স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
আমরা যারা আশি-নব্বই দশকে বড় হয়ে উঠেছিলাম, তাদের টিনএজ জীবনে প্রেমপত্র ছিল এক রোমাঞ্চকর জিনিস!
প্রেমের ফাঁদ পাতা যে ভুবনটি রয়েছে সেখানে মানুষজন যাতায়াত শুরু করে এই টিনএজ থেকেই। এখন যেমন সবার হাতে ফোন! সেই ফোনে হোয়্যাটস্যাপ, টেলিগ্রাম, ইন্সটাগ্রাম-সহ আরও নানান রকম যোগাযোগের অ্যাপ তখন এসব ছিল কল্পনারও বাইরে। এমনকী সায়েন্স ফিকশন গল্পেও এসব সেভাবে লেখা হত না। আমাদের সেই টিনএজ-এ প্রেম ছিল সামনা-সামনি ঘটে যাওয়া একটা ঘটনা। এখনকার মতো নানান কমিউনিকেটিং ডিভাইসের দৌলতে মেঘের আড়াল থেকে প্রেম করা তখন হত না!
আমি যে সময়ের কথা বলছি, সে সময় প্রেম করাটাই একটা সোশ্যাল ট্যাবু ছিল। আমাদের মফস্সলে তো বটেই শহরেও লোকজন তেতো ওষুধ গেলার মতো মুখ করে প্রেম বা প্রেম-বিবাহকে মেনে নিত। তবে অধিকাংশ সময়েই তারা মেনে নিত না! ছেলেমেয়েদের একা একা দেখা করার ব্যাপারটা ছিল তাদের কথায় ‘অসভ্যতা’! তাই ছেলেমেয়েরা দেখা করার যেটুকু সময় পেত তার মধ্যে তাদের ‘এই বুঝি কেউ দেখে ফেলল' ধরনের একটা ভয় কাজ করত সবসময়। ফলে সব মনের কথা সবসময় বলা হত না!
আর এখানেই আসত প্রেমপত্র!
আশির দশকে টেলিফোন ছিল অন্য গ্রহের ফুল। নব্বই আসতে আসতে তা অল্প অল্প করে ফুটে উঠতে শুরু করেছিল মধ্যবিত্তদের জীবনে! কিন্তু তার সঙ্গে আসত বিধিনিষেধ । বেশি ফোন করা যাবে না। ফোনের বিল বেশি আসবে। কোনও কোনও বাড়িতে তো টেলিফোনের ডায়াল প্যাডকে তালা দিয়েও রাখা হত!
তখন পাড়ায় পাড়ায় এসটিডি বুথ থাকত। কাচের সেই ছোট্ট ঘরে রাখা থাকত টেলিফোন। আর কাচের গায়ে হলুদ রং বা লাল রং দিয়ে লেখা থাকত পিসিও, এসটিডি এবং আইএসডি। বুথের মধ্যে একটা ডিসপ্লে থাকত লাল রঙের। ডায়াল করলে সেখানে নাম্বার উঠে যেত! বাইরের থেকে কেউ ইচ্ছে করলে দেখতে পারত কোন নাম্বারে কল করা হচ্ছে!
কিন্তু বুথে কথা বলতে ঢুকলে বেশিক্ষণ সময় পাওয়া যেত না। কারণ রসে ভঙ্গ দিতে কেউ না কেউ এসে কাচের দরজায় টোকা দিতে শুরু করত। ভাবটা এমন যে, তার কথা বলাটাই গুরুত্বপূর্ণ! বাকিদের কথা বলাটা একদম ফালতু! আর কোনও অল্পবয়েসি ছেলে বা মেয়েকে অমন কাচের ঘরে রিসিভার আড়াল করে, নিচু গলায় কথা বলতে দেখলে সবাই ধরেই নিত যে সে প্রেম করছে আর তখন তাকে আরও দ্রুত ওই ঘর থেকে বের করে দেওয়াটা ছিল বাকিদের কর্তব্য! কীসের যে লোকজনের এত অসূয়া ছিল কে জানে! আসলে একটা জিনিস দেখেছি সবার কাছেই অন্যের প্রেম হল ন্যাকামো আর নিজের প্রেম একদম জীবনমরণ সমস্যা! ডিপ্রেশন আর আনন্দের মধ্যে ঝোলানো তারের ওপর দিয়ে প্রাণ হাতে করে হাঁটা!
তাই এইসব নানাবিধ কারণে আমার বড় হয়ে ওঠার সেই আশি এবং নব্বই ছিল প্রেমপত্রের দশক। চিঠির মধ্যে ঢুকে তো কেউ আর বাগড়া দিতে পারবে না! তাড়া দিতে পারবে না! তাই এখানে নিশ্চিন্তে মনের কথা বলা যাবে।
প্রেমপত্র দেওয়ার ব্যাপারটাও ছিল মজার। খুব সাহসী কেউ হলে সোজা গিয়ে হাতে ধরিয়ে দিত চিঠি। সঙ্গে ম্রিয়মাণ গোলাপ আর দশ টাকার একটা চকোলেট! তারপর অমিতাভ বচ্চনের গলার স্বরের অক্ষম অনুকরণ করে বলত, ‘পড়ে উত্তর দিও!’
আর বাকি ভিতু লোকজন হয় চিঠি পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাউকে ধরত, নয়তো বইয়ের ভাঁজে ভরে দিয়ে দিত চিঠি! সবার তো আর কালিদাসের যক্ষের মতো মেঘকে দিয়ে বলে পাঠাবার ট্যালেন্ট ছিল না!
আর সেই চিঠি দেওয়ার সময় তাদের হাত থেকে শুরু করে বুক এমন কাঁপত যে একবার একজন আমায় বলেছিল, 'জানিস, মনে হচ্ছিল গায়ের মাথার সব লোম আর চুল পড়ে যাবে এমন সব কাঁপছিল!’
প্রেমপত্রের আরেকটা দিকও ছিল। তা হল উত্তরের অপেক্ষা। তুমি কাউকে চিঠি দিয়ে নিজের মনের কথা, ভালবাসার কথা তো জানালে। এবার সে কী উত্তর দেবে, তার অপেক্ষা করাটা এইচএস-এর রেজাল্টের অপেক্ষা করার চেয়ে কম কঠিন কিছু ছিল না।
বাটানগরে থাকার সেই ন'-দশ বছর বয়স অবধি আমার মাধ্যমেও পাড়ার কোনও কোনও দাদা বা কাকু প্রেমপত্রের ডেলিভারি করাত! কিন্তু সেখানে আমি ছিলাম দূত মাত্ৰ । অল্পবয়সজনিত পাকামোর যে একটা নিষিদ্ধ মজা ছিল সেটুকুই শুধু অনুভব করতাম। কিন্তু এর বাইরে আর কিছু ছিল না। কিন্তু নাইন-টেনে উঠতে উঠতে প্রেমপত্রের ব্যাপারে আমি প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছিলাম।
এখানে বলে রাখি, আমার দুর্ভাগ্য যে আমার জীবনে কোনওদিন কোনও প্রেমপত্র আসেনি বা আমিও কারও জন্য কোনওদিন প্রেমপত্র লিখিনি। না ভুল বললাম, এসেছিল একটা প্রেমপত্র। কিন্তু তাতে মেয়েটি জানিয়েছিল যে সে আমায় বন্ধুর মতো দেখে তাই আমার সঙ্গে প্রেম করা তার সম্ভব নয়। ফলে তাকে প্রেমপত্র না বলে রিজেকশন লেটার বলা ভাল। বা তাকে ক্ষেদ পত্র বলা যায়!
এখন আমার মরুভূমির মতো জীবনে তা হলে আমি কী করে প্রেমপত্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলাম? কারণ আমি ছিলাম নানান জনের প্রেমপত্রের লেখক! হ্যাঁ, কলমচি মাত্র! সেই বয়সে আমার হাতের লেখা মোটের ওপর ভালই ছিল। ফলে অনেককে আমায় তাদের প্রেমপত্র লিখে দিতে হত! তার পাশাপাশি যেহেতু অনেক কবিতা পড়তাম ফলে প্রেমিক সকল প্রেমের কোটেশনের জন্য আমার ওপর নির্ভর করত! কারণ ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার’ বাদ দিয়ে আর কারও স্টকে সেভাবে কোনও তথাকথিত আধুনিক কবিতার কোটেশন ছিল না। রবীন্দ্রনাথের কবিতাকে কোটেশন হিসেবে ব্যবহার করতে তখন সেই বয়সের ছেলেপিলেরা কেউ-ই বিশেষ চাইত না। কেন চাইত না? সেটা আমি জানি না ! কারণ আমি ‘মহাভারত'-টা রুলটানা পাতায় নামাতাম মাত্র। কিন্তু আসল রচয়িতা তো আমি ছিলাম না, তাই আমার কলার ধরে ঝাঁকাবার মানে নেই! আর এই প্রশ্ন তোলারও মানে নেই যে রবীন্দ্রনাথের কবিতা কি আধুনিক নয়! কারণ এখানে সেটা পয়েন্টই নয় !
যাই হোক, এই হাতের লেখা ভাল ছিল বলে আমাকে অনেকের প্রেমপত্র লিখে দিতে হত। তার মধ্যে যেমন আমার এক পিসতুতো দাদা ছিল তেমন এমনি পাড়াতুতো দাদাও ছিল। ছিল বয়সে ছোট কোনও ভাই বা বন্ধুও!
গদ্য লিখতে আমার বরাবর গায়ে জ্বর আসত। একপাতা লেখার পর মনে হত দু'দিন ঘুমিয়ে নিই! মনে হত কী হবে পাতার পর পাতা লিখে! আমি তো জীবনে এসব লিখব না! এখন মনে হয়, আমার এসব সংকল্পের সময় অলক্ষে ঈশ্বর হাসছিলেন! মানে সবার সংকল্প শোনার পরে যেমন তিনি হেসে থাকেন আর কি! আমার এখন মনে হয় ঈশ্বরের ফেভারিট পাস টাইম হল কী করে মানুষের সংকল্প বা ইচ্ছেকে ঘেঁটে দেওয়া যায়, সেই খেলাটা! আর এখানেও ঈশ্বর আছেন কি নেই সেই তর্ক তুলো না প্লিজ। কারণ সেটাও এখানে কোনও পয়েন্ট নয়!
এখন যেমন-তেমন পাতায় তো আর প্রেমের মতো একটা গুরুতর ব্যাপারকে নামানো যায় না! তাই সেই সময় নানান রকমের প্যাড পাওয়া যেত। হালকা গোলাপি, হলুদ, লাল বা নীলচে রুলটানা পাতার ওপর ফুল, হার্ট শেপ, হাতে হাত ধরে থাকা ইত্যাদি সব ছবি হালকা কালিতে ছাপা থাকত। কোনও কোনও প্যাড আবার সেন্টেড হত! পাতা নাকের কাছে ধরলে ফুলের সুন্দর গন্ধ বেরত!
যারা প্রেমপত্র লেখাতে আসত তারা সঙ্গে করে এসব তো আনতই তার সঙ্গে আনত নানান কালির পেন! বেশি বেশি আর্টিস্ট ছিল যারা, তারা আবার নিয়ে আসত স্কেচ পেনের সেট! কিছুটা লিখে তারা ফুল পাতা এঁকে দিত! আবার কিছুটা লিখে এঁকে দিত একটা ছেলে বা মেয়ে! আর সব শেষে থাকত ‘লাভ সাইন’!
এই ‘লাভ সাইন’ কথাটা খুব চলত তখন। আর একটা কথাও চলত— ‘অফার’! মানে এখন যেটাকে প্রোপোজ করা বলা হয় তখন, সেই বিশ্বায়ন-পূর্ব বাঙালিজীবনের সীমিত ইংরেজি ভোকাবুলারি এই ‘অফার’ শব্দটিকে নিয়ে এসেছিল প্রেমপ্রস্তাব বোঝাতে!
মানে কেউ কাউকে এভাবে বলল, 'জানিস সীমাকে, ওই বটতলার মোড়ে যে রোগা ছেলেটা থাকে না, সে অফার করেছে!’
আমার মনে হয় লাভ লেটারকে তাই ‘অফার লেটার’ বললেও খারাপ শোনাত না হয়তো!
আর এই ‘অফার’ করা কিন্তু সহজ ছিল না। বরং বিশাল কঠিন কাজ! একটা মেয়ের সামনে গিয়ে, তার চোখে চোখ রেখে তাকে ‘অফার’ করা পটকা-বুকের ছেলের কাজ ছিল না। সেসব করতে যথেষ্ট ‘ধক্’ লাগত!
এখানে এটাও বলে নেওয়া ভাল যে তখন নিরানব্বই শতাংশ ক্ষেত্রেই কিন্তু ছেলেদের ওপরেই দায়িত্ব বর্তাত এই ‘অফার’ করার। আমার এমন বান্ধবীরা ছিল যারা আমায় বলত তাদের অমুক অমুক ছেলেকে ভাল লাগে! কিন্তু যখন তাদের বলতাম, ‘তা হলে বল গিয়ে!’ তারা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিত, ‘আমি বলব কেন? আমি মেয়ে না?”
এখনকার সময়ে দাঁড়িয়ে এসব শুনলে হয়তো আশ্চর্য লাগবে। মনে হবে এসব আবার কী! কিন্তু তখন ব্যাপারস্যাপার এমনই ছিল।
তবে অধিকাংশ ছেলেই ছিল ভিতু। তাই তাদেরও আশ্রয় নিতে হত এই প্রেমপত্রের! আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিন্তু উত্তর আসত “না”!
আমার এক দিদি বলেছিল, ‘মেয়েটার পছন্দ থাকলেও সে না বলে জানিস! কারণ একবার বললেই হ্যাঁ করে যারা তারা ছোঁচা!’
‘তা হলে?” আমি হাঁ হয়ে যেতাম, ‘পছন্দ হলেও না বলবে! আর ছেলেটা কী করবে?' ‘কেন লেগে থাকবে পেছনে! সে যদি সত্যি ভালবাসে তা হলে সে একাগ্রভাবে লেগে থাকবে!’ দিদিটি নিশ্চিত গলায় বলেছিল!
সেই সময়টা ছিল জন্ম-জন্মান্তরের প্রেমের যুগ! সেই সময়টা ছিল টাইম টেস্টেড প্রেমিকের যুগ! প্রেম ফেরত না পেয়েও একতরফা ভাবে কাউকে ভালবেসে যাওয়াকে সেই যুগ গ্লোরিফাই করত সাংঘাতিকভাবে! এমন প্রেমিকদের লোকে গ্ল্যাডিয়েটরের মতো ভাবত! এখন যেমন একসঙ্গে এক ডজন প্রেম করার মানসিকতা চলে এসেছে তখন সেটা বিশেষ ছিল না।
আমি নিজে এমন অনেককে দেখেছি যারা বছরের পর বছর একটি মেয়েকেই ভালবেসে গিয়েছে। তার থেকে হয়তো সাড়া পায়নি, তবু সেই পথ থেকে তারা সরে আসেনি!
আর এই সব জায়গায় কাজে দিত প্রেমপত্র! যার ডিকটেশন নেওয়ার মোটামুটি নামকরা একজন ছেলে ছিলাম আমি!
এক দাদা ছিল সে যে দিদিটিকে ভালবাসত তাকে সেই ক্লাস নাইন থেকেই সে লক্ষ করত। এখন এসবকে স্টকিং বললেও তখন প্রেমের ক্ষেত্রে একে বলা হত ডেডিকেশন! তো সেই দাদাটি আমাকে দিয়ে অনেক প্রেমপত্র লেখাত। আর অবধারিতভাবে লেখার শেষে সে কান্নাকাটি করত! আমি কী করব বুঝতে না পেরে চুপচাপ বসে থাকতাম! দাদাটি তারপর একটা অভিনব জিনিস করত। চোখের জল বুড়ো আঙুলে নিয়ে টিপ ছাপের মতো লাগাত সেই চিঠিতে। তারপর পেন দিয়ে সেই জলে যেটুকু কাগজ ভিজে যেত সেটা আউট লাইন করে দিত!
আমি হাঁ হয়ে তাকিয়ে তার কাণ্ডকারখানা দেখতাম। এ করছেটা কী?
প্রথমে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এটা কী হল?’
দাদাটি ধরা গলায় বলেছিল, 'লোকে রক্ত দিয়ে চিঠি লেখে, আমি চোখের জলে লিখব!’
আমি ভাবতাম এ কোথা থেকে এসেছে! এমন কেউ করে নাকি! আমার বেদম হাসি পেত। কিন্তু কেউ কাঁদলে কি তার সামনে হাসা যায়!
এই রক্ত দিয়ে চিঠি লেখারও একটা ব্যাপার ছিল। একটা ছেলে ছিল। নাম ধরে নেওয়া যাক কৌশিক (আসল নাম না বলাই ভাল)। সে তার প্রেমপত্রের শেষে রক্তের ফোঁটা দিত। মানে আমি লিখে দিতাম। তারপর সে ব্লেড দিয়ে একটা আঙুল একটু চিরে রক্তের ফোঁটা ফেলত পাতায়। দেখেই আমার কেমন যেন অস্বস্তি হত। আমি ওকে বারণ করতাম এমন করতে। তাই দু'-তিনবারের পরে আমার সামনে আর এমনটা করত না!
একবার কৌশিক এসে বলল, ‘দূর আর পোষাচ্ছে না! মেয়েটা এত খেলাচ্ছে মাইরি! আর ব্লাড লস করে লাভ নেই! এবার থেকে মায়ের আলতা লাগিয়ে দেব!’
আমি অবাক হয়েছিলাম, ‘ওসব লাগাতেই বা হবে কেন?”
“আঃ! নিজে তো এসব করলি না তাই বুঝিস না! ধারাবাহিকতা বলেও একটা ব্যাপার আছে। সেটা না থাকলে হবে না!’ কৌশিক আমায় জ্ঞান শুনিয়ে মিটিমিটি হেসেছিল, 'আমি কী করছি সেটা ইমপর্ট্যান্ট নয়। মেয়েটার কাছে কী ইম্প্রেশন যাচ্ছে সেটা ইমপর্ট্যান্ট। বুঝলি?'
তবে অন্যরকম প্রেমপত্রও আমায় লিখতে হত। যেমন আমার পিসতুতো দাদার প্রেমপত্র!
দাদাটিও প্যাড নিয়ে আসত। তারপর ছোটপিসির বাড়ির বারান্দায় বসিয়ে আমায় ডিকটেশন দিত। এখনও কিছু কিছু মনে আছে! ‘লেখ।’
দাদা বলত,
আমি লিখতাম।
দাদা শুরু করত, ‘রাখী, তুমি বনজ্যোৎস্নার মাদকতা। তুমি নির্মেঘ রাতের ধূমকেতু। গঙ্গার থেকে তুলে আনা ভোলা জেলের রুপোলি মাছ! আমি তোমার জন্য সব করতে পারি! প্লিজ একবার তোমাদের বাড়ির রেশন তুলে দিতে দিও! আর ওই যে ছেলেটা তোমাদের বাড়ির উল্টোদিকের গমকলে দাঁড়িয়ে তোমার জানলার দিকে তাকিয়ে বিড়ি খায়, তাকে বোলো আমি তার হাতের পাঞ্জা কেটে নেব!’
এখানে আমি দাঁড়িয়ে পড়তাম। পাঞ্জা কেটে নেবে! এ তো থ্রেট! আমার হাতের লেখায় থ্রেট! আমি ভয় পেয়ে বলতাম, “একদম বনজ্যোৎস্না থেকে পাঞ্জা কেটে নেবে-তে নেমে এলে! আমি আর লিখব না!
—‘আরে লেখ!” দাদা আমার মাথায় চাটি মারত।
আমি অবাক হয়ে দাদার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। আর ভাবতাম এমন প্রেমপত্র পেলে মেয়েটি কী করবে? কাঁদবে না হাসবে!
আরেকজন আসত। সে একটু বয়সে বড়। লোকাল কবি। পাড়ার সুভ্যেনিয়ারে তার সব লেখা বেরত। সঙ্গে নিজের খরচেও সে দুটো বই বের করেছিল। কিন্তু তার হাতের লেখা ছিল একেবারেই দুর্বোধ্য! নিজের কোনও লেখা এক সপ্তাহ পরে পড়তে গেলে সে নিজেই ঘেমে-নেয়ে একসা হয়ে যেত! তাই প্রেমপত্রের ব্যাপারে সে আসত আমার কাছে।
আমার এক দাদার বন্ধু ছিল সে। নাম তপন (এটাও আসল নাম নয় কিন্তু)। তপনদা ছিল খুব ভদ্র আর শান্ত মানুষ। সামান্য লাজুকও। তপনদা যাকে ভালবাসত সেই দিদিটির স্বামী বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যেই মারা যায়। তারপর থেকে দিদিটি বাপের বাড়িতেই থাকত। আর একটু দূরের মফস্সলে, মেয়েদের একটা হাই স্কুলে ভূগোল পড়াত! খুব রাগী আর গম্ভীর ছিল দিদি।
ওই বাড়িতেই একটা বাচ্চাকে পড়াতে গিয়ে তপনদা সেই দিদির প্রেমে পড়েছিল। কিন্তু এত সাংঘাতিক রাগী দিদিটিকে সরাসরি কিছু বলতে পারত না। তাই আমার কাছ থেকে ছোট ছোট ‘পিস' লিখিয়ে নিয়ে যেত। এখনও আমার পুরনো ডায়রির ভাঁজে অমন দু'-একটা চিঠির খসড়া পড়ে আছে। কারণ তপনদা একবারে চিঠি লিখত না। কয়েকটা খসড়া বানিয়ে তারপর ফাইনাল করত।
এরও একটা নমুনা দিই।
‘পাড়ার কুকুরগুলো ডাকছে। রিকশাচালক নিতাইদার আজ মন ভাল নেই! এই সব মনখারাপের বিপ্রতীপে মেঘ ঘন হয়ে আসে বিপ্লবের মতো! চালের দাম বাড়ছে হু হু করে যেন পোয়াতি বিড়ালের বয়স! আমাদের সমস্ত আশা এখন বিনোদ কাম্বলির ওপর। ভরসা করে কেউ আর ছাতা নিতে পারছে না জ্যোৎস্নার দিনে! যে কোনও সময় কার্ফু লেগে যাবে! ট্রেনে ট্রেনে বিক্রি হবে গোলাপের গন্ধ! বাড়ির পাশের ছোট্ট শহিদ বেদিতে তাও অজানা ফুল ফুটে উঠবে বিকেলে। একটা প্রজাপতিকে ঘিরে নাচবে আরেকটা প্রজাপতি!’
আমার কাছে যে দু’-একটা খসড়া পড়ে আছে, তার একটা থেকে হুবহু তুলে দিলাম! 'এটা কি প্রেমপত্র!’ আমি প্রথমদিন এমন একটা লিখে হাঁ করে তাকিয়েছিলাম তপনদার দিকে।
তপনদা লাজুক স্বরে বলেছিল, 'হ্যাঁ। আসলে আমি যে কবি সেটা ও পাত্তা দেয় না! তাই একটা সাঁটে লিখলাম!’
‘কিন্তু এর মানে কী?’ সেই এগারো ক্লাসে পড়া আমি হাঁ করে জিজ্ঞেস করেছিলাম। “আঃ! বড় হলে বুঝবি!’ তপনদা ভুরু কোঁচকাত সামান্য।
আমি ভাবতাম এতে হয়তো তপনদার কাব্যপ্রতিভার বিশাল বিজ্ঞাপন হল, কিন্তু লোকটা বলতে কী চায় সেটাই যদি দিদি বুঝতে না পারে, তা হলে ব্যাপারটা এগোবে কী করে? আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এখানে প্রেমের কথা কই?'
‘আরে!’ তপনদা অবাক হয়ে তাকাত, ‘ওই যে শহিদ বেদিতে অজানা ফুল! এর মানে আমার মনে ওর প্রেম! আর ওই প্রজাপতি হলাম আমরা। আমি ওকে ঘিরে পাক মারছি! এর চেয়ে স্পষ্ট করে আর কী লিখব?'
সত্যি তো! এর চেয়ে আর স্পষ্ট কী হতে পারে! পাক মারত তপনদা আর তার প্রভাবে এসব লিখতে গিয়ে মাথা ঘুরত আমার! তাও 'না' বলতে না-পারার দোষে দুষ্ট আমি এমন বেশ কিছু ‘প্রেমপত্র’ লিখে দিয়েছিলাম তপনদাকে।
তারপর একদিন সেই দিদিটি আমাকে আর মাকে ধরল নঙ্গী স্টেশনে। সেদিন আমি আর মা কলকাতার থেকে ছোটপিসির বাড়ি এসেছিলাম বাটায়।
দিদিটি সরাসরি বলেছিল, ‘হাতের লেখা তোর ভালই। তবে বানান ভুল করিস মাঝে মাঝে। আর ক'দিন মর্কটটা আর কিছু দিচ্ছে না কেন রে? ওই পাতার পেছনে বেশ মুদির হিসেব করতাম আমি!’
‘মানে?' মা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল দিদির দিকে।
দিদি হেসে সবটা বলে মাকে শেষে টিপ্পনী যোগ করেছিল, ‘এমন রেটে চললে রাজা তো গদ্যকার হয়ে উঠবে বউদি!”
ব্যাস। তারপর মায়ের বকুনি শুরু! নিজেকে কী মনে করি আমি? এটা কোন ধরনের জনসেবা? আর ফারদার এমন করলে সোজা বাবাকে বলে দেবে! বাবা! আমার বাবা রেগে গেলে ওরেব্বাবা হয়ে যায়! ফলে তখনকার মতো আমারও প্রেমপত্রের রাইটারগিরির অবসান হয়েছিল!
প্রেমপত্রের আরেকটা দিক ছিল ধরা পড়া। অনেক মেয়ের মা-ই ছিল 'মিসেস' মার্পল! মেয়ে আচমকা বেশি সময় আয়নার সামনে কাটাচ্ছে! পড়তে বসে জানলার বাইরের তেঁতুলগাছের দিকে তাকিয়ে একা একা হাসছে! পড়ার টেবিলে প্রেমের উপন্যাসের বাড়বাড়ন্ত হচ্ছে দেখলেই সেইসব মিসেস মার্পলরা তৎপর হয়ে উঠত। তারপর চলত রেড! খাতা, বই, স্কুলের ব্যাগ, জ্যামিতি বক্সের মধ্যে পেতে রাখা কাগজের তলা, সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখত তারা। তারপর যদি কোনও চিঠি ধরা পড়ল তা হলে তো আর কথাই নেই! বাড়িতে কুরুক্ষেত্র!
আরও রিসোর্সফুল ও সাহসী কাকিমারা সেই ছেলেটিকেও ডেকে আনত। তারপর হাতের লেখা মিলিয়ে দেখা হত এ-ই ‘কালপ্রিট' কিনা! (আমার লিখে দেওয়া চিঠি নিয়ে এমন কেলেঙ্কারি হয়নি যদিও।)
আর ছেলেটি ধরা পড়লে ব্যাপারটা গড়াত তার বাবা-মায়ের কান অবধি! এতে ছেলেটির প্রাপ্তি ছিল মার! লোকলজ্জা!
তাও এসবের পরেও কেউ কেউ আবারও প্রেমপত্র লিখত! আবারও সহ্য করে নিত সমস্ত হেনস্থা! বলত, ‘ভালবাসলে তো এসব হবেই! তা বলে কি পিছিয়ে যাব! লাভ লেটার লিখব না!’
লাভ লেটার বা প্রেমপত্র কি এখনও লেখা হয়? সেই সুগন্ধী প্যাডের কাগজ! নানানরকম কালির পেন! স্কেচ পেনের সেট! সেই কাঁপা গলা! চোখের জল! হাসি! মনখারাপ! বা উত্তর পাওয়ার অপেক্ষা! এখনও হয়?

কে জানে এসব হয়তো এখন আর হয় না! মানে আমার আশপাশে তো আর সেভাবে দেখতে পাই না। সবার এখন বড্ড তাড়া। ‘অফার’ করেই সঙ্গে সঙ্গে উত্তর পাওয়ার ব্যাকুলতা! সারাক্ষণ টেক্সট করে যাওয়া! সারাক্ষণ যোগাযোগ রাখার চেষ্টা! এসব করে প্রেম এখন এমন একটা জায়গায় চলে গিয়েছে যে সম্পর্ক হতে যেমন সময় লাগে না, তেমন ভাঙতেও সময় লাগে না।
প্রেমপত্র এখন মিউজিয়ামে রাখার বস্তু হয়ে উঠেছে! তাও আজ এইসব কথা লিখতে বসে পুরনো অনেক কিছু মনে পড়ে গেল। মজা লাগলেও ফিনফিনে একটা মনখারাপও জড়িয়ে গেল যেন! কারণ সেই প্রত্যাখ্যাত ভিতু প্রেমিকদের মুখ মনে পড়ে গেল যে!
আফসোস একটাই এখনকার ছেলেমেয়েরা সেভাবে লাভ লেটার ও তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা টানাপোড়েনের অভিজ্ঞতাটা বুঝলই না! জানলই না প্রেমের একটা দিকের স্বাদ তারা আর কোনওদিন পাবে না।
আমরা যারা আশি-নব্বইতে বড় হয়ে উঠেছি তারাই লাস্ট জেনারেশন অব লাভ লেটার রাইটার্স! তারাই জানি ক্লাস ইলেভেনের সিলেবাসে পড়া এ জি গার্ডিনারের লেখা সেই ‘অন লেটার রাইটিং' প্রবন্ধে কেন যখন কিছু আর লেখার থাকে না তখন প্রেমিকটি সারা চিঠি জুড়ে শুধু ‘ক্রস' লিখে রাখে! জানি সেই ‘ক্রস' মানে আর কিছু নয়, কেবল চুম্বন!
ভাবলে খারাপ লাগে প্রেমপত্রে পাঠানো সেই চুম্বনের দিন শেষ হয়ে গিয়েছে! সেই সরল আনন্দের দিন শেষ হয়ে গিয়েছে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন