স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
আমাদের মফস্সল শহর থেকে কলকাতায় যাওয়াটা তখন একটা ব্যাপার ছিল। বাবার কাছে শুনেছি, বাবা যখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ত তখন নাকি কয়লার ইঞ্জিনের লোকাল ট্রেন ছিল। আমি সেসব দেখিনি। আশির দশকের গোড়ায় আমার প্রথম স্মৃতিতে কলকাতা যাওয়ার যে ছবি আছে তাতে স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে ইএমইউ কোচের লোকাল ট্রেনের ছবি।
এখন যেমন লোকাল ট্রেন হয় সেরকমই ট্রেন ছিল তখন। শুধু বগি থাকত আটটা। আর শিয়ালদহ-বজবজ লাইন তখন অনেক লাইনের মতোই ছিল সিঙ্গল। মানে ট্রেনের ক্রসিং হত কোনও দু’দিকে প্ল্যাটফর্মওলা স্টেশনে। আর সেটাও হত দুই ট্রেনের মধ্যে বড় রিং-এর আকারে তারের একটা খাঁচার মধ্যে রাখা গোলাকার একটা ধাতব গোলোকের আদানপ্রদানের পরে। একে বলা হত গোলা ।
আমার বেশ মনে আছে সন্তোষপুর, ব্রেসব্রিজ, মাঝেরহাট স্টেশনে দুটি ট্রেন থেমে থাকা অবস্থায় দেখেছি রেলের কর্মীরা ওই তারের খাঁচাটা এক ট্রেন থেকে নিয়ে প্রাণপণে দৌড়চ্ছে সেটি অন্য ট্রেনের গার্ড বা ড্রাইভার কাকে যেন পৌঁছে দেবে বলে!
তখন রেললাইনের পাশে এত বাড়িঘর ছিল না। ব্রেসব্রিজ পার করে ট্রেন যখন একটা সফট কার্ড নিয়ে সন্তোষপুরের দিকে যেত তখন স্পষ্ট বোঝা যেত যে এবার শহর ছেড়ে আমরা মফস্সলের দিকে বাঁক নিলাম। আবার কলকাতা আসার সময় উল্টোটাও সত্যি ছিল।
এই ট্রেনলাইনের ধারেই দেখতাম হোগলা বন। দেখতাম চাষের জমি। ছোট্টবেলায় এই ট্রেনে যেতে যেতে মায়ের কাছ থেকে প্রথম চিনেছিলাম ধানগাছ কেমন দেখতে হয়।
আবছা স্মৃতির বাক্স খুলে মনে পড়ে জীবনে প্রথম স্কুলে ভর্তির পরীক্ষায় যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ধানগাছকে ইংরেজিতে কী বলে? আর কেমন দেখতে হয়! তখন তার উত্তরে আমি আমার ট্রেন সফরের জ্ঞান উজাড় করে দিয়ে বলেছিলাম— 'লম্বা লম্বা চরু চরু'!
সেই একদম শৈশবে ‘স’-কে ‘চ’ উচ্চারণের বয়সে কলকাতায় যাওয়ার সেই ট্রেন সফর খুব কাজে দিয়েছিল। যদিও পরে আমার সেজকাকা মানে সেই ভাইপো আর আমার ন’কাকা মানে পঙ্কা বাকি জীবনটা আমায় ‘চরু’ নামেই ডেকে কাটিয়ে দিল!
তখন আরেকটা ব্যাপার ছিল, ট্রেনের ব্রিজ টপকানো। এখন যেটা নিউ আলিপুর রেল স্টেশন তখন সেটার নাম ছিল কালীঘাট। আর সেটা পার করে টালিগঞ্জ রেল স্টেশনের দিকে যাওয়ার পথে পড়ে আদিগঙ্গা। তার ওপর আছে সেই বিখ্যাত ব্রিজ। ছোটবেলায় সেই ব্রিজটা পার করার সময় আমাদের বলা হত ‘নমো’ করো। মা কালীর উদ্দেশেই ছিল সেই প্রণাম। দেখতাম ট্রেনের অনেক মানুষ অমন প্রণাম করছেন!
আর একটা ব্যাপার ছিল। ওই ব্রিজের লোহার গার্টারের ওপর তখন সার দিয়ে বসে থাকত শকুন! মানে এত শকুন একসঙ্গে খুব একটা কোথাও দেখা যেত না।
যদিও বাটানগরে ক্যাঁচড়াখানা নামক ওয়েস্ট ডাম্পিং গ্রাউন্ডে আমরা শকুন দেখতাম প্রায়ই। কিন্তু এত শকুন এমন সারিবদ্ধ ভাবে কোথাও বসে থাকতে দেখিনি।
ছোটবেলায় নানান জনে নানান রকম ভয় দেখাত। তার মধ্যে একটা ছিল, শকুনের দিকে সরাসরি তাকালে নাকি শকুন এসে চোখ তুলে নিয়ে যায়! ফলে মা কালীকে প্রণাম জানাবার পরে সহজে চোখ খুলতাম না। শুধু কোনও মতে একটু চোখ খুলে তার কোণ দিয়ে দেখতাম শকুনরা আমায় দেখে ফেলল না তো! ট্রেনের ব্রিজ পেরবার ঘটাং ঘটাং শব্দটা শেষ হলেই তবে চোখ খুলতাম।
মায়ের মামার বাড়ি ছিল মুদিয়ালির কাছে লাল পাড়ায়। ঠিকানাটা এখনও মনে আছে। দু'শো কিউ, এস পি মুখার্জি রোড!
মা মাঝে মাঝে সেখানে নিয়ে আসত আমায়। বিশাল বড় ছিল সেই বাড়িটা। কলকাতার মধ্যে বাড়িতে এমন উঠোন! তাতে আবার একটা কাঁঠালগাছ! আর সেই গাছে, ওমা কাঁঠালও হয়েছে! আমি অবাক হয়ে যেতাম।
তখন এস পি মুখার্জি রোডের মাঝখান দিয়ে চওড়া আইল্যান্ড ছিল। তাতে সুন্দর ঘাস থাকত। আর ট্রাম যেত সেই আইল্যান্ড দিয়ে। মনে আছে মায়ের সেই মামার বাড়ি থেকে বেরিয়ে মা আমায় ট্রামে করে নিয়ে যেত গড়িয়াহাটে।
ওর কাছেই ছিল লেক। রবীন্দ্র সরোবর। তখন লেক অঞ্চলটা ছোট উচ্চতার সবুজ ছিমছাম রেলিঙে ঘেরা থাকত। লেকে একটা টয় ট্রেন ছিল। সরোবরে তখন ছোট্ট মোটর বোট চলত।
তখন কলকাতার রাস্তায় এমন অটো ছিল না। ট্রাম না পেলে সিলভার রঙের পাবলিক বাস বা হলুদ কালো ট্যাক্সিই ছিল ভরসা।
বাবার অফিস প্রথমদিকে ছিল বিধান সরণিতে। পরে উঠে এসেছিল পার্ক সার্কাসের কড়েয়া রোডে। যেহেতু নিজেদের ব্যবসা, বাবা তাই মাঝে মাঝে আমাকে অফিসে নিয়ে যেত। যারা অফিসে কাজ করত তারা সবাই ছিল কাকা। আর তারাও আমায় আমার ডাকনাম ‘রাজা’ ও তুই বলেই সম্বোধন করত।
তাদের সঙ্গে গল্প করা। তাদের টিফিন খাওয়া। কাজের ফাঁকে রাবারের বল নিয়ে অফিসের সামনের ছোট্ট জায়গায় একটু খেলে নেওয়া, সবই হত।
কড়েয়া রোডের অফিসে যাওয়ার সময় ট্রেন থেকে নামতাম বালিগঞ্জ স্টেশনে। তারপর ট্রামে করে যেতে হত।
ট্রামে উঠতে কী যে ভাল লাগত। আমি অবাক হয়ে ট্রামের ফ্যানগুলোকে দেখতাম। কী বড়! জাল দিয়ে ঘেরা ফ্যান! আমার ইচ্ছে হত বড় হলে অমন একটা ফ্যান আমি নিজের বাড়িতেও লাগাব।
আসলে তখন যাই ভাল লাগত মনে হত সেটা একান্তভাবে আমার নিজের হোক! এই মনোভাব পরবর্তী জীবনে কত যে কষ্ট বয়ে এনেছে তা বলার নয়! জীবনের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতেই বুঝেছি সেই মোক্ষম কথা Suffer or be wise l
বাবার অফিসে যাবার আরও দুটো আগ্রহের বিন্দু ছিল। একটা হল অফিসের কাছের একটা বিহারি দোকান। তাদের তৈরি করা কচুরি, শিঙাড়া আর লিট্টি যে কী ভাল ছিল সে বলার নয়। বিশেষ করে ওরা যে সবুজ আর লাল রঙের দুটো চাটনি দিত! অমন জিনিস বাটানগরের কোথাও পাওয়া যেত না ।
আর দ্বিতীয় জিনিসটা ছিল ফেরার পথে বালিগঞ্জ স্টেশনের কাছের সার দেওয়া কয়েকটা দোকান! সেখানে যে কীসব বিচিত্র হজমি আর লজেন্স পাওয়া যেত! তখন নাম না জানা সব লজেন্সকে আমরা নিজেরাই নাম দিতাম। গোল বড়, প্রচণ্ড শক্ত লজেন্সটা নাম দিয়েছিলাম ঘুঘুপাখির ডিম! নরম তুলতুলে চিনি বসানো লজেন্সটাকে বলতাম স্পঞ্জ লজেন্স। আর গোলাপি স্ট্রবেরির গন্ধওলা যে লজেন্সটা খেলে গলায় বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা লাগত তাকে বলতাম পিপারমিন্ট!
কলকাতায় আসার আরেকটা কারণ ছিল, ‘শপিং’। যদিও মফস্সলের লোকেরা তাকে বলত ‘মার্কেটিং'! মূলত মা, বড়পিসি আর ছোটপিসির সঙ্গেই আসতাম গড়িয়াহাটে। মা যেহেতু বিয়ের আগে বেশ কিছু বছর ডোভার লেনে থাকত তাই এসব জায়গা ছিল মায়ের নখদর্পণে। কোন দোকানে কী পাওয়া যায়। সস্তায় পাওয়া যায়! সবটা জানত মা। ফলে মা-ই হত সবার গাইড!
মা আরেকটা জিনিসও অসাধারণ পারত। সেটা হল দরাদরি।
এই দরদাম করা ব্যাপারটা আসলে কিন্তু একটা শিল্প। কেউ কেউ এই দক্ষতা নিয়েই জন্মায়! বাকিরা আমার মতো 'ফিক্সড প্রাইস'-এর দোকানে ঢুকে ওভার প্রাইসড জিনিস কিনে খুশি থাকে!
মাও এই দরদাম করার ট্যালেন্ট নিয়েই জন্মেছিল। এটা আমি আরও বুঝি এই কারণে যে অন্যান্য সব প্রতিভার মতো আমার এই প্রতিভার ঘরেও ভগবান ঢ্যাঁড়া কেটে দিয়েছেন!
তবে সত্যি বলতে কী, এই ‘মার্কেটিং” ব্যাপারটা আমার একদম ভাল লাগত না। এই দোকান ওই দোকান ঘুরে টানাহ্যাঁচড়া করে জিনিস কেনাকাটি করাটা খুব বিরক্তিকর লাগত আমার। কোথাও কোথাও লজ্জাও লাগত। আমার বড়পিসি কলকাতায় শাড়ি কিনতে গেলে ট্র্যাঙ্গুলার পার্ক থেকে গড়িয়াহাট অবধি সব শাড়ির দোকানের সমস্ত শাড়ি নামাত। তারপর প্রথম দোকানের যে প্রথম শাড়িটা নামিয়েছিল, সেটা কিনত। তারপর দু'দিন বাদে সেই শাড়িটা নিয়ে যেত ফেরত দিতে! তারপর আবার সব শাড়ি নামাত! বড়পিসিকে আমি বড়দি পিসি ডাকি। এটা পড়লে খুব রাগ করবে! কিন্তু বড়দি পিসি তার এই ‘বুড়ো’-কে যেহেতু ভালওবাসে খুব, তাই জানি ইয়ার্কিটা বুঝে, ক্ষমাও করে দেবে!
এসব মার্কেটিং ভাল না লাগলেও মায়ের সঙ্গে আসতাম কারণ খাওয়াদাওয়া! গরিব বাঙাল বাড়ির ছেলে আমি, ছোট থেকেই, মাথা বাদ দিয়ে বাকি সবটাই আমার পেট! মার্কেটিঙের পরে খাওয়াদাওয়া হত বেশ। তবে খুব দামি রেস্টুরেন্টে নয় কিন্তু।
গড়িয়াহাটেই ছিল দুটো রেস্টুরেন্ট। একটার নাম ‘পূর্বাণী' আর অন্যটা 'সোনালী'! ‘সোনালী’-তে পাওয়া যেত দক্ষিণ ভারতীয় খাবার। তাই ধোসা খেতে ইচ্ছে হলে
সেখানে যেতে হত। কিন্তু প্রবলভাবে মাংসাশী আমি-র মন পড়ে থাকত ‘পূৰ্বাণী’-তেই।
উঁচু খাড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠত হত সেই রেস্টুরেন্টে। সেখানে ঢুকেই লম্বাটে জায়গার ডানদিকে উন্মুক্ত চেয়ার-টেবিল আর বাঁদিকে পর্দা ফেলা ছোট ছোট কাঠ আর কাচ দিয়ে বানানো চৌকো খোপ। যাকে ইংরেজিতে বলে কেবিন!
আমরা সেই খোলা চেয়ার-টেবিলেই বসতাম। আর দেখতাম ওই কেবিনে কোনও ছেলে ও মেয়ে ঢুকলেই বড়রা মুখ টেপাটিপি করে হাসছে। তখন একটুও বুঝতাম না ওই কেবিনে ঢুকলে হাসার কী হয়েছে!
ওই রেস্টুরেন্টে গিয়ে আরও একটা জিনিস প্রতিবারই বড়রা আলোচনা করত। তা হল বণিক বাড়ির মামলা। রেস্টুরেন্টের জানলা দিয়ে সেই বিশাল প্লাস্টার ছাড়া মেরুন ইটের বাড়িটা দেখা যেত! সেখানে কীভাবে একজন মারা গিয়েছিলেন সেই ভয়াবহ কথা বড়রা আলোচনা করত। আমি চুপচাপ শুনতাম। আর কেমন একটা ভয় যেন শিরদাঁড়া বেয়ে ওঠানামা করত। আবছাভাবে মনে হত পৃথিবীকে যতটা ভাল লাগে পৃথিবী হয়ত ততটাও ভাল নয়।
এই রেস্টুরেন্টে আমাদের সবচেয়ে ভাল লাগত মোগলাই পরোটা। আমি ছোট ছিলাম বলে আমার জুটত আধখানা। আসলে মা ভাবত বাড়িতে যে একহাতা ভাত খায় সে কী করে অত বড় একটা মোগলাই পরোটা খাবে! কিন্তু ভাতে আর মোগলাই পরোটায় কি তুলনা হয়!
এখানেই জীবনে প্রথম চাউমিন খেয়েছিলাম মনে আছে! তখনও বাজারে ম্যাগি এসে পৌঁছায়নি। বা পৌঁছলেও আমাদের বাড়িতে তার আগমন ঘটেনি। চাউমিন খেয়ে সত্যি বলতে কী প্রথমদিন একদম ভাল লাগেনি। আমি মনে মনে আসলে মোগলাই পরোটাই খুঁজছিলাম। ভাজাভুজি ছোটবেলা থেকেই খুব প্ৰিয় কিনা!
‘পূর্বাণী' নামের সেই রেস্টুরেন্ট এখনও গড়িয়াহাট মোড়ে বিদ্যমান। এখনও সেই কেবিন বিদ্যমান। পুরনো ধাঁচের চেয়ার-টেবিলও যথা স্থানে বিদ্যমান! জানি না দক্ষিণ কলকাতায় এমন কেবিনওলা পুরনো রেস্টুরেন্ট আর ক'টা অবশিষ্ট আছে এখনও! বাবার সঙ্গে বেরলে বাবা নিয়ে যেত ভাল রেস্টুরেন্টে। মানে সেইসব রেস্টুরেন্ট যেখানে এসি চলে। যেখানে কাচের টেবিল। কাচের দরজা। নিচু আলো। আর যেখানে মূলত চিনা খাবার পাওয়া যায়।
মনে আছে বালিগঞ্জেই গড়িয়াহাট মোড়ের পাশে নন্দী স্ট্রিটে একটা রেস্টুরেন্ট ছিল। নাম ‘ক্যাপিটল’। ভাল চাইনিজ খাবার পাওয়া যেত। বাবা সেখানে নিয়ে যেত বছরে এক-দু'বার। তা ছাড়া পার্ক স্ট্রিটের ‘কোয়ালিটি’, ‘ওয়াল্ডর্ফ’, ‘পিটার ক্যাট’-সহ আরও নানান রেস্টুরেন্টে বাবা নিয়ে গিয়েছে।
আমাদের আর্থিক অবস্থা ছিল নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির। মূলত বাবার রোজগারেই বাড়ির খরচা ইত্যাদি চলত। কিন্তু তার মধ্যেও মা-বাবা কখনও জীবনের এই দিকগুলো বাদ দেয়নি।
কলকাতায় আসার আরেকটা আগ্রহ ছিল, সেটা হল দোতলা বাস। লাল রঙের সেই বাস তখন সারা কলকাতাতেই চলত। ভিড় হলে বাসগুলো একদিকে বিপজ্জনকভাবে কাত হয়ে থাকত। আমার কেবলই মনে হত এই বুঝি উলটে গেল রে! কিন্তু অদ্ভুত ব্যালেন্স ছিল সেই বাসের। উল্টোত না।
এসব কাকাদের বলতাম আমি। কাকারা হাসত খুব। বলত ভিতু! সত্যি আমার এমন কত যে ভয় ছিল। ব্রিজের ওপর দিয়ে ট্রেন গেলে মনে হত, এই বুঝি ব্রিজটা ভেঙে পড়ল। বিছানায় শুয়ে মাঝে মাঝে মেপে দেখতাম ফ্যানটা ভেঙে পড়লে কি আমার মাথায় পড়বে না বুকে। গাড়িতে যেতে যেতে মনে হত স্টিয়ারিংটা যদি ড্রাইভারের হাতে খুলে চলে আসে! রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হত রাস্তাটা যদি দু'ভাগ হয়ে বিশাল বড় একটা খাদ তৈরি হয়ে যায় আর সেটা টপকে যদি আমি আমার বাবা, মা, মিষ্টিদাদু, ছোটদাদু, ভাইপো, পঙ্কা আর ভাইয়ের কাছে ফিরতে না পারি!
দোতলা বাসে উঠলেই শহরটা কেমন যেন পালটে যেত। আমি ভাবতাম পাখিদের কী মজা, তারা কেমন সুন্দর ওপর থেকে সবকিছু দেখতে পায়। দোতলা বাসের একতলায় কিছুতেই উঠতাম না আমি। ওই সরু সিঁড়ি দিয়ে দোতলাতেই উঠতাম। তারপর চেষ্টা করতাম একদম সামনে চলে যেতে। সেখান থেকে কাচের মধ্যে দিয়ে কলকাতা দেখতে দেখতে মনে হত আমিই যেন পাখি! মনে হত মা যে আমায় ‘বাবুই' বলে ডাকে সেটা তো এই জন্যই!
কলকাতা থেকে ফেরার পথে অধিকাংশ সময়েই আমরা ট্রেন ধরতাম বালিগঞ্জ স্টেশন থেকে। সেখান থেকে আমায় কিনে দেওয়া হত কমিকস! সেই ছোট থেকেই কমিকস পড়ার বিষয়ে প্রবল আগ্রহ ছিল। মনে হত বড় হলে আমি কমিকস বানাব নিজেই!
স্টেশনে থাকত নানান খাবারের দোকান। ঘুগনি, আলুকাবলি, খাজা, সোনপাপড়ি, কচুরি, পরোটা, মশলা মুড়ি ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আমার চোখ থাকত একটা দিকেই। ফটাশ-জল।
একটা বড় মাটির গামলায় জল আর বরফের মধ্যে ডুবিয়ে রাখা হত নানান কাচের বোতল। তারপর সেটাকে ঢেকে রাখা হত লাল কাপড় দিয়ে। কেউ চাইলেই সেই জলের থেকে বোতল তুলে বটল ওপেনার দিয়ে ফটাশ করে খুলে দেওয়া হত বোতল। তারপর ধরিয়ে দেওয়া হত কাস্টমারের হাতে।
আমি খুব অবাক হয়ে দেখতাম ব্যাপারটা। ফটাশ শব্দটা কী যে ভাল লাগত! মা বলত ওগুলো সোডা ওয়াটার।
আমার খুব খেতে ইচ্ছে করত জিনিসটা। কিন্তু মা-বাবাকে কোনওদিনই বলার সাহস পাইনি। আসলে আমার বাবা-মা নিজে থেকেই যতটা সম্ভব সব দিত আমায়, কিন্তু তাও দু'জনেই খুব কড়া আর রাগী ছিল। ফলে আমি ছোট থেকেই খুব সন্তর্পণে আর ভয়ে ভয়ে থাকতাম। তাই কোনওদিনই দামাল, স্মার্ট বা সাহসী কোনওটাই হয়ে ওঠা হয়নি আমার।
যাই হোক, সেই ফটাশ জল দেখে আমার কেবলই মনে হত বড় হলে বাটানগরের নিউল্যান্ড মোড়ে আমি এমন একটা ফটাশ জলের দোকান দেব! না না, কী বিক্রি হবে সেই বোধ ছিল না। কেবলই মনে হত দোকান দিলে আমি নিজে তো ইচ্ছেমতো খেতে পারব!
তখন ট্রেনে ভিড় হত বেশ। বরাবর ভিড় দেখলেই আমার আতঙ্ক হয়। তখনও হত। তবে ছোট ছিলাম বলে ট্রেনেই কেউ না কেউ কোলে বসিয়ে নিত আমায়। আর বাটানগরের পরিচিত কাউকে পেয়ে গেলে তো কথাই নেই!
ট্রেনে ফিরতে ফিরতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়তাম। বাবা কোলে করে নামাত ট্রেন থেকে। কখনও মা রিকশায় কোলে নিয়ে বাড়ি ফিরত। আমি ঘুমিয়েই ঘুমিয়েই জামাকাপড় পাল্টাতাম। খেতাম একটু। তারপর বিছানায় মিলিয়ে যেতাম।
ভোরে ঘুম ভাঙত পাখির ডাকে, জানলা দিয়ে আসা পাশের বড় পুকুরের ওপার থেকে আসা হাওয়ায়। টালুমালু চোখে উঠে বসে ভাবতাম কাল তো ফেরার পথে কালীঘাটের সেই লোহার ব্রিজ পার করার সময় মা কালীকে প্রণাম করা হল না! ভয় লাগত। মা আবার পাপ দেবে না তো! ভাবতাম পরেরবার যখন কলকাতায় যাব তখন একবার বেশি প্রণাম করে নেব। ভাবতাম আবার কবে যাব কলকাতায়? আচ্ছা, এমন কোনওদিন কি আসবে যখন কলকাতাতেই আমি থাকব? আর রোজ লেকের 'স্বপ্নপুরী’ স্টেশনে গিয়ে টয় ট্রেন চড়তে পারব!
গত পঁয়ত্রিশ বছর কলকাতার মুদিয়ালি অঞ্চলেই থাকি আমি। সেই রবীন্দ্র সরোবর, গড়িয়াহাট, ট্রাম, রেস্টুরেন্ট সবই এখন হাতের মুঠোয়। তবে রোজ দেখতে দেখতে ছোটবেলার সেই মজাটা আর এখন অনুভব করি না। কিন্তু যখনই বেশ কিছুদিন কলকাতার বাইরে থাকি তখনই কেমন একটা লাগে। কলকাতার জন্য, বিশেষ করে দক্ষিণ কলকাতার এই অংশটার জন্য মনখারাপ করে।
মা মারা গিয়েছে কুড়ি বছর হয়ে গেল। আমার সেই ছোটবেলার কলকাতাটাও আর নেই। স্বপ্নপুরী স্টেশন নেই। লাল দোতলা বাস নেই। বালিগঞ্জ স্টেশনের কাছে নেই সারসার মজার লজেন্স আর হজমির দোকান। নন্দী স্ট্রিটের সেই ‘ক্যাপিটল’ রেস্টুরেন্টটাও কবে যেন উঠে গিয়েছে। তবু মনে মনে তো তারা এখনও সব রয়ে গিয়েছে হারানো একটা শহরে। এই শহর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তাই আমি মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করে সেইসব দেখি। মনের মধ্যেটা কেমন যেন করে। বুঝি বয়স বেড়ে গেলেও আমাদের মনের একটা অংশ কোনওদিন বড় হয় না। সেখানে আমরা অপরিবর্তনশীল। সেখানে আমরা ফটাশ জলের দোকান দিতে চাওয়া এক চির-বালক।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন