স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
সেই ছোটবেলায় ফুটবল ছিল আমাদের মফস্সলের আসল খেলা। ক্রিকেট খেলাটাও হত। কিন্তু তার সেরকম কোনও গুরুত্ব ছিল না তার। মানে ওই শীতকালে মাঝে মাঝে একটু ক্রিকেট খেলা হত আর কি। কিন্তু ফুটবল ছিল আমাদের সবসময়ের, সবার প্রিয় খেলা!
আমাদের বাড়িটাও ছিল ফুটবলের বাড়ি। আমার বাবারা পাঁচ ভাই। তার মধ্যে জেঠু, বাবা আর সেজকাকা মানে ভাইপো তিনজনেই কলকাতা মাঠে প্রথম ডিভিশনে খেলেছিল। আমার ঠাকুরদা মানে মিষ্টিদাদুও সেই স্বাধীনতার আগে প্রথম ডিভিশন প্লেয়ার ছিল। তার বাবা মানে বুড়োদাদুও শুনেছি সাহেবদের বিরুদ্ধে খেলেছিল। আর কোন এক সাহেবকে নাকি খেলার মাঠে মেরে মাথাও ফাটিয়ে দিয়েছিল!
বাবাদের পাঁচ ভাইয়ের শেষের দু'জন মানে ন’কাকা আর ছোটকাকা প্রথম ডিভিশনে না খেললেও স্কুলের হয়ে সুব্রত কাপ খেলেছিল। আর ন’কাকা তো সুব্রত কাপে স্কুলের ক্যাপ্টেন ছিল।
তাই জন্মের পর থেকেই বাড়িতে আমি শুধু ফুটবলের কথাই শুনেছি। দেখেছি বাবা কাকাদের এত্ত এত্ত সব প্রাইজ! শিল্ড, কাপ, মেডেল থেকে শুরু করে প্রাইজে পাওয়া তোয়ালে, ছাতা, স্টোভ, চিনেমাটির বাসন আরও কত্ত কী!
মায়ের কাছে এও শুনেছি আটাত্তরের বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল, সেই দু'বছর বয়সেই নাকি গোটাটা বাবার কোলে বসে টিভিতে দেখেছিলাম আমি!
ফলে জ্ঞান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এটাই শিখেছিলাম যে পড়াশুনো এবং ফুটবল ছাড়া জীবনে আর কিছু নেই! সেই আশির দশকের সময়কার বাটানগর এই ব্যাপারে যেন আরও বেশি করে ইন্ধন জোগাত আমার মনে।
বাড়ির কাছের অরুণাচল সঙ্ঘের মাঠে রোজ বিকেলে ফুটবল খেলা হত। আর বছরে দু'বার হত দুটো টুর্নামেন্ট। নাইন-আ-সাইড মাঠ হলেও টুর্নামেন্ট হত সেভেন-আ-সাইড। তাতে কত দূর দূর থেকে যে টিম আসত খেলতে! অরুণাচল সঙ্ঘের দাদা-কাকারাও তাতে নামত। মনে আছে আমাদের বাড়ির যে উঠোন ছিল তার পাশে একটা টিউবওয়েল ছিল। সেই টিউবওয়েলের সামনে জার্সি কাচা হত। কাছের আক্রা বলে একটা জায়গা থেকে একজন আসতেন। আকবরের মা! তাঁর আসল নাম কেউ জানত না। সবাই বলত আকবরের মা! তিনি এসে জার্সি আর হোর্স কেচে দিতেন। তিরিশ টাকা নিতেন এই কাজটা করতে! এটাও মনে আছে!
আর শুধু অরুণাচল মাঠেই নয় নঙ্গী-বাটানগর অঞ্চলে আরও কিছু মাঠ ছিল। চ্যাটার্জিপাড়া বলে একটা জায়গায় ছিল এনএসএ মাঠ। আমাদের রেলব্রিজের একপাশে ছিল মিতালি মাঠ আর অন্যপাশে আশ্রমের মাঠ। বটতলায় বুড়ো বটের দু’দিকে ছিল দুটো মাঠ। সোজা বটতলার মাঠ আর কাটা বটতলার মাঠ। পরের মাঠটার একটা পাশে তেরছা করে কাটা ছিল বলে অমন নাম! আর এসবের সঙ্গে বাটা স্টেডিয়াম তো ছিলই! এ ছাড়া বাটানগরের কোয়ার্টারের সামনে ও পেছনে বিশাল বড় সবুজ ঘাসে মোড়া দারুণ সব মাঠ তো পড়ে থাকত এমনিই! সেখানেও খেলা হত জোর!
প্রায় সারা বছরই এইসব মাঠে নানান রকম টুর্নামেন্ট হত। বেহালা, আগরপাড়া, রানাঘাট এমনকী মেদিনীপুর থেকেও ফুটবল টিম আসত! সে সারাক্ষণই যেন একটা উৎসব উৎসব ভাব!
আমাদের স্কুল ছুটি হত চারটের সময়। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে খেয়েদেয়ে ফ্রেশ হতে হতে পাঁচটা বেজে যেত। এরপরই, টুর্নামেন্টের সময়, আমি মিষ্টিদাদুর সঙ্গে বেরিয়ে যেতাম খেলা দেখতে যাব বলে। সেই আট-নয় বছর বয়সে মা আমায় সবসময় একা যেতে দিত না মাঠে!
এমনও সময় গিয়েছে যখন পাশাপাশি দুটো মাঠে দুটো আলাদা টুর্নামেন্ট হচ্ছে! আর দুটো খেলাই পালা করে দেখেছি!
আসলে সেই বয়সে খেলা ভালবাসার আনন্দ তো ছিলই, কিন্তু আসল আনন্দ ছিল মাঠে গিয়ে সবার সঙ্গে হইহই করে খেলা দেখার ব্যাপার! কত লোকে যে কত মজার কথা বলত! চিৎকার করত! প্রিয় টিম গোল দিলে ডিগবাজি খেয়ে মাঠের মধ্যে ঢুকে পড়ত।
দুর্গাপুজোর আগের কিছুদিন এইসব খেলা বন্ধ থাকত। কারণ মাঠ জুড়ে বড় মেলার প্রস্তুতি চলত তখন। আর ক্লাবগুলো অধিকাংশ পুজো করত বলে দাদা-কাকারাও ব্যস্ত থাকত।
তবে কালীপুজো শেষ হলেই দেখতাম মাঠে মাঠে আবার তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে। সব মাঠে যে ভাল কাঠের বা লোহার পাইপের গোলপোস্ট থাকত তা নয়৷ ৷ অনেক মাঠেই বাঁশের বা সুপুরি গাছের কাণ্ড কেটে সেই দিয়ে গোলপোস্ট বানানো হত ! কিন্তু তাতে খেলার উৎসাহ ও সিরিয়াসনেসে কোনও ঘাটতি পড়ত না!
বাটানগরে রক্ষিতদের বাড়িটা বেশ নামকরা এক বাড়ি ছিল। বিশাল লাল রং-করা কেল্লার মতো ছিল সেই বাড়ি। বাড়ির মধ্যে মাঠ, পুকুর, বাগান সব ছিল। ওই বাড়ির ছেলে সুমিত আমার স্কুলের বন্ধু ছিল। ওদের বাড়িতে মাঝে মাঝেই খেলতে যেতাম আমি।
ওই বাড়িটার নীচে অনেক দোকানঘর ছিল। টাইপিং স্কুল ছিল। আর ছিল মনোহর মুচির ছোট্ট দোকান।
পুজোর পরে এই মনোহর মুচির কাজ বেড়ে যেত খুব! অনেক ছেলেপিলে আসত বুট সারাতে।
তখন এখনকার মতো এমন নানান রকম বুট ছিল না। তখন প্রায় সব বুটই হয় কালো নয়তো খয়েরি। তাতে চামড়ার স্টাড থাকত।
খেলতে খেলতে ক্ষয়ে যেত সেই স্টাড। দেখতাম মনোহর মুচি ছোট ছোট চামড়া কেটে তিনটে ছোট্ট পেরেক দিয়ে সেই সেই চামড়া লাগাচ্ছে বুটের নীচে। তারপর বাটালির মতো একটা জিনিস দিয়ে সেই চামড়া গোল করে চারিদিক দিয়ে চেঁছে বানাচ্ছে স্টাড।
এটা দেখতে কেন যে এত ভাল লাগত আমার! তারপর টুর্নামেন্টের আগে মাঠ সাজানো হত। এদিকে ত্রিপল খাটিয়ে একটা বসার জায়গা করা হত। মাঠের আশপাশে খাবারদাবার বসত টুকটাক! বেলুনওলা আসত। কাগজের বাঁশি বিক্রি হত! বিকেলের দিকে বাটানগরের পাশ দিয়ে বসে যাওয়া গঙ্গার থেকে হাওয়া দিত একটা। শীতের মুখে কেমন শিরশির করে উঠত শরীর। তার মধ্যে খেলার মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে মনে হত জীবনে এত আনন্দও থাকতে পারে!
মনে পড়ে মাঠে শোনা টুকটাক কথাও! তখন পেনাল্টি কিক-কে অধিকাংশ মানুষ বলত ‘প্লান্টিক’। লাইন্সম্যানকে বলত 'লাইস ম্যান'। গোলকিপার ছিল ‘গোলকি’! মনে আছে দর্শকেরা বা প্লেয়াররা চিৎকার করত, ‘পেছনে ম্যান বিহাইন্ড!’ গোলকিপার ধেয়ে আসা বল দেখে চিৎকার করে বলত, ‘লিব ইট!’ বলে নিজেই ছেড়ে দিয়ে গোল খেয়ে বসে থাকত! আর তারপর শুরু হত দর্শকদের গালি!
বাটানগরের বাইরেও খেলা দেখতে যেতাম। বজবজের দিকে দুটো মাঠে খেলা হত। একটা বার্মাশেলের মাঠ। আর অন্যটা ইএসআই মাঠ।
ভাইপোর সঙ্গে সাইকেলে করে প্রায় আধঘণ্টা লাগত সেই মাঠে যেতে। বাটানগর থেকে সেই ইএসআই মাঠের টুর্নামেন্টে নাম দিত ব্রহ্মচারী ক্লাব আর বেণুবীণা ক্লাব! আমরা ছিলাম বেণুবীণার সাপোর্টার!
একবার বেণুবীণা বজবজের যুগের যাত্রী ক্লাবকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হল! সে যে কী আনন্দ হয়েছিল! সবাই মিলে ম্যাটাডোর করে ফিরেছিলাম বড় শিল্ড নিয়ে। আমি ছোট্ট ছিলাম বলে একজন কাকু সারাটা পথ আমায় কাঁধে বসিয়ে নিয়ে এসেছিল।
তখন কোনও টিম চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফিরলেই সন্ধেবেলা শোভাযাত্রা বেরত। লরিতে কাপ বা শিল্ড সাজিয়ে তাতে ফুলের মালা-টালা দিয়ে ব্যান্ডপার্টি আর হ্যাজাক নিয়ে সারা বাটানগর জুড়ে চলত শোভাযাত্রা। আশপাশের বাড়ির থেকে ছেলে, মেয়ে, বুড়ো, বাচ্চা সবাই ছাদে, জানলায়, পথের ধারে দাঁড়িয়ে দেখত সেই প্রসেশন! তাতে ব্যান্ডপার্টি যে গানটা বাজাতই বাজাত তা হল— ‘আজ মেরি ইয়ার কি শাদি হ্ যায়!’
চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সঙ্গে এই গানের যে কী সম্পর্ক সেটা তখন কেন এখনও আমি ঠিক বুঝি না। তবে এটা দেখতাম যে রাস্তার থেকে প্রচুর মানুষ সেই শোভাযাত্রায় ঢুকে পড়েছে! আর ঢুকেই ডানা ঝাপটাবার মতো করে দু'হাত নাড়িয়ে নাচতে শুরু করত! ওটা ছিল অমিতাভের নাচ! হ্যাঁ, বচ্চন সাহেবের কথাই বলছি।
তারপর হত ওয়ান ডে ফুটবল টুর্নামেন্ট! এটা বেশি হত স্বাধীনতা দিবসের দিনে। বাটানগরের তিন-চারটে মাঠে এই খেলা হত। সকাল সাতটা থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা অবধি সময়। তার মধ্যেই হত সব ম্যাচ। দশ মিনিটের দুটো হাফ করে মোট কুড়ি মিনিটের ম্যাচ!
আমাদের পাড়ার অরুণাচল সঙ্ঘের মাঠেও এমন ম্যাচ হত। স্বাধীনতা দিবসটা তাই সারাদিনটা মাঠেই কেটে যেত আমার।
আর এই খেলাগুলোয় একটা মজা হত। পাড়ার বা অঞ্চলের ছেলেরা নিজেরাই টিম করে এই টুর্নামেন্টে নাম দিত। কোনও ক্লাব হিসেবে নয় কিন্তু। ওই একটা দিনের জন্য একটা টিম হিসেবে।
আর কী সব নাম ছিল সেই টিমের। কোনও টিমের নাম ছিল সাউথ কোরিয়া। কোনও টিমের নাম পোল্যান্ড! কেউ ডেনমার্ক। কেউ ব্রাজিল! কেউ আবার পশ্চিম জার্মানি! আমি যখনকার কথা বলছি তখনও দুই জার্মানি এক হয়নি!
মনে আছে একবার এরকম খেলায় সাউথ কোরিয়া ফাইনালে হারিয়ে দিয়েছিল ইতালিকে। তাও এক-দুই গোলে না! আট গোলে!
সেসময় টিভিতে বিদেশি খেলা খুব একটা দেখা যেত না। ওই বিশ্বকাপ হলে কয়েকটা ম্যাচ দেখতে পেতাম মাত্র। মনে আছে বিরাশি সালে বোধহয় চারটে ম্যাচ দেখিয়েছিল। তখন খবর কাগজই ছিল মূল ভরসা। সেখান থেকেই আমরা জেনেছিলাম পাওলো রসি, তিগানা, জিরেস, প্লাতিনি, জিকো, ফালকাও, রুম্যানিগের কথা! জেনেছিলাম আর্জেন্টিনায় নাকি দারুণ একটা ছেলে এসেছে! যদিও এবার সেভাবে খেলতে পারেনি! নাম দিয়েগো মারাদোনা!
মনে আছে মারাদোনার খ্যাতি বাড়ার পরে পাড়ার মাঠে খেলার সময়ে যে প্লেয়ার বল পাস না দিয়ে নিজেই বেশি কাটাবার চেষ্টা করত তাকে দর্শকদের মধ্যে থেকে আওয়াজ দেওয়া হত, ‘এই যে চারাপোনা, বলটা পাস দে এবার!’
উনিশশো বিরাশি সালে শুরু হয়েছিল নেহরু গোল্ড কাপ! কলকাতায় হয়েছিল সেই টুর্নামেন্ট। বিদেশি প্লেয়ারদের সামনে থেকে দেখার সে সুযোগ কি হারানো যায়! ভাইপোর সঙ্গে গিয়েছিলাম মাঠে। তখন ইডেন গার্ডেন্সে ফুটবল খেলা হত! সেখানে দেখেছিলাম নেহরু গোল্ড কাপ চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের খেলা! র্যামোস আর এঞ্জো ফ্রান্সিসকলির কথা সেই সময়ের মানুষজন আজও ভোলেনি!
তারপর এল ছিয়াশির ওয়ার্ল্ড কাপ। সেবার টিভিতে অনেক খেলা দেখেছিলাম আমরা। মনে আছে ব্রাজিল কোয়ার্টার ফাইনালে টাই ব্রেকারে হেরে গিয়েছিল ফ্রান্সের কাছে। কী যে কষ্ট হয়েছিল। তবে সব দুঃখকষ্ট মিটিয়ে দিয়েছিল ছোট্টখাট্টো চেহারার সেই ঈশ্বর! কোয়ার্টার ফাইনালে সেই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে গোল! সেমিফাইনালে বেলজিয়ামকে নাকাল করা। আর ফাইনালে একদম শেষ মুহূর্তে বুরুচাগার দিকে সেই পাস! সে ছিল অন্য পৃথিবী! সে ছিল অন্য ঈশ্বর! দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা!
পরের দিন মনে আছে বাটানগরে মারাদোনার ছবি নিয়ে আনন্দ-মিছিল বেরিয়েছিল। সেখানে ব্রাজিলের সাপোর্টাররাও যোগ দিয়েছিল। আমিও হাতে আঁকা মারাদোনার ছবি নিয়ে হেঁটেছিলাম পাড়ার দাদা-কাকাদের সঙ্গে!
সেই সময় খেলাকে মানুষজন খেলা হিসেবেই দেখত। ইগো, মানসম্মান, বাঁচা-মরা জড়িয়ে ফেলত না কেউ! তাই আনন্দটা অমন সুন্দর আর সহজ ছিল! খেলা ছিল সত্যি সত্যি সবাইকে মিলিয়ে দেবার এক জায়গা। বিচ্ছেদ বা বিদ্বেষ তৈরির জায়গা নয়।
ফুটবলের বিশ্বকাপ আমাদের মনে গভীর প্রভাব ফেলত। তাই আমরা যখন লোকাল টুর্নামেন্ট দেখতাম তখন নিজের মনে মনে কোনও প্লেয়ারকে নাম দিতাম প্লাতিনি। কাউকে বলতাম রসি! কাউকে আবার ডাকতাম জিকো বলে!
হায়েতপুরের দিকে একটা ছেলে থাকত। সামান্য বেঁটে। ঝাঁকড়া চুল। বাঁ পায়ে কী কাজ! তাকে সবাই কৃশানু বলে ডাকত মাঠে। সেসময় কলকাতা তথা ভারতের সেরা প্লেয়ার ছিলেন কৃশানু দে! কে জানে আজও কৃশানুই সেরা কিনা!
সেই হায়েতপুর থেকে আসা ছেলেটার ভাল নাম ছিল দয়ারাম। আমি ওকে মনে মনে নাম দিয়েছিলাম দিয়েগো!
আর ছিল ইস্টবেঙ্গল বনাম মোহনবাগানের উন্মাদনা। বড় ম্যাচের ক'দিন আগে থেকেই চলত দু’দলের সমর্থকদের একে অপরকে নিয়ে টীকাটিপ্পনী!
আমি নিজে বাঙাল বাড়ির ছেলে। আর আমাদের বাড়ির একমাত্র বাবার এক খুড়তুতো ভাই ছাড়া সবাই ইস্টবেঙ্গলের সাপোর্টার!
ছোট থেকেই মিষ্টিদাদুর কাছে পঞ্চপাণ্ডব মানে সালেহ, ভেঙ্কটেশ, আমেদ খান, আপ্পা রাও আর ধনরাজের কথা শুনতাম! শুনতাম তাদের একসঙ্গে বলা হত VEDAS ! সেটা ছিল পাঁচ ফরোয়ার্ড নিয়ে খেলার যুগ!
পরে বাবার কাছে শুনেছি তুলসীদাস বলরামের কথা! রাম বাহাদুরের কথা! বাবা বলত বলরামের পায়ের কাজ ছিল শিল্প! বলত, রাম বাহাদুর নাকি ট্যাকল করতে গিয়ে পা স্ট্রেচ করে বসে পড়তে পারতেন একদম!
তা ছাড়া চুনী গোস্বামী বা পিকে ব্যানার্জির গল্পও শুনতাম! তাঁরা ইস্টবেঙ্গলে না খেললেও খেলোয়াড় হিসেবে তাঁদের সম্মান করত বাড়ির সবাই!
ভাইপো বাটা টিমের হয়ে খেলত। শুনেছি পিকে ভাইপোদের কোচিং করিয়েছিলেন কিছুদিন! প্র্যাকটিসের মজার গল্প শুনতাম ভাইপোর কাছে।
ভাইপো খেলে ছেড়ে দেওয়ার পরেও মাঠের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিল। তখন ভাইপো রেফারি হত নানান খেলায়। ফলে আমিও সঙ্গে যেতাম। ভাইপোর জামাকাপড় একটা কাপড়ের ব্যাগে ধরে বসতাম মাঠের ধারে। এইসব ম্যাচ দেখতে যাওয়ার মজা ছিল এই যে খেলার পরে খাবারের প্যাকেট পাওয়া যেত! তাতে আমার অল টাইম ফেভারিট শিঙাড়া, কেক আর দু'-তিন রকম মিষ্টি থাকত!
একবার এমন একটা খেলায় গিয়েছি। তখন সদ্য জন্ডিস থেকে উঠেছি আমি। মা যেতে দিতে চায়নি। কিন্তু আমি জোর করে গিয়েছিলাম।
খেলা শুরুর সময় তো আমি ভাইপোর জামাকাপড় নিয়ে বসলাম এনএসএ মাঠে। এই মাঠটার চারিদিকে ছিল বাড়ি। আর মাঠটা ছিল বেশ নিচু।
খেলা শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হল বৃষ্টি! আর সে কী ভয়ানক বৃষ্টি। লোকজন দৌড়াদৌড়ি করতে লাগল। আমি ভিজে ঝুপ্পুস হয়ে গেলাম। মাঠে জল দাঁড়িয়ে গেল নিমেষে। খেলা বন্ধ হয়ে গেল। মানে যাকে বলে পরিত্যক্ত! ভাইপো আমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিল হাবলুকাকার সঙ্গে!
বাড়িতে এসে সেদিন কী বকাই যে খেয়েছিলাম। সঙ্গে ছাতা ছিল না তো! মা বলেছিল আর কোনওদিন খেলা দেখতে যেতে দেবে না!
কিন্তু এমন কথা তো মায়েরা কতই বলে! পরের সপ্তাহে সেই ম্যাচটা আবার হয়েছিল। আর মা নিজেই আমাকে সাজগোজ করিয়ে ভাইপোর সঙ্গে মাঠে পাঠিয়েছিল। সঙ্গে শুধু দিয়ে দিয়েছিল আমার হলুদ রেনকোটটা!
সেদিন বুঝেছিলাম রাগের মাথায় মানুষ অনেক কিছু বলে। সেসবকে সত্যি বলে পরতে নেই!
তবে সব যে ভাল স্মৃতি আছে তা নয়। আমিও যেহেতু টুকটাক খেলতাম তাই আমার নিজের খেলার স্মৃতিও আছে কিছু। মনে আছে একটা ম্যাচে আমরা এগারো চার গোলে হেরে গিয়েছিলাম। আমার ছোট পিসেমশাই মজা করে বলেছিল, ‘তোদের সবার জন্য একটা করে গোল দিয়েছে!”
সেদিন মাঠ থেকে বাড়ি ফেরার পথটা বড্ড লম্বা লেগেছিল আমার !
পরে অন্য অনেক ম্যাচে যে জিতিনি তা নয়। কিন্তু ওই এগারো গোল খাওয়ার স্মৃতি আজও ভুলতে পারিনি। কে জানে আমাদের স্মৃতি বোধহয় ভাল জিনিসের চেয়ে খারাপ জিনিসটাকেই বড় বেশি আপন করে রাখে!
আমাদের মফস্সলের লোকজনের মুখে আমি চিরদিন শুনে এসেছিলাম যে আমার বাবা দারুণ ফুটবল খেলে! কিন্তু অনেকদিন পর্যন্ত আমি দেখিনি। কারণ আমার জন্মের আগে আগেই বাবা খেলা ছেড়ে দিয়েছিল। জীবিকার তাড়না ছিল যে!
তারপর পাড়ায় একটা ভেটারেন্সদের ম্যাচ হয়েছিল। বাবাকে সবাই অনেক বলেকয়ে নামিয়েছিল খেলতে। আমার বাবা চিরকালই খুব গম্ভীর আর কম কথার মানুষ। বাড়ির থেকে শুরু করে পাড়া-বেপাড়ার সবাই খুব সমীহ করে চলত বাবাকে। তাও স্থানীয় বয়স্ক মানুষজন খুব বলেকয়ে বাবাকে নামিয়েছিল মাঠে।
বাবা রাইট উইংয়ে খেলত। তখন বলত রাইট আউট। বাবা খেলতে নামবে জেনে আমার সেই ক্লাস থ্রিতে কী যে টেনশন হয়েছিল! আসলে যে মানুষটাকে সবচেয়ে ভালবাসি সে যদি ভাল খেলতে না পারে! দর্শকরা যদি বাজে কথা বলে! হাসাহাসি করে! আমি ছোট হলেও কি বুঝি না খেলার মাঠে কীরকম কথাবার্তা হয়!
আমাদের পাড়ার সঙ্গে অন্য একটা পাড়ার খেলা ছিল সেটা। সে যে কী উত্তেজনা ছিল সে বলে বোঝানো যাবে না! পঁচিশ মিনিট করে একটা হাফ! মোট পঞ্চাশ মিনিট! অন্য পাড়াটিকে বাবারা ছয় গোল দিয়েছিল। বাবা নিজে করেছিল দুটো গোল। খেলার মাঠের পাশে বসে সেদিন যে কী আনন্দ হয়েছিল! বাবা এত ভাল ডজ করে! এমন গোলার মতো শট মারে! এই চল্লিশ বছর বয়সেও এমন নিখুঁত পাস বাড়াতে পারে!
এগারো গোল খাওয়ার স্মৃতি মনে এলেই আমি সেই পঁচাশি সালের সেপ্টেম্বর বিকেলটার কথা মনে করি! মনে মনে দেখি আমার বাবা দু'জন-তিনজনকে কাটিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে গোলের দিকে! দেখি সারা মাঠ উঠে দাঁড়িয়েছে উত্তেজনায়! ওই বাবা শট নিল! আর গোলকিপারের হাত এড়িয়ে বল জড়িয়ে গেল জালে!
আমি বুঝি আজও আমাদের সবার কাছে আমাদের বাবার মতো হিরো আর কেউ নেই! বুঝি ওই মানুষটার মতো হওয়া এই জীবনে আর সম্ভব হল না!
আমার মফস্সল এখন পালটে গিয়েছে। শুনেছি আর খেলাধুলো সেভাবে হয় না। মাঠগুলো আর নেই। প্রায় সব জায়গায় ফ্ল্যাট উঠে গিয়েছে! ছেলেপিলেরাও নাকি আর আগ্রহী নয়! পড়াশুনো, কোচিং, মোবাইল নিয়ে সবাই খুব ব্যস্ত!
আমার কষ্ট লাগে এসব দেখে। না, নিজের জন্য নয়। এখনকার এই সব ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের জন্য কষ্ট লাগে! মনে হয় তারা জীবনের একটা দিক জানলই না কোনও দিন!
এখনও কলকাতায় সাদার্ন এভিনিউ ধরে হাঁটতে বেরলে যখন দেখি আশপাশের মাঠে ফুটবল খেলা হচ্ছে, আমি দাঁড়িয়ে যাই একটু। আর এখনও খুঁজতে থাকি সেই প্লাতিনি কই? আর জিকো? ওই শ্যামলা ছেলেটা যে বল নিয়ে উঠছে সে কি তিগানা! তবে সামান্য বেঁটে ঝাঁকড়া চুলের কাউকে আর খুঁজি না। কারণ আমি জানি আমার ছোটবেলার সেই আনন্দ, উচ্ছ্বলতা আর যেমন নেই তেমন নেই সেই দয়ারাম শর্মাও! যাকে আমি আজও মনে মনে ডাকি দিয়েগো বলে!
ছোটবেলার মজাটা এখানেই। সামান্য জিনিসকেও সেখানে অসামান্য লাগে! রোজকার দেখা মানুষকেও মনে হয় রাজকুমার! আর আমাদের সাধারণ ভাঙাচোরা জীবন হয়ে ওঠে এক অনন্য রূপকথা! তাই এই রূপকথাটাই আমি বারবার লিখতে চাই!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন