পাড়ার দোকান

স্মরণজিৎ চক্রবর্তী

ছোটবেলায় পাড়ার দোকানগুলো ছিল আমাদের ঘুরতে যাওয়ার জায়গা। নঙ্গী স্টেশন রোডের ওপরেই ছিল সব দোকান। সার বেঁধে পরপর দাঁড়িয়ে থাকত তারা। আর কী ছিল না সেখানে? ফটো স্টুডিয়ো থেকে শুরু করে মুদিখানা, হার্ডওয়্যার স্টোর্স, স্টেশনারি দোকান, টেলারিং শপ, সেলুন-সহ সব রকমের দোকান ছিল সেই সারিবদ্ধ ঘরের মধ্যে।

আমার ঠাকুরদা মানে মিষ্টিদাদুর দোকানও ছিল এই স্টেশন রোডের ওপর। নাম 'চক্রবতী ব্রাদার্স'। সেটা ছিল দর্জির দোকান। সঙ্গে চায়ের পাতা, বিস্কুট, চানাচুরও রাখা হত। টুকটাক বিক্রি হত। সেলাই মেশিনের ঘড়ঘড় শোনা যেত। ইন্দুবাবু বলে একজন আসত দাদুকে সাহায্য করার জন্য।

তখনও অধিকাংশ মানুষ কাপড় কিনে বানানো জামা-প্যান্টই পরত! তবে দাদুর দোকানটা ছিল মূলত একটা ক্লাব। বয়স্ক মানুষদের আড্ডার জায়গা। আশপাশের সব বয়স্ক লোকজনকে দেখতাম দাদুর দোকানে এসে সামনে পাতা বেঞ্চে বসত। সঙ্গে ছিল তাদের তাসের আড্ডা! ব্রিজ তোলার সে কী ধুম! এমনকী সেই খেলায় যোগ দিতে দুটো স্টেশন দূর থেকে মিত্তির সাহেব পর্যন্ত রোজ আসত! দোকান থেকে লাভ কী হত কে জানে, কিন্তু তাও সারা সপ্তাহ দোকান খোলা থাকত! ছুটির দিন ছিল না কোনও। আমরা রোজ দাদুর দোকানে গিয়ে উৎপাত করতাম। চানাচুর, বাদাম আর গোলাপি শক্ত এনপি বাব্লগাম ছিল প্রতিদিনের লুঠ!

তবে শুধু আমাদের দোকানেই নয়, আশপাশের সমস্ত দোকানেই, আমাদের মানে আমি, আমার পিসতুতো দিদি, বোন আর খুড়তুতো ভাই, এই চারজনের অবাধ গতি ছিলা সব দোকানেরই কেমন যেন নিজস্ব আলাদা গন্ধ ছিল! চোখ বন্ধ করে দিলেও যেন বলে দিতে পারতাম এটা কোন দোকান!

মনে আছে ঘোষ সাউন্ড নামে একটা দোকানের থেকে মাইক ভাড়া দেওয়া হত। এখানে বেশ কিছু পুরনো গ্রামাফোনও রাখা থাকত! কেন থাকত কে জানে! কেউ কি ভাড়া নিত? কোনওদিন তো দেখিনি! ওই দোকানে ঢুকে ওই গ্রামাফোনের চোঙের মধ্যে উঁকি মেরে দেখার কী যে একটা আকুলতা ছিল আমার! কেন যেন মনে হত, যে কোনও সময় কেউ হাত বাড়াবে ওই চোঙের মধ্যে থেকে!

পাশেই ছিল ঘোষ বাইন্ডিং নামক আরেকটা দোকান। সেখানে বই বাঁধানোর সঙ্গে ছবিও বাঁধানো হত! এই দোকানের ঘোষজেঠুকে আমি কোনওদিন হাসতে দেখিনি। চুপচাপ বসে থাকতে দেখিনি! সারাক্ষণ ঘাড় গুঁজে মানুষটা কাজ করে যেত! কারও সঙ্গে বিশেষ কথা বলত না। আমি দোকানে গিয়ে ঢুকলেও তাকাত না। কেবল আস্তে করে বলত, ‘কাচ দেখে হেঁটো!”

রঞ্জন ভটচাজের দোকানটা ছিল বড়লোকদের দোকান! তখন আমাদের কাছে পৃথিবী খুব সহজ দু'ভাগে ভাগ করা থাকত। বড়লোক আর গরিব লোক! ডাক্তার বাগচীর কী বিশাল বাগান ঘেরা বাড়ি! ডাক্তার বাগচী বড়লোক! মনুদারা মাটির বাড়িতে থাকে। মনুদারা গরিব! জ্ঞানজেঠুর কত্ত বড় বাড়ি, কলকাতায় বড় ব্যবসা! সপ্তাহে দু'দিন ওদের বাড়ি থেকে মাংসের গন্ধ আসে! জ্ঞানজেঠুরা বড়লোক! আর আমাদের বাড়িতে এত লোক। রবিবার একবেলা মাংস খেলে পরেরবেলা আলু ঝোল খাই শুধু। আমরা গরিব।

তেমনই রঞ্জন ভটচাজের চশমার দোকানে ছিল একটা টেলিফোন! কালো, চকচকে। তাই সেটা ছিল বড়লোকদের দোকান! সেই দোকানে ঢোকার সময় আমার স্বভাবসিদ্ধ তিড়িংবিড়িং-পনাটা আপনা থেকেই কেমন যেন শান্ত হয়ে যেত। আমি সাবধানে গিয়ে টেলিফোনের সামনে দাঁড়াতাম। বিশাল লম্বা রঞ্জনজেঠু বলত, ‘একবার কিন্তু, তার বেশি নয়!’ আমি খুশি হয়ে মাথা নাড়তাম। তারপর জামায় দু'হাত মুছে, টেলিফোনের ভারী রিসিভারটা দু'হাতে তুলে কানের কাছে ধরতাম! রিং-টোন! কী যে আনন্দ হত! আমি জানতাম কেউ কোনওদিন আমায় ফোন করবে না! আমাদের বাড়িতেও এমন দারুণ একটা কালো চকচকে টেলিফোন আসবে না কখনও! তাও ওই সপ্তাহে একবার কি দু'বার টেলিফোন ধরে রিংটোন শোনার যে আনন্দ পেতাম তার তুলনা নেই!

সেই রঞ্জনজেঠু আর নেই এখন! কালো টেলিফোনটাও যে নেই তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু সেই রিংটোন শোনার স্মৃতি আজও অমলিন! এখনকার হাজার দামি মোবাইল ফোন ও তার নানান অ্যাপ ছোটবেলার সেই আনন্দ ফিরিয়ে দিতে পারে না।

আর ছিল গুপ্তদা! বয়সে আমার বাবার চেয়েও বড়, কিন্তু তাও ছেলে-বুড়ো সবার কাছে সে ছিল গুপ্তদা। থুতনিতে একটা বড় আঁচিল ছিল গুপ্তদার। স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরে বসে থাকত নিজের হার্ডওয়ারের দোকানে। দোকানে ফ্যান ছিল না। গেঞ্জিটা গুটিয়ে ভুঁড়ির ওপর তুলে রাখত। আর সারাক্ষণ একটা হাতপাখা দিয়ে হাওয়া খেত। মাঝে মাঝে মনে হত হাতপাখাটা গুপ্তদার হাতের সঙ্গেই ফিট করা। লীলা মজুমদারের গল্পের সেই মাদুলি চুলকোবার মতো গুপ্তদার হাতপাখাটাও মাঝে মাঝে নিশ্চয় চুলকোয় !

কোদাল, কড়াই, তারের ব্রাশ, উনোন, ছাই খোঁচাবার শিক, কেরোসিনের ল্যাম্প থেকে শুরু করে ঘুড়ি-লাটাই সবকিছু পাওয়া যেত গুপ্তদার দোকানে। আমরা ভাইবোনেরা গিয়ে ছোট্ট কড়াই নামিয়ে মাথায় হেলমেটের মতো পরতাম। তারপর কাঠের স্কেলকে বন্দুক বানিয়ে শুরু করতাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের লড়াই! মুখ দিয়ে এত গোলাগুলির শব্দ হত যা নির্ঘাত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও হয়নি! গুপ্তদা হাসত আমাদের দেখে। বলত, ‘তোরা যুদ্ধ কর, আমি দেখি। আমি চার্চিল!’

চার চিল কী পাঁচ চিল সেসব তখন জানতাম না! শুধু জানতাম যুদ্ধের শেষে ভাইয়ের গুলিতে যদি আমি মারা না যাই তা হলে ভাই প্রচণ্ড কান্নাকাটি করবে।

গুপ্তদার পাশেই নন্দীর স্টেশনারি ভ্যারাইটি স্টোর্স। নন্দীকাকুর বাঁহাতের কড়ে আঙুলের নখ বড়। তাতে লাল নেলপলিশ লাগানো! আমার কেন কে জানে বিচ্ছিরি লাগত! হজমি কেনা ছাড়া খুব বেশি যেতাম না ওইখানে। দশ পয়সায় দশটা হজমি পাওয়া যেত!

আর এর উল্টোদিকে ছিল মাটির ভাঁড় তৈরির দোকান। মাটির চাকা ঘুরিয়ে কী সুন্দর ভাঁড় তৈরি করত মিশ্রাজি! আমি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম!

মিশ্রাজি হেসে আমায় বলত, ‘তুম ভি ট্রাই করো!’ ট্রাই করতাম। কিন্তু সবকিছুর মতো এটাও পারতাম না!

আরেকটা দোকান ছিল, বাড়ির থেকে একটু দূরে। স্টেশন রোডের ওপরেই। সেটা ছিল পানের দোকান। রোজ বিকেল শুরুর মুখে মা ছ’কোনা কুড়ি পয়সা দিয়ে আমায় পাঠাত পান এনে দেওয়ার জন্য। মায়ের ছিল পানের শখ। মিঠা পাতা, খয়ের ছাড়া, গোপাল জর্দা আর চমনবাহার! সেই কবে যেতাম পান আনতে। চুরাশি-পঁচাশি সালে!

তাও কী করে যে আজও মনে রয়ে গিয়েছে! সেই দোকানের দাদু আমায় রোজ এক চিমটি করে মৌরি দিত। সেটা বাড়িতে এনে আমি কাচের বোতলে জমিয়ে রাখতাম। তারপর অনেকটা হয়ে গেলে ভাইবোনেরা ভাগ করে খেতাম! সামান্য মৌরি ভাগ করার মধ্যের যে আনন্দ, তার তুলনা আজও কিছুতে পাই না!

আর ছিল কালিকা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। মন্টুদার দোকান! ছোটদাদুর সঙ্গে সেই দোকানের একদম ভিয়েনে চলে যেতাম। দেখতাম রসগোল্লা তৈরি হচ্ছে! কড়াইতে ভাজা হচ্ছে পান্তুয়া! ছোটদাদুর কীসের কী যোগাযোগ ছিল ওদের সঙ্গে কে জানে। বানানো মিষ্টির থেকেই একটা-দুটো তুলে আমায় খাইয়ে দিত। কোনওদিন কেউ দাম চাইত না!

স্টেশন রোডের পাশে আরও নানান দোকান ছিল! মামুর ইলেকট্রিকের দোকান! মধু পালের বড় রেশন শপ! মিত্র টি হাউজ! আশা-লতার চপের দোকান! যুগলকাকার সেলুন! সব জায়গাতেই ঘুরে বেড়াতাম আমরা। তারাও দোকানে ঢুকতে দিত। এটা ওটা খেতে দিত। গল্প করত। কোনওদিনও বকত না, বিরক্ত হত না! এরা আমাদের কে ছিল? কেন আমাদের সমস্ত উপদ্রব হাসি মুখে সহ্য করত! ছোট ছোট সব দোকান। খুব যে বিক্রিবাটা হত তাও নয়। তবু, কোনওদিন আমি কাউকে রাগ করতে দেখিনি। বিরক্ত হতে দেখিনি। খুব সাধারণ সব মানুষের মধ্যেও কত যে অসাধারণ সব মন ছিল!

এখন পুরনো মফস্সলে গেলে দেখি সেইসব দোকান আর নেই। কালের নিয়মে সব পালটে গিয়েছে! গুপ্তদার দোকানের লাইন ভেঙে সেখানে এখন চারতলা বিল্ডিং! ঘোষ সাউন্ডের দোকানের লাইন পুরো পরিত্যক্ত, আগাছায় ভরা! আমার দাদুর দোকানের জায়গায় এখন কাচ-লাগানো বিউটি পার্লার! রঞ্জন ভটচার্জের দোকানেও যেন কীসব রঙিন আলো! হাতে মোবাইল নিয়ে বসে থাকা অচেনা মুখ!

পুরনো দোকান আর একটাও নেই। সেই মনকেমন রাস্তা এখন যেন আর চিনতে পারি না। তাও সেই পথ দিয়ে গেলেই এখনও কেন কে জানে সব মনে পড়ে যায়! আমরা যারা এমন সব মানুষজন ছেড়ে বহুদূর চলে এসেছি তাদের সবারই হয়তো এমন মনে হয়! তাদের সবারই হয়ত একজন গুপ্তদা থাকে৷ মিশ্রাজি থাকে! থাকে পুরনো একটা গ্রামাফোন, যার মধ্যে থেকে যে কোনও সময়ে বেরিয়ে আসতে পারে একটা হাত! আর থাকে বিকেল শুরুর মফস্সলের নির্জন রাস্তায় হাতের মুঠোয় ধরে থাকা মৌরির ঘ্রাণ! এই ঘ্রাণ একবার জীবনে মিশে গেলে, সারাজীবন থেকেই যায়!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%