স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
ছোটবেলায় আমাদের জীবনে লোডশেডিং ছিল খুব স্বাভাবিক আর রোজকার একটা ঘটনা। দিনেরবেলায় কখনও কখনও হলেও সূর্য ডোবার পরে লোডশেডিং হত রোজই। তখন জীবন ছিল এই অন্ধকারের নিয়মে বাঁধা।
বিকেলে কোয়ার্টারের মাঠে খেলতে যেতাম আমরা। মায়ের কড়া হুকুম ছিল সন্ধে ছ'টার মধ্যে বাড়ি ফিরতেই হবে! সারাজীবন সবার বাধ্য আমি তাই সেরকম সময়েই ফিরে আসতাম। তারপর হাত-মুখ ধুয়ে, ব্যায়াম করে, মুড়ি খেয়ে পড়তে বসতে হত। আর সেই পড়তে বসার একটু পরেই হত লোডশেডিং! আমরা বলতাম, ‘কারেন্ট অফ, কারেন্ট অফ!’
লোডশেডিং হলেই আমাদের মফস্সলের একতলা দোতলা পাড়াগুলো কেমন যেন ডুবে যেত খয়েরি রঙের অন্ধকারে! আর সব বাড়ির ছোট ছোট জানলায় জ্বলে উঠত হলুদ রঙের আলো! কেরোসিনের ল্যাম্প! হ্যারিকেন! হ্যাঁ, তখন সব ল্যাম্প সাদা রঙের কেরোসিন তেলে জ্বালানো হত।
আমাদের সময় দু'রকমের ল্যাম্প হত। টিনের ফ্রেমওলা হ্যারিকেন যেমন ছিল, তেমন ছিল কাচের বেস-ওলা টেবিল ল্যাম্প। কাচের ওই বেস-এ তেল ভরা হত। তারপর সেটার ওপর প্যাঁচ দিয়ে লাগানো হত পলতে ভরার পেতলের জায়গা। আর তার মাথায় পরানো হত কাচের চিমনি।
এই কাচের চিমনিগুলো পরিষ্কার করা একটা রোজকার কাজ ছিল। তখনও অনেক বাড়িতে উনোন ছিল। ফলে ছাইয়ের অভাব ছিল না। সেই ছাই দিয়ে কাচের চিমনি মাজা হত। তারপর শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে ঝকঝকে করে রাখা হত! এরপর ছিল ল্যাম্পে পলতে পরানো! আমাকে মাঝে মাঝে এই কাজটা দেওয়া হত।

ল্যাম্পের সঙ্গে যে পেতলের অংশটা থাকত (নাম জানি না), একটা নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সেটার মধ্যে পলতে পরানো হত! পলতে কিনে এনে মা বা কাকুমা মাপমতো কেটে দিত! তখনকার সময়ে এই ল্যাম্পে পলতে পরানো আর স্টোভে পলতে পরানো একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল।
আলো জ্বালাবার পরে আবার সেই নব দিয়েই পলতে বাড়িয়ে-কমিয়ে আগুনের শিখা ঠিক রাখা হত। শিখা বেশি বেড়ে গেলে চিমনিতে কালি পড়ে যেত। তাতে আবার চিমনি মাজার ঝক্কি বাড়ত!
এখন যেমন কশ্চিৎ কখনও শহরে লোডশেডিং হয়ে গেলে ছেলেমেয়েরা পড়াশুনো গুটিয়ে রাখে। আমাদের কিন্তু তা ছিল না। ওই ল্যাম্পের আলোতেই আমাদের পড়তে হত। কারণ রোজ রোজ তো আর পড়া কামাই করা যায় না।
তবে সত্যি কথা বলতে কী লোডশেডিং হলে আমার পড়ায় আর তেমন মন বসত না। আমি ওই হলুদ আলোর মধ্যে ছায়ার কারসাজি দেখতেই ব্যস্ত হয়ে পড়তাম। এই মা হেঁটে গেলে দেওয়ালে কেমন ছায়া পড়ল! আমাদের পোষা কুকুর টোপর দৌড়ে গেলে কেমন ছায়া পড়ল! ভাই দাঁড়িয়ে রাগের মাথায় হাত-পা ছুড়লে কেমন ছায়া পড়ল! এইসব দেখতাম। আর দেখতে দেখতে আমিও হাতের আঙুল মুড়ে-খুলে সদ্য শেখা ছায়াবাজির কায়দায় দেওয়ালে ফোটাবার চেষ্টা করতাম খরগোশ, কুকুর, হরিণ, মানুষের মুখ!
এখন জানি একে বলে শ্যাডোগ্রাফি বা ওস্ত্রোম্যানি! কিন্তু তখন, কাকে কী বলে সেটা জেনে ও জানিয়ে জ্ঞান জাহির করার চেয়ে যে কাজটা করলে মজা লাগে বেশি সেটা করাই ছিল লক্ষ্য! জীবনে সহজ সরল আনন্দগুলোই ছিল আসল।
লোডশেডিংয়ে আমাদের পাশের উঠোনে মাঝে মাঝে যে গান-কবিতার আসর বসত সেটা তো আগেই বলেছি।
অর্থাৎ সব মিলিয়ে লোডশেডিংয়ের মধ্যেও আনন্দ খুঁজে নেবার চেষ্টা করতাম আমি! মনে আছে বর্ষাকালে পাশের পুকুরে বেজে যাওয়া অবিরাম বৃষ্টির শব্দ, বাঁশবনে বয়ে যাওয়া বাতাসের শব্দ আর ব্যাঙের ডাকের মধ্যে কারেন্ট অফের সন্ধেগুলো যে কী আশ্চর্য একটা পৃথিবী তৈরি করত তা লিখে বোঝানো সম্ভব নয়! ওই হলুদ-কালো আলোছায়ার মধ্যে আমাদের মফস্সলটাই পালটে যেত যেন! প্রতিটা বাড়িতে, প্রতিটা দোকানে জ্বলত অমন হলুদ ল্যাম্প আর হ্যারিকেন! মনে হত কেউ যদি আমার মফস্সলকে দূর থেকে দেখে তা হলে তার মনে হবে বিশাল অন্ধকার এক ঝোপের মধ্যে দপদপ করছে হাজার জোনাকি!
এ ছাড়া ছিলও হ্যাজাক! পেট্রোম্যাক্স ল্যাম্প! না, পেট্রোম্যাক্স শব্দটা তখন জানতাম না। আমরা হ্যাজাকই বলতাম। বিয়েবাড়ি বা অন্যান্য অনুষ্ঠান বাড়িতে তখন ডিজেলের সবুজ রঙের জেনারেটর সেট ভাড়া করা হত না। হ্যাজাকই ছিল ভরসা। আর হ্যাঁ, হ্যাজাকে আলো হত দারুণ! একদম সাদা, ফটফটে!
ওই যে হ্যাজাক জ্বালাবার আগে হ্যাজাকের গায়ে লাগানো ছোট পিস্টন জাতীয় জিনিস দিয়ে হ্যাজাকটা পাম্প করা হত, সেটা দেখতে আমাদের খুব ভাল লাগত। কোনও অনুষ্ঠানে হ্যাজাক জ্বালানো হলেই আমি আর ভাই সবাইকে ঠেলেঠুলে সামনে গিয়ে দাঁড়াতাম। দু'জনেই চোখ বড় বড় করে দেখতাম একজন লোক খুব মন দিয়ে হ্যাজাক পাম্প করে যাচ্ছে! আর সবাই, কখন আলো জ্বলবে, এই আশায় তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তখন অনুষ্ঠান বাড়িতে বেশ কয়েকটা করে হ্যাজাকের ব্যবস্থা রাখা হত।
আমি আর ভাই মনে মনে গুনতাম কতবার পাম্প করা হল। যে যত কম বার পাম্প করে আলো জ্বালাতে পারত সে আমাদের কাছে দু'দিনের জন্য কুমার গৌরব হয়ে উঠত! এমন একজন মানুষের কথা মনে পড়ে। তপন রক্ষিত! অন্য অনেকে হ্যাজাকে পাম্প দিতে এগোলেও সে-ই তপনকাকুই অধিকাংশ সময় কুমার গৌরব উপাধিটা পেত!
লোকটার মাথায় চুল ছিল কিছু! ঘন কালো। তেল দিয়ে ঠাস করে আঁচড়ালেও কপালের ওপর ঝাঁপিয়ে নেমে আসত চুল! হ্যাজাক পাম্প করতে তপনকাকু এগিয়ে যেত কোনও কোনও সময়! তবে পাম্প করার আগে বেলবটম প্যান্টের পেছনের পকেট থেকে একটা লাল চিরুনির খাপ বের করত তপনকাকু। তারপর সেটা সামনে মেলে ধরে এদিক ওদিক সবার মুখের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসত। বিশাল কোনও ম্যাজিক দেখাচ্ছে এমন ভাব করে এবার চিরুনির খাপের একপাশে ছোট্ট একটা বোতামে চাপ দিত তপনকাকু। আর ছিক্ শব্দে ছোরার মতো খুলে ফেলত চিরুনির দাঁড়ার দিকটা! তারপর মন দিয়ে এগারোবার চুল আঁচড়াত! হ্যাঁ, এগারোবার। ভাই প্রতিবার গুনত! তারপর আবার চিরুনি গুটিয়ে প্যান্টের পেছনের পকেটে ঢুকিয়ে রেখে চলত হ্যাজাক পাম্প দেওয়া। আর প্রায় প্রত্যেকবার তপনকাকুই হত আমাদের কুমার গৌরব!
তখন কুমার গৌরব ছিল সদ্য নাম করা হিরো! লাভ স্টোরি নামে একটা সিনেমা খুব হিট করেছিল কুমার গৌরবের! তাই সবাই খুব নাম করত তার। প্যান্ডেলে খুব গান বাজত সেই সিনেমার। প্রেম নিবেদন করে ব্যর্থ দাদা-কাকারা শুনতাম গলা ভারী করে অমিতকুমারের অনুকরণে গাইছে— ‘তেরি ইঁয়াদ আ রহি হ্যায়...'। আমরাও কিছুটা বুঝে আর কিছুটা না বুঝে সবাই কুমার গৌরব হতে চাইতাম বা যাকে দেখে সাংঘাতিক কিছুটা একটা নায়ক মনে হত, তাকেই কুমার গৌরব বলতাম!
সেই হ্যাজাক জ্বালানো দেখে আমি আর ভাই কতবার প্ল্যান করেছি যে বড় হলে অবশ্যই আগে একটা হ্যাজাক কিনতে হবে। হ্যাজাক আর বোতাম টিপলে ছিক্ করে খুলে যায় এমন লাল একটা চিরুনি!
তবে অনুষ্ঠান বাড়ির বাইরেও সাধারণ দিনে হ্যাজাক থাকত দু’-একটা দোকানে! তার মধ্যে আমার মিষ্টিদাদুর দোকানের কাছের বিমল স্যাঁকরার দোকান ছিল অন্যতম!
আমাদের বাড়িওয়ালার জেঠুর ছেলে যে শঙ্করদা, সেই শঙ্করদাই ছিল আমার গুরু! মানে জীবনের খারাপ ভাল যা কিছু তার অধিকাংশই সেই বয়সে শেখাত শঙ্করদা! শঙ্করদা যা বলত তার প্রায় সবটাই বিশ্বাস করতাম আমি।
সেই শঙ্করদা বলেছিল, বিমল স্যাঁকরা নাকি আসলে ছদ্মবেশে থাকা রবীন্দ্রনাথ! অমন লম্বা চেহারা, সাদা বড় চুল, বুক অবধি নেমে আসা সাদা দাড়ি! এ রবীন্দ্রনাথ না হয়ে যায়!
রবীন্দ্রনাথ! তিনি তো কবে মারা গিয়েছেন! তাও শঙ্করদার মুখের ওপর কে বলবে! ঝুলপিতে টান খাওয়ার চেয়ে বিমল স্যাঁকরাকে রবীন্দ্রনাথ হিসেবে মেনে নেওয়া অনেক ভাল !
সেজোকাকা, মানে যাকে আমি ভাইপো বলতাম, সে বলত বিমল স্যাঁকরা আসলে একজন বিপ্লবী! ব্রিটিশ আমলে নাকি তাঁর কালাপানির সাজা হয়েছিল! আর আন্দামানের সেলুলার জেলে বন্দি হয়ে ছিল বহু বছর। ভাইপোর কাছে শুনতাম সেলুলার জেলের কঠিন আর কষ্টকর জীবনের গল্প! সেই সেলুলার জেল থেকে পালিয়ে নাকি সমুদ্র সাঁতরে এই নঙ্গী-বাটানগরে এসেছিল বিমল স্যাঁকরা! তারপরে এখানেই থেকে গিয়েছে!
এখন বুঝি এসব ভাইপোর বানানো গল্প। কিন্তু তখন এসব শুনে কী যে রোমাঞ্চ হত! তাই বিমল স্যাঁকরার দোকানটা ছিল একটা অদ্ভুত জায়গা। কারণ সেখানে এই গল্পের সঙ্গে এসে মিশত হ্যাজাকের আলো!
আমি দেখতাম লোহার গরাদের অন্যদিকে বসে বিমল স্যাঁকরা সেই আলোয় সোনার গয়নার কাজ করে যাচ্ছে। সরু নল দিয়ে ফুঁ দিচ্ছে! ছোট্ট সন্না দিয়ে পাথর বসাচ্ছে নাকছাবিতে! সাদা ফটফটে আলোয় দেখতাম মাথা আর দাড়ির রুপোলি চুল চকচক করছে বিমল স্যাঁকরার! মনে হত লোকটা রবীন্দ্রনাথ যে নয় সেটা জানি। কিন্তু বিপ্লবী? যার দোকানে এমন একটা হ্যাজাক আছে, সে কি অন্তত একজন বিপ্লবী হবে না!
তারপর একদিন শুনলাম বিমল স্যাঁকরার দোকানে ডাকাতি হয়েছে! ডাকাতরা সিন্দুক ভেঙে অনেক কিছু নিয়ে গিয়েছে! তছনছ করে গিয়েছে দোকানটা। কিন্তু এসবের মধ্যে আমার প্রথম যে প্রশ্নটা মনে এসেছিল, তা হল, হ্যাজাকটা কি আছে? নাকি ডাকাতরা সেটাও ভেঙে দিয়ে গিয়েছে!
পরে ওই দোকানের সামনে দিয়ে যেতে গিয়ে দেখেছি বিমল স্যাঁকরা মাথা নিচু করে কাজ করে যাচ্ছে। আর সামনে জ্বলছে সাদা আলোর হ্যাজাক! আমি ভেবেছি, যাক ডাকাতরা হ্যাজাকটা অন্তত নিয়ে যায়নি! ডাকাতদের প্রতি কোথায় যেন সূক্ষ্ম একটা কৃতজ্ঞতা অনুভব করতাম আমি।
লোডশেডিংয়ের আরেকটা মজা ছিল আকাশ দেখা। আমাদের বাড়ির উঠোনে মাদুর পেতে শুয়ে আমি আর ভাই আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। অন্ধকারের মধ্যে আকাশের গ্রহ তারারা সব চকচকে রাংতার টুকরোর মতো জ্বলজ্বল করত! কালপুরুষ আগেই চিনতাম। কিন্তু তারপরে ধীরে ধীরে চিনেছিলাম মঙ্গল গ্রহ, ক্যাসিওপিয়া, লুব্ধক সহ আরও কত কী! আকাশ খুব পরিষ্কার থাকলে দেখতাম আবছা কুয়াশার ওড়নার মতো কী যেন একটা পড়ে আছে আকাশের এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত অবধি! মিষ্টিদাদু বলত, ওটা আকাশগঙ্গা! মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সি! বলত আমাদের পৃথিবী নাকি এর অংশ! এর অংশ? মানে? না, সেই বয়সে এর বেশি কিছু জানতাম না!
তবে সবচেয়ে আশ্চর্য হয়েছিলাম অন্য এক সন্ধেবেলা। ফাঁকা অরুণাচল মাঠে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে পাড়ার এক কাকু বলেছিল, “ওই দেখ, দুটো দাঁড়া। আর ওই শরীর। আর ওই দিকে লেজটা দেখ কেমন বেঁকে গিয়েছে! শুধু চোখে দেখলে হবে না। মনে মনেও দেখতে হবে। মনে মনে উজ্জ্বল তারাগুলো যোগ করতে হবে! করেছিস? দেখতে পেয়েছিস?’
আর আমি অবাক হয়ে দেখেছিলাম আমার সামনে, আকাশে যেন ফুটে উঠেছিল মহাকায় সেই বৃশ্চিক রাশি!
তারপর এল এমার্জেন্সি লাইটের সময়। আমাদের বাড়িতেও এল একটা এমার্জেন্সি লাইট! বাবা সেটা কিনে এনেছিল কলকাতা থেকে।
জিনিসটার নীচে একটা চৌকো বাক্স। তাতে বড় কালো রঙের ভারী ব্যাটারি রাখা । আর তার সঙ্গে একটা স্ট্যান্ডের সঙ্গে ফুটখানেকের টিউবলাইট লাগানো বাক্সটার ওপরে। লাইটের পাশেই লাগানো ছোট্ট ছ'ইঞ্চি ব্যাসের লাল ব্লেডের ফ্যান! ফ্যানটা ঘুরলেই একশো বোলতা ওড়ার মতো আওয়াজ হত! ব্যাটারিটার মাথায় লাগানো ছোট ছোট ক্যাপ খুলে পঙ্কা, ডিস্টিলড ওয়াটার ভরত মাঝে মাঝে। মাঝে মাঝে অ্যাসিডও দেওয়া হত সেই ব্যাটারিতে। কারেন্ট থাকলে চার্জ দিতে হত সেই ব্যাটারিতে! আর কারেন্ট অফ হলে এই এমার্জেন্সি আলো আর হাওয়া পাওয়া যেত দেড়-দু' ঘণ্টার মতো! তারপর আবার জীবন ফিরে যেত হলুদ জোনাকি-আলোর ভরসায় !
নানান দোকানে, যেগুলোয় ভাল বিক্রিবাটা হত, সেখানেও এমার্জেন্সি আলো এল। আমার কেন কে জানে ভাল লাগত না এই আলো! কেরোসিন ল্যাম্পের সেই আলো-আঁধারির যে রহস্য সেটাই যেন কেমন চলে যেত এই এমার্জেন্সি আলো জ্বললে! আর আলোটাও ঠিক জুতসই হত না। কেমন দুর্বল কালচে একটা আলো যেন! দেড়-দু' ঘণ্টা পরে কেমন যেন শুকিয়ে যাওয়া ফুলের মতো ম্রিয়মাণ হয়ে যেত! আর তারপর সেখানে আবার জ্বলে উঠত আমার প্রিয় হলুদ আলোর জোনাকি! মফস্সল যেন ফিরে পেত তার হারানো রহস্য!
হ্যাঁ, সেসময় লোডশেডিং চলত টানা চার-পাঁচ ঘণ্টা। এমনকী আঠারো থেকে চব্বিশ ঘণ্টাও লোডশেডিং চলেছে এমন দিনও মনে আছে! তবে সাধারণভাবে ওই চার-পাঁচ ঘণ্টা মানিয়ে নিতাম আমরা। আর সত্যি বলতে কী কশ্চিৎ কখনও লোডশেডিং না হলে আমার কেন কে জানে সন্ধেটা খালি খালি মনে হত! মন হত আজ কী একটা যেন হল না। কে যেন এল না আমার পাড়ায়!
এখন শহরে থাকি আমি। সেভাবে এখানে লোডশেডিং হয় না আর। এখনকার বাচ্চারা লোডশেডিংয়ে পড়াশুনো করবে এমনটা ভাবতেও পারে না। কিন্তু আমার এখনও মাঝে মাঝে সেই আলো-আঁধারির রহস্যটার জন্য মনখারাপ করে। সেই চৌকো অন্ধকার বাড়িঘরের মধ্যে বড় ভালবাসার মতো জ্বলে ওঠা হলদে আলোর জন্য মনখারাপ করে! মনে হয় বড্ড বেশি শব্দের মতো এখন যেন বড্ড বেশি আলোও চারিদিকে! ছোটবেলার অনেক কিছুই যেন হারিয়ে যায় এখনকার এই চোখধাঁধানো আলোয়! মনে পড়ে মধ্য চল্লিশ হয়ে গেল, তবু সেই হ্যাজাকটা আজও কেনা হল না! আজও একাগ্র হয়ে সমবেত জনতার সামনে জ্বালানো হল না, দেখানো হল না সেই সাদা আলোর জাদু! বুঝি, এ জীবনে আমার আর কুমার গৌরব হওয়া হল না!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন