স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
বাটানগরের ছেলে আমি। জন্ম থেকেই বড় গঙ্গা দেখেছি। তার পাড়ে বসে আড্ডা মেরেছি। তার পাশের মাঠে ফুটবল খেলেছি। তার ওপর নৌকা নিয়ে ঘুরেছি! নদীর সঙ্গে তাই ছোট থেকেই একটা অন্যরকম সখ্যতা আছে আমার।
সেখান থেকে কলকাতায় চলে আসার পরে প্রথম প্রথম যে মনখারাপের জায়গাটা তৈরি হয়েছিল তার অনেক কারণের মধ্যেকার একটা কারণ হল বাড়ির কাছে কোনও নদী নেই আমাদের!
আদি গঙ্গা ছিল। কিন্তু সেটাকে সবাই বলত টালি নালা। আর সত্যি বলতে কী ওটাকে দেখলে আর যাই হোক নদী বলে মানতে পারতাম না!
মাকে একদিন এই নিয়ে বলেওছিলাম আমি।
আমি এমনিতেই ছোট থেকে অন্তর্মুখী ধরনের। কলকাতায় এসে আরও চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলাম। তাই মা একদিন বলেছিল, 'এভাবে ঘরে বসে থাকিস কেন? বিকেলে বেরতে পারিস না?
উত্তরে আমি বলেছিলাম, ‘গঙ্গা নেই তো! বিকেলে কোথায় যাব?’
মা হেসে বলেছিল, ‘লেকে যাবি। দেখবি ভাল লাগবে!”
লেক মানে, অনেকের কাছে ঢাকুরিয়া লেক। লেক মানে অনেকের কাছে রবীন্দ্র সরোবর! কিন্তু আমাদের কাছে লেক মানে শুধুই লেক!
লেকে আমি আগে একবার গিয়েছিলাম। সেই যখন বাটানগরে নার্সারি স্কুলে পড়তাম তখন স্কুল থেকে আমাদের লেকে নিয়ে এসেছিল। তখন দেখেছিলাম লেক!
কিন্তু স্কুলের সঙ্গে এলে কতটুকুই-বা দেখা যায়! শুধু মনে আছে লেকের টয়ট্রেনে করে ঘুরেছিলাম পুরো লেকটা!
মা বলার পরে আমি মিষ্টিদাদুর সঙ্গে লেকে যাওয়া শুরু করেছিলাম। এমনিতেই স্কুলে যাব বলে টালিগঞ্জ স্টেশন থেকে ট্রেন ধরতাম। সেটার জন্য লেকের গা ঘেঁষেই যেতে হত। কিন্তু সেই যাওয়া আর লেকের মধ্যে ঢোকা এক নয়!
আমি যে সময়ের কথা বলছি সেটা সাতাশি, অষ্টাশি সাল! তখনকার লেক-এর চারিপাশ কিন্তু এখনকার মতো ছিল না। এমন বড় লোহার গ্রিল দিয়ে ঘেরা ছিল না লেক। তখনকার লেকের চারিপাশটা সবুজ লোহার ছোট রেলিং দিয়ে ঘেরা ছিল। রেলিংগুলো বড়জোর বুক অবধি ছিল উচ্চতায়। মাঝে মাঝে লোহার রোটেটিং গেট ছিল। সেগুলো ঠেলে লেকে ঢুকতে হত। লেকের মধ্যেও দুটো ভাগ ছিল। বড় লেক আর ছোট লেক। আমাদের বাড়ির কাছে মেনকা সিনেমা হলের সামনে দিয়ে ওই ছোট লেকের দিকে ঢোকা যেত। ছোট লেক কারণ, জলাধার একটা হলেও লেক গার্ডেন্স স্টেশনে যাওয়ার পথে একটা ব্রিজ দিয়ে লেকটাকে দুটো ভাগে ভাগ করা হয়েছে। অন্যদিকের লেকটা অনেক বেশি বিস্তৃত!
সে সময় লেকের মধ্যে টয়ট্রেন চলত। ডিজেলচালিত ইঞ্জিন ছিল সেই ট্রেনের। একটা স্টেশন ছিল। নাম ছিল, ‘স্বপ্নপুরী'! স্টেশনে ঢোকার মুখের গেটটা ছিল খুব মজার! ধূসর রঙের একটা রাক্ষসের মুখ হাঁ করে ছিল। সেই হাঁ-এর মধ্যে দিয়ে ঢুকতে হত লোকেদের! তবে রাক্ষসের মুখ দিয়ে ঢুকলেও ভেতরের স্টেশন ও তার প্ল্যাটফর্মটা ছিল দারুণ। লালচে রঙের ওপর ঘন লাল বর্ডার দেওয়া! প্ল্যাটফর্মের একপাশে একটা ছোট্ট টিকিটঘরও ছিল। আর ছিল ওভার ব্রিজ! ঠিক যেন বড় কোনও স্টেশনের ছোট্ট এক সংস্করণ!
ট্রেনের বগি ক'টা ছিল এখন আর সঠিক মনে নেই। তবে তিনটে ছিল বোধহয়! ছোট লেকের থেকে শুরু করে ট্রেন বড় লেক হয়ে গোটাটা পাক মেরে আবার ফিরে আসত স্টেশনে। এই ট্রেন চড়ার অভিজ্ঞতাটা ছিল অসাধারণ! ছোট্ট চিমনি দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে হেলেদুলে চলত ট্রেন। মাঝে মাঝে আবার হুইসল বাজাত! রোগা রেললাইনের ওপর খসে পড়ত গাছের পাতা! গাছের ফল! পাখিরা ঘুরে বেড়াত! ট্রেন আসছে দেখলে ওরা ছোট্ট লাফে সরে যেত। খুব কিছু ভয় পেত না!
ট্রেনটা লেক-কে পাক দিয়ে অন্যদিকে গিয়ে একটা টানেলের মধ্যে ঢুকত। আর চারিপাশের আলো, হাওয়া, গাছপালা নিমেষে হারিয়ে যেত! অবাক হয়ে দেখতাম চাকা আর রেল লাইনের ঘর্ষণে জোনাকির মতো আগুনের ফুলকি উড়ছে!
কংক্রিটের তৈরি ছিল সেই টানেলটা। সেটা এখন একটা ক্রিকেট অ্যাকাডেমি ব্যবহার করে।
স্টেশনের কাছে একটা বোটিং করার জায়গাও ছিল। ছোট ছোট দু'জন-চারজন চড়ার মতো বোট থাকলেও দুটো বড় বোটও ছিল। তাতে দশ-বারোজন করে বসতে পারত। পাড়ের থেকে জেটির মতো ছিল। সেই জেটি দিয়ে কিছু দূর হেঁটে গিয়ে ওই বোটে উঠত হত!
শেষ বিকেলের আলোয় যখন পাগল পাগল হাওয়া দিত, তখন ওই বোটে চড়ে হলদে-কমলা জলের ওপর ঘোরার যে আনন্দ সে কি লিখে বোঝানো যায়!
ওই বোটিং-এর জায়গার পাশেই একটা ওপেন এয়ার রেস্তোরাঁ ছিল। একটা সাদা রঙের বাড়ি আর তার সামনে সুন্দর হেজ দিয়ে ঘেরা একটা জায়গা। ভেতরে রঙিন ছাতার তলায় বেতের চেয়ার-টেবিল। এখানে স্ন্যাক্স, কফি, কোল্ড ড্রিঙ্ক পাওয়া যেত। ওই বাড়িটা ছিল কিচেন আর ক্যাশ কাউন্টার। বেশ লোকজন হত ওখানে। নামটা এখনও মনে আছে, ‘নিরালা'!
লেকের পাশেই রোয়িং ক্লাব। সেখান থেকে রোয়িং করতে বেরত লোকজন। বাটানগরে তো এরকম জলযান দেখিনি! তাই সরু লম্বাটে নৌকোগুলো প্রথম দেখে খুব অবাক লেগেছিল। এসব চলছে কেন? এসব চালিয়ে কী হয়?
লেকের অন্যদিকে একটা ছোট্ট লোহার পুল ছিল। এখনও আছে। নাম লিলি পুল! ওটা একটা কেব্ল স্টেয়েড হ্যাঙ্গিং ব্রিজ। ব্রিজের ওপর হাঁটলে ব্রিজটা কেমন যেন দোলে! ছোটবেলায় প্রথম প্রথম বেশ ভয় লাগত আমার! তবে পরে আর লাগেনি।
কেন যে ওর নাম লিলি পুল তা আমি জানি না। ওখানে কি লিলি ফুল ফুটে থাকত জলে! ওয়াটার লিলি!
আমি ওই ব্রিজের ধারে দাঁড়িয়ে, পকেটে করে, বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া মুড়ি ছড়িয়ে দিতাম নীচের জলে। আর অবাক হয়ে দেখতাম ইয়াব্বড় বড় বড় সব মাছ ব্রিজের নীচে এসে পড়েছে সেই মুড়ি খাবে বলে!
আমি মাছ চেনার চেষ্টা করতাম! ক্যাট ফিশ ছাড়া আর কোনও মাছ চিনতে পারতাম না। মিষ্টিদাদু আমায় সাহায্য করতে পারত না এই ব্যাপারে। কারণ মিষ্টিদাদুর চোখ প্রায় নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সবকিছুই আবছা হয়ে গিয়েছিল। ডাক্তার বলেছিল, নার্ভ নাকি শুকিয়ে গিয়েছে, আর কিছু করার নেই! তাই মিষ্টিদাদু আবছাভাবে সব দেখতে পেলেও দুরের কিছুই দেখতে পেত না। কিন্তু লিলি পুলে যেতে মজা পেত!
তখন মেনকা সিনেমার সামনে ছাড়াও আরও নানান দিক দিয়ে ঢোকা যেত লেকে। সবুজ লোহার রেলিংয়ের অনেক জায়গাই ভাঙা থাকত। লেকের ভেতরে জলের ধারে বসার জন্য সবুজ রঙের বেঞ্চ ছিল কিছু। সেখানে মর্নিং ওয়াকাররা যেমন এসে বসত তেমন বিকেলে বৃদ্ধদের নানান জমায়েত হত! আমার মিষ্টিদাদুও তেমন একটা জমায়েতের সদস্য ছিল।
আমি মিষ্টিদাদুর সঙ্গে লেকে গিয়ে কিন্তু অমন বেঞ্চে বসতাম না। বরং বসতাম লেকের মাঠে। সবুজ বাটির মতো একটা মাঠ। ধারে ধারে গাছ দিয়ে ঘেরা! ওই মাঠে কখনও কখনও বল নিয়ে গিয়ে খেলতামও!
তখন লেকে লোকজন একটু বেশিই স্বাধীনতা নিত। ফলে লেকটা নোংরা থাকত এদিক ওদিক। আশপাশের বস্তি অঞ্চলের লোকেরা এসে জলে স্নান করত! জামাকাপড় কাচত। লেকে ঘুরতে আসা লোকজন যা খুশি তাই ছুড়ে ফেলত জলে। বেশ নোংরাই থাকত জলের ধারটা! কোনও পাহারার ব্যবস্থাও ছিল না সেভাবে। শুধু রাতে পুলিশ এসে টহল দিত শুনেছি। কারণ শুনেছি রাতে লেকচত্বরে মাঝে মাঝে অসামাজিক কাজকর্ম হত!
অনেক পরে কলেজের শেষের দিকে, মানে আটানব্বই-নিরানব্বই-এ যখন আমি প্রচুর টিউশনি করতাম তখন একটা ছোট্ট ঘটনা দেখেছিলাম। মনে আছে গোলপার্ক অঞ্চলে ছাত্রী পড়িয়ে রাতে সাদার্ন অ্যাভিনিউ দিয়ে হেঁটে ফেরার সময় দেখেছিলাম দুটো পুলিশ একটি লোককে তাড়া করছে লেকের ভেতরে। লোকটি সেই নিচু সবুজ রেলিং টপকে রাস্তায় এসে পড়েছিল। তারপর প্রায় আমাকে ধাক্কা দিয়ে বিবেকানন্দ পার্কের মধ্যে দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। দু'জন পুলিশ যারা ধাওয়া করছিল তাদের একজন লোকটির পেছনে দৌড় লাগালেও আরেকজন পারেনি। আমার সামনে এসে কোমরে হাত দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে জল চেয়েছিল। ভাগ্যিস জল ছিল আমার সঙ্গে। পুলিশটি জল খেয়ে বলেছিল, ‘এসব ভাল লাগে ভাই? লেকটাকে সুন্দর করে রাখতে কী অসুবিধে! শালারা সারাক্ষণ নোংরামো করছে। বাড়িতে মায়ের শরীর খারাপ! এমনিতেই চিন্তা হচ্ছে!’
হ্যাঁ মাঝে মাঝে লেকে ঘটে যাওয়া নানান ঘটনার খবর পেতাম! বছরে দুটো-তিনটে খুন তো হতই। আর খুন করে লেকে ফেলে দিয়ে যেত! এমন মৃতদেহ দেখতে আমিও দু'-একবার লেকে গিয়েছি পঙ্কার সঙ্গে!
বাটানগর যেমন সুন্দর ছিল তেমন সেখানে মাঝে মাঝেই ক্রাইম হত। ফলে এসব আমার কাছে সাংঘাতিক সাড়া জাগানো কোনও ঘটনা ছিল না। তবে তাও খুন দেখলে কেমন যেন একটা অস্বস্তি হতই!
লেকের মাঝে দ্বীপের মতো ভূখণ্ড রয়েছে। সেখানে এখন কেমন যেন মৃত সব গাছেদের জটলা। তখন এসব গাছ জীবন্ত ছিল। দেখতাম ছেলেরা লেকের জলে সাঁতার দিয়ে এই পাড় থেকে গিয়ে ওই দ্বীপে উঠত। তারপর গাছ বেয়ে ওপরের ডালে চড়ত। সেখান থেকে তারা লাফিয়ে পড়ত জলে। এটাই ছিল তাদের মজা !
লেকে নানান পাখি দেখতাম। মিষ্টিদাদু চিনিয়ে দিত পাখি। প্যারাকিট, পানকৌড়ি, বক, মাছরাঙা আরও কত কী!
আমার জল ভাল লাগলেও জলে নামতে আমার ভয় লাগে! জলে নামলেই মনে হয় দম আটকে আসছে। এই ভয় তখনও আরও বেশি ছিল। তাই আমি নিজে লেকের জলে নামার সাহস কোনওদিন করিনি! বাবা-মা আমাকে অ্যান্ডারসন ক্লাবে ভর্তি করে দিয়েছিল সাঁতার শেখার জন্য। লেকের একদিকে সেই ক্লাব। এখন নাম ইন্ডিয়ান লাইফ সেভিং সোসাইটি। কিন্তু সেখানে পুলে নামতেও আমার যে কী ভয় লাগত! তাও নামতে
হত। কিন্তু সাঁতার কি শিখতে পেরেছিলাম, না পারিনি তা এখনও অমীমাংসিত!
সেই ছোট বয়সে স্কুল থেকে ফিরে সপ্তাহে তিন কি চারদিন লেকে যেতাম! মিষ্টিদাদুর সঙ্গে বসতাম ওই মাঠে। আর প্রায় দিনই আসত মাধবদা।
মাধবদা ওইখানে ঘুরে ঘুরে আলুকাবলি, ঝালমুড়ি, বাদাম মাখা, চানা মাখা এসব বিক্রি করত।
আমার বরাদ্দ ছিল পাঁচ টাকার আলুকাবলি। মাধবদা বিটনুন আর বেশি টক দিয়ে এমন করে মেখে দিত যে মনে পড়লে এখনও জিভে জল এসে যায়!
মিষ্টিদাদু জলের দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে থাকত। আসলে বাটানগর ছেড়ে আসার পরে আমার চেয়েও আমার মিষ্টিদাদুর কষ্ট হয়েছিল বেশি! এটা প্রথম প্রথম আমি বুঝতে পারিনি। কিন্তু পরে ক্রমশ বুঝেছিলাম। তবে বরাবরের চাপা স্বভাবের মানুষটা সেই সময়ে কাউকেই কিছু বলত না!
আমি তাও জিজ্ঞেস করতাম, ‘তোমার কি মনখারাপ করে?'
মিষ্টিদাদু লেকের জলের দিকে তাকিয়ে বলত, ‘দেশ ছেড়েছি সেই সাঁইত্রিশ সালে। তারপর জামশেদপুর। বাটানগর। আর এখন কলকাতায়! মানুষের জীবন তো এমনই! নদীর মতো বয়ে যায়! নদী কি মনখারাপ করে?'
অনেক পরে আমি বুঝেছি, যে মানুষের জীবন মোটেও নদীর মতো নয়। সে কিছুই ভুলতে পারে না। তাই তার দুঃখ অনন্ত!
মিষ্টিদাদু ওই বিকেলগুলোতে, লেকের পাড়ে বসেই গল্প বলত আমায়। মিষ্টিদাদুর ছোটবেলার গল্প! সেই চাঁদপুর! মেঘনার পাড়ে বহরিয়া গ্রাম! ছোট ঠাকুরবাড়ি। বাড়ির পাশের বড় পুকুর! মেঘনা নদীর পাড়ে কাশফুলের সারি! মাছ ধরার নৌকারা সব ভোরবেলা ফিরত! নৌকা-বোঝাই ইলিশ মাছ এসে থামত নদীর পাড়ে!
মিষ্টিদাদু বলত, ‘মেঘনার ইলিশকে বলে রুপোলি ফসল!
বলত নদীর বুকে নৌকায় ঘুরে বেড়ানোর কথা। নানান খালের ওপর দুটোমাত্র বাঁশ দিয়ে তৈরি করা সাঁকো পেরিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা!
কাছের চিনিকলে আসা সন্ডার্স সাহেবের কথা! তাঁর মেয়ে এলিজাবেথের কথা! গোলাপি ফ্রক আর হলদে স্যাটিনের ফিতে দিয়ে চুল বেঁধে মেঘনার পাড়ে কাজের লোকেদের সঙ্গে ঘুরতে যেত এলিজাবেথ! মিষ্টিদাদু দূরে দাঁড়িয়ে দেখত। এলিজাবেথ হাসত মিষ্টিদাদুকে দেখে। কথা বলত! ওদের বাড়িতেও যেত দাদু। কখনও কখনও মাকে দিয়ে ইলিশ মাছ রান্না করিয়েও নিয়ে যেত! বাবার থেকে লুকিয়ে নাকি মিষ্টিদাদুর মা, মানে মাম রান্না করেও দিত! এলিজাবেথের কাঁটা বেছে খেতে অসুবিধে হলেও, স্বাদের টানে খেয়ে নিত! একবার নাকি গলায় কাঁটাও ফুটেছিল এলিজাবেথের!
কোনও কিছুই লুকিয়ে থাকে না। তাই মিষ্টিদাদুর বাবা, মানে আমাদের কাছে যে বুড়ো দাদু, একদিন সব শুনে খুব মেরেছিল দাদুকে। বলেছিল যে কোনওদিন যেন সাহেবদের বাড়ি আর না যায়!
জীবনে প্রথম ও শেষবার বাবার মুখে মুখে জবাব দিয়েছিল দাদু। বলেছিল, 'কেন গেলে কী হবে? ও তো আমার বন্ধু হয়!’
মাস চারেক পরে চলে গিয়েছিল সন্ডার্স সাহেব! মিষ্টিদাদু স্কুল যাওয়ার পথে এক সকালে দেখেছিল সেই বিশাল বড় সাহেব বাংলো ফাঁকা! শুধু দুটো কাঠবিড়ালী ঘুরে বেড়াচ্ছে সামনের মাঠে।
এলিজাবেথ তো বলেনি চলে যাবে! তা হলে!
উত্তর দিয়েছিল চিনিকলের গোমস্তার মেয়ে। বলেছিল, 'আসলে কী জানিস বগলা, তুই কষ্ট পাবি, তাই তোকে বলেনি! ও তো তোর বন্ধু হয়!”
‘বন্ধু হয়! বন্ধু হয়!’ মেঘনার পাড়ের ভেজা হাওয়ায় ঘুরে বেড়াত সেই শব্দ! জেলে নৌকার ছোট্ট পালের হাওয়া পালটে যেত বর্ষা থেকে শরতের দিকে। ছাতিমের গন্ধে ভারী হয়ে যেত গ্রামের বাতাস! আচমকা হাওয়ায় মাথা নাড়ত কামারপাড়ার রোগা রোগা সুপুরি গাছগুলো! মোজাম্মেল চাচা খড়বোঝাই গাড়ি নিয়ে ধীরে ধীরে চলে যেত খেতের পাশের মেঠো রাস্তা দিয়ে! তার বলদের গলায় বাঁধা ঘণ্টির আওয়াজ ছোট ছোট প্রজাপতির মতো পাখনা মেলত বিকেলের রোদ পড়ে আসা আকাশে! জাম্বুরা দিয়ে ফুটবল খেলে, ধুলোমাটি মেখে ফেরা ছেলেরা দেখত তাদের টিমের রাইট আউট বগলা মাঠে না গিয়ে বসে আছে মেঘনার পাড়ের বড় মাটির বুরুজটার ওপর। ওই দিকে সূর্য ডুবছে আর তার আভায় কেমন যেন এলোমেলো হয়ে আছে সে!
তারা বুঝত না কেন শুধুমাত্র যে ‘বন্ধু হয়’ তার জন্য এমন কষ্ট পাচ্ছে বগলা!
কিন্তু শুধুই কি বন্ধু? সেই বারো বছর বয়সের আমার মনে প্রশ্ন জাগত! ভালবাসা নামক অনুভূতির জটিল ও দুর্বোধ্য জাল সেই বয়সে সবে আমার সামনে উন্মোচিত হতে শুরু করেছে। তার আলোয় যেটুকু নকশা ফুটে উঠত তার সূত্র ধরে আমি বোঝার চেষ্টা করতাম গোঁড়া ব্রাহ্মণ বাড়ির ছেলেটার কি প্রোটেস্টান্ট সেই বালিকার জন্য মনে মনে মায়া জন্মেছিল!
কে জানে! মিষ্টিদাদু আর কিছু বলত না। কিন্তু মিষ্টিদাদুর ধূসর চোখদুটো কেমন যেন সজল হয়ে উঠত কষ্টে! মানুষ যদি নদী হত তা হলে কি সে এক জীবন আগে ফেলে আসা আবছা কোনও জনপদের জন্য এমন এলোমেলো হয়ে যেত! লেকের জলের দিকে তাকিয়ে মিষ্টিদাদু বলত, ‘কোথায় সেই মেঘনা! কোথায় এই লেক! জীবন কত পালটে গেল!’ বলত, ‘দেশ ভাগ না হলে তুইও বুঝতিস নিজের নদী কাকে বলে!’
বিকেলে লেকের পাড়ে বসে এমন কত কথাই যে জানতাম মিষ্টিদাদুর থেকে। মাঝে মাঝে কথা শুনতে শুনতে শুয়ে পড়তাম ঘাসে। দেখতাম উজ্জ্বল আকাশ ম্লান হয়ে আসছে ক্রমে। বকের দল, সিনারির খাতার ছবির মতো সার বেঁধে কোথায় যেন যাচ্ছে চলে যাচ্ছে নির্বিকার! আকাশে ভেসে উঠেছে চন্দনের ফোটার মতো চাঁদ!
এখন লেক অনেক বদলে গিয়েছে। এখন লেক অনেক বেশি সুন্দর আর আমাদের হেরিটেজ! এখন লেকে সুরক্ষাও অনেক বেশি। জলও কেউ নোংরা করে না আর। আশপাশে নোংরা প্লাস্টিক ফেলে দূষণ ছড়ায় না!
আমি ভাবি, আমার ছোটবেলায় যদি এই লেকটা পেতাম! যদি আমার মিষ্টিদাদু এই লেকটা দেখত! মাঝে মাঝে ভাই, বন্ধুদের সঙ্গে লেকে যাই। আর আমার মিষ্টিদাদুর কথা মনে পড়ে খুব। শেষ বিকেলে যখন ঝরঝর করে হাওয়া দেয়, লিলি পুলের দিকে সূর্যটা ডুবতে শুরু করে, তখন কেন যে এমন মনখারাপ করে! বুঝতে পারি না।
আসলে কিছুই যেন বুঝতে পারি না! শুধু মনে হয় আমার রক্তেও কি বইছে মেঘনার স্রোত? তাই কি নদীর দিকে আমার এত টান! আমি স্থির হয়ে জলের দিকে তাকিয়ে থাকি। জলের ওপর নুয়ে পড়া গাছে রুমঝুম শব্দ ওঠে! নরম আলো আর বাতাসে ডুবে যায় সবকিছু! আমি মনে মনে শুধু ওই শান্তি আর নিরালাটুকুই ধরে রাখি। মনে মনে আমার মিষ্টিদাদুর হাতটা ধরে রাখি। আর সব ভুলে যেতে চাই!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন