স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
আমাদের ছোটবেলার মফস্সল শহরে ছাদ একটা দারুণ আনন্দের জায়গা ছিল। আমরা যে বাড়িতে ভাড়া থাকতাম সে বাড়ির ছাদটা ছিল তিনতলায়। নীচের তলায় ভাড়া থাকলেও ছাদে ওঠার ব্যাপারে আমাদের কোনও বিধিনিষেধ ছিল না। যখন তখন আমি ও অন্যান্য ভাইবোনেরা ওপরে সোমাদিদি আর মাম্মামদের বাড়ির বেল বাজিয়ে দরজা খুলিয়ে ছাদে উঠে যেতাম।
ছাদটা আমার নিজের কাছে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল। একটা ছোট্ট বাড়িতে আমরা অনেকে মিলে থাকতাম। খুব আনন্দেই থাকতাম। তাও মাঝে মাঝে আমার নিজের জন্য একটু জায়গার দরকার হত। মানে এমন একটা জায়গা যেখানে কেউ এসে আমার ওপর খবরদারি করবে না। কেউ এসে জিজ্ঞেস করবে না, কী করছি! কেন এখনও অঙ্ক না করে হাবিজাবি কাজে সময় নষ্ট করছি!
তাই আমার একার জায়গা হিসেবে ছাদটা ছিল সবচেয়ে ভাল হাইড আউট! ছাদের মাঝখানে একটা ঘর ছিল। দুপুরের রোদে তাই ছাদের একদিকে ওই ঘরটার ছায়া পড়ত। ফলে বহু গ্রীষ্মের দুপুরে বা শীতের দুপুরে ওই ছায়ায় মাদুর পেতে আমি নিজের মতো বসে থেকেছি। বই পড়েছি, ছবি এঁকেছি, পেপার আর কার্ডবোর্ড কেটে কেটে মডেল বাড়িঘর বানিয়েছি! প্লেন আর গাড়ি বানিয়েছি। আবার কখনও কিছু না করে শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে থেকেছি। মেঘের আকার দেখে কীসের সঙ্গে তার মিল আছে, খোঁজার চেষ্টা করেছি। দেখেছি একটা মেঘ কীভাবে ভেঙে, পালটে অন্য মেঘ হয়ে গেল! দেখেছি পাখির ঝাঁক ওই রেললাইনের ওদিক থেকে এসে মিলিয়ে গেল গঙ্গার দিকে। দেখেছি বকের সারি! পানকৌড়ির রেখা! আবার লম্বা লেজঝোলা তোতাপাখির ঝাঁক! সেই বয়সে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনের মধ্যেটা কেমন যেন হয়ে যেত! কেমন যেন সবার থেকে আলাদা আর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার একটা অনুভূতি আসত! মনে হত আমার কেউ নেই। মনে হত আমিও তো কারও নই!
ওই বয়সে কেন অমন হত কে জানে। ছোট থেকেই অনেক মৃত্যু দেখেছি বলেই হয়ত মানব জীবনের নশ্বরতাবোধ ছোটবেলা থেকেই মনের মধ্যে কার্নিসের কোনায় জন্মানো ছোট্ট চারাগাছের মতো বেড়ে উঠেছিল! সেই ছাদের একাকিত্ব আমায় মাঝে মাঝে সেই চারাগাছটির খোঁজ দিত!
তবে এই একা থাকাটা ভেঙে যেত বিকেল হলে। কারণ বাড়িওয়ালা জেঠুর মেয়ে সোমাদি উঠে আসত ছাদে। আমার অন্যান্য ভাইবোনেরাও উঠে আসত। আর তখন শুরু হত খেলা। কানামাছি, রুমাল চোর থেকে শুরু করে কিৎকিৎ, একা দোক্কা কী খেলা না হত! আর শঙ্করদা উঠে এলে হত ফুটবল।
বড় ছাদের দু'দিকে হাওয়াই চটি দিয়ে গোলপোস্ট বানিয়ে দু'জন কি তিনজনের টিম করে শুরু হয়ে যেত খেলা। ছেলেমেয়ে সবাই মিলেই ফুটবল খেলা হত। আর বল হত হয় ঝানুদার দোকান থেকে কিনে আনা বাতাবি লেবু সাইজের রাবারের নয়তো পাড়ার নন্দী স্টোর্স থেকে কিনে আসা ক্যাম্বিসের!
ছাদের মেঝেটা সমান ছিল না। বরং এবড়োখেবড়ো ছিল। তাই কতদিন যে পড়ে গিয়ে হাঁটু কেটেছে আর আঙুলের ছাল উঠেছে তার ইয়ত্তা নেই! তাও সেই খেলার কোনও বিরাম ছিল না।
তবে রোজ ফুটবল হত না। কারণ শঙ্করদা রোজ ছাদে উঠত না। সোমাদির তত্ত্বাবধানে আমরা অন্যান্য খেলা খেলতাম। তারপর একটা মজার জিনিস হত।
আমাদের ওই বাড়িটার মধ্যে দিয়ে নারকেল গাছ উঠেছিল। মানে এমন করে বাড়ির বারান্দা করা হয়েছিল যাতে গাছটা কাটতে না হয়। তাই দোতলার বারান্দা ফুঁড়ে, ছাদ ফুঁড়ে নারকেলগাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকত। আর মজাটা হত এই যে ছাদে দাঁড়ালেই নারকেলপাতা একদম হাতের নাগালের মধ্যেই এসে যেত। আর সেই নারকেলপাতা ছিঁড়ে ঘড়ি বানিয়ে সোমাদি আমাদের চার ভাইবোনের হাতে পরিয়ে দিত! চৌকো ডায়ালের সে ঘড়িটা যে কী সুন্দর দেখতে হত! সোমাদি সেই ডায়ালের ওপর ডট পেন দিয়ে এক দুই তিন লিখে আবার ঘড়ির কাঁটাও এঁকে দিত। টেটু মানে আমার খুড়তুতো ভাই ছিল আমাদের সবার প্রিয়। বিশেষ করে সোমাদি তো খুব ভালবাসত ওকে। তাই ভাইয়ের ঘড়িটা ছিল স্পেশাল। তাতে মাঝে মাঝে ডিজিটাল ঘড়ির অনুকরণে নাম্বারও এঁকে দিত সোমাদি!
সেই ঘড়ি রাত অবধি পরে থাকতাম আমরা! খুলতামই না! এখনও নারকেলগাছ দেখলে আমার সোমাদির তৈরি করে দেওয়া সেই ঘড়ির কথা মনে পড়ে। কিন্তু কিছুতেই সেই পাতা দিয়ে ঘড়ি তৈরির প্রক্রিয়াটা মনে করতে পারি না! কীভাবে যে সেই পাতা ভাঁজ করে ডায়াল, বেল্ট বানাত সোমাদি স্মৃতির মধ্যে থেকে সেইসব হারিয়ে গিয়েছে!
ছাদের আরেকটা মজা ছিল। সেটা হল ঘুড়ি! বিশ্বকর্মা পুজোর আগে বাটানগরের আকাশ পুরো মোজাইকের পাথরের মতো ছোট ছোট ঘুড়ির রঙে ভরে উঠত! তখন মাঞ্জা কিনে এনে ঘুড়ি ওড়ানোর চল ছিল না। তখন সবটাই বানিয়ে নিতে হত।
পুরনো নষ্ট টিউবলাইট বা কাচের বালব সারা বছর ধরে জমিয়ে রাখত শঙ্করদা। ঠিক বিশ্বকর্মা পুজোর আগে সেসব গুঁড়ো করে তাতে আলতা, ভাতের আঠা, গদের আঠা আরও কীসব কীসব মিশিয়ে একটা কাথ মতো বানাত। তারপর সারা ছাদময় ট্রামের তারের মতো টাঙানো হত ভাল কোয়ালিটির সুতো।
শঙ্করদা সেই কাখ একটা কাপড়ের মধ্যে নিয়ে টান দিতে শুরু করত সেই সুতোয়। আর আমায় বলত ওর টানের পেছনে পেছনে সুতোয় ‘টিপ' দিতে। সারাদিন ধরে চলত এই মাঞ্জা দেওয়া। রোদে পুড়ে আমরা ঘোর তামাটে হয়ে যেতাম। কিন্তু সেসব নিয়ে মাথাই ঘামাতাম না। সেই সুতো শুকোবার পরে লাটাইতে গুটিয়ে তুলে রাখা হত।
বিশ্বকর্মা পুজোর দিনটায় দুপুর হলেই সবাই ছাদে উঠে যেতাম। তারপর শুরু হত ঘুড়ি ওড়ানো! শঙ্করদা ছাড়াও শঙ্করদার জ্যাঠতুতো দাদা ভজনদা আসত ঘুড়ি ওড়াতে। আরও আসত বিজুদা, তাতাইদা। সবাই মিলে শুরু হত হুল্লোড়! ভজনদা ছিল ঘুড়ি ওড়ানোয় মাস্টার! ভজনদার ঘুড়ি কাটতে পারে এমন লোক বাটানগরে ছিলই না !
আমি ঘুড়ি ওড়াতে পারি না। আর সত্যি বলতে কী ঘুড়ি ওড়ানো যে শিখব সেটাতেও খুব কিছু আগ্রহ ছিল না আমার। সবার লাটাই ধরে দাঁড়ানোই ছিল আমার কাজ। আর সেটাতেই আনন্দ পেতাম। টানে খেলছে, সলে খেলছে। এসব শুনতাম। বলতামও। কিন্তু খুব যে বুঝে বলতাম তা নয়! আকাশের দিকে তাকিয়ে উড়ে যাওয়া ঘুড়ি, কেটে যাওয়া ঘুড়ি দেখেই কী যে ভাল লাগত!
আর সবচেয়ে মজা হত যখন ভজনদা বা শঙ্করদা অন্যের ঘুড়ি কাটত! সেই যে সবাই মিলে ‘ভোকাট্টা' বলে চিৎকার তা যেন এত দশকের ওপার থেকে এখনও ভেসে আসে! অন্যের জয়ের জন্যও যে আনন্দ পাওয়া যায় সেটাও যেন সেই লাটাই ধরে থাকার বয়সটাই আমায় শিখিয়েছিল!
সন্ধেবেলা হলেই প্রায় রোজই লোডশেডিং হয়ে যেত। পূর্ণিমা থাকলে আমরা লোডশেডিংয়ের সময় ছাদে উঠে আসতাম কখনও কখনও। আর শুধু আমরা না, আশপাশের বাড়ির ছাদেও উঠে আসত নানান লোকজন। বি-পিসি, চন্দনকাকা, বিজয় সাহার বাড়ির লোকজনসহ আরও অনেকে! তারপর চলত এ ছাদ থেকে ওই ছাদে গানের লড়াই! সোমাদি খুব ভাল গাইত। ফলে সোমাদির সঙ্গে বিশেষ কেউ পেরে উঠত না। তবে চেষ্টা চালাত সবাই। আর আমাদের ছোট্ট পাড়ার ছায়া ছায়া অন্ধকার, জ্যোৎস্নার নীচে সুরে-বেসুরে কী যে এক মায়াময় পৃথিবীর জন্ম দিত! আমি আকাশের দিকে তাকাতাম। সোনার বোতামের মতো চাঁদ যেন আমাদের পাড়ার দিকে চেয়েই ধীরে ধীরে ঘুরে যেত হায়েতপুরের দিকে! হলুদ
তারপর একবার খুব বৃষ্টি হল। বাটানগর আসলে পুরনো গঙ্গার খাতের ওপর তৈরি। তাই বেশ নিচু। সেই প্রচণ্ড বৃষ্টিতে সেটা টুপ করে ডুবে গেল পুরো৷ আর আমাদের নঙ্গী অঞ্চল কিছুটা উঁচু বলে কোনওমতে জলের ওপরে নাক তুলে জেগে রইল। বাটা কোয়ার্টার থেকে কাকারা চলে এল আমাদের বাড়িতে। লোকজন যেন আরও বেড়ে গেল। চারিদিকে জলের মধ্যে আমাদের পাড়াটা যেন নোয়ার নৌকার মতো ভেসে রইল।
তার মধ্যেও ছাতা মাথায় করে ছাদে যেতাম আমি। দেখতাম পাশের বাটানগরের কোয়ার্টার অঞ্চলটা কে যেন আয়না দিয়ে মুড়ে দিয়েছে! ছাদের ওপর থেকে জলের আয়নায় কাঁপা কাঁপা ছবি দেখতে কী যে অপূর্ব লাগত! তখন যে বয়স ছিল তাতে তলিয়ে ভাবার মতো অবস্থা ছিল না মনের। তাই এমন জমে থাকা জলের জন্য কত লোকের যে কত ক্ষতি হচ্ছে তা বুঝতে পারতাম না।
ছাদটা আবার ওয়াচ টাওয়ারও ছিল! আমাদের সময়ে মানুষের কৌতূহল বেশি ছিল বোধহয়। সবাই দেখতাম সবার হাঁড়ির খবর নেওয়ার জন্য ব্যস্ত থাকত। আমাদের বাড়িতে মা-কাকিমাদের সঙ্গে ওপরের মাম্মাম, পাশের বাড়ির কাকিমাসহ আরও অনেক পাড়াতুতো দিদা, পিসিরা এসে আড্ডা জমাত। সেখানে কার বাড়িতে কী রান্না হল, কে কার সঙ্গে ঝগড়া করল থেকে রান্নার নানান রেসিপি, নতুন কী বই এল বাটা সিনেমায় সেসব নিয়ে জোর আলোচনা হত। সেই সময়ে সিনেমাকে সবাই ‘বই’-ই বলত!
ছাদটা যেমন ছিল আমাদের বিকেলের খেলার জায়গা, তেমন মা, কাকুমা, পিসি আর মাম্মামদের বিকেলের আড্ডার জায়গাও। ছাদের পাঁচিল ধরে দাঁড়িয়ে সবাই রাস্তা দেখত। পাড়ার মোড়ের দিকে নজরও রাখত কি!
পাড়ার উঠতি বয়েসি মেয়েরা পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে কার সঙ্গে কথা বলল। মোড়ের উল্টোদিকের অরুণাচল ক্লাবের কোন ছেলে কোন মেয়েকে বাদাম বা চানাচুর কিনে দিল সেসব ‘ওয়াচ' করত ওয়াচ টাওয়ারের লোকজন! সেই আটের দশকের প্রথমদিকে আমাদের মফস্সলে প্রেম বেশ নিষিদ্ধ আর মুখরোচক একটা ব্যাপার ছিল। পাড়ায় কেউ প্রেম করছে জানলে পরে সবাই তাকে উঁকি দিয়ে দেখত।
এই ছাদের থেকে একবার সবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম পাড়ার একটি ছেলে আর একটি মেয়ে গল্প করছে। আমি যে বড় হয়ে গিয়েছি সেটা বোঝাতে ওস্তাদি করে বলেছিলাম, ‘আরে ওরা প্রেম করছে!’ ব্যাস সবার সামনে মায়ের কাছে কানমলা খেয়েছিলাম ওই ছাদেই!
বিকেল শেষ হওয়ার পরে ছাদের ঘরে আমরা জড়ো হতাম। সেখানে মাম্মামদের ঠাকুরঘর ছিল। সোমাদি সেখানে সন্ধে দিত। আমরা ভাইবোনেরা সার বেঁধে বসতাম সেই ঘরের একদিকে। সোমাদির সঙ্গে গান গাইতাম। প্রেয়ার সং! গান শেষ হলে সোমাদি শাঁখে ফুঁ দিত। ধূপ আর প্রদীপ জ্বালিয়ে ঘণ্টা বাজিয়ে আরতি করত। ভাই বলত, ‘সোমাদিদি, পু টিনটিন!’ পু মানে শাঁখ! আর টিনটিন মানে ঘণ্টা!
পুজো শেষ হলে আমাদের হাতে আসত দুটো করে নকুলদানা! সেই নকুলদানা হাতের মুঠোয় নিয়ে আমরা আবার নেমে যেতাম নীচে। কাজের জীবনে।
কলকাতায় আসার পরে ছাদ ব্যাপারটা প্রায় চলে গিয়েছে জীবন থেকে। এখন বাটানগরে গেলে দেখি মাম্মামদের বাড়ির ওই ছাদটা ঢেকে দেওয়া হয়েছে। বুঝি ওখানে গেলে পুর্ণিমার সন্ধেবেলা আর সোনার বোতামের মতো চাঁদ দেখা যাবে না। আসলে যা যায়, তা তো আর ফেরে না। তাও আমাদের সেই জীবনে, যেসব সামান্য জিনিসেই আমরা খুশি হয়ে উঠতাম, প্রাপ্তির পূর্ণতায় ভরে উঠতাম, সেসব কথাগুলো এখন মনে পড়ে! মাঞ্জা-ঘুড়ির বিকেল, নারকেলপাতা দিয়ে বানানো হাতঘড়ির বিকেল, সবাই মিলে খেলা করার সেই বিকেল আজও যেন ভেসে আসে কোন এক আশ্চর্য সময় থেকে! সেই সময়, যখন আমাদের কিচ্ছু ছিল না তবু আনন্দ ছিল অফুরান! সেই সময়, যখন নকুলদানার মিষ্টি স্বাদে ভরে থাকত বড় ক্ষুদ্র আর বড় সাধারণ আমাদের সুখের পৃথিবী।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন