শেষটুকু ঝাল লজেন

স্মরণজিৎ চক্রবর্তী

কারেন্ট নুনের কথা মনে পড়ে খুব। কালো রঙের নুন। হাতের পাতায় নিয়ে জিভের ডগা দিয়ে ছুঁলেই চিড়িক করে একটা কেমন যেন লাগত! আমরা চোখমুখ কুঁচকে নিলেও হাসতাম। নোনতার সঙ্গে সামান্য টক একটা ভাব! কী যে ভাল লাগত। নঙ্গী স্টেশনের কাছে একটা দোকানে এমন নুনের ছোট্ট পাতলা প্যাকেট মালার মতো ঝোলানো থাকত। দশ পয়সা দাম ছিল। মিষ্টিদাদুর সঙ্গে গিয়ে কিনে আনতাম।

আর ছিল দামুদা। নিউল্যান্ড স্কুলের সামনে বসত। সে বিক্রি করত লটারি। পানের খিলির মতো প্যাকেটের মধ্যে কখনও থাকত একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের আংটি, কখনও ছোট্ট ছুরির আকারের খেলনা বা একটা কাচের গুলি! এর সঙ্গে একটা দই খাওয়ার কাঠের চামচের গায়ে লাগানো আচার! বোনকে পয়সা দিয়ে দিলে ও স্কুল-শেষের পরে নিয়ে আসত কিনে। আমরা সবাই এক এক করে সেই কাগজের খিলিটা খুলে দেখতাম কে কী পেল! কেউ জানত না কার ভাগ্যে কী থাকবে। তাই এর নাম ছিল লটারি!

এক বৃদ্ধ আসত। সাইকেলের পেছনে ক্যারিয়ারে ছোট্ট একটা কাঠের বাক্স বাঁধা থাকত সাইকেলের ফাটা টিউব দিয়ে। তার মধ্যে থাকত ছোট ছোট আইসক্রিম! কিন্তু না, এমনি পয়সা দিয়ে কেনা যাবে না সেই আইসক্রিম! খেলতে হবে একটা খেলা। ব্যাগাটেলি!

সে একটা ব্যাগাটেলি নামাত। তাতে পঞ্চাশ, পঁচাত্তর একশো, দেড়শো সব ঘষে তুলে ফেলে লেখা থাকত শূন্য, এক, দুই, তিন আর পাঁচ! এবার একবার একটা লোহার গুলি মেরে দেখতে হবে সেটা কোন খোপে গিয়ে আটকায়! যারটা যে খোপে আটকাবে সে ততগুলো আইসক্রিম পাবে! প্রতিটা গুলি মারার দাম সেই দশ পয়সা!

এই আইসক্রিমের সঙ্গে যুক্ত ছিল মজা। কে ক’টা পেতে পারে সেটা নিয়ে একটা উত্তেজনা থাকত। একবারই আমি একজনকে পাঁচটা আইসক্রিম পেতে দেখেছিলাম। সে প্রাথমিকভাবে উত্তেজিত হলেও পরে পাঁচটা আইসক্রিম নিয়ে কী করবে বুঝতে পারেনি! এমন কেউ পেলে সেই বৃদ্ধ একটা প্রস্তাব দিত। সে একটা আইসক্রিম দেবে বিনামূল্যে, যদি চারটে তাকে কেউ ফিরিয়ে দেয়!

আর ছিল বায়েস্কোপওয়ালা। মাথায় করে একটা বাক্স নিয়ে এসে স্ট্যান্ড করাত মাঠে। তারপর বাক্সের নানান দিকের গোলমতো ঢাকনা খুলে দিত। সেখানে চোখ লাগিয়ে দেখত সবাই। ভেতরে রঙিন সব ছবি! সঙ্গে গান চলত। এই বায়েস্কোপওয়ালার টিকিটের দাম ছিল এক টাকা। যা সামান্য বেশি লাগলেও ওই ছবি দেখার সঙ্গে পাওয়া যেত একটা প্যাকেট। তাতে সিনেমার নায়কদের ছবি দেওয়া। আর সেই প্যাকেটের মধ্যে থাকত ভাজা মৌরি আর মিছরির দানার মিশ্রণ!

আমরা সবাই ছিলাম বাবলগাম আর চুইংগামের ভক্ত! এনপি বাবলগাম পাওয়া যেত লাল-কালো দু'দিক মোড়ানো মোড়কে। সেখানে একজন টুপি পরা লোকের ছবি থাকত! কী যে শক্ত ছিল সেই বাবলগামটা! কিছুক্ষণ লজেন্সের মতো করে চুষে নরম করার পরে সেটাকে চিবোতে হত।

আর ছিল চিকলেট। মানে চুইংগাম। হলুদ আর কমলা স্যাসেতে পাওয়া যেত। একটা স্যাসের মধ্যে দুটো করে বালিশের মতো দেখতে চুইংগাম থাকত। আর পাওয়া যেত সবুজ মোড়কের অন্যরকম এক চুইংগাম। সেটার একটা প্যাকে থাকত চারটে চুইংগাম। আমরা ফুটবল খেলতে নামার আগে একসঙ্গে চারটে চুইংগাম মুখে পুরে দিতাম। কারণ বিদেশে প্লেয়াররা নাকি তাই করে! এই তথ্যটা যে আমাদের ক দিয়েছিল সেটা আর মনে নেই। কিন্তু আমরা তেমনই জেনেছিলাম!

এখন যেমন লম্বা পাতলা চুইংগাম পাওয়া যায়, তখন তেমন পাওয়া যেত না এখানে। বিদেশ থেকে কোনও আত্মীয় এলে তারা সেসব নিয়ে আসত। আর আমরাও সেসব মহার্ঘ হিসেবে যত্ন করে রাখতাম। যে আমরা চারটে চুইংগাম একসঙ্গে খেয়ে নিতাম, সেই আমরাই পুরো একটা স্ট্রিপ একবারে মুখে না ঢুকিয়ে ভাগে ভাগে একটু একটু করে খেতাম। কারণ যত দেরিতে ফুরোয় আর কী!

এ ছাড়াও বিগ বাবুল, বুমার সহ আরও কত কী যে পাওয়া যেত! এসবের প্যাকেটের মধ্যে আবার থাকত স্টিকার বা জলছবি! এর জন্যও ওইগুলো কেনার আগ্রহ হত খুব!

আমরা ছিলাম কোল্ড ড্রিঙ্কের ভক্ত! তখন থামস আপের যুগ। সে কী সাংঘাতিক ঝাঁঝ। খাবার আধঘণ্টা পরেও নাক-মুখ জ্বালিয়ে ঢেকুর উঠত। আর ছিল লিমকা। মিলকোস! আমার মা যেমন পছন্দ করত থামস আপ তেমন ছোটপিসিকে দেখতাম মিলকোস ছাড়া কিছু খেত না। আর বাবার ফেভারিট ছিল লিমকা! তখন ‘লাইম অ্যান্ড লেমনি লিমকা'-র বিজ্ঞাপন দিত সদ্য যুবক হওয়া বড় চুলের, রোগা সলমন খান!

থামস আপের বোতলের মুখের যে ছিপি তার নীচের রাবারের মধ্যে থাকত ক্রিকেটারদের কার্টুন! আমরা সেফটি পিন দিয়ে খুঁচিয়ে সেটা তুলে ফেলতাম! কেউ যদি একটা টিমের এগারোজনের ছবি সংগ্রহ করতে পারত তবে সে পেত সেই প্লেয়ারদের সই করা একটা ছোট ব্যাট! আবার বোলারদের সংগ্রহ করতে পারলে পেত লাল ছোট্ট ডিউস বল। সান্ত্বনা পুরস্কারও ছিল। একটা ইঞ্চিচারেক লম্বা থামস আপের বোতল! আমার যে কী ইচ্ছে ছিল কিছু একটা এমন সংগ্রহ করার! কিন্তু কোনওদিনই কিছু পাইনি!

তবে কোল্ড ড্রিঙ্কের মধ্যে আমার ফেভারিট ছিল গোল্ড স্পট! কমলা লেবুর স্বাদের সঙ্গে সোডার ঝাঁঝ! কী যে ভাল লাগত! মনে আছে বিজ্ঞাপনের ক্যাচ লাইন ছিল— ‘গোল্ড স্পট দ্য জ়িং থিং!’ যখনই কোল্ড ড্রিঙ্কের কথা উঠত আমি গোল্ড স্পট খেতাম! এখনও তার স্বাদ স্মৃতিতে রয়ে গিয়েছে! হ্যাঁ স্মৃতিতেই, কারণ সব ভালবাসার মানুষ আর জিনিসের মতোই গোল্ড স্পটও হারিয়ে গিয়েছে জীবন থেকে!

এর বাইরেও ছিল নানান রকম কোল্ড ড্রিঙ্ক। যেমন ক্যাম্পাকোলা! আমার এক দাদার পিসেমশাই বাইরে থেকে এসে প্রথম ক্যাম্পাকোলা দেখে কী উচ্চারণ করতে করবে বুঝতে না পেরে বলেছিল, ‘ভাই আমায় একটা চম্পাকোলা দাও তো!’

তারপর থেকে আমরাও ইচ্ছে করে কোল্ড ড্রিঙ্ক কিনতে গিয়ে দোকানিকে জিজ্ঞেস করতাম, ‘দাদা, চম্পাকোলা হবে?'

আরেকটা কোলা ছিল। রতি অগ্নিগোত্রী তার বিজ্ঞাপন করতেন। নাম ছিল ‘থ্রিল’!

ঝাঁঝ কম ছিল তাতে। মাঝে মাঝে এটাও খেতাম। ক্লাস নাইনে ওঠার সময়ে দেশে মুক্ত বাণিজ্যের শুরু হয়েছিল। পেপসি, লেহর কোম্পানির সঙ্গে মিলে নিয়ে এসেছিল লেহর-পেপসি। তার সঙ্গে এসে ঢুকেছিল সেভেন আপ! এসেছিল সিট্রা। আমরা প্রথম দেখেছিলাম ছোট বোতলের পাশাপাশি বড় দেড় লিটারের ভারী কাচের বোতলও পাওয়া যাচ্ছে।

আমরা সাধারণত চিপস খেতাম পাতলা ট্রান্সপারেন্ট প্যাকেটের। লোকাল দোকানে ভাজা। এই প্যাকেটে কখনও কখনও লালচে নুনের একটা প্যাকেটও থাকত। তারপর বাজারে এল একটা চিপস। নাম ফান মাঞ্চ। সে কী দারুণ খেতে! লালচে কমলা রঙের প্যাকেটে বিক্রি হত সেই চিপস। তাতে এমন একটা মশলা মাখানো থাকত যে খেতে শুরু করলে আর থামা যেত না! এর সঙ্গে সঙ্গে আরও নানান চিপস এসেছিল। কিন্তু আমার স্মৃতি থেকে বাকি সব মুছে গেলেও এই ফান মাঞ্চ রয়ে গিয়েছে!

তবে এই নানান রকম মজার খাবারের পাশে আমার সবচেয়ে পছন্দ ছিল বালি লজেন্স! আসল উচ্চারণ লসেঞ্জ। কিন্তু আমরা বলতাম লজেন্স। আরও সঠিকভাবে বললে, ঝাল লজেনা

প্রায় কালো এই লজেন্সের স্বাদ ছিল টক, মিষ্টি, ঝাল আর নোনতা! ঠিক আমাদের জীবনের মতো! তারপর চুষতে চুষতে লজেন্স পাতলা হয়ে এলে আচমকাই মাঝখানটা ভেঙে যেত। আর বেরিয়ে পড়ত নরম জেলি! সেটাও সামান্য মিষ্টি, সামান্য টক, নোনতা আবার একটু যেন আলো।

ট্রেনের হকারদের কাছে, স্টেশনারি দোকানের কাচের বয়ামে, সিগনালে সিগনালে লজেন্সওলাদের কাছ থেকে আমি কিনতাম এই লজেন্স! বলতাম, 'ওই কালোগুলো দেবেন, শুধু কালোগুলোই দেবেন!’ আর সেসব কিনে এনে, একা একা নয়, ভাগ করে খেতাম সবার সঙ্গে। দেখতাম লজেন্সের স্বাদ যেন তাতে আরও বেড়ে যেত।

টক মিষ্টি নোনতা ঝাল একের মধ্যে নানান স্বাদ পেলেও একে আমরা ঝাল লজেনই বলতাম। কেন এমন বলতাম কে জানে! কিন্তু যাই হোক না কেন এখন মনে হয়, ঝাল লজেন আর আমাদের জীবন যেন এক! সেই ছোট্টবেলার আমাদের বাড়ি উঠোনে, চাঁদের আলোয় বসে গাওয়া গান যদি মিষ্টি হয়, তা হলে ফুটবল মাঠে ভিজে ঝুপ্পুস হওয়ার স্মৃতিটা কেমন যেন নোনতা! আবার ক্লাস ইলেভেন থেকে টুয়েলভে ওঠার সময় কেমিস্ট্রিতে ফেল করাটা যদি টক হয় তো ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে চলে আসার স্মৃতি আজও ঝালের মতোই লাগে!

একটা সামান্য জীবন আমাদের। কতটুকুই-বা কী করতে পারি তার মধ্যে! তবু আজ এই মধ্য চল্লিশে এসে মনে হয় এই ঝাল লজেনটাও মিষ্টি হয়ে ওঠে যদি সবার সঙ্গে তা ভাগ করে নিতে পারি! তাই এই সামান্য জীবনের ছোটখাটো আনন্দ দুঃখ মনখারাপ আর ভালবাসার গল্পগুলো ভাগ করে নিলাম সবার সঙ্গে! আর এত কিছু লিখতে লিখতে, স্মৃতির আলো-আঁধারিতে হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম আমার সামান্য ঝাল লজেন কখন যেন নিজের থেকেই মিষ্টি হয়ে উঠেছে! আমার সামান্য গল্প আর সকলের গল্প হয়ে উঠেছে!

অধ্যায় ৩৪ / ৩৪
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%