দূরে কোথাও

স্মরণজিৎ চক্রবর্তী

উনিশশো পঁচানব্বই সালে আমি উচ্চমাধ্যমিক পাশ করি। তারপর এখানের কোনও কলেজে ভর্তি না হয়ে চলে যাই কর্ণাটকে। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে। সেখানে আমি ভর্তি হয়েছিলাম ইলেকট্রনিক অ্যান্ড কমিউনিকেশন নিয়ে।

আমাদের সময়ে সায়েন্স নেওয়া ছিল প্রত্যেকটা ছাত্রছাত্রীদের মেধাবী হওয়ার মাপকাঠি। যদি কেউ সায়েন্স না নিত, তা হলে সে যতই মেধাবী হোক না কেন, তাকে সবাই একটু খাটো চোখেই দেখত।

হ্যাঁ, ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই ছিল। কিন্তু সেটা নিয়মকেই আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করত। এখন ভাবলে অবাক লাগে কী করে একটা গোটা জেনারেশন এমন একটা মানসিকতার স্বীকার হয়ে পড়েছিল! এর ফলে অন্য ক্ষেত্রে যারা অনেক সফল হতে পারত তারাও স্রেফ ‘পিয়ার প্রেশার’-এ পড়ে সায়েন্স নিয়ে নাস্তানাবুদ হত!

আমার এখনও মনে আছে মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরবার পরে, পাড়ার যে কাকু-কাকিমা সারা জীবনেও কথা বলত না, তারাও বাড়ি বয়ে এসে জিজ্ঞেস করে যেত, রেজাল্ট কেমন হল? ক'টা লেটার পেল? সায়েন্স নেবে তো? জয়েন্ট দেবে তো?

মনে হত আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সারা পৃথিবীর সাংঘাতিক মাথাব্যথা!

তো আমি নিজেও সেই ‘পিয়ার প্রেশার’ মানসিকতার স্বীকার হয়েছিলাম। বরাবর হিউম্যানিটিজ-এ ঠিকঠাক নাম্বার পেলেও গড্ডলিকা স্রোতে পড়ে সায়েন্স নিয়েছিলাম। যাই হোক, উচ্চমাধ্যমিকের পরে আমি এখানে কোথাও ভর্তি না হয়ে সোজা চলে গিয়েছিলাম দক্ষিণ ভারতে।

জায়গাটার নাম তিপটুর। বেঙ্গালুরু থেকে একশো চুয়াল্লিশ কিলোমিটার মতো দূর।

তখন সদ্য দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে জায়েঙ্গে রিলিজ করেছে। দুর্গাপুজো, কালীপুজো শেষ। হেমন্ত তার মনখারাপের চাদর আস্তে আস্তে বিছাতে শুরু করেছে। ব্রোঞ্জের প্রজাপতি উড়তে শুরু করেছে কলকাতায়। বিকেল ছোট হয়ে এসেছে অনেকটা। ঠিক এমন একটা সময়েই আমি এই শহরের পাট চুকিয়ে পাড়ি দিয়েছিলাম সেই দূরের শহরে।

তিপটুর ঠিক শহর নয়। বলা যেতে পারে ছোট্ট একটা মফস্সল। যেখানে একটা সিনেমা হল আছে। একটা হোটেল আছে। একটা রেস্তোরাঁ আছে। আর আছে খুব সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষজন।

সেখানে মাইলের পর মাইল ঢেউখেলানো মাঠ। তাতে শাল আর ইউক্যালিপটাসের সারি। সেখানে পোস্ট অফিস মাঠের বড় ঘড়ি ঢং ঢং করে সময় জানায়! দূর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝরনা আর ছোট্ট রেললাইন ছবির মতো ফুটে থাকে। আখের খেত, নারকেলের বাগিচা, আর কলা বাগান থেকে ট্র্যাক্টর করে মাল যায় দূরের বড় শহরে! এই ছোট্ট জায়গাটাকে ঘিরে থাকে আধখানা চাঁদের মতো পাহাড়। যাতে সন্ধে নামার সঙ্গে সঙ্গে এক এক করে জ্বলে ওঠে তারার মতো নীলচে সাদা আলো!

আমাদের কলেজটা ছিল হাইওয়ের ওপরে। বেশ বড় ক্যাম্পাস। মাত্র কয়েক বছর শুরু হয়েছিল বলে সাজসজ্জা পুরোপুরি হয়নি তখনও।

মূল কলেজের পাশেই ছিল সিনিয়র বয়েজ হোস্টেল। সেই হোস্টেলের একতলায় মেস। এই হস্টেলের সামনেই বিশাল একটা মাঠ। আর মাঠের অন্যপ্রান্তে একা একা দাঁড়িয়ে থাকা জুনিয়র বয়েজ হোস্টেল।

জুনিয়র বয়েজ় হোস্টেলে আমার রুম ছিল তিনতলার ওপর। সিঁড়ি দিয়ে উঠে দু'দিকে চলে গিয়েছে লম্বা করিডোর। তার দু'পাশে সার দেওয়া ঘর। আমার রুম নাম্বার ছিল চুয়াল্লিশ। রুমমেট ছেলেটি শান্ত, ভদ্র। নাম বিশ্বদীপ। রুমে দুটো খাট। দুটো আলমারি। আর দু'জনের জন্য একটা করে টেবিল-চেয়ার।

শীতকাল সবে আসতে শুরু করেছে তখন। তাই রাতের বেলা ঠান্ডা লাগত বেশ। কিন্তু দিনের বেলায় ছিল গরম! রোদের তাপ এমন যে খুব সহজেই সবাই তামাটে রঙের হয়ে যেত। আমরাও হয়ে গিয়েছিলাম!

এর আগে আমি জীবনে কখনও হোস্টেলে থাকিনি। বলা যায় ওভার প্রোটেক্টেড লাইফ পেয়েছি। বড়দের কাছে সারাক্ষণ মানসিক আশ্রয় আর প্রশ্রয় দুটোই পেয়েছি।

আমাদের সময়ে এমন রেসিডেনশিয়াল কলেজে র‍্যাগিং একটা বড় সমস্যা ছিল। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে পড়তে যাবার সময়েই একটা ভয় কাজ করত যে না জানি কী রকম র‍্যাগিংয়ের সামনে পড়তে হবে! আমারও সেরকম ভয় ছিল।

প্রথম দিন সন্ধেবেলা মেস-এ খেতে গিয়েই সামান্য র‍্যাগিংয়ের সামনে পড়েছিলাম। তখনও জানি না মেস-এ ঢুকে কোন টেবিলে বসব! কে জুনিয়র কে সিনিয়র কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। আমাদের ওয়ার্ডেন শিবযোগী স্যারকে রিপোর্ট করে আমি একটা জায়গায় বসে পড়েছিলাম।

সেদিন গোটা অঞ্চলে লোডশেডিং ছিল। হ্যাজাক বসানো ছিল প্রতিটা টেবিলে। সেই হ্যাজাকের পাশে রাখা ছিল একটা গামলা। তাতে ভাত। পাশেই দুটো বালতি। তাতে দুটো ডালের মতো কী যেন। আর কিছু নেই! একটু পরেই থালা এসে গিয়েছিল। তাতে দুটো রুটি আর চিচিঙের তরকারি।

এসব খাব কী করে! আমি রুটি খাই না। আর চিচিঙে! জীবনে খাইনি! কিন্তু ঠ্যালার নাম বাবাজি! ওই খেতে হয়েছিল। দুটো রুটি আর ওই তরকারি কোনওরকমে খেয়ে টেনে নিয়েছিলাম ভাত। এক স্কুপ ভাত নিয়ে ইয়াব্বড় বালতি থেকে ডাল ঢেলেছিলাম। দেখেছিলাম ডালের মধ্যে ডুবে আছে বুড়ো ডাঁটা, বেগুন, কুমড়োর বড় খণ্ড-সহ আরও কত কী! সবটাই বিস্বাদ! খারাপ খেতে।

সামনে বসে থাকা একজন লম্বামতো ছেলে ততক্ষণে আমার নাম-ধাম জেনে নিয়েছে। বলেছে যে সে আমার সিনিয়র!

এবার সে জিজ্ঞেস করেছিল, “কিউ, খানা ক্যায়সা হ্যায়?”

এখন কেউ যদি জিজ্ঞেস করে খাবার কেমন, সে যত খারাপই হোক না কেন ভদ্রতা করে তো ভালই বলতে হয়!

তাই আমিও হেসে মাথা নেড়ে বলেছিলাম, ‘আচ্ছা হ্যায় স্যার!’

হ্যাঁ, সিনিয়রদের যে 'স্যার’ বলে ডাকতে হয় সেটা ততক্ষণে আমি জেনে গিয়েছিলাম! ‘আচ্ছা হ্যায়!’ ছেলেটা এমন করে তাকিয়েছিল যে আমি বুঝেছিলাম মর্মভেদী দৃষ্টি কাকে বলে! ছেলেটা এবার হেসে বলেছিল, ‘ঠিক হ্যায়, ফির ইয়ে চাওয়াল পুরা খতম করকে হি টেবল ছোড়না!”

এই সেরেছে! বলে কী! এক বিশাল গামলা ভাত খেতে হবে আমায়? মারা পড়ব যে!

ছেলেটা দৈববাণীর মতো করে কথাটা বলে উঠে গিয়েছিল হাত ধুতে। এদিকে আমি খাওয়া শেষ করে বসে আছি। ভয় লাগছে বেশ। কারণ কথা যে মানা যাবে না সেটা তো বুঝতে পারছি। কিন্তু বুঝতে পারছি না যে কথা না মানলে কী হবে!

কিছু পরে সিনিয়র দাদাটি এসে বলেছিল, 'ফিরসে ঝুট মত বোল না। যো বুরা হ্যায় উসে বুরা বোলনা সিখ! অব যা।’

ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়েছিল আমার। তবে বেশিক্ষণের জন্য নয়। কারণ মাঝরাতে আচমকা আমাদের ঘরের দরজায় ধাক্কা দেওয়া হয়েছিল। খুলে দেখি একজন সিনিয়র। আমাদের বলা হয়েছিল, নীচে যেতে হবে। এটা জুনিয়র বয়েজ হোস্টেল হলেও সেখানে নীচে কয়েকঘর সিনিয়র থাকে। তারা ডেকে পাঠিয়েছে। ইন্ট্রো হবে!

আমার তো আত্মারাম খাঁচাছাড়া অবস্থা! তা হলে এই কি সেই সময় এল! সেই লেজান্ডারি র‍্যাগিং কি এবার হবে? জ্বলন্ত বাল্বে চুমু খেতে হবে? খোলা ইলেকট্রিকের তারে হিসু করতে হবে? ছাদের প্যারাপেটে উঠে হাঁটতে হবে? কী হবে ওই ঘরে যাওয়ার পর!

নীচের ঘরে যখন ঢুকেছিলাম মনে হচ্ছিল আমার বুকের মধ্যে ব্যান্ড পার্টি বাজছে! সারাজীবনেও এমন অবস্থায় পড়িনি! এবার কী করব আমি?

হ্যারিকেনের আলোয় বসেছিল পাঁচজন সিনিয়র। তাদের দেখে নিয়মমতো গ্রিট করতে হয়েছিল। তারা হেসে তাকিয়েছিল। তারপর শুরু হয়েছিল ইন্ট্রো! আমার সম্বন্ধে সব জানার পরে একজন জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তোর গার্লফ্রেন্ড আছে?'

আমি নিরীহভাবে বলেছিলাম, 'বয়েজ স্কুলের ছাত্র স্যার! কীভাবে থাকবে!’

সে হিহি করে হেসে বলেছিল, ‘আরে তু ভি ভুখা পার্টি! চল অব নাচ!” সেই রাতে' নাচ, গান, আবৃত্তি, অভিনয় সব করতে হয়েছিল। তারপর হতোদ্যম হয়ে ছাড়া পেয়েছিলাম শেষ রাতে! রুমে ফিরে স্বাভাবিক হতে বেশ অনেকটা সময় নিয়েছিলাম আমি।

ওই কলেজে গোটা দেশ থেকে ছাত্ররা আসত। দু'-একদিনের মধ্যেই নাগাল্যান্ডের ভিজয়, বিহারের ভিকাস, কোড়দোয়ারের অভিষেক রাওয়াত, গুজরাটের রুচির আগরওয়ালসহ কত যে বন্ধু হয়ে গেল! তার সঙ্গে বাঙালি ছেলেরা তো ছিলই। রাহুল, বসন্ত, অভিনব, ময়ূখ ও আরও কত জন।

দক্ষিণ ভারতীয় ছাত্রদের মধ্যে অরভিন্দ অপ্রমেয়, বাঙ্গারু গিরিশ, চিট্টিবাবু, চাকো, কৃষ্ণন, মহেশ আরও কতসব ছেলেদের সঙ্গে আলাপ হল, বন্ধুত্ব হল! আমাদের জুনিয়র বয়েজ হোস্টেল ছিল ছোট্ট এক ভারতবর্ষ! সবাই সাংস্কৃতিকভাবে আলাদা হয়েও কীভাবে যেন এক! ভাবলেও এখন আনন্দ হয়! পৃথিবীতে আমাদের দেশের মতো এমন আশ্চর্য সুন্দর দেশ আর কোথাও নেই!

গোটা কলেজের ছেলেরা দু'ভাবে বিভক্ত ছিল। সাউদি আর নর্থদি! অন্ধ্রপ্রদেশের ওপরের সবাই নর্থদি। সে নাগাল্যান্ড হোক বা হিমাচল। সবাই নর্থ ইন্ডিয়ান! তবে সেই নিয়ে অবশ্য কোনও বিবাদ ছিল না। একটাই ব্যাপার ছিল যে নর্থের ছেলেদের নর্থের সিনিয়ররা র‍্যাগিং করবে আর সাউথের ছেলেদের সাউথের সিনিয়ররা।

হস্টেলে দিন শুরু হত সক্কাল সক্কাল। কারণ সকাল আটটা থেকে ছিল ক্লাস। ফলে ছ'টায় উঠে ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট খেতে যেতে হত। আটটা থেকে বারোটা অবধি ক্লাস। তারপর দেড় ঘণ্টার ব্রেক। আবার দেড়টা থেকে পাঁচটা অবধি হয় ড্রইং, ল্যাব নয় ওয়ার্কশপ বা প্র্যাকটিকাল!

ব্রেকফাস্ট খেতে আমি একদিন গিয়েই আর যায়নি। সে যে কী অখাদ্য খাবার বলে বোঝানো যাবে না!

আগের দিনের ভাতের সঙ্গে গাজর আর বেগুন ছোট করে কেটে হালকা ভেজে ব্রেকফাস্টে দেওয়া হত। যে খায়নি তাকে বোঝানো যাবে না সেই খাবারের কী ভয়ঙ্কর স্বাদ! দুপুরে আর রাতে থাকত ওই রুটি তরকারি ভাত ডাল আর টক দই।

রবিবার দুপুরে ভাল খাবার দেওয়া হত। হয় পোলাও, নয় লেমন রাইস, নয়তো বিসিবেলেভাত! সঙ্গে রায়তা মতো কিছু একটা। গজা আর কলা! এটা দেখেছিলাম দক্ষিণ ভারতে স্পেশাল খাবারের সঙ্গে কলা দেওয়া হত সবসময়!

রবিবার রাতেরবেলা মেস বন্ধ থাকত। সেদিন কে কোথায় খাবে সেটা নিজেদের ঠিক করে নিতে হত।

আমাদের কলেজটা মূল টাউন থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে ছিল। সুরীর একটা দোকান আর আন্টিজ শপ ছাড়া সেভাবে খাবারের দোকান আর ছিল না। এক রবিবার বিকেলে আখের ট্রাকে করে শহরে খেতে গিয়ে দেখেছিলাম যে দেড়শো টাকা বেরিয়ে গিয়েছে কিন্তু সেভাবে পেট ভরেনি। ফলে আমি আর আমার রুমমেট একটা উপায় বের করেছিলাম।

কাছের বেকারি থেকে দু'জনে চারটে বানরুটি কিনতাম। মোট দু' টাকা। আর তারপর সুরীর দোকান থেকে পনেরো টাকার ভেজ মাঞ্চুরিয়ান কিনে আনতাম। সস্তায় পুষ্টিকর খাবার! আন্টিজ শপে একরকম বাদাম পাওয়া যেত। হালকা হলুদ মশলা মাখানো আর রসুন দিয়ে ভাজা। সে এক অমৃত! কে জানে সেভাবে খেতে পারতাম না কিছু বলেই বোধহয় এসবকে এত ভাল লাগত ।

বেশিরভাগ দিন দুপুরে আমি ওই বাদাম আর দুটো সন্দেশ বিস্কিট দিয়ে লাঞ্চ করতাম। তবে স্নেহা (আসল নাম অন্য) এটা জানার পর আমার জন্য খাবার নিয়ে আসত। গার্লস হোস্টেলে ওরা নিজেদের ঘরে হিটার জ্বালিয়ে অনেক কিছু রান্না করত। আমরা ছেলেরা অধিকাংশই এসব ব্যাপারে অপদার্থ ছিলাম। শুধু কেউ কেউ অ্যালুমিনিয়ামের মগে জল নিয়ে তাতে ছোট্ট ইমারশন হিটার ডুবিয়ে ডিম ফেলে সেদ্ধ করে খেত! আসলে এখানে খাওয়াদাওয়া ছিল সম্পূর্ণ নিরামিষ!

স্নেহা আমার জন্য কোনওদিন চিঁড়ের পোলাও, কোনওদিন আপ্পাম, কোনওদিন ছোট্ট ধোসা, ইডলি বা রাজমা-চাওল করে আনত। মাঝে মাঝে ডিমের কী একটা রান্নাও আনত। কারিপাতা থাকত তাতে! আমি অবাক হয়ে ভাবতাম, হোস্টেলে নিজের কাজ, তারপর এত পড়াশুনোর মাঝেও এতসব রান্না ও করত কী করে? পরে বুঝেছি মেয়েরাই বোধহয় পারে! তাই তাদের দশ হাত! তাই তাদের পুজো করা হয়!

মেকানিকাল ওয়ার্কশপের পেছনে বড় একটা শিরীষ গাছ ছিল। তার নীচে বসে খেতাম আমি। স্নেহা পাশে বসে থাকত। আড়াল-আবডাল নিতে হত, কারণ সিনিয়ররা চাইত না যে জুনিয়র ছেলেরা মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশা করুক। আসলে জুনিয়রদের জন্য নানান নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়েছিল।

যেমন, ফুল শার্ট পরতে হবে কিন্তু জামা গোঁজা চলবে না। ছেড়ে পরতে হবে। জামার গলার বোতামটাও বন্ধ করে রাখতে হবে। পায়ে শু পরা যাবে না। হাওয়াই চটি পরতে হবে। সিনিয়রদের ‘স্যার’ বা 'ম্যাম' বলতে হবে। দেখা হলেই জামার তৃতীয় বোতামে হাত দিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে ‘উইশ’ করতে হবে গুড মর্নিং, গুড আফটারনুন বা গুড ইভনিং বলে। তার সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু ছাত্রদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু রুটিন ছিল।

আমার যেমন ডাকনাম দেওয়া হয়েছিল, 'ম্যাও ম্যাও'। কারণ এক সিনিয়র ম্যাডাম বলেছিলেন, ‘ইউ লুক লাইক আ ক্যাট!’

সিনিয়ররা আমাকে মাঝে মাঝে নবাবি ঢঙে হুকুম দিত, ‘ম্যাও ম্যাও উইশ কর!’ আমায় সঙ্গে সঙ্গে মার্শাল আর্ট-এর নমস্কারের ভঙ্গিতে দুই হাত জড়ো করে বলতে হত, ‘ম্যাও ম্যাও!’

মনে আছে সিনিয়র হোস্টেলের নীচের মেস থেকে খাবার খেয়ে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যখন মাঠ ভেঙে আমাদের হোস্টেলে ফিরতাম। বিশাল হোস্টেলের বিভিন্ন জানলা থেকে ‘ম্যাও ম্যাও' বলে আওয়াজ উঠত। আমায় দু'হাত তুলে সেইসব আওয়াজ যে আমি শুনেছি তা বোঝাতে হত।

গোটা ব্যাপারটার মধ্যে এমন একটা মজা ছিল যে খারাপ লাগা আসতই না।

একদিন এক সিনিয়র দাদা একজন লোকের সঙ্গে দেখা করিয়েছিল। লোকটা মাঝারি উচ্চতার। সামান্য মোটা। মাজা রং। আমার সঙ্গে লোকটি হেসে হেসে কথা বলছিল ভাঙা হিন্দিতে। তারপর একসময় বলেছিল, 'তুমি জুনিয়র। বড়দের কথা শুনে, মেনে চলবে। না হলে আমি কিন্তু রাগ করব!’

সিনিয়র দাদাটি এবার তাকে বলেছিল, ‘ভাইয়া দিখাইয়ে না ইসে!’

লোকটি দোনোমনো করেছিল একটু। তারপর জামার পেছনে গুঁজে রাখা একটা পিস্তল বের করে সামনে ধরেছিল!

আমি চমকে উঠে, ঘেমে একসা!

‘ডরনে কা নেহি!” লোকটা আবার পিস্তলটা ঢুকিয়ে নিয়েছিল কোমরে।

আমার মনে ভেসে উঠেছিল সেই বাটানগরে শ্যামাকাকার কাছে দেখা রিভলভারের স্মৃতি!

লোকটি চলে যাবার পরে দাদাটি আমায় বলেছিল, ‘আরে এ ডেঞ্জারাস লোক। স্থানীয় এক নেতার বডিগার্ড! ন'টা খুন আছে এর নামে!

এর ঠিক দশদিনের মাথায় বিকেলে কলেজ শেষ হওয়ার পরে দেখি চারিদিকে কী হইহই!

অরবিন্দ বলল, “চল দেখি কী হয়েছে!’

আমরাও দৌড়লাম। উঁচু-নিচু মাঠ পেরিয়ে বিশাল বড় একটা জলহীন পুকুর ধরনের বাটির মতো জায়গায় দেখলাম একটা লোক উলটে পড়ে আছে। তখনও পুলিশ আসেনি। চারিদিকে বেশ ভিড়!

একটু কাছে গিয়ে অবাক হয়ে গেলাম! আরে এ তো সেই লোকটা! কেউ গুলি করেছে লোকটার মাথায় আর পিঠে! মাথাটা ডানদিকে ঘোরানো! আধখোলা চোখ নিয়ে লোকটা পরে আছে উপুড় হয়ে

এই বলেছিল না ও রাগ করবে! সেখানে ওর ওপর কারা যে রাগ করেছিল কে জানে! এসবের থেকে দূরে স্নেহা ছিল গাছের ছায়ার মতো! বেঙ্গালুরুর মেয়ে ছিল স্নেহা। উইক-এন্ডে প্রায়ই চলে যেত বাড়িতে। মাঝে মাঝে দেখতাম ওর বাবা-মা নিতে এসেছেন ওকে।

নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে আমায় প্রথমবার আলাপ করিয়ে দেওয়ার আগে স্নেহা বলেছিল, আমি যেন ওঁদের না বলি যে আমি নন-ভেজ। যেন না বলি যে স্নেহা মাঝে মাঝে আমায় ডিম রান্না করে দেয়! কারণ ও বাবা-মাকে বলেছে আমি ব্রাহ্মণ বাড়ির ছেলে এবং শুদ্ধ নিরামিষাশী।

কেন স্নেহা এমন বলেছে বাবা-মাকে! আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম।

মাখনের মতো গায়ের রঙের স্নেহা স্ট্রবেরি রঙের হয়ে উঠতে উঠতে বলেছিল, ‘বিকজ ইউ আর আ ডাফার!”

স্নেহার সঙ্গে আমার আরও দেখা হত সন্ধেবেলা লাইব্রেরিতে। আমি ওর জন্য সেই বাদাম নিয়ে যেতাম আন্টিজ় শপ থেকে। ও কখনও আনত মায়ের করে দেওয়া মিষ্টি বা কাজুবাদাম।

লাইব্রেরিতে সন্ধেবেলা সেভাবে সিনিয়ররা আসত না। আমরা নিশ্চিন্তে কথা বলতে পারতাম। ও আমায় কেমিস্ট্রি দেখিয়ে দিত। আর আমি ওকে সলভ করে দিতাম মেকানিক্সের অঙ্ক!

স্নেহা বলত, ‘ইউ মাস্ট টেক আপ আ জব ইন ব্যাঙ্গালোর আফটার কলেজ!’

বলত, ‘ফার্স্ট সেমের পরে কলকাতা ফেরার আগে আমাদের বাড়িতে যাবে? ইউ উইল মিট মাই কাজ়িনস্।’

রবিবারগুলো ছিল শূন্য আর শান্ত। আমি একা একা হাঁটতে বেরতাম। মাঝে মাঝে আবীরদাও যেত সঙ্গে। আবীরদা ছিল আমার সিনিয়র! কাঁচড়াপাড়ার ছেলে!

সেই বিকেলগুলোয় পাহাড়ের ধার ধরে ঘুরতাম আমি। ঝরনার পাশে বসে থাকতাম একা। পোস্ট অফিস মাঠের পেটা ঘড়িতে ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজত। শুনতাম৷

দূরে হাইওয়ে দিয়ে এক্সপ্রেস বাস চলে যেত উটির দিকে। আখ-বোঝাই গাড়িকে টেনে নিয়ে যেত ট্র্যাক্টর! ঝুমঝুম করে যেত ছোট্ট ট্রেন! আমি চুপ করে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম! দূরে লম্বা জল ট্যাঙ্কির ওপর দিয়ে পাখিদের সারি ফিরে যেত কোথায়! হেমন্তের যাই যাই আলোর মাঝে কখনও কখনও দেখতাম রুপোলি এরোপ্লেন ভাসতে ভাসতে চলে যাচ্ছে অজানা কোনও দেশে! পাহাড়ের ঢালের বাড়িগুলোয় জ্বলে উঠল নীলচে টিপের মতো আলো! পাখির ডাক আর ঝরনার বয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনও শব্দ থাকত না চরাচরে! আমার মনে হত এখানে সন্ধের মুখে যে আলো, আমার শহরেও তো এখন তেমনই আলো! আর আচমকা মায়ের জন্য মনখারাপ করত আমার!

তারপর একবার স্ট্রাইক হল। ছাত্রছাত্রীরা প্রিন্সিপালের ওপর রাগ করে ধর্নায় বসল। দশদিন সব বন্ধ! একদিকে অনশন হচ্ছে আর অন্যদিকে চলছে ক্রিকেট খেলা! স্কুলের মতো এখানেও আমি আম্পায়ার!

মাঝে একদিন মিছিল বের হল। ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য মিছিল। আমি ঠিকমতো স্লোগান দিচ্ছিলাম না বলে আমায় লাঠি দিয়ে বেশ দু' ঘা দিয়ে দিল এক সিনিয়র! সঙ্গে বাছা বাছা বিশেষণ!

যে আমি ক্লাস টুয়েলভ অবধি শালা-ও বলতাম না, সেই আমি কী করে যেন ছয়আট অক্ষরের গালি দিয়ে ফেলতে লাগলাম অনায়াসে!

দেখতাম সিনিয়ররা র‍্যাগিং করলেও ভালওবাসত। আবীরদা থাকত ক্যাম্পাসের বাইরের একটা ছোট্ট ঘরে। সেখানে মাঝে মাঝেই যেতাম। আবীরদা খিচুড়ি রান্না করত। খুব রাগী ছিল। বড় বড় চোখ করে তাকালে জুনিয়রদের অবস্থা খারাপ হতে যেত!

আর ছিল অরবিন্দার সিং। রোগা ছিপছিপে চেহারা। চাপা রং। খুব ভদ্র, বিনয়ী। সুইমার ছিল। আমাকে মাঝে মাঝেই বাইকে করে ঘুরতে নিয়ে যেত! পুলে সাঁতার কাটার সময় আমার হাতে স্টপওয়াচ ধরিয়ে দিয়ে বলত, ‘টাইম দেখ!’

হস্টেলে ফেরার পথে খাওয়াত চকোলেট, দুধ! অরবিন্দার স্যারের গার্লফ্রেন্ড ছিল একজন। তাকেও ম্যাম বলতে হত। সেও আমায় মাঝে মাঝে খাওয়াত। আসলে হস্টেল লাইফে আমরা সারাক্ষণ ক্ষুধার্ত থাকতাম! মেসের জঘন্য খাবার। হাতে সেভাবে টাকা না থাকা! সব মিলিয়ে সে এক যা তা অবস্থা! তাই খাওয়ানোটাই ছিল শ্রেষ্ঠ পুরস্কার!

ক্রমে আমার র‍্যাগিং কমে এসেছিল একদম। সিনিয়রদাদাদের সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। তাদের বাইকে করে ঘুরে বেড়াতাম সারাদিন! রবিবারের নিঃসঙ্গতা আর ছিলই না!

স্নেহা সামান্য অনুযোগ করত, ওর সঙ্গে গল্প করা কমিয়ে দিয়েছি বলে! প্রথম প্রথম যে ভয় আর বুক দুরুদুরু নিয়ে থাকতাম। তা সম্পূর্ণ মিলিয়ে গিয়েছিল। কলকাতা ছেড়ে এসে ওই ছোট্ট জায়গাটা আমায়, ও আমি ওই ছোট্ট জায়গাটাকে আপন করে নিয়েছিলাম প্রায়!

আর তারপরই আচমকা একটা গোলমাল হয়েছিল। যেন আকাশ ভেঙে পড়েছিল আমার মাথায়! আর ইঞ্জিনিয়ারিং জীবনের ইতি টেনে আমায় ফিরে আসতে হয়েছিল বাড়িতে! চিরদিনের মতো!

এর অনেক পরে দু' হাজার তেরো সালের জুন মাসে কলকাতায় এক বৃষ্টির দিনে অফিস যাওয়ার পথে একজনকে দেখে আমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম। লোকটি ফোনে কথা বলছিল। আমি এগিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম সামনে। সে ফোনে কথা বলতে বলতেই আমায় দেখে হাত দেখিয়ে অপেক্ষা করতে বলেছিল। আমিও অপেক্ষা করছিলাম।

ফোনে কথা শেষ করে সে এরপর ঘুরেছিল আমার দিকে। তারপর বড় বড় চোখ করে বলেছিল, 'ম্যাও ম্যাও!’

আবীর মজুমদার আগের চেয়ে বেশ ভারী হয়ে গেলেও তার সেই বড় বড় চোখ। চওড়া হাসি। আর বকুনির আড়ালে স্নেহ একই রয়ে গিয়েছে!

আজ সেইসব দিন থেকে এতদূরে এসে দাঁড়িয়ে মনে হয় কয়েক মাসের সেই হস্টেল জীবন আমায় যে কত কিছু দিয়েছিল। একাকী সময়ের মাঝে সেইসব হারিয়ে যাওয়া মুখ মনে পড়ে আমার। মনে পড়ে সেই হাইওয়ে। সুরীর দোকানের পাশের বড় গাছে ছোট্ট লালমুখো বাঁদরের ভিড়৷ পাহাড়ি ঝরনার ধারে কুড়িয়ে পাওয়া রঙিন পাথর। মনে পড়ে রাতের নির্জন সেই মাঠের ওপর বিশাল আকাশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য নক্ষত্র! মেকানিকাল ওয়ার্কশপের পেছনের সেই শিরীষ গাছের ছায়া। লম্বা জল ট্যাঙ্কির ওপর দিয়ে ভেসে যাওয়া রুপোলি এরোপ্লেন! আর রাতের অন্ধকার ভেঙে ঝুমঝুম করে ছুটে চলা ছোট্ট রেলগাড়ি!

স্নেহা কোথায় হারিয়ে গিয়েছে জানি না! আমি আর ডিম খেতে পারি না বহুদিন। অ্যালার্জি! শুধু মনে হয় সেই কারিপাতা দেওয়া ডিমের কারি-টা এখন কার জন্য রান্না করে ও!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%