ছোটবেলার স্কুল

স্মরণজিৎ চক্রবর্তী

আমার ছোটবেলার স্কুলের মতো সুন্দর স্কুল আমি জীবনে সেভাবে আর দেখলাম না। আমার, বা বলা ভাল আমাদের স্কুলটার নাম ছিল বাটানগর নার্সারি অ্যান্ড কিন্ডারগার্টেন স্কুল। দুটো নার্সারিসহ ওয়ান থেকে ফোর অবধি ছিল এখানে।

বাটানগরের একদম শেষপ্রান্তে ছিল আমাদের সেই স্কুলটা। অনেকটা ছড়ানো জায়গার ওপর একতলা স্কুলবাড়ি। সেখানেই প্রায় সব ক্লাসঘর। এই বিল্ডিংয়ের পাশে মাঠ। আর মাঠের অন্য প্রান্তে আরেকটা আলাদা ঘর। ক্লাস ওয়ানের রুম। এই মাঠের এক ধারে ছিল দোলনা। পাশেই স্লিপ বা স্লাইড। আর এর পেছনে সি-স বা যাকে বাংলায় বলে ঢেঁকি!

মূল স্কুল বিল্ডিংয়ের সঙ্গে ওই একলা দাঁড়িয়ে থাকা ঘরটা একটা ইটের রাস্তা দিয়ে যোগ করা ছিল। মাঠের উত্তরদিকে ছিল একটা দেবদারু বীথি। সেই দেবদারু বীথিতে আমাদের প্রেয়ার হত!

ক্লাসরুমগুলো ছিল বিশাল মাপের। আর একটা দিক সম্পূর্ণ খোলা। যখন স্কুল বন্ধ হত, তখন বড় বড় কাচের ভাঁজ-করা দরজা দিয়ে লক করে দেওয়া হত ক্লাসরুমগুলো। প্রতিটা ক্লাসের মেঝের রং ছিল আলাদা। আর সবকিছু ঝকঝক করত। মাথার ওপর ফ্যান থাকত দুটো বা তিনটে করে। আমাদের ক্লাসের চেয়ার-টেবিলগুলো ছিল একদম অন্যরকম। না, এখানে টানা বেঞ্চ বা ডেস্কে আমাদের বসতে হত না। আমাদের সবার জন্য ছিল আলাদা আলাদা কাঠের হাতলওলা চেয়ার আর টেবিল। চেয়ার-টেবিলগুলো লাল, সবুজ আর ঘিয়ে রং করা ছিল। শুধু ক্লাস ফোরের চেয়ার-টেবিলগুলো ছিল লোহার। ফোল্ডিং।

আমাদের স্কুলটা ছিল ইংলিশ মিডিয়াম। তবে টিচারদের ম্যাডাম বলতে হত না। টিচারদের আমরা বলতাম ‘আন্টি’! প্রতিটা ক্লাসের একজন করে আয়াদিদি থাকতেন। তাদেরকে দিদি বলতে হত। যেমন গীতাদি, ইলাদি, পুষ্পদি আর কাঞ্চনদি। এদের মধ্যে পল্পদি থাকতেন স্কুল কম্পাউন্ডের মধ্যেই। তাঁর স্বামীর কী নাম ছিল আমরা জানতাম না। আমরা সবাই তাকে মালিদা বলতাম। কারণ স্কুলের চারিদিকে যে ফুলগাছ ছিল সেইসব দেখাশুনো করার ভার থাকত মালিদার ওপর।

আমাদের স্কুলের ড্রেস ছিল লাল সাদায়! ছেলেদের ছিল লাল প্যান্ট সাদা জামা। আর মেয়েদের সাদা শার্ট সঙ্গে লাল টিউনিক! পায়ে সাদা মোজা। ছেলেরা পায়ে দিত নটি বয় শু আর মেয়েরা ব্যালেরিনা!

স্কুলের বাস ছিল একটা। মানে ঠিক বাস নয়, অনেকটা বড় ভ্যান ওয়াগন ধরনের। গাড়িটা দেখেই বোঝা যেত যে অনেক পুরনো। খুব বেশি কিছু স্পিডও উঠত না। কখনও একটু জোরে চালালেই বুড়ো গাড়ির সামনে থেকে কেমন যেন গোঙানি শুরু হত। স্টিয়ারিং হুইলের মাঝে একটা বোতাম থাকত। সেটা টিপলে ওঙা-ওঙা করে অদ্ভুত স্বরে হর্ন বাজত। আমাদের সবার লক্ষ্য থাকত একবার অন্তত ওই হর্নটা বাজাব!

স্কুলবাসের দুটো ট্রিপ হত। আমরা ছিলাম ফার্স্ট ট্রিপের স্টুডেন্ট। নিউল্যান্ড মোড় থেকে উঠতাম বাসে। আগে বাস এলে বাসে ওঠার জন্য সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ত যেমন শিয়ালদায় ট্রেন ঢুকলে সবাই ঝাঁপায়। আমার মিষ্টিদাদু লাইন করে বাসে ওঠার প্রথাটা চালু করে। ছেলেমেয়েদের ছাড়তে আসা সব বাবা-মায়েরা মিষ্টিদাদুর কথা মানত খুব। সেই লাইন করে বাসে ওঠার নিয়ম অনুযায়ী, আমরা সবাই যে যার নিজের ওয়াটার বটল দিয়ে লাইন রাখতাম।

স্কুলে আমাদের কোনও প্রেয়ার হল ছিল না। বরং ছিল একটা দেবদারু বীথি। ঘন করে লাগানো দেবদারু গাছের সারির নীচে আমরা প্রার্থনার জন্য সার বেঁধে দাঁড়াতাম। লাইনটায় দাঁড়াতে হত বেঁটে থেকে লম্বা অনুযায়ী। আমি যেহেতু সবচেয়ে বেঁটে ছিলাম তাই সারা জীবন সব ক্লাসে লাইনের সামনে আমাকে দাঁড়াতে হত!

প্রথম প্রথম যে গানটা গাইতে হত তা হল— ‘শাশ্বত চির তুমি...' তারপর গানটা পালটে দিয়ে করা হয়েছিল— ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে...'

আমার কিছুতেই গানের শব্দ মনে থাকত না (যেমন এখনও কোনও গানের লাইন মনে থাকে না)। কিন্তু সবাই মিলে যখন গাইতাম তখন সুরের টানে ঠিক গেয়ে দিতাম! আমাদের ক্লাস শুরু হত এগারোটায়। পরপর চারটে ক্লাস হত। তারপর মাঝে পঞ্চাশ মিনিটের একটা টিফিন ব্রেক থাকত। আর তারপর আবার ক্লাস। এবার তিনটে। বেলা চারটের সময় শেষ হত স্কুল।

টিফিন আওয়ার্সে আমাদের লাইন করিয়ে নিয়ে যাওয়া হত হাত ধোওয়াতে। ‘হামাম’ সাবান নিয়ে একজন আয়াদিদি দাঁড়িয়ে থাকতেন ট্যাপের কাছে। আমরা তাঁর তত্ত্বাবধানে হাত ধুতাম। হামাম সাবানের গন্ধ যেন ভেসে থাকত হাওয়ায়!

ক্লাসে ফিরে আমাদের প্রেয়ার করতে হত। ‘Thank you God for world so sweet...' । তারপর কোলের ওপর তোয়ালে পেতে যে যার টিফিন খেতাম! তবে শান্তভাবে নয়, আমরা টিফিন খেতাম গোগ্রাসে! কারণ খেলতে হবে যে! আসলে মাঝের ওই টিফিন ব্রেকটাই ছিল আমাদের ফুটবল খেলার ব্রেক।

আমরা নিজেরা কেউ না কেউ বল নিয়ে যেতাম। বল মানে খুব বড় বল নয়৷ অধিকাংশ সময়ে ক্যাম্বিসের টেনিস বল। তবে কেউ কেউ আরেকটু বড় বাতাবি লেবুর মাপের রাবারের বলও আনত।

ক্লাস টু থেকে আমরা খেলায় চান্স পেতাম। আমি, সঞ্জয়, শোভন আর সুমিত ছিলাম নিয়মিত প্লেয়ার। পরে অমর্ত্য, সোমনাথ, বিবেক, কৌশিকও খেলত। বড় দাদাদের সঙ্গে টিম করে মিলিয়ে মিশিয়ে খেলা হত! এখনও মনে আছে পার্থদা, অরিন্দমদা, সোমশুভ্রদাদের কথা। তবে সবচেয়ে বেশি মনে আছে কৃশানুদার কথা !

তখন আমার হিরো কলকাতা তথা ভারতীয় ফুটবলের শেষ জাদুকর কৃশানু দে! তো তার নেমসেক ছিল কৃশানুদা। কৃশানু গুহ। ছোটখাটো, ছিপছিপে চেহারা ছিল কৃশানুদার। কিন্তু পায়ের যা কাজ ছিল তাতে আমি ও আমরা হাঁ করে দেখতাম! আমরা সবাই নিশ্চিত ছিলাম এই ছেলে বড় হলে ইন্ডিয়ার হয়ে ফুটবল খেলবে!

কৃশানুদা কিছুদিন ফুটবল খেললেও স্কুলের পরে আর ফুটবল খেলেনি। কেন খেলেনি কে জানে! এখনও আমার সঙ্গে কশ্চিৎ দেখা হলে আমি কৃশানুদাকে বলি সেই খেলার কথা, আমার মুগ্ধতার কথা! কিন্তু কৃশানুদা তার উত্তর দেয় না। শুধু হাসে। এমন করে কত কৃশানু যে হারিয়ে গেল কে জানে!

আর ছিল চিরদা। পুরো নাম আজ আর মনে নেই। শুধু ‘চিরদা’-টুকু মনে আছে।

তারও ছিল দারুণ পায়ের কাজ। বডি ফেইন্ট! আর খুব মিষ্টি ব্যবহার ছিল। সবাই মিলে আমরা দল করে খেলতাম। একদিকের গোলপোস্ট ছিল দুটো দেবদারু গাছ। আর অন্যদিকের গোলপোস্ট ছিল গুটিয়ে রাখা দোলনা।

পরে অনেক ফুটবল খেলেছিল। ম্যাচ খেলেছি। কিন্তু সেই ছোটবেলার উত্তেজনার কথা ভাবলে আজও মন ভাল হয়ে যায়!

আমাদের স্কুল ছিল কো-এডুকেশন। আর খুব বেশি স্টুডেন্ট যে পড়ত এমনটা নয়। আমার কাছে ছেলে আর মেয়ে আলাদা বলে কিছু ছিল না। মানে মেয়েরা যে আমাদের চেয়ে আলাদা সেটা আমার কোনওদিন মনে হয়নি। কিন্তু ক্লাস থ্রি-তে উঠে আমার প্রথম জ্ঞানচক্ষু খুলেছিল।

একদিন দেখলাম ক্লাসের মধ্যে দুটি ছেলে আর তিনটি মেয়ে সবার দিকে তাকিয়ে হাসছে আর লাফাচ্ছে! কী ব্যাপার! ছুটির সময় আমায় বলা হল, ক্লাসে নাকি একজনের সঙ্গে অন্যজনের প্রেম!

প্রেম! আমি চমকে উঠেছিলাম! বলে কী! প্রেম তো বড়রা করে! তাও লুকিয়ে! আমি যে আমাদের পাড়ায় দেখেছি! সেখানে এই ক্লাস থ্রি-তে প্রেম! আর আমি নাকি একটা মেয়েকে ভালবাসি! এদিকে সেটা আমিও জানি না! তা ছাড়া প্রেম আমি কেন করতে যাব? আমার কি ফুটবলের বাইরে অন্য কিছুর জন্য সময় আছে!

কিন্তু সব ক্লাসের মতো আমাদের ক্লাসেও কিছু মোড়ল ছিল। তারা ক্যাঙারু কোর্ট বসিয়ে নিদান দিল যে এর সঙ্গে ওর প্রেম! যাঃ বাবা! আর এও বলা হল যার সঙ্গে যার প্রেম তাদের মধ্যে কথা বলা বন্ধ!

এ কীরকম প্রেম রে ভাই যে কথা বলা যাবে না! তবে আমি খুশি হয়েছিলাম এই ভেবে যে আমার তো বর্ণালীর সঙ্গে কথা বলতে সবচেয়ে ভাল লাগে। ভাগ্যিস ওর সঙ্গে আমার নাম জড়ায়নি!

কিন্তু সত্যি বলতে কী আমায় এসব কিছু ছোঁয়নি! সেই পঁচাশি সালে আমি ফুটবল নিয়ে বড্ড ব্যস্ত থাকতাম। মনে মনে উত্তেজিত হয়ে ভাবতাম পরের বছর ওয়ার্ল্ড কাপ ! কিন্তু আমি গুরুত্ব না দিলেই তো আর পৃথিবী চুপ করে বসে থাকবে না! কে যেন কায়দা করে এসব প্রেমের নামপত্তর এ ‘প্লাস' ও সহযোগে ওয়াশরুমের দেওয়ালে লিখে এল। ব্যাস! কেলেঙ্কারি!

আমাদের হেড মিস্ট্রেস ডেকে পাঠালেন সবাইকে! তারপর আমাদেরকে অফিস রুমে দাঁড় করিয়ে নরমে গরমে কী বকা! আমার কানে যদিও কিচ্ছু ঢুকছিল না! কারণ এসব প্রেম-ফেমের মতো ফালতু জিনিস নিয়ে আমি কোনওদিনই বদাড ছিলাম না। আমার শুধু মনে হচ্ছিল টিফিন আওয়ার চলে যাচ্ছে। কৃশানুদা, অরিন্দমদা, পার্থদারা কতটা খেলা খেলে ফেলল!

মনে আছে হেড আন্টির ঘর থেকে বেরিয়ে গায়ের থেকে বালি ঝাড়ার মতো করে সব বকা আর বোঝানো ঝেড়ে ফেলে দিয়ে কয়েকজন বলেছিল, 'আমরা নাকি ভাই বোন! ভাগ!’

বর্ণালীকে আমায় বোন ভাবতে হবে? না, ব্যাপারটা আমারও মনঃপূত হয়নি! কিন্তু কেন মনঃপূত হয়নি! আমি তো ফুটবলের জন্য বলিপ্রদত্ত! তা হলে? তা হলে কি পাথরের তলায় ছোট্ট কোনও চারাগাছের জন্ম হয়েছিল?

আরও কিছু পরে যখন হাইস্কুলে উঠেছিলাম তখন বুঝেছিলাম ব্যাপারটা! সেই বয়েজ স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরে সব বান্ধবীদের সঙ্গেই সম্পর্ক শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তার মধ্যে আমার বর্ণালীর জন্য মনখারাপ করত শুধু। কেবলই চোখের সামনে ভাসত ওর নীল স্কুলব্যাগ! হাসলে গালে জেগে ওঠা গভীর ঘূর্ণি। টোল!

আজ সেইসব দিনের থেকে অনেক অনেক দূরে সরে এসে এসব কথা মন ভাল করা স্মৃতির মতো হয়ে আছে বলেই বলতে পারলাম হয়তো। হয়তো এজন্যও বলতে পারলাম কারণ এসব এখনকার এই স্মরণজিতের জীবনের কিছু নয়। এসব সেই হারিয়ে যাওয়া গত জন্মের স্মরণজিতের স্মৃতি!

আমাদের স্কুলে স্পোর্টস হত বিশাল করে। বাটা কোম্পানির নিজের স্কুল বলে কোম্পানি স্পোর্টসটা করত দারুণভাবে।

স্কুল কম্পাউন্ডের বাইরে ছিল তিনটে বিশাল খোলা মাঠ। তার একটায় হত স্পোর্টস। আমাদের সবাইকে নাম দিতেই হত এই স্পোর্টসে। নানান রকমের দৌড় প্রতিযোগিতা ছিল। যেমন ম্যাথস রেস, স্পুন রেন, বিস্কিট রেস, স্যাক রেস, স্কিপিং রেস, মিউজিক্যাল চেয়ার ইত্যাদি ইত্যাদি। আর ছিল সবার শেষে রিলে রেস!

বাবা-মায়েদের জন্যও রেস ছিল। পেরেন্টস রেস। আমার বাবা বা মা কোনওদিন আমার স্কুলে যায়নি। ভাইপো মানে সেজকাকাই যেত। যেহেতু ভাইপোর ছেলে মানে আমার খুড়তুতো ভাইও ওই স্কুলে পড়ত তাই দু'জনকে নিয়ে ভাইপোই যেত!

আর প্রতিবার ভাইপো রেসে কিছু না কিছু একটা জিততই! এমনকি আমি ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময় দেখেছিলাম ভাইপোর পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে গিয়েছে একটা হকি ম্যাচ খেলতে গিয়ে। সেই নিয়েও সেবার ভাইপো পঞ্চাশ মিটারে সেকেন্ড হয়েছিল।

স্পোর্টসে দারুণ দারুণ প্রাইজ দেওয়া হত। আর দেওয়া হত অনেক লজেন্স আর মিষ্টির প্যাকেট! এবং সবার শেষে সবাইকে একটা করে গিফটও দেওয়া হত।

স্পোর্টসে আমি ভালই ছিলাম। ক্লাস ওয়ানে প্রথমবার স্পোর্টসে তিনটে বিভাগে ফার্স্ট হয়েছিলাম। এত প্রাইজ দিয়েছিল স্কুল থেকে যে ভাইপোর সঙ্গে সাইকেল করে সেইসব প্রাইজ বাড়িতে আনতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল। মনে আছে সেদিন লোডশেডিং ছিল। বাড়ির সামনে সাইকেল থেকে নামামাত্র ভাই, বোন আর দিদি দৌড়ে এসেছিল! আমার মা সেই প্রাইজগুলো সবাইকে সমানভাবে ভাগ করে দিয়েছিল। আমি জিতেছিলাম বলেই সবকিছুর ওপর যে আমার অধিকার ছিল, তা কিন্তু নয়!

এ ছাড়াও মনে আছে ক্লাস ওয়ান থেকে থ্রি অবধি অঙ্ক রেসে প্রতিবার ফার্স্ট হওয়ায় বাটা কোম্পানির তখনকার জেনারেল ম্যানেজার মিস্টার বহুগুণার স্ত্রী, মিসেস বহুগুণা আমায় একটা স্পেশাল প্রাইজ দিয়েছিলেন!

ভিকট্রি স্ট্যান্ডে প্রাইজ দেওয়ার সময় আমায় জিজ্ঞেস করেছিলেন আমি কী খেলতে ভালবাসি? এ আবার কেউ জিজ্ঞেস করে? পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খেলাটি কী? ফুটবল! সেটাই বলেছিলাম।

স্পোর্টস হয়ে গিয়েছিল জানুয়ারি মাসে। আর জুন মাসে আমাদের স্কুলে আমার নামে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল স্পেশাল প্রাইজ! একটা লাল, আর বাদামি চামড়া দিয়ে বানানো নতুন ফুটবল!

সেদিন ফুটবল নিয়ে স্কুলবাস থেকে নামার পরে মিষ্টিদাদু আমার হাত থেকে নাইলনের বড় বড় খোপের নেটের ব্যাগে রাখা ফুটবলটা নিয়ে হাতে ঝোলাতে ঝোলাতে বাড়ি ফিরেছিল। আর বাড়ি ফেরার পথে সবাইকে বলছিল, ‘আমাদের বাড়ির ছেলে তো! স্পোর্টসে স্পেশাল প্রাইজ পাবে এ আর আশ্চর্য কী!’

না, স্পোর্টসে আমি জীবনে কিছুই করতে পারিনি। জীবনের নানান গোলকধাঁধায় আমার মধ্যেকার প্লেয়ারটা হারিয়ে গিয়েছে সেই কবে! শুধু স্পোর্টসম্যানটা বেঁচে আছে হয়তো! তাও এইসব স্মৃতির দিকে তাকালে মিষ্টিদাদুর সামনে সামনে সেই তিড়িং বিড়িং করে বাড়ি ফিরতে থাকা ন' বছরের ছেলেটাকে আমার নিজের চেয়ে অনেক বেশি সফল আর সুখী বলে মনে হয় ।

এ ছাড়াও ছিল স্কুলের ফাংশন। বাটানগরে, গঙ্গার ধারে একটা পাঁচিল ঘেরা এলিট কলোনি ছিল। আমরা বলতাম সাহেব কলোনি। কেউ কেউ আবার কে জানে কেন সেটাকে বলত চায়না কলোনি!

এখানে বাটা কোম্পানির এ গ্রেড অফিসারদের বাংলো ছিল। আর ছিল একটা ক্লাব। বাটা ক্লাব। সেই ক্লাবে হত আমাদের অ্যানুয়াল ফাংশন।

বাটা ক্লাবটা ছিল দারুণ সুন্দর সাজানো। বিশাল বড় একটা অডিটোরিয়াম ছিল সেখানে। পুরো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত। আর ছিল একটা সুইমিং পুল। নীল টালি বসানো। এই ক্লাবেই আমাদের ফাংশনের ড্রেস রিহার্সাল আর মূল অনুষ্ঠান হত।

এই ক'দিন স্কুলে ক্লাস করতে হত না আমাদের। স্কুল থেকেই খাবার দেওয়া হত। আর বাটা ক্লাবে গেলে পাওয়া যেত অঢেল কোল্ড ড্রিঙ্ক!

আমি দু'বার নাটকে অভিনয় করেছিলাম। একটা ছিল ‘হারাধনের দশটি ছেলে' আর অন্যটি ‘ভারতমাতা’। আর সেই দুটিতে অভিনয় করেই বুঝেছিলাম আমার কাজ স্টেজের ওপরে নয়। বাইরে। সবার চোখের আড়ালে।

তবে ফাংশনের মজা ছিল সবাইকে দেওয়া প্রাইজের জন্য। স্পোর্টসের মতো এখানেও দারুণ দারুণ সব প্রাইজ দেওয়া হত। আর সবার শেষে বাড়তি পাওনা ছিল ছুটি। স্কুল কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করতেন যে ফাংশনের পরে ক'দিন স্কুল ছুটি থাকবে! সারা বছরের ছুটিতে যত না মজা হত, তার চেয়ে বেশি মজা হত এই ছুটিটায়। এ যেন ছিল ফাউয়ের ফুচকা।

আমাদের স্কুলে মর্নিং ক্লাসও হত। সেটা হত গরমের ছুটির একমাস আগে। সকালে ঘুম থেকে উঠতে হলে আমার গায়ে জ্বর আসত। ফলে মর্নিং স্কুলের প্রথম কয়েকদিন আমার অসুবিধে হত খুব। তারপর শুরু হত ভাললাগা।

সকালবেলার বাটানগর যে কী সুন্দর ছিল! সোনার মতো রোদ উঠত। ঘাসের মাথায় শিশির ফুটে থাকত বুদবুদের মতো। আর ছিল গুলমোহর গাছ। আমরা বলতাম কৃষ্ণচূড়া! তার ফুলে লাল হয়ে থাকত গাছের তলা। সবুজ কুঁড়ি পড়ে থাকত ঘাসে। আমরা সেই কুঁড়ি কুড়িয়ে নিতাম। তারপর সেটার থেকে বের করতাম পুংকেশর। একে অপরের সঙ্গে সেই পুংকেশর দিয়ে প্যাঁচ খেলতাম! আমাদের স্কুলে এটা খুব বিখ্যাত খেলা ছিল। আমার মনে আছে আমি লিরিল আর বর্ণালীর জন্য অনেক কুঁড়ি কুড়িয়ে নিয়ে যেতাম!

গরমের ছুটি পড়ত যেদিন সেদিন স্কুল ড্রেস পরতে হত না। যে যেমন খুশি জামা পরে যেতে পারত! আমি পাজামা-পাঞ্জাবিই পরতাম। এই দিনটা ছিল দারুণ আনন্দের! এদিন স্কুলে রবীন্দ্র জয়ন্তী হত! আমাকে কিছু না কিছু নিজের লেখা পড়তে হত! আমার লিখতে একটুও ভাল লাগত না। তাই আমার অধিকাংশ লেখাই মা লিখে দিত।

ক্লাস টু অবধি আমার রেজাল্ট ভাল হত না। আমার ভাই সেদিক দিয়ে খুব ভাল রেজাল্ট করত। ও, হয় ফার্স্ট নয় সেকেন্ড হতই! আর আমি বত্রিশ জন স্টুডেন্টের মধ্যে এই চব্বিশ মতো র‍্যাঙ্ক করতাম। মনে আছে এক আন্টি বলেছিলেন, ‘তোমার ভাই এত ভাল পড়াশুনোয় আর তুমি একটা গাধা!’ ‘গাধা' শুনে আমার খারাপ লাগেনি একটুও! কারণ ওটা আমি আমলই দিইনি! ভাই ফার্স্ট হয়েছে এটাই যে আসল আনন্দের খবর! তখন থেকেই আমি আজও চেষ্টা করি খারাপ আর ভাল একসঙ্গে মিশে থাকলে ভালটুকু শুধু কুড়িয়ে নিতে।

তারপর ক্লাস থ্রি থেকে কী যে হল, আমার রেজাল্ট ভাল হয়ে গেল আচমকা। কেন হল কে জানে! কিন্তু আমি ফোর্থ হয়ে গেলাম। আর সেটাই যেন থ্রি আর ফোর-এ আমার স্বাভাবিক রেজাল্ট হয়ে গেল। কোনও সাবজেক্ট-এ হায়েস্ট নাম্বার পেলে আমাদের মেরিট কার্ডও দেওয়া হত। এখনও বেশ কিছু মেরিট কার্ড আমার কাছে রয়ে গিয়েছে!

স্কুলের আন্টিরা ছিলেন খুব ভাল। আদরে শাসনে এমন করে রাখতেন যে আমাদের স্কুলে যেতে ইচ্ছে করত। এখনও অর্চনা আন্টি, দুর্গা আন্টি, স্মৃতি আন্টি, কল্যাণী আন্টি, আরতি আন্টির কথা খুব মনে আছে! মনে আছে আমি খুব বকবক করতাম বলে স্মৃতি আন্টি আমায় একদম সামনে, ওঁর হাতের কাছে বসাতেন! চশমা পরতাম বলে মাঝে মাঝে মজা করে ডাকতেন ‘শিয়াল পণ্ডিত'!

ছিয়াশি সালে এই বাটানগর নার্সারি অ্যান্ড কিন্ডারগার্টেন স্কুল থেকে আমি পাশ করে যাই! যেদিন রেজাল্ট নিয়ে স্কুল ছেড়ে আসব মনে আছে বান্ধবীরা কাঁদছিল খুব। লিরিলের ফর্সা মুখ কেঁদে কেঁদে লাল হয়ে গিয়েছিল। আমার খারাপ লাগলেও চোখে জল আসেনি! কিন্তু আজ এই লেখা লিখতে বসে চোখে জল চলে এল! ছত্রিশ বছর দেরিতে এল!

আসলে এখন বুঝেছি সেই ছোটবেলা আর ছোটবেলার স্কুলের মতো স্বর্গ আর কোথাও নেই! সেই স্লাইড, গুটিয়ে রাখা দোলনা, স্কুলের থেকে দেখা গঙ্গা দিয়ে ভোঁ দিতে দিতে জাহাজ যাচ্ছে, সেই বোগেনভেলিয়ার ঝোপ! কলকে ফুলের বিকেল! রঙ্গন ফুলের মধু! খেলায় গোল করার পর বন্ধুদের জড়িয়ে ধরা! সেই ছোট্ট স্কুলবাস! নীল স্কুলব্যাগ নিয়ে দূরের মাঠ দিয়ে ছোট থেকে আরও ছোট হয়ে মিলিয়ে যাওয়া একটা মেয়ে! গরমের ছুটি পড়ার দিনের সবাই মিলে সেই আনন্দের চিৎকার! আর হামাম সাবানের গন্ধ! এসব যতই লিখি না কেন তাও কী যেন বলা বাকি থেকে যায়! বোতলের শেষে লেগে থাকা হজমির মতো একটা অনুভব যেন রয়েই যায়! যাতে, শত চেষ্টা করেও, শব্দের আঙুল পৌঁছয় না! আর এই না-পৌঁছনো, এই বলেও না-বলা কথাটাই জীবনকে সুন্দর আর মায়াময় করে তোলে!

আর কে না জানে প্রেম, স্নেহ, ভালবাসার চেয়ে মায়া-র জোর আর দাবি চিরকালই অনেক বেশি!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%