধের! তিন প্রধান ছাড়াও ছিল এরিয়ান, রাজস্থান, রেলওয়ে এফ ফি, জর্জ টেলিগ্রাফ, পুলিশ, খিদিরপুর, উয়াড়ি আর কতসব টিম! আর এদের মধ্যে

আমার আরেকটা টিমের নাম মনে আছে। কী সুন্দর ছিল সেই নাম! সোনালি শিবির! হয়তো স্কুল থেকে ফিরছি, বাড়ির ফিলিপসের রেডিয়োতে মিষ্টিদাদু কমেন্ট্রি শুনছে! অজয় বসু বা সুকুমার সমাজপতির গলা পাওয়া যাচ্ছে! হয়তো ড্র চলছে খেলা। কিন্তু মনখারাপ হত না আমাদের। কারণ আমরা জানতাম আমাদের তো রন্টুদা আছে!

আর ফাউলও করত সবাই! নাইজেরিয়ান আরেকজন প্লেয়ার ছিলেন। ক্রিস্টোফার নাম! কী মারটাই না মারতেন কৃশানুকে! মনে আছে পেছন থেকে পা চালাতেন! ঘাড়ে কনুই দিয়ে মারতেন! আমাদের যা রাগ হত! কিন্তু আমাদের কিছু করতে হত না! কারণ কৃশানুকে আটকাবে কে! ঠিক কৃশানু বেরিয়ে যেতেন এইসব বাধাবিপত্তি কাটিয়ে! দিনে দিনে আমরা সবাই কৃশানু দে-র ভক্ত হয়ে উঠেছিলাম। কৃশানুর যে কোনও সাফল্য ছিল আমাদের সাফল্য। তাঁর চোট ছিল আমাদের শরীরে আঘাত! এত ভালবাসা যে কেউ পেতে পারে এখন হয়তো কেউ বিশ্বাস করবে না!

তারপর মারডেকায় কৃশানু হ্যাট্রিক করলেন! পাড়ার ক্লাবে সেই উপলক্ষে ফিস্ট হল একদিন! আর যে কাকুরা সেই আমায় খুব খেপিয়ে কাঁদিয়েছিল তারা সবাই মিলে আমায় কিনে দিল একটা লাল, হলুদ আর কালো রঙের ফুটবল!

কৃশানু দে অগণিত সাফল্য এনে দিয়েছেন ইস্টবেঙ্গলকে। পরে মোহনবাগানকেও ! তিনিই বোধহয় একমাত্র প্লেয়ার যাঁকে সবাই, কোন ক্লাবে খেলছেন সেটা না দেখে, শুধু ফুটবলার হিসেবে ভালবাসত! বিকাশ পাঁজির সঙ্গে তাঁর জুটি! চিমা ওকেরির সঙ্গে তাঁর জুটি এখনও গল্পকথার মতো হয়ে আছে! কত ম্যাচ যে তিনি তাঁর টিমকে জিতিয়েছেন তা বলে শেষ করা যাবে না! তাঁকে নিয়ে দলবদলের সময় এমন নাটক হত যা যে কোনও থ্রিলার গল্পকেও হার মানাবে! তবু এসবের বাইরে তিনি ছিলেন শান্ত। মাথা নিচু করে নিজের মনে হেঁটে যাওয়া পাশের বাড়ির দাদা, রন্টুদা! ,

আমরা ছোটরা মিলে বাটানগরেই কৃশানু দে-র ফ্যানস্ ক্লাব করেছিলাম। বাবা কলকাতা থেকে কৃশানুর রঙিন বড় একটা ছবি এনে দিয়েছিল!

তারপর ভাইপোর সঙ্গে কলকাতা মাঠে লিগের খেলা দেখতে গিয়ে প্রথম চাক্ষুষ দেখেছিলাম কৃশানুকে! ছোটখাটো চেহারায় এমন খেলেন কী করে?

ভাইপো বলত, ‘গড গিফটেড প্লেয়ার!’ বলত, 'ওয়ান্স ইন আ জেনারেশন প্লেয়ার!’

খেলার শেষে সেদিন ভাইপোর সঙ্গে ইস্টবেঙ্গল মাঠের বাইরে দাঁড়িয়েছিলাম। বেশ অনেক পরে কৃশানু বেরিয়ে এসেছিলেন। ভাইপো গিয়ে কথা বলেছিল। কৃশানু দাঁড়িয়ে কথা বলেছিলেন সামান্য ।

ভাইপো আমায় দেখিয়ে বলেছিল, ‘তোমার অন্ধ ভক্ত!’ তারপর আমায় বলেছিল, “কীরে কথা বল!’

বরাবরের লাজুক আমি, মাথা নামিয়ে সংকুচিত হয়ে গিয়েছিলাম। না, সই-টই নেওয়ার কথা তখন অত জানতাম না, মাথাতেও আসেনি। উনি হেসে শুধু আমার মাথায় হাত দিয়ে আদর করেছিলেন একটু! ব্যাস! ওই যথেষ্ট! ওই ঈশ্বর-স্পর্শ আমার!

কৃশানু দে কি ঈশ্বর? আমার কাছে কৃশানু দে ফুটবলের ঈশ্বর! কারণ তিনি একদিন নিজের অজান্তে হলেও, একটা মনমরা, হেরে যাওয়া বালককে একাই জিতিয়ে দিয়েছিলেন! তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন! জীবনের নানান না-পারার মধ্যে সেই বালকটির হয়ে, তার মতো অগণিত মানুষের হয়ে লড়াই করে তাদের বারবার জিতিয়ে দিয়েছেন কৃশানু দে!

আমরা ছোটবেলায় পেলে মারাদোনার খেলা সেভাবে দেখার সুযোগ পাইনি। কিন্তু আমাদের সেই আক্ষেপ অনেকাংশে মিটিয়ে দিয়েছিলেন কৃশানু! তাই যতদিন আমি ফুটবলের সাপোর্টার থাকব ততদিন আমি কৃশানু দে-র সাপোর্টারও থাকব!

অনেক পরে, দুহাজার তিন সালের বিশে মার্চ কৃশানু দে আমাদের ছেড়ে চলে যান। মনে আছে খবর কাগজে সেই সংবাদ পড়ে আমি একা একা কেঁদেছিলাম খুব।

কেন কেঁদেছিলাম! কে হন কৃশানু দে আমার! বহু বহু আগে একদিন তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছিলেন মাত্র। একবার মাথায় হাত দিয়েছিলেন মাত্র! আর তো কোনওদিন তাঁকে চাক্ষুষ দেখিনি আমি! তাও কীসের এই টান! কেন এই টান! যা এত বছর পরেও এতটা জীবন্ত! কেন আজও রন্টুদার কথা মনে পড়লে চোখে জল আসে! কেন গলার কাছটা ব্যথা করে? চোখের সামনে ভেসে ওঠে বাঁ পায়ের ছোঁয়ায় সবুজ ঘাসে ফুটে ওঠা ফুল!

কারণ তিনি আমায় ফুটবল ভালবাসতে শিখিয়েছেন! শিখিয়েছেন জীবনে প্রকৃতভাবে সমর্থন কীভাবে করতে হয়! কীভাবে কারও খারাপ সময়েও তার ওপর বিশ্বাস রাখতে হয়, তাকে ভালবাসা দিতে হয়! কীভাবে হেরে যাওয়া ম্যাচ আবার নিজের দিকে নিয়ে আসতে হয়! কৃশানু দে আমার কাছে শুধু ফুটবলার নন, তিনি আমার ছেলেবেলার অংশ! ভরসার জায়গা! তিনি আমার ম্যাচ জেতার পরে সিঁড়ি দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে নীচে নেমে আসার আনন্দ! সাহস!

হ্যাঁ, আমার জীবনে কৃশানু দে ভালবাসার আর সাহসের আরেকটা নাম!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%