পরীক্ষা

স্মরণজিৎ চক্রবর্তী

ছোটবেলায় আমার মনে হত সারা বছর পরীক্ষা হয় না কেন! তা হলে তো আর সারাদিন স্কুল করতে হয় না। ওই পরীক্ষার সময়টুকু স্কুল করলেই ল্যাঠা চুকে যায়!

পরীক্ষা নিয়ে ছোটবেলায় আমার কোনও টেনশন হত না। এখন যেমন অনেক স্কুলে ছোটদের পরীক্ষা হয় না, আমাদের সময় কিন্তু তা ছিল না। বছর চারেক বয়স থেকে আমাদের স্কুলে ভর্তি হতে হত! সেটাও পরীক্ষা দিয়ে। তারপরেই শুরু হয়ে যেত পরীক্ষার মিছিল!

আমার জীবনের প্রথম পরীক্ষার কথা আমার আবছা আবছা মনে আছে। সেটা ছিল নার্সারি স্কুলে ভর্তির পরীক্ষা। আরও অনেকের সঙ্গে আমিও স্কুলের বাইরে অপেক্ষা করছিলাম। আমায় নিয়ে গিয়েছিল আমার সেজকাকা মানে ভাইপো।

নিজের নাম, বাবা-মায়ের নাম, নানান রঙের নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন আন্টিরা। তারপর জিজ্ঞেস করেছিলেন ধানগাছের ইংরেজি কী? আমি বলেছিলাম 'প্যাডি'।

আন্টি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কেমন দেখতে জানো?”

আমি বলেছিলাম, “চরু চরু, লম্বা লম্বা!’

সেই ছোট বয়সে আমি ‘স’-কে ‘চ’ বলতাম। ফলে ‘সরু’ হয়ে গিয়েছিল ‘চরু’! এটা আমার স্পষ্ট মনে আছে কারণ তারপর থেকে আমাকে ভাইপো, পঙ্কা, হাবলুকাকা সহ অনেকেই মাঝে মাঝে ‘চরু’ বলে ডাকত!

সেই পরীক্ষার পরে ভাইপো আমাকে স্কুলের স্লিপ, দোলনা আর ঢেঁকি চড়িয়ে এনেছিল। এটাও মনে আছে।

ক্লাস ফোর অবধি পরীক্ষা দিতে বসে আমার মূল লক্ষ্য ছিল সবার আগে লেখা শেষ করে খাতা জমা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাওয়া। আমার কীসের যে এত তাড়া ছিল কে জানে! এখনও সেই বদ অভ্যেস যায়নি আমার। যে কোনও লেখাই আমি যত দ্রুত সম্ভব শেষ করার চেষ্টা করি! তফাত একটাই তখন লেখার পরে একটুও রিভিশন করতাম না আর এখন লেখার পর সাংঘাতিকভাবে কাটাকুটি করি!

আমাদের স্কুলে ‘ওরাল এক্সাম' হত অঙ্ক-র। সেখানে নানান যোগ বিয়োগের সঙ্গে টেবল্স বা নামতাও পড়তে হত। মনে আছে নামতা পড়ার সময় আমাদের দুটো হাত আন্টির টেবলের ওপর পেতে রাখতে হত, কারণ যাতে কেউ লুকিয়ে কাউন্ট না করে!

ছোটবেলার পরীক্ষা ছিল একরকম। বড় হয়ে হাই স্কুলে উঠে দেখলাম পরীক্ষা কঠিন হতে শুরু করেছে। এই প্রথম বুঝতে শুরু করলাম কম্পিটিশন বলে একটা ব্যাপার আছে!

দেখতাম রেজাল্ট ভাল হলে ভাল ছেলে, খারাপ হলে খারাপ ছেলে বলে দাগিয়ে দেওয়া হতে লাগল! মানে সে মানুষ হিসেবে যেমনই হোক না কেন, কিন্তু রেজাল্টই যেন ঠিক করে দিত সে ভাল ছেলে না খারাপ ছেলে! এই মানসিকতাটা খুবই কষ্ট দিত আমাকে। এখনও দেয়। কারণ এমন ভূরি ভূরি উদাহরণ আছে যেখানে দেখেছি প্রকৃত মানুষ হওয়ার সঙ্গে পড়াশুনোর বা পরীক্ষার ফলের কোনও সম্পর্ক নেই। তাও স্কুলের যখন নিয়ম তখন পরীক্ষা দিতেই হত।

নার্সারি স্কুলে পরীক্ষার সময় আমরা ভাবতেও পারতাম না যে কেউ কারও খাতা দেখে লিখবে! তা ছাড়া আমাদের পরীক্ষাও হত যার যার নিজের ক্লাসে। কিন্তু হাইস্কুলে উঠে এসব ধারণা পালটে গেল। জীবনে প্রথম দেখলাম যে অন্য ক্লাসে আমাদের সিট পড়েছে।

প্রথম পরীক্ষার দিন স্কুলের বারান্দায় একটা বোর্ডে লিখে দেওয়া হত কত নম্বর রুমে কত থেকে কত রোল নাম্বারের সিট পড়েছে। আমরা সেই ঘরে গিয়ে দেখতাম বেঞ্চে কাগজ সেঁটে দেওয়া হয়েছে। তাতে ক্লাস আর রোল নাম্বার লেখা। একদম প্রথমে এই সিট নাম্বার খোঁজাটা বেশ একটা মজার ব্যাপার ছিল।

কিন্তু ক্লাসে পরীক্ষার সময় নকল করার ব্যাপারটা মোটেও মজার ছিল না।

সারাজীবন জেনে এসেছি কখনও অসৎ কাজ করতে নেই। সেখানে ক্লাস ফাইভে পরীক্ষা দিতে গিয়ে দেখলাম ওপরের ক্লাসের দাদাদের সঙ্গে সিট পড়েছে। আর তারা দেদার নকল করছে। এ ওকে জিজ্ঞেস করছে। জ্যামিতি বক্সের মধ্যে ছোট ছোট কাগজের চিটে ততোধিক ছোট অক্ষরে কীসব লিখে নিয়ে এসে সেখান থেকে টুকছে! স্যারেরা পায়চারি করছেন, কিন্তু এদের এত সাহস যে স্যারদের চোখকে খুব দক্ষতার সঙ্গে ফাঁকি দিচ্ছে।

এসব কী হচ্ছে! আমার তো মনে হয়েছিল এ কোথায় এলাম রে ভাই! তবে আমার কিছু করার নেই বুঝে, চুপচাপ নিজের লেখাতেই মন দিয়েছিলাম।

কাণ্ড করেছিল আমার এক বন্ধু। নাম প্রসেনজিৎ। খুব ফটফট করে মুখের ওপর কথা বলে দিত ছেলেটা।

মনে আছে একদিন পরীক্ষা চলাকালীন ও সটান উঠে দাঁড়িয়ে গার্ড দিতে আসা স্যারকে বলেছিল, ‘স্যার এই দাদাটা পেনসিল বক্সের মধ্যে করে টুকলি এনে টুকছে!’

স্যার ঘাবড়ে গিয়েছিলেন প্রথমে। উনি আসলে মন দিয়ে একটা গোয়েন্দা গল্পের বই পড়ছিলেন! তাই ব্যাপারটা বুঝতে পারেননি। যাই হোক স্যার উঠে এসে সেই ছোট কাগজ বাজেয়াপ্ত করে ছেলেটির খাতায় পাঁচ নম্বর মাইনাস করে দিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ করে প্রসেনজিৎ আবার উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিল, 'স্যার দাদাটা বলছে রাস্তায় বেরলে আমায় ক্যালাবে! স্যার ক্যালাবে গালাগালি না?”

স্যার কী করবেন কিছুই বুঝতে না পেরে ছেলেটাকেই আবার ধমক দিয়েছিলেন। এর মিনিট দশেক পরে আবার উঠে দাঁড়িয়েছিল প্রসেনজিৎ।

স্যার প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে বইয়ের মধ্যে আঙুল ভরে বলেছিলেন, ‘এবার আবার কী হল?'

অকুতোভয় প্রসেনজিৎ বলেছিল, 'স্যার, দাদাটা কী অসভ্য অসভ্য কথা বলছে দেখুন!’

‘কী বলছে?”

প্রসেনজিৎ বলেছিল, 'বলছে, তোর মাকে তো হেব্বি দেখতে!’ ,

স্যার গুগলি বুঝতে না পেরে বোল্ড হয়ে যাওয়া ব্যাটসম্যানের মতো হাঁ করে তাকিয়েছিলেন! এর কী শাস্তি দেবেন!

কোনও কোনও স্যার ছিলেন খাতা কেড়ে নিতেন না বা নাম্বার কমিয়ে দিতেন না,

পরীক্ষার মধ্যে বেঞ্চে দাঁড় করিয়ে রাখতেন পনেরো বা কুড়ি মিনিট! কোনও কোনও সময় এমনও দেখেছি স্টুডেন্টের খাতা কাড়তে গিয়ে টানাটানিতে খাতা ছিঁড়ে গিয়েছে! মানে পরীক্ষার সময় আমাদের স্কুলে কিছু না কিছু একটা লেগেই থাকত!

কোনও কোনও স্যার ছিলেন খুব কড়া। তাঁরা গার্ড হলে সমবেত দীর্ঘশ্বাসের আওয়াজ স্টিম ইঞ্জিনের মতো লাগত! আবার কোনও কোনও স্যার ছিলেন নরম-সরম। তাঁরা গার্ড হলে সবার মনে দুর্গাপূজা আসার মতো খুশি জেগে উঠত।

একবার মনে আছে ফিজিকাল সায়েন্স পরীক্ষায় আমার পেছনে দাঁড়িয়ে সন্দীপবাবু ঠায় আমার লেখা পড়ছিলেন। আমার অস্বস্তি হচ্ছে। কী না কী লিখছি! স্যার কিছু পরে (হেসে বলেছিলেন, ‘একটু বানানগুলো দেখো।’

কোনও কোনও স্যারকে ছেলেরা চেপে ধরত, ‘স্যার প্লিজ একটা বলে দিন, একটা বলে দিন' বলে!

বারবার ‘না’ করেও কেউ কেউ বলেও দিতেন! বা একটু ধরিয়ে দিতেন!

আমিও মাঝে মাঝে একে ওকে জিজ্ঞেস করতাম। বা কেউ জিজ্ঞেস করলে বলে দিতাম! সবাই তো বন্ধু!

মাধ্যমিক পরীক্ষা জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা। তখন নাইন আর টেন দু' বছরের সিলেবাস মিলিয়ে পরীক্ষা হত।

আমাদের সিট পড়ত অন্য স্কুলে। যেটা বাটানগর থেকে আরও দূরে। মনে আছে নিমাইদার রিকশা করে আমি সেই পরীক্ষা দিতে যেতাম।

অঙ্ক পরীক্ষা ছিল সব পরীক্ষার মধ্যে উত্তম কুমার! প্রতিবার অঙ্ক পরীক্ষার পরে খবর কাগজে কিছু না কিছু ঝামেলার খবর বেরত!

নাইন থেকে টেনে উঠতে অঙ্কে আমি খুব খারাপ ফল করেছিলাম। অঙ্কের স্যার আলীবাবু গোটা ক্লাসের সামনে বলেছিলেন, ‘তুমি ভাল ছেলে তাই পাশ করিয়ে দিয়েছি। আসলে তোমার পাশ করার কথা নয়!”

এটা খুব সম্মানে লেগে গিয়েছিল। তাই একটা জেদ ছিল যে মাধ্যমিকে অন্তত অঙ্কে ভাল ফল করতেই হবে! তারওপর আলীবাবু ঘোষণা করেছিলেন, মাধ্যমিকে যারা যারা অঙ্কে নব্বই শতাংশ বা তার বেশি নম্বর পাবে তাদের উনি নিজে পুরস্কার দেবেন! তখনকার দিনে ওয়েস্ট বেঙ্গল বোর্ডে পাইকারি হারে নব্বই দেওয়া হত না।

আমাদের সময় পাটিগণিতের দুটো প্রশ্ন আসত। ছয় করে মোট বারো নাম্বার !

এদিকে হয়েছে কী পরীক্ষায় সব অঙ্ক করলেও একটা পাটিগণিত কিছুতেই পারছি না। এখন কী হবে? ছ' নম্বর ছেড়ে দেব?

আমার সামনে বসেছিল মধুসূদন। খুব ভাল ছেলে ছিল মধু। আমি উপায় না দেখে মধুসূদনকেই সেদিনের মতো মধুসূদনদাদা হিসেবে ধরে নিয়েছিলাম।

পেন্সিল দিয়ে খুঁচিয়ে বলেছিলাম, “এই একটা পাটিগণিতের অঙ্ক দেখা!’

মধু বলেছিল, ‘আমি একটা এক্সট্রা পারছি না। সেটা দেখা তা হলে।”

ব্যাস সঙ্গে সঙ্গে চুক্তি হয়ে গিয়েছিল। একটা পাটিগণিতের বদলে জ্যামিতির একটা এক্সট্রা।

মধু একটু সরে বসে খাতাটা খুলে রেখেছিল। আমি কোনওদিকে না দেখে টুকেছিলাম। তারপর আমিও খাতা খুলে রেখেছিলাম আর মধুও একটা এক্সট্রা হুবহু টুকেছিল।

সেই পরীক্ষায় আমি ঠিক নব্বই পেয়েছিলাম। দশ নাম্বার কাটা গিয়েছিল আমার। জানি না তার মধ্যে মধুর করা ওই অঙ্কটাও ছিল কিনা। কিন্তু সেদিন ওই নাম্বার পেয়ে আমার মনের মধ্যে এক তীব্র গ্লানি হয়েছিল। খালি মনে হয়েছিল যে নাম্বার আমি পেয়েছি তার যোগ্য আমি নই।

তাই সেবার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আমি যাইনি। মনে হয়েছিল আমার যাওয়ার যোগ্যতা নেই!

আলীবাবু পুরস্কার হিসেবে বই দিয়েছিলেন। জানতেন আমি কবিতা পড়তে ভালবাসি। তাই নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতা সমগ্রের প্রথম খণ্ডটা দিয়েছিলেন আমায়। বইটা কয়েক মাসের মধ্যে আশ্চর্যভাবে হারিয়ে গিয়েছিল! কীভাবে যে বইটা হারিয়ে গেল সেটা আমার কাছে আজও রহস্য! কিন্তু সেদিন থেকে একটা জিনিস আমি বুঝেছি যে অসৎভাবে কোনও কিছু পেলে তা জীবনে স্থায়ী হয় না। সেই ক্লাস ইলেভেনে উঠে আমি নিজের কাছেই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে কোনও কিছু না পারলেও আর কোনওদিন কোথাও অসৎ উপায় অবলম্বন করব না ।

ক্লাস ইলেভেনের প্রথম পরীক্ষাতেও অঙ্কতে খুব খারাপ ফল করেছিলাম আমি। কিন্তু কারও থেকে সাহায্য চাইনি। তারপর সারাজীবন আর কোনও পরীক্ষাতেই আমি কারও থেকে সাহায্য নিইনি! অঙ্কতে ভাল নাম্বার পাওয়া আমায় একটা শিক্ষা দিয়ে গিয়েছিল।

ইলেভেন-টুয়েলভে ভাল করে পড়াশুনো করিনি আমি। যখন হুঁশ হয়েছিল, দেখেছিলাম উচ্চমাধ্যমিকের সিলেকশন টেস্টের আর সাড়ে তিন মাস বাকি। তারপর থেকে দিন-রাত পড়াশুনো করে এইচএস দিয়েছিলাম।

তখন এইচএস-এ প্রতিদিন দুটো করে পেপার দিতে হত। তিন ঘণ্টা করে একএকটা পেপার। ইয়া মোটা মোটা সব বই ছিল সিলেবাসে! আমার মনে হত যাঁরা শিক্ষাব্যবস্থা দেখেন, তাদের সঙ্গে কি ছাত্রছাত্রীদের কোনও শত্রুতা আছে? না হলে এমন করে পিষে দেওয়ার কি মানে আছে বুঝতাম না! যেকাজে মানুষ আনন্দ পাবে না, শুধু তার ভয় আর উদ্বেগ জন্মাবে সেই কাজে সে ভাল ফল করবে কী করে? এমন করে পড়াশুনোর নামে সবকিছু গুঁতিয়ে মুখস্থ করাবার মানেই বা কী আছে!

যাই হোক পরীক্ষা শেষ করেছিলাম কোনওমতে। কেমিস্ট্রির প্রথম পেপার নিয়ে বেজায় চাপে ছিলাম। ফেল করব না তো!

মনে আছে রেজাল্ট বেরবার দিন সকালে টেনশনে আমার জ্বর এসে গিয়েছিল। পরীক্ষা ভাল হয়নি। খুব কিছু ভাল নাম্বার পাব না জানি। কিন্তু ফার্স্ট ডিভিশনটা কি পাব?

আমার ছোট পিসেমশাই, যাকে আমি পিসাই বলতাম, সে আমাদের স্কুলের শিক্ষক ছিল। পিসাই যেত রেজাল্ট আনতে। তো রেজাল্ট হাতে পেয়েই পিসাই অফিস থেকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিল আমাদের বাড়িতে।

মনে আছে ফোনে মা কথা বলছিল পিসাইয়ের সঙ্গে। আর আমি টেনশনে লাল হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলাম বিছানার ওপর। মা যেই বলেছিল যে ফার্স্ট ডিভিশন আছে, সঙ্গে সঙ্গে লাফ মেরে বিছানা থেকে নেমে বাথরুমে গিয়ে বমি করে ফেলেছিলাম আমি! মা দেখেছিল জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে!

বিকেলের মধ্যে জ্বর ছেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু যেতে যেতে একটা শিক্ষা দিয়ে গিয়েছিল যে, কোনও কাজে কখনও ফাঁকি দিতে নেই! দিলে আবার এমন হাল হবে!

তারপর থেকে আমি আমার সীমিত ক্ষমতার মধ্যে যতটুকু যা পারি সেটাই খুব মন দিয়ে, সৎভাবে করার চেষ্টা করি!

কলেজে পরীক্ষায় সেভাবে কোনও অসুবিধে বা ঝামেলা হয়নি। কিন্তু একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল কোচিং-এর একটা পরীক্ষায়।

এখানে বলে নিতে হবে যে কলেজে যাওয়ার প্রথম দিনে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমি একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছিলাম। এভাবে কি কেউ কয়েক ঘণ্টায় প্রেমে পড়ে! লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট কি সম্ভব?

আমার মতে সম্ভব। মানে এই লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট আর ভূত দেখাটা এক রকম। যাদের সঙ্গে হয়েছে তারা ছাড়া আর বাকি কেউ মানে না!

তা আমার সঙ্গে হয়েছিল ব্যাপারটা। মেয়েটি আমার ক্লাসেই ছিল। তখন আমরা ভবানীপুরের কাছে এক জায়গাতেই টিউশন পড়তে যেতাম। এই যে মেয়েটি আমার ক্লাসে পড়ে, এক কোচিং-এ পড়ে এ সবকিছুকেই আমি দৈবনির্ধারিত সংকেত হিসেবে মেনে নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম ঈশ্বর চান যে আমাদের প্রেম হোক!

কিন্তু কিছুদিন পরেই মেয়েটি পড়তে এসে একটা ছোট্ট আমড়া পটকা ফাটিয়েছিল। কী? না ও এবার থেকে অন্য জায়গায় পড়বে। এই স্যারের কাছে আর পড়বে না।

আমার মাথায় তো আকাশ ভেঙে পড়ল! এখন কী করি আমি? এমনিতেই ওর পেছনে বিশাল বড় লাইন। সেখানে আমি বেলাইন করে একদম সামনে সামনে থাকি, সেটা যদি ফস্কে যায়!

আমি কোনও চিন্তাভাবনা না করেই বলেছিলাম, ‘আমিও ওই স্যারের কাছে পড়ব। আমায় নিয়ে যাবি?”

ও বলেছিল, ‘পড়বি? ঠিক আছে, চল!’

স্যারের বাড়ি লেক মার্কেটে। ভবানীপুর থেকে হেঁটে লেক মার্কেট অবধি যেতে যেতে শুনেছিলাম স্যার খুব কড়া। সবাইকে কোচিং-এ নেন না।

স্যারকে দেখে ভাল লেগেছিল আমার। বয়স বেশি নয়। সঙ্গে খুব ভদ্র। ইংরেজি উচ্চারণ অসাধারণ। সবই ভাল, কিন্তু উনি আমায় বললেন, ‘তোমায় তো নেব না। মনে হচ্ছে তুমি ভাল ফল করতে পারবে না!’

আমি প্রায় ঝাঁপিয়ে পায়ে পড়ে গিয়েছিলাম স্যারের। মানে এখানে ও পড়বে আর আমি পড়ব না! এটা কী করে হয়!

অনেক কাকুতি-মিনতি করার পরে স্যার বলেছিলেন, ‘ঠিক আছে। তবে একমাস পরে আমি একটা পরীক্ষা নেব। সেটাতে খারাপ ফল করলে আমি আর তোমায় পড়াব না! তুমি এতে রাজি?’

আমি সবেতে রাজি ছিলাম তখন! মোট কথা ওর থেকে দূরে যাওয়া যাবে না। আমার ইংরেজি অনার্স ছিল। স্যার একটা দশ পাতার নোট দিয়েছিলেন। ইমেজারি অব্ শেলি অ্যান্ড কিটস!

স্যার বলেছিলেন, ‘আমি যা লিখেছি তা হুবহু মুখস্থ চাই আমার। মনে থাকে যেন!’ হুবহু মুখস্থ! আমি কোনওদিন চার লাইন মুখস্থ করতে পারি না। সেখানে দশ পাতা নোটস!

কিন্তু হয় মুখস্থ করো নয়তো ওর থেকে দূরে চলে যাও!

সেটা ছিল সাতানব্বইয়ের প্রখর এপ্রিল। মনে আছে বাড়িতে আত্মীয়স্বজন ভর্তি তখন। ভাইবোনেরা এসেছে সব। সবাই হুল্লোড় করছে, আনন্দ করছে। শুধু আমি ওই সেদ্ধ হয়ে যাওয়া গরমে মাঙ্কি ক্যাপ আর মাফলার জড়িয়ে পড়া মুখস্থ করে যাচ্ছিলাম!

কেউ বুঝতে পারছিল না, টিউশনের একটা সামান্য পরীক্ষার জন্য এই ছেলেটা এমন করছে কেন!

এমনিতে কোচিং-এ আমি সারাক্ষণ ইয়ার্কি করতাম। কিন্তু সেই পরীক্ষার দিন আমি কারও সঙ্গে কোনও ইয়ার্কি মারিনি। একাগ্র হয়ে টানা পরীক্ষা দিয়ে গিয়েছিলাম।

রেজাল্টের দিন স্যার বলেছিলেন, 'তুমি এত ভাল রেজাল্ট করবে আমি ভাবিনি!

আমি হেসেছিলাম শুধু। স্যারকে আর বলিনি যে গুঁতোয় গরু গাছে ওঠে! কিন্তু বিপদ হল অন্য জায়গায়। মেয়েটা খুব খারাপ রেজাল্ট করল। ফলে এবার উলটো চাপে পড়ে গেলাম। ওকে যদি স্যার আর না পড়ান!

না, স্যার সেরকম কিছুই করেননি। মেয়েটি ওইখানেই পড়ত। আর তার জন্য আমাকেও অন্যরকম নানান পরীক্ষা দিতে হয়েছিল পরবর্তী জীবনে। তবে সে গল্প এখানে নয়!

ছোট্টবেলার স্কুল লাইফে সেই যে মনে হত, সারা বছর পরীক্ষা চললে ভাল হয়, ঈশ্বর আমার আর কোনও ইচ্ছে না শুনলেও এটা ঠিক শুনে ও মেনে নিয়েছিলেন! তাই হয়তো এখন জীবনের সব ক্ষেত্রে সারাক্ষণ পরীক্ষা দিতে হয়! আর এই পরীক্ষায় তাড়াতাড়ি লিখে, খাতা জমা দিয়ে, স্কুলের মাঠে পাগল হাওয়ার মধ্যে ঘুরে বেড়াবার কোনও সুযোগ নেই!

জানি এ শুধু আমার নয়, সবারই গল্প! আমরা সবাই সারাক্ষণ নানান পরীক্ষায় জড়িয়ে আছি। এক অদৃশ্য ইনভিজিলেটর আমাদের মাথার ওপর বসে! আর সারাক্ষণ কোথায় যেন ওয়ার্নিং বেল বেজে চলেছে! যেন শুনতে পাচ্ছি কোন সুদূর থেকে কেউ বলছে, ‘খাতা বেঁধে নাও, খাতা বেঁধে নাও। আর সময় নেই!’

এখন এই মধ্য চল্লিশে এসে মনে হয় ছোটবেলার সেই হাসি-কান্নার পরীক্ষাগুলো অনেক অনেক ভাল ছিল!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%