সেই মেয়েটা

স্মরণজিৎ চক্রবর্তী

কলকাতায় আমাদের ভাড়ার বাড়িটা ছিল তিনতলা। একদম ওপরের তলাটা খালি থাকলেও দোতলায় একটা পরিবার থাকত। স্বামী-স্ত্রী আর তিন সন্তান। দুই দিদি আর ছোট ভাই। মিঠি, মিষ্টি আর নোনতা। এমন ডাকনামেই ওদের ডাকত ওদের বাবা-মা। আমি নীচের থেকে শুনতে পেতাম! ওদের দেখতামও রাস্তায়! অফিসের থেকে ওদের বাবা গাড়ি পেত। তাতে করে ওরা প্রায়ই ঘুরতে যেত।

মা ওদের চিনত। বলত মেয়ে দু'জন অশোক হল-এ পড়ে। পড়াশুনোয় খুব ভাল ওরা। আর ক্যারাটেও নাকি শেখে!

শনিবার দিন আমাদের স্কুল হাফ ডে হত। দুপুর একটা চল্লিশে ছুটি হয়ে যেত। আড়াইটে নাগাদ ট্রেন ছিল ফেরার। তো একদিন এমন ট্রেনে ফিরছি। বর্ষাকাল। প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। আমি টালিগঞ্জ স্টেশনে নেমে দেখলাম চারিদিক জলে থইথই করছে একদম! আমার চামড়ার জুতো যদি ভিজে যায়! সোমবার স্কুলে কী পরে যাব? জুতো খুলে হাতে ঝুলিয়ে আমি ছাতা মাথায় বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলাম।

‘পিপ-ইন' বলে লেকে ঢোকার রাস্তার মুখে যে ফাস্ট ফুড সেন্টার কাম রেস্তোরাঁটা আছে তার সামনেটা যেন নদী হয়ে গিয়েছে! হাঁটু অবধি ডুবে যাচ্ছে পুরো। পা টিপে টিপে রাস্তা পার হয়ে আমি ফুটপাথে উঠে বাড়ির দিকে আসছি, এমন সময় পাশের একটা দোকানের শেড থেকে শুনলাম নরম গলায় কে যেন বলল, 'এক্সকিউজ মি!’

আমি থমকে দাঁড়ালাম। আসলে ব্যাপারটা হল মফস্সলের বাংলা মিডিয়াম স্কুলে পড়তাম আমি। স্কুলের রেজাল্ট ভাল হলেও সেখানে হই হট্টগোলই হত সারাক্ষণ। ছেলেপিলেরা কেউ খুব একটা সফিস্টিকেশনের ধার ধারত না। কেউ কাউকে ডাকলে নাম ধরে চেঁচিয়ে ডাকত! সেখানে এমন পিপারমিন্টের গলায় কে ডাকল!

তাকিয়ে দেখি আমাদের ওপরে যে দুই বোন থাকে তাদের একজন। এখানে বলে রাখা ভাল যে মেয়েদের প্রতি আগ্রহ সেই সময়ে সবে জন্মাচ্ছে আমার। কিন্তু কাউকেই সিরিয়াসলি ভাললাগার মতো সাহস তখনও হয়নি। কারণ নিজের সম্বন্ধে সেই সময়ে আমার একটা ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স ছিল। আমি বেঁটে। সামান্য তোতলা। দেখতে ভাল নই! পড়াশুনোয় উচ্চমধ্যবিত্ত টাইপ! সেখানে কে আমায় পছন্দ করবে! কেনই-বা করবে! তাই মেয়েদের প্রতি আগ্রহ জন্মাতে থাকলেও তাদের কাছে যাবার কোনওরকম সাহস আমার ছিল না।

সেখানে একটা মেয়ে আমায় ডাকছে! কেন?

আমি তাকিয়ে দেখলাম যে মেয়েটার মুখটা কাঁদো কাঁদো। মাখনের মতো ফর্সা মুখ স্ট্রবেরি আইসক্রিমের মতো হয়ে গিয়েছে! কেন? ভয়ে? আমি বললাম, ‘কিছু বলবে?”

—‘আমায় একটু বাড়ি নিয়ে যাবে? এত বৃষ্টি! আমার ছাতাটাও উলটো পালটা হাওয়ায় ভেঙে গিয়েছে! নিয়ে যাবে প্লিজ!’ মেয়েটা নরম কিন্তু ভিতু গলায় বলল আবার!

আমি শশব্যস্ত হয়ে বললাম, ‘নিশ্চয় নিশ্চয়।’ একই বাড়িতে তো থাকি!

আমি এগিয়ে গিয়ে ছাতা বাড়িয়ে ধরলাম! আর ছাতা বাড়িয়ে ধরেই বুঝলাম আমার পিঠের ব্যাগ থেকে আরম্ভ করে জামার অনেকটা ভিজতে শুরু করেছে! কিন্তু তোমার শরণে যখন কেউ এসেছে তাকে কি তুমি বিপদে ফেলে পালিয়ে যাবে? আমার মাথার মধ্যে মিষ্টিদাদুর গলার স্বর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের মতো বেজে উঠল।

মেয়েটা এসে ছাতার তলায় দাঁড়াল। আমরা আস্তে আস্তে বাড়ির দিকে এগোতে লাগলাম। জানলাম ওদের স্কুল ছুটি। তাই ভিডিয়ো পার্লারে গিয়েছিল ভিএইচএস টেপ-এর সিনেমা আনতে। কিন্তু গিয়ে দেখে এই দুর্যোগে ‘প্রিয়াঙ্কা' নামের ভিডিয়ো পার্লারটি বন্ধ! সেখান থেকে ফেরার পথে দমকা হাওয়ায় ছাতা উলটে এই বিপত্তি!

ভিএইচএস টেপ এখন আর দেখাই যায় না প্রায়! যাদের বাড়িতে আছে তারা হয়তো স্মৃতি হিসেবে রেখে দিয়েছে। কিন্তু তখন এরই রমরমা বাজার ছিল! আমাদের বাড়িতে একটা ভিসিআর ছিল। আমিও সেই ‘প্রিয়াঙ্কা' দোকানটা থেকেই ভিএইচএস টেপ নিয়ে আসতাম। যদিও সেই বড় কালো টেপকে সবাই বলত ক্যাসেট!

এই আবহাওয়াতে সিনেমার ক্যাসেট আনতে বেরিয়েছে! কী আশ্চর্য! কিন্তু আমি কিছু না বলে চুপচাপ হাঁটতে লাগলাম। আমার ডানদিকের হাত আর পিঠের ব্যাগ ভিজে গিয়েছে ততক্ষণে! কিন্তু সেই, ঠাকুর্দার ভয়েস ওভার!

—‘আমার নাম মিষ্টি! তোমার নাম তো রাজা, না?' ছাতার নীচে হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করল মিষ্টি!

মিষ্টি! মানে সত্যি তো আর কীই-বা নাম হবে! আর রাজা! দূর! এর সামনে আমি তো প্রজারও অধম কিছু!

আমি কিছু না বলে বোকার মতো হাসলাম। আর এত কাছে আছে বলেই বুঝতে পারলাম মিষ্টির স্কিনের নীচে কেউ গোলাপি ফুলের চারা পুঁতে দিয়েছে! বুঝলাম ওর চোখের পাতা কী বড় আর ওপরের দিকে কার্ল করা! আর এটাও দেখলাম মিষ্টির চোখের মণি হালকা বাদামি!

আচমকা অপরাধ বোধ হল আমার। এভাবে কাউকে দেখা কি ঠিক! এটা তো পাপ! আসলে সেই বয়সে পাপ আর পুণ্য নিয়ে নানানরকম আইডিয়া আমাদের মাথার মধ্যে পুঁতে দেওয়া হত! আর বরাবর সবাইকে বিশ্বাস করে ফেলা আমি, কী করব আর কী করব না এটা বুঝতে বুঝতেই ট্রেন বেরিয়ে যেত! এই যে মিষ্টিকে এত সুন্দর লাগছে আমার! এই যে ওর সঙ্গে এক ছাতায় হাঁটতে ভাল লাগছে, সেটা কি পাপ হচ্ছে! এমন করে কারও সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে ভাল লাগলে কি ভগবান পাপ দেয়!

মিষ্টি বলল, “তুমি জুতো খুলে হাঁটছ কেন? পায়ে কিছু ফুটে গেলে!’

আমি আমতা আমতা করে সামান্য তুতলে বললাম, ‘সোমবার স্কুল আছে। চামড়ার জুতো... তাই...'

মিষ্টি সামান্য গম্ভীরভাবে বলল, ‘এমন করতে নেই! নিজের শরীর বেশি ইমপরট্যান্ট না ওই জুতো? কিছু ফুটলে ইনজেকশন নিতে হবে!’

ইনজেকশন! আমার গলা শুকিয়ে গেল! ওই জিনিসটায় যে খুব ভয় লাগে আমার। কিন্তু মিষ্টির সামনে সেটা বলিই-বা কেমন করে! এমন একজনের সামনে কি নিজেকে ভিতু প্রমাণ করা যায়!

সেই জায়গা থেকে আমাদের বাড়িটা কাছেই ছিল একদম। তাও আমার পায়ে জুতো ছিল না বলে আমরা আস্তে আস্তে হাঁটছিলাম। আমার মনে যেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল তেমন আবার ভালও লাগছিল।

আসলে বড় হয়ে ওঠার বয়সগুলোয় আমাদের মনের ছাঁকনিটা ঠিকমতো তৈরি হয় না। তা ছাড়া আশপাশের ব্যর্থ, লেটেন্ট ডিপ্রেশনে ভোগা আর সবকিছুতে পলিটিকালি কারেক্ট থেকে সবার কাছে ভাল হতে চাওয়া মানুষজন চিরকাল আমাদের এমন কিছু শেখায় যেখানে মানুষ নিজেকে গুরুত্ব দিতেই ভুলে যায়! নিজেকে ভালবাসাকে তারা অপরাধ বলে মনে করতে শুরু করে! আমার সঙ্গেও তেমনই হয়েছিল! ফলে এই ভাললাগাকে আমি মন থেকে তাড়াতে চাইছিলাম!

ওদের দোতলায় ঢোকার দরজা ছিল বাড়ির অন্য পাশে। আমি ওকে দরজা অবধি এগিয়ে দিলাম। ও কলিং বেল বাজিয়ে দরজার সামনে শেডের তলায় দাঁড়িয়ে তাকাল আমার দিকে। বলল, ‘আমায় সেফ রাখতে গিয়ে নিজে তো ভিজলে। ইউ আর নাইভ! বাট ভেরি সুইট!’

—‘নাইভ’ মানে কী? ‘নাইফ’ মানে তো ছুরি! কিন্তু ‘নাইভ’! সেটা কী?

বাড়িতে মা একটু বকল জুতো খুলেছি আর ভিজে এসেছি বলে। কিন্তু আমার গায়ে সেসব লাগলই না! আমার মনে হল এমন বৃষ্টি কি কলকাতায় রোজ হতে পারে না? আর

রোজ কি কেউ অমন ভিএইচএস টেপ আনতে গিয়ে ছাতা উল্টিয়ে বিপদে পড়তে পারে না? সেদিন রাতে শুয়ে আমার খালি মিষ্টির মুখই ভেসে উঠছিল সামনে। আর স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম যে আমি বড় হয়ে গিয়েছি!

কেউ যদি ভাবে কী পাকা ছেলে! ক্লাস সেভেনেই এমন! তারা হয়তো নিজেদের সেই ক্লাস সেভেন-এইটের বয়সটা ভুলে গিয়েছে!

সেই মিষ্টিকে দেখা! সামান্য কথা বলা। আর তারপর থেকে ভাললাগার শুরু! আমাদের একতলার উঠোন থেকে ওদের দোতলার একটা জায়গা দেখা যেত! কিন্তু মা বুঝতে পেরে যাবে বলে আমি সেইভাবে ওকে দেখার চেষ্টা করতাম না।

স্কুল থেকে ফেরার পথে আমি দেখতাম মিষ্টি ওদের দোতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে! আমায় দেখে কখনও-সখনও, পাশে মা বা দিদি না থাকলে, কপাল আর গালের ওপর এসে পড়া চুল কানের পেছনে সরিয়ে দিয়ে একটু হাসত ও। তারপর ঘরে ঢুকে যেত!

কোনওদিন আমি বাড়ি থাকলে স্কুল থেকে ফেরার পথে আমাদের বাইরের ঘরের জানলার পাশে এসে ও দাঁড়াত। না, কথা হত না। দু'জন দু'জনকে একটু দেখতাম মাত্র। তারপর ও চলে যেত!

আমার কেমন একটা লাগত যেন! কেন এমন হচ্ছে বুঝতে পারতাম না! শুধু মনে হত কে যেন আমার বুকের মধ্যে বিশাল বড় এক হলঘর তৈরি করে দিয়ে গিয়েছে! কাউকে ভাল লাগলে যে এমন একা লাগে সেই সময় থেকেই বুঝতে শুরু করেছিলাম আমি!

মাঝে মাঝে আমরা কোনও ক্যাসেট আনলে মা ওদের দেখতে দিত! মিষ্টির মাকে নীচের থেকে ডেকে বলে দিত মা! আর একটু পরেই মিষ্টি নীচে এসে আমাদের ভেতরের দরজা দিয়ে নিয়ে যেত!

তবে ক্যাসেটটা নিয়েই চলে যেত না। সিঁড়ির ওপর একটু দাঁড়াত। আমি দরজা বন্ধ করার আগে একটু তাকাতাম। নির্জন আবছায়া সিঁড়ি। সেখানে ফ্রক পরে দাঁড়িয়ে রয়েছে মিষ্টি! ওপরের রঙিন কাচ দিয়ে আলো আসত অন্য কোনও গ্রহ থেকে! মিষ্টিকে দেখে মনে হত এমন সুন্দর কেউ তো পৃথিবীর হতে পারে না! আচ্ছা, ও কি প্লুটো থেকে এসেছে!

আমি কথা না বলে তাকিয়ে থাকতাম একটু। মিষ্টিও তাকিয়ে থাকত! তারপর ধীরে ধীরে ওপরে চলে যেত। আর আমিও বন্ধ করে দিতাম দরজা!

টার্মিনালের সময় আমার যখন ফার্স্ট হাফে পরীক্ষা থাকত। আমি তাড়াহুড়ো করে একটু আগে স্টেশনে যাব বলে বাড়ি থেকে বেরতাম! তবে সেটা যে শুধু আগের ট্রেন ধরব বলে তা নয়। একটু আগে বাড়ি থেকে বেরতাম কারণ মিষ্টি আর ওর দিদি ওই সময় স্কুল বাস ধরবে বলে বাসস্টপে দাঁড়িয়ে থাকত। আমি ওদের কাছ দিয়েও যেতাম না। বিশাল চওড়া এসপি মুখার্জি রোডের অন্যদিকে দাঁড়িয়ে থাকত ওরা। আর আমি উলটোদিক দিয়ে যেতাম। দূর থেকে ওদের আকাশি-নীল সাদা স্কুলড্রেস দেখতে পেতাম। ভাবতাম মিষ্টিও কি আমায় দেখতে পাচ্ছে?

রোজ যে অমন করে দেখার সুযোগ হত, তা কিন্তু নয়! কিন্তু যেদিন যেদিন মিষ্টিকে দেখতে পেতাম আমার মন ভাল হয়ে যেত! মনে হত পৃথিবী কী সুন্দর! মনে হত আমাকে আরও ভাল মানুষ হতে হবে! আরও ভাল রেজাল্ট করতে হবে। মনে হত আমার ভাল ও সুন্দর মানুষ হওয়ার ওপরে এই পৃথিবীর সকল ভাল ও মন্দ নির্ভর করে আছে!

ক্রমে ক্রমে ক্লাস এইটে উঠলাম। জানলাম বাবা একটা বাড়ির একতলাটা কিনবে। কারণ লালপাড়ার ওই ভাড়াবাড়ি থেকে আমাদের উঠে যেতে বলা হয়েছে! আমার বাবা ঝামেলা ঝঞ্ঝাট একদম পছন্দ করত না। ফলে বাবা নানান দিকে লোককে বলতে লাগল বাড়ি কোথায় কেনা যায় সেই ব্যাপারে !

রাতে শুয়ে আমার কেমন যেন একটা মনখারাপ করত! মনে হত, তা হলে কি আর মিষ্টিকে কোনওদিন দেখতে পাব না? কিন্তু শুধু দেখেই-বা কী হবে! আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু অয়নাংশুকে আমি বলেছিলাম এই ব্যাপারটা। ও আমায় বলেছিল এটাই নাকি প্রেম! বলেছিল, আমার নাকি মিষ্টিকে ‘আই লাভ ইউ' বলে দেওয়া উচিত!

সর্বনাশ! পাগল নাকি? আমি ওইসব বলব! ওসব তো ওঁচা ধরনের হিন্দি সিনেমায় বলায় হয়! আমি সেখানে ওসব বলি কী করে!

অয়নাংশু বিরক্ত হয়ে মাথা নাড়িয়ে বলত, ‘তোর দ্বারা কিচ্ছু হবে না!

ও যে কতটা সত্যি কথা বলত আজ এই মধ্য চল্লিশে এসে বুঝতে পারি! আমার দ্বারা তখনও কিছু হয়নি, এখনও কিছু হয় না!

তারপর বাবা একটা তিনতলা বাড়ির একতলাটা কিনল। আর আমাদেরও এই বাড়িতে থাকার সময় ফুরিয়ে এল!

গৃহপ্রবেশের সময় বেশ কিছু লোকজনকে খাওয়ানো হল। মিষ্টিরাও সবাই এল। কিন্তু এতজনের মধ্যে কেমন যেন আমার সব ভুলভাল হয়ে গেল। আমি ঠিকমতো ওর দিকে তাকাতেই পারলাম না।

এর কয়েকদিন পরে একদিন মিষ্টি আমাদের বাড়িতে এল চাবি রাখতে! আসলে মাঝে মাঝেই ওরা সবাই মিলে ক্লাবে যেত। তখন আমাদের কাছে চাবি রেখে যেত!

সেদিন চাবি দিতে এসে আচমকা দাঁড়াল মিষ্টি। এমনিতে আমার হাতে চাবি দিয়েই চলে যেত। কিন্তু সেদিন গেল না। আমি চাবিটা নিতে গিয়ে দেখলাম শক্ত করে ধরে আছে। আমি অবাক হয়ে তাকালাম ওর দিকে!

মিষ্টি বলল, ‘তুমি চলে যাচ্ছ? আর দেখা হবে না?” দেখা হবে না মানে? আমি তো দেখতাম। হ্যাঁ, ও মাঝে মাঝে তাকাত বটে, কিন্তু মূলত আমিই তো দেখতাম! একটু দেখব বলে অপেক্ষা করে থাকতাম। তা হলে? তা হলেও ও নিজেও কি ....

মিষ্টি আর দাঁড়ায়নি সেদিন। চলে গিয়েছিল।

তার কিছুদিন পর আমরাও নতুন বাড়িতে চলে আসি। সেটা ছিল অক্টোবরের ছাব্বিশ তারিখ। উনিশশো নব্বই সাল!

তারপর আমার পৈতের সময়, মানে প্রায় সাতমাস পর মিষ্টিকে দেখেছিলাম রিসেপশনের দিন। মনে হয়েছিল, এই সাতমাসেই মিষ্টি এতটা বড় হয়ে গিয়েছে! আরও সুন্দর হয়ে গিয়েছে! আর সেভাবে তো তাকাচ্ছে না আমার দিকে! কিন্তু আমি কেন কাঙালের মতো তাকাচ্ছি! আমার ভাইবোনেরাও ব্যাপারটা জানত। তারা এসে আমায় আওয়াজ দিতে শুরু করেছিল। ঠেলে ঠেলে, ও যে ঘরে বসেছিল সেখানে ঢোকাবার চেষ্টা করছিল! আর আমি, সেই ক্লাস নাইনের ন্যাড়া, মাথা রোগা, লাজুক আর ভীষণ বোকা ছেলেটা লজ্জায় বেগুনি হয়ে আরও আড়াল খুঁজছিলাম!

অনুষ্ঠান শেষে চলে যাওয়ার আগে মিষ্টি আমার সামনে এসেছিল। তারপর সেই নরম গলায় বলেছিল, ‘রিসেপশনে কেউ এমন সাদা শার্ট পরে? ইউ আর স্টিল ভেরি নাইভ!’

সেই ‘নাইভিটি’ আমার আজও কাটেনি! আড়াল খোঁজার বাতিকও যেন বেড়ে গিয়েছে!

সেদিনের পরে আর সেভাবে মিষ্টির সঙ্গে দেখা হয়নি আমার!

আসলে সেটা ছিল বাড়িতে বাড়িতে ফোন আসার আগের সময়। সেটা ছিল বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকার সময়। আর সেই বয়সে ভিতু আমি, নিজেকে নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগা আমি, মিষ্টির সঙ্গে আর যোগাযোগ করে উঠতে পারিনি।

হয়তো সেটাই ভাল হয়েছে। জীবনের সব গল্প যে শেষ হবে তা তো নয়! কিছু গল্প এমনই আচমকা শীর্ণ নদীর মতো হারিয়ে যাবে! কিছু বইয়ের শেষের দশটা পাতা কে বা কারা যেন ছিঁড়ে নিয়ে চলে যাবে! কিছু ম্যাচ আর কোনওদিন দেখা যাবে না অ্যান্টেনা ভেঙে, ছবি ঝিরঝির করায়!

শুধু ওই বৃষ্টির রাস্তা, স্কুল ফেরার সেই বিকেল আর রাস্তার এই পাড় থেকে দেখা মেয়েটাই থেকে যাবে স্মৃতিতে, সারা জীবনের জন্য!

যে কলকাতাকে আমার আস্তে আস্তে ভাল লাগছিল সেই কলকাতাই আমার মনের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল এই মিষ্টির জন্য!

মিষ্টি? সে কে? আমাদের বাড়ির দোতলায় মিষ্টি নামে তো কোনও মেয়ে থাকত না! শান্ত স্নিগ্ধ রুপোর মতো যে মেয়েটা থাকত তার নাম তো ছিল অন্য কিছু!

কী নাম ছিল? সেটা থাক। এতদিন পরে সেটা আর নাই বা বললাম! কারণ তুমি কে ছিলে তা তুমিই একমাত্র জানো।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%