স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
ঠাণ্ডা মেশিন মানে ফ্রিজ। কিন্তু আমাদের মফস্সলে বয়স্ক লোকজন সেই আশির দশকের প্রথমে ফ্রিজকে ঠান্ডা মেশিন বলেই ডাকত!
আমাদের ফ্রিজটার নাম ছিল ‘জেম’। ফ্রিজের দরজার হাতলের ওপর বর্গাকার একটা পাতুর পাত আটকানো ছিল। তাতে ছিল একটা হিরের ছবি। তলায় লেখা জেম! মানে রত্ন!
তা রত্নের চেয়ে কম কিছু ছিল না সেই ফ্রিজটা। কারণ সারা পাড়ায় আমাদের বাড়িতেই তখন একমাত্র ছিল সেই ঠান্ডা মেশিন। যাকে বলা যায় পাড়ার সবেধন নীলমণি ছিল এই ফ্রিজটা।
ফ্রিজটা ছিল আইভরি হোয়াইট রঙের। একশো পয়ষট্টি লিটার। এক পাল্লার। বেশ ভারী ছিল পাল্লাটা। আর পাল্লাটার ওপরের বাঁদিকে ইংরিজি ‘ইউ’ আকৃতির একটা হাতল ছিল।
আমাদের আর্থিক সঙ্গতি তেমন না থাকলেও আমার মা খুব বিষয়ী ছিল। টাকা জমিয়ে জমিয়ে টুকটুক করে এটা ওটা কিনত। ফ্রিজটাও ছিল অমন করে টাকা জমিয়েই কেনা।
আমাদের বাড়িতে যখন প্রথম ফ্রিজ আসে তখন আমার বয়স পাঁচ কি ছয়। কিন্তু আসার দিনটার কথা এখনও স্পষ্ট মনে আছে। সারা বাড়িতে এমন সাজো সাজো রব পড়ে গিয়েছিল যে বলার নয়। আর শুধু আমাদের বাড়িতেই নয় আমাদের আশপাশের বাড়ির লোকজনেরাও বিকেল থেকে এসে জমা হয়েছিল আমাদের বারান্দায়, ঘরে। আমাদের নিস্তরঙ্গ মধ্যবিত্ত জীবনে সেই ফ্রিজ ছিল একটা ঘটনা বিশেষ !
মনে আছে পাড়ার মোড়ে একটা সবুজ ম্যাটাডোর করে এসেছিল ফ্রিজটা। সারা গায়ে প্লাস্টিক জড়ানো আর পিচবোর্ডের খোলসের মধ্যে ভরা ছিল জিনিসটা।
আমাদের বাড়িটা ছিল পাড়ায় ঢুকেই বাঁহাতে প্রথম। সেইটুকু ফ্রিজটাকে বয়ে নিয়ে এসেছিল আমাদের অরুণাচল ক্লাবের কাকুরা। কোল্যাপসিবল গেট পেরিয়ে যখন ফ্রিজটা ঢুকছিল আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম পাড়ার কোনও কোনও জেঠিমা-কাকিমা উলুও দিচ্ছে!
ফ্রিজটা রাখা হয়েছিল আমাদের শোওয়ার ঘরে। আসলে ছোট্ট বাড়িতে সেরকম জায়গা ছিল না।
তারপর ফ্রিজের ধরাচূড়ো খুলে সেটাকে বসানো হয়েছিল কাঠের একটা চৌকো মতো পেডাস্টালের ওপর। আগে থেকেই ইলেকট্রিকের প্লাগ পয়েন্ট আর সুইচ করা ছিল। সেখানে প্লাগ গুঁজে চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল ফ্রিজটা! আমি ফ্রিজ না দেখে সবার মুখ-চোখ দেখছিলাম। সবার মুখেই কী যে আনন্দ দেখেছিলাম তা বলে বোঝাবার নয়!
আসলে আমাদের ছোট্ট পাড়ায় সবকিছুই ছিল সবার। বি-পিসির বাড়ির টিউবওয়েল থেকে সবাই জল নিত। পালদের বাড়ির বাতাবি লেবু গাছের লেবু সবার বাড়ি যেত। ঢালীবাবুদের বাগানের ফুলে ভরে উঠত সবার সাজি! যোগেন সর্দারদের পুকুরের তেলাপিয়া মাছ ইচ্ছে করলেই যে কেউ ধরে নিয়ে যেতে পারত! পুকুরের ওই পাড়ের মিহির রক্ষিতদের গাছের ফল সবার বাড়িতে আসত।
তাই ফ্রিজটা আমাদের বাড়িতে এলেও সেটাকে দেখা হয়েছিল এই ভাবে যে সবার বাড়িতেই ফ্রিজ এল!
ফ্রিজ তো চালানো হল। এবার ঠান্ডা হলে কেমন লাগবে? আমার ছোটপিসি আর মা মিলে কয়েকটা বোতল পরিষ্কার করে তাতে জল ভরে রেখেছিল আগেই। এবার চালু ফ্রিজের মধ্যে ভরে দেওয়া হল বোতলগুলো। তারপর সবাই অপেক্ষা করতে লাগল। মানে কেউই বাড়ি গেল না, সবাই বসে গল্প করতে লাগল আর মাঝে মাঝে আড়চোখে দেখতে লাগল কখন জল ঠান্ডা হবে!
মা জিজ্ঞেস করল, ক'জন চা খাবে! অন্যদিন হলে অন্তত পনেরো কাপ চা হতই! কিন্তু সেদিন সবাই বলল, একটু পরেই তো ঠান্ডা জল খাওয়া হবে, তাই চায়ের আর কী দরকার!
আমাদের মধ্যে কোনও কোনও ছোটরা মাঝে মাঝে ফ্রিজ খুলে দেখার চেষ্টা করলে বড়রা ধমকও দিচ্ছিল। আরে বারবার দরজা খুললে জল ঠান্ডা হতে সময় লাগবে যে!
তখন আমাদের ছোট্ট শহরে ঠান্ডা পানীয় বলতে ছিল কোল্ড ড্রিঙ্ক। কিন্তু সেটাও খাওয়া হত কালেভদ্রে। মিষ্টির দোকানের যে ফ্রিজ ছিল সেগুলো ছিল পুরনো দিনের। ইয়াব্বড়। কাঠের দরজা। পেতলের হাতল! সেটা খুললেই ভেতরে কেমন যেন ধোঁয়া ধোঁয়া ভাব। আর তাতে ছোট বড় খুড়িতে সাজানো দই!
সেসব ছিল বাহুল্যবর্জিত এক সময়। ফ্রিজ, টিভি, টেলিফোন, গ্যাস থাকাটা ছিল একধরনের বিলাসিতা। এয়ার কন্ডিশনার কেনার কথা তো মানুষ স্বপ্নেও ভাবত পারত না। লোকজন সামান্য ছাতা বা হাতঘড়ি সারিয়ে-টারিয়ে চালাত বছরের পর বছর। আমার ঠাকুরদা মানে মিষ্টিদাদুর কাছেই শুনেছি যে তাঁর অ্যাংলো সুইস হাতঘড়িটা নাকি উনিশশো চল্লিশ সালে কেনা!
এমন এক পরিস্থিতিতে আমাদের ছোট্ট বাড়িতে ফ্রিজ এসেছে! সেখানে উৎসব হবে না তা হয়!
বেশ কিছুক্ষণ পরে ফ্রিজ খোলা হল। হলুদ নরম আলো তার পেটের ভেতরে! আর এখানেও সেই কালিকা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ফ্রিজের ভেতরের মতো ধোঁয়া ধোঁয়া ভাব! আর সঙ্গে কী নরম একটা ঠান্ডার ঝাপটা!
জলের স্বচ্ছ বোতলটা কেমন যেন মেঘলা হয়ে আছে। গায়ে জলের মিহি গুঁড়ো। গরমের দিনে দু'হাতে সেই বোতল ধরতে কী যে ভাল লাগছে!
সবাই এক এক করে জল খেতে শুরু করেছিল। কেউ গ্লাস হাতে কেউ আবার সরাসরি বোতল থেকেই! আর সঙ্গে সঙ্গে নানান মন্তব্য। কারও গলায় লেগেছে! কারও দাঁত কনকন করে উঠেছে। কারও আবার কিছুই হয়নি এবং সে নাকি এর চেয়েও ঠান্ডা খেতে পারে! এমন নানান কিছু ওড়াউড়ি করতে লাগল ঘরে। কেউ কেউ ছোটদের বকতেও লাগল। ছোটরা যেন হুড়োহুড়ি না করে। যেন সাধারণ তাপমাত্রার জল মিশিয়ে খায় ঠান্ডা গুলে! নানান রকম শাসন চলতে লাগল। তার মধ্যেই আমার বছর তিনেকের খুড়তুতো ভাই ফ্রিজের দরজা খুলে দাঁড়িয়ে ঠান্ডার ভাপ নিতে শুরু করল!
আমরা এও দেখলাম যে ফ্রিজের ওপরে আবার আলমারির লকারের মতো আরেকটা ছোট্ট খোপ। সেটা আবার স্প্রিং লোডেড একটা ছোট্ট পাল্লা দিয়ে আটকানো! ওটাকে বলা হল ডিপ ফ্রিজার! ওখানে বরফ তৈরি হয়! অ্যালুমিনিয়ামের কানা-উঁচু আয়তাকার ট্রের মধ্যে প্লাস্টিকের চৌকো ঘর কাটা একটা প্লাস্টিক। সেটা ট্রে-র মাপে ফিট করে যায়। তাতে জল ভরে রাখা হল ডিপ ফ্রিজারে।
বেশ কিছু পরে দেখা গেল সুন্দর লুডোর ছক্কার আকারের বড় বড় বরফের টুকরো! এ যে আশ্চর্য জিনিস! আমরা সেই বরফ নিয়ে খেতে লাগলাম। না, পারলাম না ঠিক খেতে। কারণ ঠান্ডাও যে এমন করে জ্বালা ধরায় কে জানত! কিন্তু সেই ঠান্ডা জল, বরফ দেখে, ধরে খেয়ে সবাই যে কী খুশি হয়েছিল তা না দেখলে কেউ বিশ্বাসই করবে না!
প্রথম দু'-তিনদিন নানান লোকজন আসতে লাগল এই ফ্রিজ দেখবে বলে। বাড়িতেও
কিনে আনা হল ‘রসনা' নামের একটা শরবত বানানোর প্যাকেট। বানানো হল রসনা । বোতলে ভরে রাখা হল ফ্রিজে। আস্তে আস্তে খাবারদাবার রাখা হতে লাগল। বাবা কলকাতার অফিস থেকে ফেরার পথে কিনে আনতে লাগল লজেন্সের প্যাকেট। মিষ্টির বাক্সও জমতে লাগল ।
প্রচণ্ড গরমে বড়দের চোখ এড়িয়ে আমরা ছোটরা ফ্রিজের পাল্লা খুলে তার সামনে কয়েক সেকেন্ড করে দাঁড়াতেও শুরু করলাম।
তখন পাড়ার লোকজন এসেই প্রথমে বলত, ‘ঠান্ডা জল খাব।’ কেউ আবার বলত ‘র’ দিও না। মিশিয়ে দাও। লোকজন এবাড়ি ওবাড়ি থেকে বাটি করে রেখে যেত খাবার। তরকারি। পাড়ার সান্ধ্য অনুষ্ঠানের জন্য সকালবেলা আনা ফুলের মালা রাখা হত ওই ফ্রিজেই।
বাড়ির সামনেই অরুণাচলের মাঠ। তাতে ফুটবল খেলা হত খুব। আর কারও চোট লাগলেই আমাদের কোল্যাপসিবল গেটের সামনে এসে বাচ্চুকাকা, বাবুকাকা, অরুণ পাল, বিটুদা, ছোটকা বা বিধানকাকা চিৎকার করত, ‘বউদি বরফ দাও!’
আরেকবার মজা হল। একটু দূরে থাকে যে সাধনকাকা, তার বোনের বিয়ে হবে। পাত্র নাকি খুব বড়লোক বাড়ির ছেলে। মেয়েকে দেখে পছন্দ হয়েছে বলে বিনা পণে বিয়ে করতে আসছে। এই যে পণ নিচ্ছে না এটাতেই তখন সবাই কৃতার্থ হয়ে গিয়েছিল। এখন ভাবলে হাসি পায় যেটা স্বাভাবিকভাবে হওয়া উচিত সেটা আদতে হয় না বলেই মানুষ এমন কৃতার্থ হয়ে ওঠে!
যাই হোক, সাধনকাকা এসে বলল যে বিয়েতে ছেলেরা যেহেতু দূর থেকে আসবে তাই বাটার একটা ফাঁকা কোয়ার্টারে বরযাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে সবই আছে, শুধু ঠান্ডা জলের ব্যবস্থা নেই! ছেলের নাকি অসুবিধে হবে। তাই ফ্রিজটা কি দু'দিনের জন্য দেওয়া যাবে?
মানুষ জামাকাপড় চায়, ঘড়ি চায়, ছাতাও চায়। কিন্তু আস্ত ফ্রিজ!
আমাদের বাড়িটা যেহেতু একটু হট্টমেলা ধরনের ছিল তাই প্রায় সবসময়ই পাড়ার কেউ না কেউ থাকত।
আমরা কিছু বলার আগেই পাড়ার দুই কাকিমা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল এই বলে, এভাবে ফ্রিজ নিয়ে যায় নাকি কেউ! আর আমাদের বাড়ির আশপাশের অনেকেই ফ্রিজে নানান জিনিস রাখে, তাদের কী হবে তা হলে? আর এমন কথা কেউ বলতে পারে? আশ্চর্য! তবে আমার মা আপত্তি করেনি। এতে পাড়ার অনেকেই মাকে বলেছিল, 'এটা ভুল করলে অর্চনা। দেখবে ফ্রিজটা ভেঙে ফেলবে, নষ্ট করে দেবে!’
আমার মনে আছে মনুদার ভ্যানে করে ফ্রিজটা দু'দিনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। যখন যন্ত্রটা ভ্যানে ওঠানো হচ্ছে আমার ছোট্ট ভাই মায়ের কোলে উঠে কেঁদে ভাসিয়েছিল একেবারে। ফর্সা, ছোট্ট মানুষ গোলাপি হয়ে গিয়েছিল পুরো।
অন্যের চোখে জল দেখলে বরাবর জল এসে যায় আমার চোখে। ভাইকে কাঁদতে দেখে আমারও চোখেও তাই জল এসে গিয়েছিল। দেখাদেখি আমার পিসতুতো দিদি আর বোনও কেঁদেছিল! সেই ছোট বয়সে সবটাই কেমন যেন দেখাদেখি করে হত!
ফ্রিজটা চলে যাওয়ার পরে মা আমাদের বসিয়ে বলেছিল, 'এটা তো সামান্য যন্ত্র একটা। এর জন্য এমন করতে নেই! আর শুধু যন্ত্র কেন, কোনও কিছুর সঙ্গেই এত অ্যাটাচমেন্ট ভাল নয়। অত মনে নিতে নেই কিছু। যত এমন করে কেউ আঁকড়ে, আটকে থাকবে তাকে তত কষ্ট পেতে হবে!’
তখন এসব কিচ্ছু বুঝিনি! শুধু মনে হয়েছিল আমাদের ফ্রিজটা নষ্ট হয়ে যায় যদি! তখন ছিল সবকিছু মুঠো শক্ত করে ‘আমার আমার’ বলে ধরে রাখবার চেষ্টা করার বয়স। পরে, অনেক পরে মায়ের কথার আসল মর্মটা বুঝেছি। সেই ছোটবেলার থেকে কত কথাই তো মনের ফাঁক দিয়ে গলে পড়ে হারিয়ে গিয়েছে! কিন্তু বৈশাখের সেই বিকেলে মায়ের সব কথাগুলো এত কথার ভিড়েও কী করে যেন মনে থেকে গিয়েছে আজও! বুঝেছি অমন সত্যি কথা জীবনে খুব কমই শুনেছি।
ফ্রিজটা ফিরে এসেছিল। আর অক্ষত অবস্থাতেই এসেছিল। আমার ভাই সহ পাড়ার অনেকের মুখেই ফুটে উঠেছিল উজ্জ্বল হাসি।
বছরখানেক পরে আমাদের বাড়িওয়ালা জেঠু আর মাম্মামদের বাড়িতেও ফ্রিজে এসে গেল। ফ্রিজ এল বুয়াদের বাড়িতে। আশিসকাকাদের বাড়িতে। আপ্লুদের বাড়িতেও। আস্তে আস্তে আরও সব বাড়িতে ফ্রিজ আসতে লাগল। লোকজন আর যখন তখন ঠান্ডা জল খেতে চাইত না। আশপাশের বাড়ি থেকে খাবার, তরিতরকারি আসা বন্ধ হয়ে গেল। বরফ খেতে আর আসত না কেউ! সবার ফ্রিজ ক্রমে ক্রমে শুধু আমাদের হয়ে উঠল। কিন্তু তাতে আমার কোথায় যেন সূক্ষ্ম একটা কষ্ট হয়েছিল।
সেটা কি গুরুত্ব হারানোর কষ্ট? নাকি লোকজনের সেই আনন্দময় মুখ দেখতে না পাওয়ার কষ্ট? এখন আর মনে নেই। তবে হয়েছিল এটা মনে আছে।
তারপরেও আমাদের বাড়িতে সারাক্ষণ পাড়ার লোকজন আসত, কিন্তু ফ্রিজের জল বা অন্য কিছুর প্রতি আর তাদের আগ্রহ ছিল না। আমাদের কাছেও ফ্রিজটা ক্রমে হয়ে উঠল ন’কাকার সাইকেল, ঠাম্মার মিটসেফ বা মিষ্টিদাদুর কাঠের আলমারির মতো!
সাতাশি সালে কলকাতায় ভাড়াবাড়িতে চলে এলাম আমরা। নব্বইতে এলাম নিজেদের নতুন বাড়িতে। দু'বছর পরে নতুন প্লাস্টিকের বডির ফ্রিজ এল বাড়িতে। সেই পুরনো ‘জেম’ ফ্রিজটিকে মেরুন রং করিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হল আমাদের অফিসে। আমাদের যেন আর খেয়ালই থাকল না তার কথা!
দু'হাজার পনেরো সাল অবধি সেই ফ্রিজ ছিল আমাদের অফিসে। তারপর অন্য অফিসে উঠে যাওয়ার সময় সেটা কাকে যেন দিয়ে দেওয়া হল!
সেদিনও অফিসের সামনে ভ্যান এসেছিল একটা। তাতে ফ্রিজটাকে তুলে নিয়ে চলে যাওয়ার সময় আমি একাই দাঁড়িয়েছিলাম রাস্তায়।
মা নেই সেই দু’হাজার দুই সাল থেকে। সেই ছোট্ট খুড়তুতো ভাই এখন চল্লিশ পার করে গিয়েছে। স্ত্রী-সন্তানসহ থাকে লস অ্যাঞ্জেলেস-এ। পিসতুতো দিদির বিয়ে হয়ে গিয়েছে কলকাতার অন্য এক প্রান্তে। পিসতুতো বোনও বিয়ের পর দিল্লি নিবাসী!
সেই ফ্রিজ অবশেষে যখন চলে যাচ্ছিল তখন আমি ছাড়া আর কেউ ছিল না তাকে বিদায় জানাবার! আমাদের পণ্ডিতিয়ার অফিসের সামনে থেকে সেই ভ্যান ধীরে ধীরে বাঁক নিয়ে মিলিয়ে গিয়েছিল কলকাতা শহরের ভিড়ে।
আমার চোখের কোণ জ্বালা করে উঠেছিল হঠাৎ। গলার মধ্যে কী যেন আটকে যাওয়ার এক কষ্ট! মনে পড়ছিল মায়ের সেই কথা! অত মনে নিতে নেই কিছু!
না, ফ্রিজের জন্য তো গলার কাছে অমনটা হয়নি। তা হলে কেন হয়েছিল? সেই হারিয়ে যাওয়া ছোটবেলার জন্য কি অমনটা হয়েছিল। সেই সবাই মিলে একসঙ্গে আনন্দ করার দিনগুলোর সাক্ষী ছিল যে জিনিসটা, সেটা চলে গেল বলে কি অমনটা হয়েছিল? জীবনের সহজ আনন্দগুলো সব শেষ হয়ে গেল বলেই কি সেই সন্ধের মুখে দাঁড়িয়ে কষ্ট হয়েছিল আমার?
কী জানি! তবে আজও ফ্রিজটার কথা মনে পড়লে আমার খুব আনন্দ হয়। এক মিহি ভাললাগা মনের মধ্যে জড়িয়ে যায় পাহাড়ি কুয়াশার মতো। মনে হয় আবার সেই •গরমের ছুটির দুপুর এসেছে। বাড়ির সবাই ঘুমোচ্ছে। তার মধ্যে আমি আর ভাই পা টিপে টিপে এগোচ্ছি ফ্রিজের দিকে। ওইখানে যে লজেন্স রাখা আছে! চিত্রকূট রাখা আছে! আর আছে ফ্রিজের দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকার মতো একটা দার্জিলিং!
ফ্রিজটা আর নেই। তবু তার স্মৃতি আজও আমার কাছে এক আশ্চর্য টাইম মেশিন!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন