স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
ছোটবেলা থেকেই খেলা দেখতে যাওয়া আমার কাছে একটা বড় ব্যাপার ছিল। আমাদের বাড়িটাকে সবাই খেলার বাড়ি বলেই জানত। তাই জ্ঞান হওয়ার পর থেকে খেলা ছাড়া জীবন আমরা ভাবতেই পারতাম না। ফলে যেখানে যেখানে যা খেলা হত আমি দেখতে চলে যেতাম।
আমাদের বাড়ির সামনে ছিল ফুট সাতেকের একটা ইট-পাতা রাস্তা। আর সেই রাস্তার ওইদিকে কোনাকুনি ছিল মাঠ। অরুণাচল সঙ্ঘের মাঠ। নাইন-আ-সাইড ফুটবল মাঠ ছিল সেটা। সেখানে নিয়ম করে ফুটবল খেলা হত। আর বছরে দু'বার হত টুর্নামেন্ট। তবে সেসব সেভেন-আ-সাইড টুর্নামেন্ট।
যেহেতু একদম আমাদের বাড়ির সামনেই হত এসব তাই জ্ঞান হওয়া থেকেই ওখানে খেলা দেখতাম। এ ছাড়াও বাটানগরের বড় বড় মাঠ তো ছিলই। গরমকালে সেখানে নানান টুর্নামেন্ট হত। এমনও হয়েছে বটতলার তিনদিকের তিনটে মাঠে তিনটে টুর্নামেন্ট হচ্ছে একসঙ্গে। আর আমি মিষ্টিদাদুর সঙ্গে একবার এই মাঠের পাশে গিয়ে দাঁড়াচ্ছি তো আরেকবার অন্য মাঠের পাশে যাচ্ছি!
বাটানগরের সব মাঠের মধ্যে সবচেয়ে বড় যে দুটো মাঠ ছিল তা হল মিতালি মাঠ আর বাটা স্টেডিয়াম।
মিতালি মাঠে ফুটবল খেলা হত। নরম মাটির মাঠ ছিল সেটা। ঘন ঘাসে মোড়া। এখানে যে টুর্নামেন্ট হত তাতে কলকাতা থেকে নানান টিম আসত। সেই মাঠের চারিদিকে ভিড় হয়ে যেত! আর একটু দূরের কোয়ার্টারের উঁচু পাঁচিলেও লোকজন উঠে বসত। আমি ছোট ছিলাম। ভিড়ের মধ্যে দেখতে পেতাম না বলে, কাকুরা আমায় ওই উঁচু পাঁচিলে বসিয়ে দিত। আসলে অনেকেই তো খেলা দেখতে যেত তাই আমাদের মুখচেনা হয়ে গিয়েছিল!
বাটা স্টেডিয়ামে ফুটবল মাঠ ছিল তিনটে। সঙ্গে আরেকটা মাঠ ছিল যেখানে চার ফুট দশের ফুটবল টুর্নামেন্ট হত! স্টেডিয়ামের কোনার দিকে ভলিবল কোর্ট ছিল। আর ক্লাব হাউসের পাশে ছিল ব্যাডমিন্টন কোর্ট!
এই স্টেডিয়ামে যে শুধু ফুটবল খেলা হত তা নয়। এখানে বাটা কোম্পানির ইন্ট্রা ডিপার্টমেন্ট ক্রিকেট আর হকি লিগও হত! আর হত বাটা কোম্পানির বিশাল স্পোর্টস! এগুলোতে যে কী দারুণ ব্যাপার হত তা ভাবলে আজও রোমাঞ্চ হয়।
ভাইপো চাকরি করত বাটা কোম্পানিতে। আর নিজে ফুটবল, ক্রিকেট, হকি সব খেলত। ভাইপোর সঙ্গে সব জায়গায় ঘুরতাম আমি। অনেকেই ভুল করে ভাবত ভাইপো মানে আমার সেজকাকাই আমার বাবা। তারা ভাইপোকে জিজ্ঞেস করত, 'কী স্বপনদা তোমার ছেলে?’
ভাইপো আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বলত, ‘ছেলের চেয়ে অনেক বেশি!”
ভাইপো আর নেই। শেষ বয়সে স্মৃতিও হারিয়ে ফেলেছিল মানুষটা। তাও কাছে গেলে আমার দিকে তাকিয়ে থাকত খানিকটা সময় তারপর আলতো করে মাথায় হাত দিয়ে বলত, “বাবু, যাবি না খেলা দেখতে?’
ভাইপো ছিল তাই আমি এত খেলা দেখতে পেয়েছি! আমাকে এত ভাল আর কেউ বেসেছে কি কোনওদিন? ভাইপোর চলে যাওয়াটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্টগুলোর মধ্যে একটা।
সারা বাটানগর জুড়েই ভাইপোর প্রতিপত্তি ছিল বিশাল। সবাই এক ডাকে চিনত! রাস্তা দিয়ে যাবার সময় কতবার যে দাঁড়িয়ে কত লোকের সঙ্গে কথা বলতে হত ভাইপোকে! কেউ ‘স্বপন’, কেউ ‘স্বপনদা' বলে ডেকেই যেত! কেউ আবার বলত, ‘রেফারি!’
বাটা স্পোর্টসের ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বেও ছিল ভাইপো। এদিকে নিজে স্পোর্টসে নামও দিত। একশো মিটার, দু'শো মিটার থেকে শুরু করে দু'শো ইন্টু চার রিলে রেসেও নাম দিত!
আর কী অবাক কিছু না কিছু প্রাইজ প্রতিটা ইভেন্ট থেকেই নিয়ে আসত! বাটা স্পোর্টসে, দর্শক হিসেবে আমি থাকতাম মূল টেন্টে। ভাইপোর সঙ্গে সব জায়গায় যেতাম বলে লোকে আমায় চিনত। সেই টেন্টে ছিল ঢালাও খাবারের ব্যবস্থা। আর ছিল আইসক্রিম! বড় কাঠের একটা বাক্স আসত। তাতে বরফ থাকত। আর সেই বরফে রাখা থাকত স্টিক আইসক্রিম!
যে যত পারো খাও। ফুরিয়ে গেলে আবার আনা হবে! আমি ওই একটা দিন মনের সুখে আইসক্রিম খেতাম। কেউ তো বারণ করার ছিল না। শুধু যে কাকু আইসক্রিম দিত সে মাঝে মাঝে আমায় ধাওয়া দিত। বলত, ‘স্বপনরে কইতাসি দাঁড়া!’ বলত, আবার আইসক্রিমও দিত বের করে। তারপর স্নেহের গলায় বলত, ‘আইসক্রিম খাইয়া জল খাইয়া লস! ঠান্ডা লাগব না!’ সত্যি-মিথ্যে জানি না। তবে আজও আইসক্রিম খাওয়ার পরে আমি জল খেয়ে নিই। সেই ছোটবেলার খেলার মাঠের অভ্যেস !
বাটার স্পোর্টসে তখন বাইরে থেকেও অ্যাথলিটরা আসতেন। তাঁদের মধ্যে একজনের নাম এখনও মনে আছে। মনোরঞ্জন পোড়েল। লম্বা, ফর্সা, সুন্দর দেখতে একজন মানুষ। চোখে হাই পাওয়ারের চশমা। বেশ গম্ভীর। কিন্তু মানুষটি খুব ভাল দৌড়তেন। যে রেসেই নামতেন সেই রেসেই ফার্স্ট!
মনে আছে ভাইপো যে টিমে ছিল সেই রিলে রেসের টিমটা হেরে গিয়েছিল মনোরঞ্জন পোড়েলদের টিমের কাছে!
যে কাকুটি এন্ড রানার হিসেবে মনোরঞ্জন পোড়েলের বিরুদ্ধে লাস্ট ল্যাপটা টেনেছিল পরে আমার পাশে বসে বলেছিল, 'ওর মাসল স্ট্রেন্থই আলাদা! অনেক চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারলাম না। তাও ও ফুল এফোর্ট দেয়নি!’
সেই মনোরঞ্জন পোড়েল তারপর এসে বসেছিলেন টেন্টে। আমি কাছের থেকে প্রথম দেখেছিলাম স্টার্টিং ব্লক। দেখেছিলাম রানিং শু কেমন হয়!
নঙ্গী অঞ্চলে বড় মাঠ বেশি ছিল না। ওই আমাদের অরুণাচল মাঠ। রেললাইনের পাশে রেলের মাঠ। আর আরও ভেতরদিকে চ্যাটার্জিপাড়ার মধ্যে এনএসএ মাঠ! পুরো নাম নঙ্গী স্পোর্টিং অ্যাসোসিয়েশনের মাঠ! এই এনএসএ মাঠের চারিদিকে বাড়িঘর ছিল। চারিদিকে ঘন বসতির মধ্যে মাঠটা যেন অনেকটা টাক পড়া মানুষের মাথার মতো মনে হত। এই মাঠে বিশাল কিছু ঘাস ছিল না। আর মাঠটা কেমন যেন নিচু ছিল। গরু চড়ত বলে মাঠের কিছু জায়গা বেশ এবড়োখেবড়ো হয়ে গিয়েছিল।
এই মাঠেই একবার একটা কাণ্ড হয়েছিল। তখন আমি ক্লাস টু-তে পড়ি। বর্ষাকাল।
কয়েকদিন আগেই আমি জন্ডিস থেকে উঠেছিলাম। আমার এই জন্ডিস রোগটা খুব বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। সেরে ওঠার পরেও দুর্বল ছিলাম খুব।
তার মধ্যেই পড়ল খেলা। এনএসএ মাঠে খেলা। কী একটা টুর্নামেন্টের ফাইনাল। ব্যাস আমি ভাইপোর সঙ্গে চলে গেলাম। যদিও মা একটুও যেতে দিতে চায়নি আমায়। কিন্তু খেলা আমি খুব ভালবাসি বলে আর কিছু বলেনি।
খেলা দেখতে বসেছিলাম একটা গোলপোস্টের ঠিক পাশে। জুন মাস ছিল সেটা। খেলা শুরু হওয়ার আগেই দেখলাম আকাশ কালো করে এল। যাই হোক খেলা শুরু হল। আর কিছু পরেই একটা টিমের লেফট আউট বল নিয়ে উঠে আসার সময় অন্য টিমের রাইট উইং ব্যাকের সঙ্গে টক্কর দিতে গিয়ে ঠেলাঠেলি করে বল-সমেত এল পড়ল আমার ওপর! অমন বড়সড় চেহারার দু'জন প্লেয়ার! তার সঙ্গে অমন গতিবেগ! ধাক্কা খাওয়ার পরের কিছুক্ষণ আমার জ্ঞান ছিল না। তারপর চোখ খুলে দেখলাম ভাইপোসহ আরও অনেকে আমার ওপর ঝুঁকে পড়ে তাকিয়ে আছে! ভাইপোর মুখ লাল! হাতের জলের বোতল থেকে জল নিয়ে আমার মুখে ঝাপটা মারছে! দেখলাম সেই ভিড়ে অনেক প্লেয়ারও দাঁড়িয়ে।
খুবই লজ্জা লেগেছিল আমার। আমি যত দ্রুত সম্ভব কিছুই হয়নি ভান করে উঠে বসেছিলাম। যদিও বুঝতে পারছিলাম যে বুকে বেশ ভালই লেগেছে। আর বুটের স্টাডে পায়েও চোট পেয়েছি।
সবাই বলছিল আমায় পাশের কোনও বাড়িতে শুইয়ে রাখতে। কিন্তু সেই ছোট বয়সে খেলার মধ্যে বসে, নিজেকে মনে মনে প্লেয়ার ভেবে নেওয়া আমি কি মাঠ ছাড়তে পারি ? ফলে মাঠেই বসেছিলাম।
কিন্তু সেই দিনটাই ছিল অন্যরকম। এবার খেলা শুরু হওয়ার দশ মিনিটের মধ্যেই প্রচণ্ড বৃষ্টি নেমেছিল। মানে এমন বৃষ্টি যে নিমেষে সাদা হয়ে গিয়েছিল সব। আর বাটির মতো আকৃতির মাঠটা ভরে উঠেছিল জলে। ব্যাস খেলা বানচাল! আমিও ভিজে ন্যাতা!
ভাইপো একটা ছাতা জোগাড় করে আমাকে পাড়ার হাবলুকাকুর সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়েছিল বাড়ি। ভাইপো আসতে পারেনি। কারণ ওই টুর্নামেন্টের উদ্যোক্তাদের মধ্যে আমার ভাইপোও যে ছিল!
ছাতায় কি ওই বৃষ্টি মানে? বৃষ্টিতে ভিজলেই মা স্নান করিয়ে দিত। সেদিনও দিয়েছিল। সঙ্গে জুটেছিল বকুনি। আর খেতে হয়েছিল এত বড় একটা সাদা ট্যাবলেট! যেটা গিলতে কী কষ্টই না হচ্ছিল আমার!
তবে তার জন্য আমি দমে যাইনি! ভাইপোর সঙ্গে সাইকেল করে তারপরেও যেতাম দূরে দূরে। সেই সারেঙ্গাবাদ বা বজবজ। সেখানের ইএসআই মাঠ বা বার্মা শেলের মাঠে বসত জমজমাট ফুটবল টুর্নামেন্ট! বাটানগর থেকেও টিম যেত। কাঠগোলা বয়েজ, স্বামীজি সংঘ, ব্রহ্মচারী আর বেণুবীণা! বজবজের বিখ্যাত টিম ছিল যুগের যাত্রী।
মনে আছে একবার ফাইনালে আমাদের প্রিয় দল বেণুবীণা দুই-শূন্য গোলে হারিয়ে দিয়েছিল যুগের যাত্রীকে। বেণুবীণা দলে তখন খেলতেন কলকাতা মাঠে খেলা বেশ কিছু প্লেয়ার। তাদের মধ্যে আমার শঙ্কর অধিকারীর কথা মনে আছে। বাঁ পায়ের প্লেয়ার ছিলেন। ভাল পায়ের কাজ! তাঁকে আটকাতে সব টিমই বেশ বেগ পেত!
ওই ফুটবল টুর্নামেন্টটা ছিল গোটা অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে নাম করা! তাই ওই টুর্নামেন্টের কোনও খেলা বাদ দিতাম না।
এইসব মফস্সলি টুর্নামেন্টগুলোকে যে ‘খেপ খেলা' বলে সেটা তখন জানতাম না । আমরা ফুটবল দেখার আনন্দেই মশগুল থাকতাম।
এইসব খেলার মাঠের পাশে ছোটখাটো একটা খাদ্যমেলা বসে যেত! তবে আমি যে সময়ের কথা বলছি তখন রোল পাওয়া গেলেও বিরিয়ানি বা মোমো রাস্তার পাশের দোকানে পাওয়া যেত না।
মাঠের পাশের খাবার বলতে ছিল ঘুগনি, আলুকাবলি, ফুচকা, বাদাম, চপ, ভুট্টা। শিঙাড়া খেতে হলে যেতে হত মিষ্টির দোকানে। আর রোলের দোকান একটা জায়গায় নির্দিষ্ট থাকত। খেলার সঙ্গে এইসব টুকিটাকি খাবারের লোভটা কম ছিল না। তবে যেহেতু বিশাল কোনও ভ্যারাইটি ছিল না খাবারে, তাই আমরাও অল্পেই সন্তুষ্ট হয়ে যেতাম।
ক্লাস ওয়ানে আমি প্রথম কলকাতা মাঠে যাই। ইস্টবেঙ্গল মাঠে। খেলাটা ছিল কলকাতা লিগের। রাজস্থান বনাম এরিয়ান্সের! এক-এক গোলে খেলাটা অমীমাংসিত হয়েছিল। মাঠ প্রায় ফাঁকা ছিল সেদিন। খেলার পরে টেন্ট থেকে ভাইপো খাইয়েছিল হাফরুটি আর চিকেন স্টু! আমার স্টু-টা একদম ভাল লাগেনি। আমার মুখ দেখে সেটা বুঝতে পেরে ভাইপো বলেছিল, ‘সব প্লেয়াররা এটা খায়! এটা খেলে ভাল খেলা যায়!’
এটা খেলে ভাল খেলা যায়! ব্যাস আমি আর নাক কুঁচকাইনি। সোনা মুখ করে খেয়ে নিয়েছিলাম। কারণ আমাকেও তো ভাল খেলোয়াড় হতে হবে! সেই বয়সে ভাল ফুটবল খেলোয়াড় হওয়া ছাড়া আমার কোনও লক্ষ্য ছিল না। সেই ফুটবল প্লেয়ার হতে না-পারার আক্ষেপ ছাড়া আর কোনও আক্ষেপ নেই আমার জীবনে।
তারপরেও কলকাতা মাঠের লিগের বেশ কিছু খেলা দেখেছি। আর খেলা ভাঙার পরে নানান টেন্টে গিয়েছি ভাইপোর সঙ্গে! অবাক হয়ে দেখেছি ভাইপোকে এখানেও কত লোক চেনে! আসলে মানুষটা সবার সঙ্গে খুব মজা করে, হেসে কথা বলত। আর কনফিডেন্স ছিল বিশাল। মাত্র পাঁচ ফুট লম্বা ছিল ভাইপো, কিন্তু আসলে মানুষটার মনের উচ্চতা ছিল একশো ফুটের বেশি।
ক্লাস ওয়ানে আমি প্রথম ইডেন গার্ডেন্সে খেলা দেখতে গিয়েছিলাম। ওয়েস্ট ইন্ডিজ বনাম ইন্ডিয়ার টেস্ট ম্যাচ ছিল সেটা। পঞ্চম টেস্ট। কততম দিন সেটা আর মনে নেই। তবে এটা মনে আছে যে ডিসেম্বরের প্রথমদিকে শুরু হয়েছিল খেলাটা। খেলার ঘটনা কিছু সেভাবে মনে নেই আমার। তবে যেটা মনে আছে সেটা হল ইন্ডিয়ার উইকেট পতনের মাঝে কপিলদেব, রজার বিন্নি আর সৈয়দ কিরমানি প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন! এই খেলাটা দেখতে যাওয়ার টুকরো টুকরো স্মৃতি মনে আছে এখনও। মনে আছে কাতারে কাতারে মানুষজনের ইডেনের দিকে হেঁটে যাওয়া। সান গার্ডের জন্য ইলাস্টিকের ব্যান্ড লাগানো টুপি দেওয়া হয়েছিল মাঠের ঢোকার আগে। এ ছাড়াও প্লাস্টিকের কাপ দেওয়া হচ্ছিল বিনামূল্যে। আর দেওয়া হয়েছিল ছোট ছোট অটোগ্রাফ বুক। সব প্লেয়ারদের ছবি ছিল তাতে আর ছিল নীচে অটোগ্রাফ নেওয়ার জায়গা।
খেলার শেষে ভাইপোর সঙ্গে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম গ্র্যান্ড হোটেলের বাইরে। সেখানেই দুই টিমের প্লেয়াররা ছিলেন। খুব ভিড় ছিল সেই জায়গাটায়। ভিড়ের মধ্যে ভাইপো আমায় কাঁধে তুলে নিয়েছিল। আর আমি অবাক হয়ে দেখেছিলাম বাস থেকে নেমে হোটেলের মধ্যে ওই ঢুকে যাচ্ছেন, সুনীল গাভাস্কার, দিলীপ বেঙ্গসরকার, কপিলদেব! তারপর এসেছিল আরেকটা বাস। আর সেখান থেকে নেমেছিলেন। ইয়া লম্বা ক্লাইভ লয়েড! ম্যালকম মার্শাল, গর্ডন গ্রিনিজ, ডেসমন্ড হেইন্স, ল্যারি গোমস, জেফ দুজোঁ, মাইকেল হোল্ডিং! আর সবার শেষে নেমেছিলেন ভিভিয়ান রিচার্ডস!
পৃথিবীতে যে কোনও দেশের যে কোনও সমর্থকদের একজন কমন হিরো থাকে। তিনি কোন দলের হয়ে খেলেন, সেটা বড় কথা নয়! তিনি খেলেন, সেটাই বড় কথা!
এমনই একজন খেলোয়াড় ছিলেন ভিভিয়ান আইজ্যাক আলেকজান্ডার রিচার্ডস! সমস্ত পৃথিবীর কাছে যিনি ভিভ রিচার্ডস!
ভিভ বাস থেকে নামামাত্র যে পরিমাণ চিৎকার আর গর্জন হয়েছিল তা বলার নয়! আমি ভারতের সমর্থক হলেও আমারও হিরোর নাম ছিল ভিভ রিচার্ডস! এত কাছ থেকে ভিভকে দেখব আমি স্বপ্নেও ভাবিনি! আমি চিৎকার করা আর হাততালি দেওয়া ভুলে হাঁ করে তাকিয়েছিলাম ভিভের দিকে। মনে আছে ভিভ হোটেলের গেটে ঢুকে যাওয়ার আগে আচমকা দাঁড়িয়ে পড়ে ঘুরে তাকিয়েছিলেন দর্শকদের দিকে। তারপর তার ট্রেড মার্ক হাসিটা হেসে ভারতীয় কায়দায় হাতজোড় করে নমস্কার করেছিলেন প্রথমে। তারপর দু'হাত তুলে ওয়েভ করেছিলেন! জনতা পাগল হয়ে গিয়েছিল! ‘ভিভ, ভিভ' বলে কী যে চিৎকার হয়েছিল! ভিভ রিচার্ডসও সামান্য সময়ের জন্য হলেও থমকে দাঁড়িয়েছিলেন। এত ভালবাসা পাওয়া যে সবার ভাগ্যে থাকে না! তিনি আরেকবার হেসেছিলেন। তারপর আস্তে আস্তে ঢুকে গিয়েছিলেন হোটেলে! ফেরার পথে এসপ্লানেড থেকে শেয়ার ট্যাক্সি ধরেছিলাম আমরা। ময়দানের
আশপাশে তখন শেয়ার ট্যাক্সির স্ট্যান্ড ছিল। ওখান থেকে ইন্দ্রধনু সিনেমার সামনে অবধি আসত সেই ট্যাক্সি। সেখানে নেমে হেঁটে বাড়ি আসতে আমাদের পনেরো মিনিট লাগত খুব জোর!
সেই শেয়ার ট্যাক্সিতে ভিড় হত খুব। পেছনে চারজন আর সামনে ড্রাইভার ছাড়া আরও দু’জন! বাচ্চা কেউ থাকলে তাকেও সামনে গুঁজে দেওয়া হত! গাড়িতে বসতে খুব চাপাচাপি হত। কিন্তু উপায় ছিল না। তবে তখন ট্যাক্সিগুলোর গিয়ার স্টিয়ারিং হুইলের সঙ্গেই থাকত। এখনকার মতো পাশে মেঝের সঙ্গে লাগানো থাকত না। তাই সামনে ঠেলেঠুলে বসে যেতে অসুবিধে হত না!
আমি যে সময়ের কথা বলছি তখন ইডেন গার্ডেন্সে ফুটবল ম্যাচও হত! মনে আছে চুরাশি সালের নেহরু গোল্ড কাপ আমি ইডেনে বসেই দেখেছিলাম। পোল্যান্ড আর কার একটা বেশ খেলা ছিল। মনে আছে পোল্যান্ডের হয়ে খেলেছিলেন ওয়ার্ল্ড কাপ খেলা ফুটবলার স্মোলারেক! দারুণ ড্রিবল ছিল তাঁর পায়ে। সেই চুরাশির নেহরু কাপে স্মোলারেক হয়ে উঠেছিলেন কলকাতার জনতার হট ফেভারিট! আসলে তখন আমরা সেভাবে সারা পৃথিবীর খেলা দেখতে পেতাম না। বিশ্বকাপেও কয়েকটামাত্র ম্যাচ দেখতে পেতাম। তাই সবাই তৃষ্ণার্তের মতো চেয়ে থাকত এমন টুর্নামেন্টের দিকে। এখানেই আমরা পেয়েছি ওয়ার্ল্ড কাপ খেলা বা পরে খেলবেন এমন সব প্লেয়ারদের। উরুগুয়ের এঞ্জো ফ্রান্সিস্কোলি, র্যামোস, পোল্যান্ডের স্মোলারেক, আর্জেন্টিনার গ্যারেকা, বুরুচাগা এঁদের মধ্যে বিখ্যাত!
ফুটবল ছাড়াও ইডেনে আমি ভারত-পাক ক্রিকেট ম্যাচ থেকে শুরু করে, পঁচাশি সালের আজহারউদ্দিনের প্রথম টেস্ট ম্যাচ, উনিশশো সাতাশি সালের রিলায়েন্স ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনাল, নেহরু সেন্টেনারি কাপ ফাইনাল, হিরো কাপের দুটো সেমিফাইনাল ও ফাইনালসহ আরও কত ম্যাচ যে দেখেছি তার ইয়ত্তা নেই! কিন্তু প্রথমবারের সেই ভিভ রিচার্ডসকে দেখার স্মৃতি আজও অমলিন!
যেমন অমলিন ইডেন গার্ডেন্সকে প্রথম দেখার স্মৃতি! গেট পেরিয়ে গ্যালারির তলা দিয়ে গিয়ে মাঠে ঢুকেই সামনে খুলে গিয়েছিল সবুজ ঘাসের বৃত্ত! কচ্ছপের পিঠের মতো ঢালু সবুজ মাঠ যে এত সুন্দর হতে পারে ইডেন গার্ডেন্স না দেখলে বিশ্বাসই হত না কোনওদিন! আর ভরা স্টেডিয়ামে খেলা দেখা! সেটা যে না দেখেছে তাকে কী করে বোঝাই!
মনে আছে সাতাশি সালে, রিলায়েন্স ওয়ার্ল্ড কাপ ক্রিকেট ফাইনালটা হয়েছিল ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে। সবাই ভেবেছিল ইন্ডিয়া-পাকিস্তান খেলা হবে। কিন্তু দুটো দলই হেরে গিয়েছিল সেমিফাইনালে!
ইন্ডিয়াকে হারিয়েছিল ইংল্যান্ড! তাই ফাইনালে গোটা ইডেন সমর্থন করেছিল অস্ট্রেলিয়াকে। কে জানে সেই চাপেই হয়তো মাইক গ্যাটিং রিভার্স সুইপ মারার মতো একটা ভুল করে আউট হয়ে গিয়েছিলেন! আর ইংল্যান্ডের হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল ম্যাচ! খেলা শেষে কাপ নিয়ে অস্ট্রেলিয়া টিম সারা মাঠ ঘুরেছিল। ইডেন গার্ডেন্সের সকল দর্শক উঠে তাঁদের অভিনন্দন জানিয়েছিল! ক্লাস ফাইভের আমি মুগ্ধ হয়ে খুঁজে পেয়েছিলাম ভিভ রিচার্ডসের পরবর্তী সময়ে আমার হিরোকে! স্টিভেন রজার ও কে!
আজ এইসব কথা মনে পড়লে মনে হয় এসব কি সত্যি আমার সঙ্গেই হয়েছিল! সেই অরুণাচল মাঠের ওয়ান ডে ফুটবল টুর্নামেন্ট! বাটা স্টেডিয়ামে হকির ম্যাচ দেখা! এনএসএ মাঠে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া! বা প্রথম দেখা ইডেন গার্ডেন্স! খেলা দেখতে যাওয়া খুব সাধারণ একটা ঘটনা মনে হলেও আমার মনে হয়, খেলা দেখতে যাওয়ার মধ্যে জীবনের অন্য এক পাঠ লুকিয়ে আছে! সবার সঙ্গে মিশে যাওয়ার, একাত্ম হয়ে ওঠার, বিরুদ্ধ মতকেও ঠান্ডা মাথায় মেনে নেওয়ার পাঠ দেয় খেলা দেখতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা। দেয় উদ্বেগকে ঠান্ডা মাথায় মোকাবিলা করার শিক্ষা। আর এনে দেয় অনাবিল প্রাণখোলা এক আনন্দ! হারা-জেতা পেরিয়ে যে শেখায় এগিয়ে যেতে। পরের ম্যাচে ঘুরে দাঁড়াতে। বন্ধুর মতো অন্যের দিকে হাত বাড়িয়ে দিতে!
না, ফুটবলার হওয়া আমার আর হয়ে ওঠেনি। কিন্তু এই মাঠে যাওয়ার মধ্যেই জীবন আমাকে জড়িয়ে রেখেছে খেলার সঙ্গে। শিখিয়েছে বন্ধুত্ব! বলেছে ভেঙে পড়ার কারণ নেই। পরের ম্যাচে আমরা আবার নতুন করে যাব। নতুন করে সমর্থন করব! নিজের বিশ্বাস আর ভালবাসাকে সমর্থন করতে শেখানোটাই সেই ছোটবেলা থেকে খেলা দেখতে যাওয়া আমায় শিখিয়ে গিয়েছে অলক্ষে!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন