রেস্তোরাঁ নয়, রেস্টুরেন্ট

স্মরণজিৎ চক্রবর্তী

'গরিব বাঙাল বাড়ির ছেলে আমি। সারাক্ষণ খিদে পায় আমার! খাবার ছাড়া আর কিছুই বুঝি না! মাথা বাদ দিয়ে বাকিটা আমার পেট!’ বাটানগরে থাকার সময় পিন্টুকাকা এমনটা প্রায়ই বলত! আমার খুব মজা লাগত শুনে। আর আমারও কেন জানি না মনে হত পিন্টুকাকার কথাটা আমার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য! সত্যি বলতে কী এখনও মনে হয় আমার শরীর দুই ভাগে বিভক্ত! একটা হল মাথা আর অন্যটা হল মাথার নীচের থেকে পা অবধি গোটাটা— পেট!

বাটানগরে থাকার সময় আমাদের আর্থিক অবস্থা খুব কিছু ভাল ছিল না। নিম্নমধ্যবিত্তই ছিলাম বলে চলে। আমাদের বড় সংসারটা মূলত আমার বাবার রোজগারেই চলত। ফলে খাবারের ব্যাপারে মা খুব মেপে চলত সবসময়। যদিও সে সময় জিনিসপত্রের দাম খুব বেশি ছিল না। ফলে মাছ রোজই আসত। তবে একবেলা। আর রবিবার আসত মাংস! মিষ্টিদাদু বাজার করতে যেত। মনে আছে রবিবার বাজার যাওয়ার আগে আমাদের জিজ্ঞেস করত, ‘দুই ঠ্যাং, না চার ঠ্যাং?”

আমরা বাচ্চারা সমস্বরে চিৎকার করতাম, ‘দুই, দুই!’ পাঁঠার মাংসের দাম যেহেতু অনেক কম ছিল তাই সেটাই বেশি হত। ফলে আমাদের একঘেয়ে লাগত! আমরা চাইতাম মুরগি হোক! তাই দু' ঠ্যাঙের আবদার!

শুনেছি একসময় আমাদের বাড়িতে পাঁঠার মাংস ছাড়া আর কোনও মাংস ঢুকত না। মিষ্টিদাদুর বাবা আর মা, মানে বুড়োদাদু আর মাম এসব ব্যাপারে খুব গোঁড়া ছিল। কিন্তু বাবাদের জেনারেশনে এসে আস্তে আস্তে নিয়ম শিথিল হতে থাকে! বাড়িতে মুরগির মাংস ঢোকে!

মিষ্টিদাদুর কাছে শুনেছি, যুবক বয়সে দাদু যখন পূর্ববঙ্গে থাকত তখন নাকি একবার মাত্র মুরগির মাংস খেয়েছিল। চাঁদপুর থেকে স্টিমারে করে রেঙ্গুন যাওয়ার পথে মিষ্টিদাদু এই কাণ্ডটা ঘটিয়েছিল! সেটা তখনকার যুবকদের কাছে নাকি ছিল এক ধরনের অ্যাডভেঞ্চার!

যাই হোক, বাটানগরে আমাদের বাড়িতে রবিবার করে মাংস হত। তবে শুধু দুপুরবেলা। আমরা খেতে বসে পেতাম দু'পিস মাংস সঙ্গে একপিস আলু। আর রাতেরবেলা বরাদ্দ ছিল শুধু আলু আর ঝোল !

এ ছাড়া ডিমও হত কখনও কখনও। দেখতাম মা আর কাকুমা সেদ্ধ ডিমকে সুতো দিয়ে কেটে অর্ধেক করছে। তারপর ঝোল বানাচ্ছে সেটা দিয়ে। সবার কপালেই ওই অর্ধেক ডিম জুটত। আমার ডিমের কুসুমটা খেতে কী যে ভাল লাগত! মনে আছে আমি সেই অর্ধেক কুসুম জমিয়ে রাখতাম। তারপর খাওয়ার শেষে সেই কুসুমের সঙ্গে কোনও একটা তরকারির আলু, দু' ফোঁটা ঝোল, লেবুর রস আর নুন মেখে নিতাম! তারপর একটু একটু করে খেতাম! এ ছিল আমার নিজস্ব রেসিপি! আর কী যে অসাধারণ খেতে লাগত! কোনও কিছুর সঙ্গেই সেই স্বাদের তুলনা হবে না!

এ ছাড়াও রাতে মাঝে মাঝে অনেকটা আটার সঙ্গে দুটো ডিম মিশিয়ে পেঁয়াজ আর লঙ্কাকুচি দিয়ে মেখে ডুবো তেলে ভেজে আলুর চপের মতো দেখতে একটা অদ্ভুত ধরনের বড়া তৈরি করা হত। সেই বড়া আর ডাল দিয়ে বাড়ির সবাই খেয়ে নিত। দুটো ডিমেই অতগুলো লোকের হয়ে যেত!

যেহেতু খাবারদাবারে বৈচিত্র্য বা পদ বেশি থাকত না তাই বোধহয় স্বাদ বাড়াবার জন্য পাতিলেবু রাখা হত। আমি সবকিছুর সঙ্গেই লেবু খেতাম! আর সেই লেবু খাওয়ার অভ্যেস আমার এখনও রয়ে গিয়েছে!

বাড়িতে যেহেতু এমন খাবারদাবার হত, তাই আমার বাইরের খাবারের দিকে আগ্রহ ছিল খুব। বাটানগরে সেভাবে রেস্টুরেন্ট ছিল না। বাটার ভেতরে কো-অপারেটিভ স্টোর্সের পেছনে সার্ভিস মার্কেট বলে একটা খাবার দোকান ছিল। সেখানে কাটলেট, মোগলাই পরোটা আর ভেজিটেবল চপ পাওয়া যেত। সেখানে খেতে যেতাম বছরে এক বা দু'দিন! হয়তো মা আর পিসির সঙ্গে যেতাম একদিন। আর পুজোর আগে ভাইপো যেদিন আমাদের সবাইকে জুতো কিনে দিত সেদিন ভাইপোই সবাইকে নিয়ে যেত ওখানে।

মায়ের সঙ্গে কলকাতায় কেনাকাটি করতে গেলে কখনও কখনও গড়িয়াহাট মোড়ের একটা রেস্টুরেন্টে যেতাম! তাও খুব কম।

খাবারদাবারের ব্যাপারটা অনেকটাই পালটে গিয়েছিল কলকাতায় আসার পর। আমাদের বড় পরিবার কলকাতায় আসার পর ভেঙে গিয়েছিল। মিষ্টিদাদু আর পঙ্কা আমাদের সঙ্গে এলেও বাকিরা বাটানগরেই থেকে গিয়েছিল। আর ততদিনে সবাই মোটামুটি নিজের মতো দাঁড়িয়ে গিয়েছে। লোকজন কমে যাওয়ায় বাবার ওপর চাপ কমে গিয়েছিল। আর বাবার ব্যবসাও তখন আগের চেয়ে ভাল চলছিল। ফলে কলকাতায় আসার পরে আমাদের খাবারদাবারের মান বেড়ে গেল!

মায়ের হাতের রান্না ছিল অসাধারণ। সবাই বলত অন্নপূর্ণা! এত স্বাদ কিন্তু খানিকটা খেলেই পেট ভরে যায়! কলকাতায় আসার পরে মা নানান রকম রান্না করত। সেই আটা ডিমের বড়া আর খেতে হত না! আর কলকাতায় আসার পর জানতে পারলাম যে মানুষজন গোটা ডিমও খায়!

আর এই সময় থেকেই বাইরে খাবার ব্যাপারটা বাড়ে।

আমার বাবা খেতে ভালবাসত খুব। বাবাই মূলত বাইরে নিয়ে যেত খেতে! রেস্টুরেন্টে নিয়ে যেত। হ্যাঁ রেস্তোরাঁ নয়, রেস্টুরেন্ট! আমরা অমনই বলতাম।

নন্দী স্ট্রিটে একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্ট ছিল। নাম ছিল ‘ক্যাপিটল’। সেখানে বাবা নিয়ে যেত মাঝে মাঝে। সেখানে মিক্সড ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন আর সুইট অ্যান্ড সাওয়ার ফিশ অর্ডার করা হত বেশিরভাগ সময়! তখন ফ্রায়েড রাইসের দাম ছিল যত দূর মনে পড়ে, প্রতি প্লেট কুড়ি-পঁচিশ টাকার মতো। মাংস বা মাছের প্লেট ছিল পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ টাকার মতো।

চাইনিজ আমার বরাবর খুব প্রিয়! ওই যে কোনও কোনও খাবারে হালকা একটা টক ভাব থাকে সেটা আমার দারুণ লাগে! তখনও কিন্তু আমি একবারও বিরিয়ানি খাইনি! আমার বাবা মা অমন ধরনের খাবার ভালও বাসত না।

‘ক্যাপিটল' ছাড়াও বালিগঞ্জ ফাঁড়ির কাছে ‘কোয়ালিটি' নামে একটা রেস্টুরেন্টে গিয়েছি। সেখানে খাবার পরে আইসক্রিমও খেতাম! কে জানে রেস্টুরেন্টের নাম ‘কোয়ালিটি' বলেই বোধহয় আইসক্রিম খেতাম!

সেই বয়সে পার্ক স্ট্রিটে যে খুব খেয়েছি তা নয়। তাও ‘ওয়াল্ডর্ফ’, ‘কোয়ালিটি’ আর ‘পিটার ক্যাট’-এ খেয়েছি। তবে সেটা এতটাই কম যে সেভাবে স্মৃতি তৈরি হয়নি।

বাবা একটা রেস্টুরেন্টে খুব নিয়ে যেত। সেটার নাম হল 'জিমি'স কিচেন'! মল্লিক বাজারের মোড়ে ছিল সেটা। এখনও আছে। হলদে সাইনবোর্ডের ওপর লাল দিয়ে নাম লেখা থাকত। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেই শান্ত পরিবেশ। মৃদু আলো। এসির ঠান্ডা হাওয়া! আর এসবের সঙ্গে ছিল সয়া সস, টার্টার সস-সহ আরও নানান সস ও রান্নার সুগন্ধ!

চাইনিজ প্যাটার্নের মোটিফ দিয়ে সাজানো ছিল রেস্টুরেন্টটা। নরম চেয়ার। এমনকী খাবারের প্লেটেও অমন মোটিফ থাকত তখন। আর সবেতেই কেমন যেন একটা লালচে রঙের ছাপ। পরে জেনেছি লাল রং নাকি ক্ষুধাবর্ধক!

আরেকটা জিনিস দেখতাম যে খাবারের প্লেটগুলো সামান্য উষ্ণ থাকত! যারা খাবার দিত তারা কী অদ্ভুতভাবে খাবারের প্লেটটা ধরত! আর ওদের রান্না ছিল অসাধারণ! এখানে খেতে গেলে বাবা কিছু না কিছু খাবার প্যাক করে আনতই আনত। এমনকী কখনও কখনও বাবা বাড়ির জন্য এই রেস্টুরেন্টের থেকে খাবার নিয়ে আসত।

শুধু মায়ের সঙ্গে বেরলে মা খুব একটা দামি জায়গায় খেতে নিয়ে যেত না। মা নিয়ে যেত গড়িয়াহাট মোড়ের ‘পূর্বাণী'-তে। বালিগঞ্জ স্টেশনের দিকে মুখ করলে ডানদিকে পড়ত এই রেস্টুরেন্টটা।

রাস্তা থেকে স্বর্গ অবধি উঠে যাওয়ার মতো সোজা আর খাড়াই সিঁড়ি। ভেতরে ঢুকলে দেখা যেত লম্বাটে বসার জায়গা। ডানদিকে কাঠের চেয়ার-টেবিল আর বাঁদিকে পর্দা-টানা কেবিন। ডানদিকে বসলে জানলা দিয়ে ইট বের করা বিশাল একটা বাড়ি দেখা যেত! জেনেছিলাম ওটাই নাকি চন্দ্ৰনাথ বণিকদের বাড়ি!

এই রেস্টুরেন্টের স্পেশালিটি ছিল মোগলাই পরোটা। সঙ্গে পাঁঠার মাংস! সাদা বড় প্লেটে মোগলাই পরোটা দেওয়া হত, যা প্লেটের থেকে বেরিয়ে থাকত! আমার দেখে মনে হত ব্রাউন রঙের একটা খাম কেউ যেন তেলে ভেজে দিয়েছে সামনে!

আর পরোটাটা খেতে ছিল দারুণ। বাটানগরে অরুণাচল ক্লাবের বিশুকাকার ভাষায় ‘হেক্কার’! তবে মা গোটাটা খেতে দিত না। ক্লাস টু-তে পড়ার সময় আমার জন্ডিস হয়েছিল। আর সেটা বেশ কঠিন দিকেই মোড় নিয়েছিল। এ ছাড়াও আমার নানান রকম অসুস্থতা লেগেই থাকত! ফলে আমার শরীর যাতে খারাপ না হয়ে যায় তার জন্য মা সারাক্ষণ চিন্তা করত!

মা আরেকটা জায়গাতেও নিয়ে যেত। ‘সোনালী' রেস্টুরেন্ট! গড়িয়াহাট থেকে যেরাস্তাটা গোলপার্কের দিকে যাচ্ছে সেই রাস্তার ডানদিকে ছিল সেই রেস্টুরেন্ট! তখন গড়িয়াহাটে ফ্লাইওভার ছিল না। চওড়া রাস্তাটাও চওড়া ছিল না অতটা। বরং রাস্তার মাঝে বুলেভার্ডে ছিল নানান দোকান! সোনালী রেস্টুরেন্ট সেই বুলেভার্ডের উল্টোদিকে ডানদিকের ফুটপাথে ছিল।

এই রেস্টুরেন্টে দক্ষিণ ভারতীয় খাবার পাওয়া যেত। ইডলি আমার কোনওদিনই ভাল লাগত না। ধোসাই খেতাম তাই। সেই ছোট বয়সে আমার একটা ধারণা ছিল যে দক্ষিণ ভারতীয় মানুষজন ইডলি ধোসা ছাড়া আর কিছু খায় না। আর আমিষ তো খায়ই না। যদিও পরে সেই ধারণা আমার ভেঙে গিয়েছিল।

এখানকার ধোসাটা ছিল ইয়াব্বড়। আমার ভাল লাগত খেতে। তবে চাইনিজ রেস্টুরেন্টের মতো “সোনালী' রেস্টুরেন্ট অত সাজানো গোছানো ছিল না। বরং কিছুটা পুরনো ধাঁচেরই ছিল।

আমাদের বাড়ির কাছে তখন একমাত্র নামকরা রোলের দোকান ছিল ‘পিপ-ইন’। লেকে ঢোকার রাস্তার মোড়ের কোনায় ইংরেজি ‘এল’ অক্ষরের মতো আকারের দোকান। কাউন্টারে টাকা দিয়ে যে রোলটা কিনতে চাই সেই মতো টোকেন নিতে হত। তারপর পাশের কাউন্টারে সেই টোকেন দিলে কাস্টমারকে নির্দিষ্ট রোলটা দেওয়া হত।

ওদের দোকানের একেকটা রোল বেশ বড় হত। আর তার সঙ্গে ইয়া মোটা। মানে একজন মানুষ একটা রোল খেয়ে নিলেই একবেলার মতো তার লাঞ্চ বা ডিনার হয়ে যেত। ওদের ওই রোল খাবার জন্য বিশাল লাইন পড়ত! এখনও দোকানটা আছে। তবে তাদের রোলের স্বাদ আগের মতো আছে কিনা সেটা আর আমি জানি না।

ওদের রোলের দোকানের পাশে ছিল ‘পিপ-ইন' রেস্টুরেন্ট। দরজা দিয়ে ঢুকে নরম আলো-জ্বলা সিঁড়ির ধাপ বেয়ে উঠতে হত একটু ওপরে। সেখানে বেশ বড় জায়গা নিয়ে রেস্টুরেন্টটা! সে সময় ভেতরটা খুব সাজানো গোছানো ছিল। এখানে ঢুকলেও সয়া সস-সহ আরও নানান খাবারের গন্ধ খিদে বাড়িয়ে দিত!

এখানে একটা ব্যাপার ছিল এই যে আমার বাবা-মা খাবার নিয়ে খুব একটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করত না। চাইনিজ হলে ওই ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন আর সুইট অ্যান্ড সাওয়ার প্রন বা ফিশ। এর বাইরে কিছু অর্ডার করা হত না। আর মোগলাই হলে মোগলাই পরোটা। অর্থাৎ চেনাশুনো খাবার ছাড়া অন্য কিছু অর্ডার করত না। বছরে তিন-চারবার বড়জোর আমরা বাইরে খেতাম। কিন্তু তাতেই খুশি থাকতাম। কিন্তু মনে মনে আমার নানান রকম খাবার খেতে ইচ্ছে করত। যদিও বাবা-মাকে সেসব বলিনি কোনওদিন। শুধু ভাবতাম যবে থেকে একা একা আমি বাইরে খেতে যাব তখন নানান রকম খাবার খাবই খাব!

কলেজে উঠে আমি টিউশনি করতাম প্রচুর। সেই সাতানব্বই সালে আমার মাসিক রোজগার ছিল সাতাশশো টাকা। তখনকার বাজার হিসেবে অনেক! এদিকে আমার কোনও নেশা নেই। এমনকী চা বা কফিও খাই না। ফলে হাতে অনেক টাকা থাকত। আর তার থেকে কিছুটা খরচ হত খাবারে।

কলেজে পড়ার সময় আমার যে মেয়েটির সঙ্গে ভাব ছিল তাকে নিয়ে টুকটাক নানান জায়গায় খেতে যেতাম। চাইনিজ খাবার ছিল বান্ধবীটির সবচেয়ে পছন্দের। তাই অধিকাংশ সময় আমরা চাইনিজ রেস্টুরেন্টেই যেতাম। বিশেষ করে ট্র্যাঙ্গুলার পার্কের কাছের একটা রেস্টুরেন্টে! সিঁড়ি দিয়ে উঠে ওখানে একটা ল্যান্ডিং ছিল। যাতে একটা দরজার মতো খাঁজ ছিল। সেই খাঁজটা ছিল প্রেমিক-প্রেমিকাদের চুমু খাওয়ার জায়গা!

তবে এই রেস্টুরেন্টে কিছুতেই আমি চিলি চিকেন আর সুইট অ্যান্ড সাওয়ার প্রন বা ফিশ অর্ডার করতাম না। এগুলো বাদ দিয়ে একেক দিন একেক রকম চিকেনের প্রিপারেশন অর্ডার করতাম আমরা। ও খাওয়ার পরে আইসক্রিম খেত একটা করে। বাটার স্কচ উইথ চকোলেট চিপস্। আমি খেতাম না। তবে পরে আমিও সেই আইসক্রিমের স্বাদ পেতাম!

এখানে একটা অন্য কথা একটু বলে নিই। ওই রেস্টুরেন্টটার একটা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ওখানে যারাই খেতে যায় তাদের মধ্যে নাকি সম্পর্ক ভেঙে যায়! মানে শুধু যে প্রেমের সম্পর্ক ভাঙে তা নয়। অন্য সব সম্পর্কও নাকি ভেঙে যায়! এটা নিয়ে আমরা বন্ধুরা এখন খুব হাসাহাসি করি! কারণ আমরা সবাই দেখেছি আমাদের সবারই অভিজ্ঞতা এক!

এখন বাইরের খাবার আকছার খাওয়া হয়। সুইগি, জোম্যাটো থাকায় যে কোনও রেস্টুরেন্ট এখন বাড়ির মধ্যে ঢুকে এসেছে। তাই আগেকার মতো বাইরে খেতে যাওয়ার আগ্রহ আর উত্তেজনা এখন আর নেই। এখন বাইরে খাওয়াটা দৈনন্দিন জীবনের একটা অঙ্গ হয়ে গিয়েছে।

কিন্তু সেই মধ্য আশি বা নব্বইয়ের শুরুতে মানুষের জীবন বা দৃষ্টিভঙ্গি একদমই আলাদা ছিল। মধ্যবিত্ত রোজকার জীবন থেকে খরচ বাঁচিয়ে টাকা জমাত। ক্রেডিট কার্ড বলে কিছুর অস্তিত্ব ছিল না। ঋণ করে বাবুগিরি করাকে বাঙালি ঘৃণার চোখে দেখত। সবার জীবনে অনেক বেশি সংযম ছিল। বছরে তিন-চারবার বাইরে খাওয়াটাকেই অনেকে বাড়াবাড়ি মনে করত। আমি এমন অনেক বন্ধুকে জানি ছোটবেলায় যারা একবারও বাইরে খায়নি! সেই সময় থেকে এখন অবধি আসতে আসতে আমাদের ভ্যালু সিস্টেমের আমূল পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে!

এখন সেইসব দিনের দিকে তাকালে সামান্য মনখারাপ করে। ভেবে অবাক লাগে কত অল্পতেই আমি ও আমরা খুশি হয়ে যেতাম। বাইরে খেতে যাওয়াটা একটা উৎসবের মতো মনে হত! সে যত সামান্য খাবারই হোক না কেন আমি যে কী সোনা-মুখ করে খেয়ে নিতাম! বড় হয়ে যাওয়ার পর সবটা কেমন যেন হয়ে গেল!

এখন কোনও রেস্টুরেন্টে গেলে যখন দূর থেকে দেখি অন্য টেবিলে বাবা-মায়ের সঙ্গে কোনও বাচ্চা ছেলে বসে আছে, আমার কী যে ভাল লাগে! আর তার সঙ্গে কী যে মনখারাপ করে! কারণ বাবা-মায়ের সঙ্গে খুব কোথাও তো ঘুরতে যাওয়া হয়নি আমার! শুধু রেস্টুরেন্টে যেতাম আমরা। তাই শুধু বাইরের খাবার নয়, বাবা-মায়ের সঙ্গে বেড়াবার আনন্দও ধরে রেখেছে সেইসব রেস্টুরেন্টগুলো! জীবনে একেকটা জিনিসের সঙ্গে কত কী যে জড়িয়ে থাকে, কোথায় কোথায় যে জড়িয়ে থাকে, আমরা নিজেরাও সবসময় বুঝতে পারি না ।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%