স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
দুর্গাপুজো এলেই আমার কেমন যেন একটা অস্বস্তি হত।
আমাদের মফস্সলে দূষণহীন নীল আকাশে মেঘের তুলো উড়ত খুব। কাছের যে গঙ্গার বাঁক যা খিদিরপুরের দিক থেকে এসে বেঁকে গিয়েছে বজবজের দিকে, সেই বাঁকটার পাশের পাড়ে, অনেকখানি জায়গা জুড়ে ফুটে থাকত কাশফুল! বর্ষা শেষের হাওয়ায় ফুলে উঠত মাঝগঙ্গার নৌকার পাল। গঙ্গার বাঁধের ওপরদিকে দেখতাম ঢাকিরা আসছে বড় বড় ঢাক নিয়ে। প্যান্ডেল তৈরি শেষ। বাটা কোয়ার্টারের বড় বড় মাঠে মেলা বসছে। তিনখুঁটি কি পাঁচখুঁটির সার্কাস বসছে। টয়ট্রেনের লাইন পাতা হচ্ছে। পুতুলনাচের তাঁবু টাঙানো হচ্ছে। মরণকূপ তৈরির কাঠের পাটাতন গাঁথা হচ্ছে মাটিতে। আস্তে আস্তে ফাঁকা মাঠ চলে যাচ্ছে নানান দোকান, পশরা আর তাঁবুর দখলে!
স্কুলেও কেমন যেন ছুটির হাওয়া! আমাদের স্কুলটা ছিল গঙ্গার পাশে। সেখানে ছিল দেবদারু বীথি! টগরগাছের সারি! ছিল বোগেনভেলিয়ার ঝোপ! কলকে ফুলের গাছ! দেখতাম সব গাছে কী সুন্দর ফুল ফুটে উঠেছে! গোলাপি বোগেনভেলিয়ার ফুলের পাশে ঝরে পড়ছে কাঁচা সোনার মতো টোপর টোপর কলকে ফুল!
চারিদিকেই পৃথিবী কেমন যেন পালটে যাচ্ছে! বর্ষার মেঘলা মুখে যেন আলো এসে পড়ছে! সবাই হাসিখুশি হয়ে উঠছে কোনও কারণ ছাড়াই! মনে হত মানুষও যেন ফুলের মতো ফুটে ওঠে পুজো এলেই! কিন্তু তাও আমার মনের মধ্যে খুব কিছু স্বস্তি থাকত না! কীসের যেন একটা অস্বস্তি হত! যেন খুব ছোট্ট একটা ধুলোকণা পড়ে আছে চোখের কোণায়! কিন্তু কিছুতেই বেরচ্ছে না!

বাটানগরে দুর্গাপুজো ছিল একটা দেখার মতো ব্যাপার! এমন পুজো আমি আর কোনওদিন কোথাও দেখিনি! বড় বড় দুটো পুজোর পাশাপাশি প্রায় পনেরোটা মতো ছোট পুজো হত!
পুজোর ঝাপটা এসে লাগত মহালয়া থেকেই। মিষ্টিদাদুর যে ফিলিপসের রেডিয়োটা ছিল, তাতে ভোর ভোর চালিয়ে দেওয়া হত মহালয়া। আমাকেও ডেকে দেওয়া হত। কিন্তু আমার ঘুমে জড়িয়ে থাকত চোখ। অনেক রাত করে শুতে যাওয়ার ফলে ঘুম ভাঙতই না সহজে! ছোট বয়সে আমার ঘুম ছিল সমুদ্রের তলদেশের ভারী পাথরের মতো! আর সত্যি বলতে কী মহালয়া শুনতে ইচ্ছেও করত না আমার। যে দু'-একবার আমাকে টেনে তুলে দেওয়া হয়েছিল তাতে আমি দেখেছিলাম যে মহালয়া শুরু হওয়ার প্রথম পাঁচ মিনিট পরে যে-যার কাজে ব্যস্ত হয়ে গিয়েছে! মা চা বানাচ্ছে। মিষ্টিদাদু ঠাকুর প্রণাম করছে। ভাইপো স্নানের তোড়জোর করছে ফ্যাক্টরি যাবে বলে। দোতলার শঙ্করদা পাশের সাহাবাড়ির পুলিশকাকুর সঙ্গে গল্প জুড়ে দিয়েছে! ন’কাকা উঠে ফ্রি হ্যান্ড শুরু করেছে! পাশের বাড়িতে সনুর মা উনোন ধরিয়েছে! বাটায় চাকরি করে যে প্রদীপকাকু সে বেশ জোরের সঙ্গেই হিন্দি ছবির গান গাইতে শুরু করেছে আর সবার বাড়িতে বেচারা রেডিয়োরা একা একা মহালয়া বাজিয়ে চলেছে!
পুজোর শুরুর দিনটায়, মানে ষষ্ঠীর দিন ভোরে উঠতে অবশ্য আমার আপত্তি ছিল না। সেদিন ভাইপোর সঙ্গে আমি যেতাম গঙ্গার পাড়ে।
মহালয়ায় যেমন পিতৃ-তর্পণ হত গঙ্গায় তেমন ষষ্ঠীর দিনেও গঙ্গায় ভিড় হত স্নান করার। ভাইপো খুব ভাল সাঁতার কাটত। আমি ভাইপোর জামাকাপড় নিয়ে পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। আর ভাইপো অনেক পরিচিত মানুষদের সঙ্গে গিয়ে উঠত একটা ভটভটি নৌকায়! তারপর নৌকাটা মাঝগঙ্গায় গেলে সবাই একসঙ্গে ঝাঁপ দিয়ে পড়ত জলে। সেখান থেকে তারা রেস লাগাত কে আগে পাড়ে এসে পৌঁছবে! সেই নিয়ে গঙ্গার পাড়ে বেশ একটা মজা আর উত্তেজনা হত!
এ ছাড়াও ছিল একজন মানুষ। নাম আর মনে নেই। সে অদ্ভুত কায়দায় জলের মধ্যে ভাসমান অবস্থায় ব্যায়াম করত! পাড়ের সবাই থ হয়ে তাকে দেখত! আমিও অবাক হয়ে যেতাম। আমারও বাড়িতে ব্যায়ামের স্যর আসতেন। তিনি দারুণ ব্যায়াম পারতেন। কিন্তু তিনিও এমন জলের মধ্যে ভাসমান অবস্থায় ব্যায়াম করতে পারতেন না!
বিশাল বাঁধানো চাতালে দুটো বড় পুজো হত। একটা নিউল্যান্ডের পুজো। আর অন্যটা বাটার পুজো। এই দ্বিতীয় পুজোটা হত বাটা কোম্পানি ছাড়িয়ে গঙ্গার প্রবেশপথের কাছে। এই দুটো পুজোর জন্য ইট দিয়ে বাঁধানো বড় চাতাল ছিল। যেন সেভেন-আ-সাইড ফুটবল খেলার মাঠ। আর সেই চাতাল জুড়ে হত প্যান্ডেল! না, এখনকার মতো কোনও থিম-টিম ছিল না। সেই প্যান্ডেল ছিল একদম ঢালাও। অনেকটা চারচালা ধাঁচের। সারা চাতাল জুড়েই অনেক খুটির সাপোর্ট থাকত। প্যান্ডেলের একদিকে থাকত মঞ্চ। তাতে প্রতিমা রাখা হত। আর প্যান্ডেলের মাঝ বরাবর বানানো হত একটা বড় স্টেজ। কাঠের সেই স্টেজে ওঠার জন্য থাকত একটা কাঠের স্লোপ। র্যাম্প! বেশ বড় হত এই স্টেজটা। আর এখানেই পুজোর চার রাতে হত চারটে যাত্রাপালা!
আমি যে সময়টার কথা বলছি সেই আশির দশকের প্রথম থেকে শেষের দিক অবধি দুর্গাপুজোয় যাত্রা দেখাটা বহু মানুষের কাছে একটা ব্যাপার ছিল। আমরা পুজোর সন্ধেবেলা ওই প্যান্ডেলে গিয়ে দেখতাম যে কত্ত লোক ব্যাগ আর চাটাই নিয়ে এসে তখন থেকেই বসে পড়েছে রাত বারোটায় যাত্রা দেখবে বলে!
আমিও এমন এক পুজোয় যাত্রা দেখেছিলাম। তখন আমি ক্লাস ওয়ানে পড়ি। সেজকাকা মানে সেই ভাইপো, আর কাকুমা মানে সেজকাকিমার সঙ্গে আমি গিয়েছিলাম যাত্রা দেখতে। ছোট থেকেই যেহেতু রাত জাগার অভ্যেস আছে, তাই রাত তিনটে অবধি জেগে বসে থাকতে আমার কোনও অসুবিধে হয়নি।
এখনও মনে আছে যাত্রাপালাটির নাম ছিল 'গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম’। গোটা যাত্রাপালাটির কথা আর মনে নেই আমার। শুধু মাঝে মাঝের কিছু দৃশ্য এখন মনে আছে! মনে আছে দেবব্রত আর রাজা শান্তনুর মধ্যে একটা প্রায় যুদ্ধের উপক্রম হতে যাওয়ার সময় দু'জনের মধ্যে দিয়ে একজন মহিলা কেমন যেন নাচতে নাচতে চলে গিয়েছিল। আর তার গায়ে ফেলা হয়েছিল নীল রঙের আলো!
ভাইপো আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলেছিল, ‘এ হল গঙ্গা! দেবব্রতর মা আর শান্তনুর স্ত্রী! গঙ্গা এসে দু'জনের মধ্যেকার যুদ্ধ থামিয়ে দিল!’
ক্লাস ওয়ানের আমি ব্যাপারটা দেখে বেশ অবাক হয়েছিলাম। আর বিরক্ত হয়েছিলাম দেখে যে মাঝে মাঝেই একটা লোক স্টেজে এসে গলা কাঁপিয়ে গান গাইতে শুরু করছে! গল্প থামিয়ে এটা কে বারবার এসে এমন গান গাইছে? কোনও কমন সেন্স নেই!
ভাইপো বলেছিল, ‘এ হল বিবেক!’
বিবেক! সে তো আমার স্কুলের বন্ধু। বিবেক ঘোষ! বিপুলদার ভাই। সারেঙ বাড়িতে থাকে!
ভাইপো হেসে বলেছিল, ‘এ অন্য বিবেক। মনের মধ্যেকার ঠিক আর ভুল বলে দেয় যে, সে! বড় হ তারপর বুঝবি!’
বড় হওয়ার পর বোঝার মতো কতকিছু যে জমে থাকে জীবনে!
সত্যি বলতে কী আমার খুব বিরক্ত লাগছিল। ঝনঝন করে বেজে ওঠা বাজনা। অট্টহাসি। ঝলমলে পোশাক! নকল যুদ্ধ! আর মধ্যে মধ্যে কান্না কান্না গলায় গান! আমার একটুও ভাল লাগছিল না। আমি মাথা ঘুরিয়ে দেখছিলাম একটু দূরে মঞ্চের ওপর অধিষ্ঠিত দেবীপ্রতিমাকে। দেখছিলাম চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা মানুষদের। মনে হচ্ছিল, এই দেখতেই এত লোক এত উৎসাহ নিয়ে বসে থাকে! আসলে তখন তো আর ফোক আর্ট ব্যাপারটা জানতাম না!
যাই হোক, সেই একবারই যাত্রা দেখেছিলাম। তারপর আর কোনওদিন দেখা হয়ে ওঠেনি।
পুজোর আরেকটা দিক ছিল সার্কাস। বাটা ব্রিজের পাশের বড় মাঠে পড়ত সার্কাসের তাঁবু। সেখানে এসে যখন সার্কাসের লরি দাঁড়াত সারা বাটানগর যাকে বলে ‘চনমন’ করে উঠত!
পুজো আসার আগে থেকেই আমাদের কৌতূহল হত জানার যে এবার কত খুঁটির সার্কাস আসছে! মানে যত বেশি খুঁটি, তত বড় সার্কাস! ওই লরি আসার সময় অনেকে দাঁড়িয়ে দেখত ক'টা বড় খুঁটি নামছে! আর সেই খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ত চারিদিকে।
সন্ধেবেলা সার্কাসের থেকে বড় বড় দুটো সার্চলাইট মারা হত! আকাশের দিকে উঠে
যেত সেই বিশালাকার আলোর লাঠি! আর সমগ্র নঙ্গী ও বাটানগর থেকে দেখা যেত সেই আলো! অনেক ছোটবেলায় মনে আছে বাড়িওয়ালা জেঠুর ছেলে শঙ্করদা আমায় বলত, 'জানিস রাজা ওই আলো দুটো চাঁদ অবধি পৌঁছে যায়!”
আমি হাঁ করে শঙ্করদার কথা শুনতাম। শঙ্করদা যখন বলছে তখন হবেও-বা সেটা।
সার্কাসের আরেকটা ব্যাপার ছিল। আর সেটা হত সকালবেলা। দশমীর পরে আমরা
ভাইবোনেরা বাটা ব্রিজের পাশের ওই মাঠে যেতাম মিষ্টিদাদুর সঙ্গে। দেখতাম সার্কাসের হাতিদের নিয়ে মাহুত বেরিয়েছে। ব্রিজ দিয়ে ওঠা-নামা করছে হাতিরা। মাহুতের নির্দেশে তারা আমাদের দেখে শুঁড় কপালে ঠেকিয়ে আওয়াজ করত! নতুন শেখা বাংলা জ্ঞান দেখিয়ে আমি আমার ছোটভাইকে বলতাম, ‘একে বলে বৃংহণ!
আর দেখতাম সিংহ! না তারা কেউই হৃষ্টপুষ্ট ছিল না। বরং কেমন যেন দুঃখী। মনমরা। খাঁচার মধ্যে পাশ ফিরে শুয়ে থাকত। আমরা কাছাকাছি গেলে একবার অবহেলার সঙ্গে ফিরে তাকাত। তারপর আবার মুখ ঘুরিয়ে নিত! আমার কষ্ট হত ওদের দেখে! সার্কাসে রিং মাস্টারের চাবুক খেয়ে কতকিছুই না করতে হত ওদের। কিন্তু সেসব করতে কি আর ওদের ইচ্ছে করত! মানুষ নিজের স্বার্থে কতভাবে যে জীবজগৎকে এক্সপ্লয়েট করে তার ঠিক নেই! এখন যে সার্কাসে পশুপাখিদের খেলা দেখানো বন্ধ হয়ে গিয়েছে সেটা খুব ভাল হয়েছে!
সার্কাসে আমার আগ্রহ ছিল ট্র্যাপিজের খেলা দেখার। ওই শুন্যের মধ্যে দোল খেয়ে একটা বার থেকে লাফিয়ে আরেকটা বারে চলে যাচ্ছে লোকজন! আর সেই ভেসে যাওয়ার মাঝে ডিগবাজি খাচ্ছে শূন্যে! তাদের মধ্যে আবার জোকাররা ঢুকে পড়ত। তারাও ওভাবে লাফাত! আর মাঝে মাঝেই ইচ্ছে করে পড়ে যেত নীচে! না কিছু হত না! নীচে টাঙানো থাকত মোটা নেট! সেই নেটে পড়েও জোকাররা ডিগবাজি খেত! নানান অঙ্গভঙ্গি করত! ওরা যখন ওপর থেকে নীচে পড়ত আমার পেটের মধ্যেটা কেমন যেন করত! মনে হত কয়েকশো মার্বেল গুলি কে যেন গড়িয়ে দিয়েছে পেটের ঢালুতে!
আরও একটা খেলা ছিল যেটা দেখার সময় আমি দু'হাতের পাতা দিয়ে চোখ বন্ধ করে নিতাম। সেটা ছিল ত্রিফলা বা পঞ্চফলা বর্শা ওপরের দিকে ছুড়ে তার তলায় বুক পেতে শুয়ে পড়ার খেলা! আর সেই হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পরার কায়দাটা এমন হত যে বর্শার ফলাগুলো শরীরে না লেগে যেন হাত-পায়ের মাঝে মাটিতে পড়ে, আর যে খেলা দেখাচ্ছে সে অক্ষত থাকে!
এই খেলাটা দেখাবার সময় যখন ফলাগুলো ওপরের দিকে ছুড়ে দেওয়া হত তখন দুম্ করে একটা ছোট্ট পটকা ফাটত। আর আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করে নিতাম! কারণ আমার কেবলই মনে হত যে ফলাগুলো, যে মানুষটি খেলা দেখাচ্ছে, তার শরীরে গেঁথে যাবে! তাও কীসের যে অমোঘ টানে আমি সার্কাস দেখতে যেতাম কে জানে! এখন মনে হয় ভয় আর কষ্টেরও একটা নিজস্ব মোহ, একটা টান থাকে! যা নিজেদের অলক্ষেই আমাদের ওপর কাজ করে!
পুজোর সকালে আমরা চার ভাইবোন ঘুরতে বেরতাম আমার বাবার সঙ্গে। নিউল্যান্ড পুজো প্যান্ডেলে ঠাকুর দেখার পরে আমরা কাঠের নাগরদোলনা চড়তাম। সেই যে হাত দিয়ে টেনে টেনে যেগুলো নামানো হয়! তারপর চড়তাম মেরি-গো-রাউন্ড-এ! সঙ্গে ছিল আইসক্রিম আর আচার খাওয়া। মনে আছে নিউল্যান্ডের ওই প্যান্ডেলের সামনে বসত লক্ষ্মীদা। তার ঝাঁকা ভর্তি থাকত নানান কাচের বয়াম। আর তাতে অমৃতের মতো খেতে সব আচার! আমার ঝোঁক ছিল, কুল, চালতা আর কয়েতবেলের দিকে। লক্ষ্মীদা যেমন আচার বানাত তেমন আর কোথাও পেলাম না!
আর ছিল বটতলায় তপনের পান! বটতলা মানে বিশাল বড় একটা বটগাছের ছায়া! গাছের গোড়াটা লাল সিমেন্টে বাঁধানো ছিল। আর সেই ছায়ায় ছিল দুটো দোকান। তার একটা তপনের। নীল দোকানে লাল রং দিয়ে লেখা থাকত ‘তপনের পান’। বাবা সেই দোকান থেকে সিগারেট কিনত আর আমাদের কিনে দিত পান!
ছোট বয়সে বছরে অমন দু'-একটা দিন পান খাওয়ার খুব ঘটা থাকত আমাদের। মিঠা পাতা, চুন, খয়ের, চমনবাহার আর লাল-হলুদ-সবুজ কুচোনো মশলা। সঙ্গে কেমন সোনালি রঙের জেলি!
পান খাওয়ার পরে আমরা জিভ বার করে এ ওকে দেখাতাম। কার জিভ বেশি লাল হয়েছে সেটা নিয়ে একটা মজার খুনসুটি চলত!
সন্ধেবেলা আমরা ওই চারজনই ঘুরতে বেরতাম ভাইপোর সঙ্গে। তখন চলত গোটা নঙ্গী আর বাটানগর ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখা। এই সময় রাস্তায় ভিড় হত খুব। মানে অষ্টমী আর নবমীর দিনে হাঁটাই দুষ্কর হয়ে উঠত। তাও আমরা বেরতাম। আমার এই ভিড়টা অসহ্য লাগত। তাও ভাইবোনেদের পাল্লায় পড়ে বেরতাম আর কি! ভাইপোকে দেখে অনেকেই বলত, ‘স্বপনদা, ব্যাটেলিয়ন নিয়ে বেরিয়েছ!”
ঘোরার শেষে হত খাওয়াদাওয়া। কোনওদিন রোল। কোনওদিন সার্ভিস মার্কেটের মোগলাই পরোটা। কোনওদিন আবার রাস্তার পাশে অমলেট আর হাফ পাউরুটি! সঙ্গে প্রায় রোজই ঘুগনি আর ফুচকা থাকত।
এখানে বলে রাখা ভাল যে এমন ছোটখাটো খাবার দোকান বাটানগরের পুজোর অঙ্গ ছিল। আর সেখানে নানান কায়দায় হেঁকে ডেকে কাস্টমার ধরা হত।
আমার কাকারা যখন এমন দোকান দিত আমি শুনেছি তারা চোঙা মুখে চিৎকার করত, ‘আসুন আসুন শিক্ষিত পাঁঠার মাংস খেয়ে যান!”
একজন কাকু যে টোস্ট-অমলেট বিক্রি করত সে চেঁচাত, ‘এ ডিম বাইরে ফোটে না জিভে ফাটে! বিস্ফোরক মামলেট-টা খাবেন!’
এক বয়স্ক জেঠু মোগলাই পরোটার স্টল থেকে বলত, ‘আকবার বাদশার খাস পরোটা খেয়ে যান! পাঁচ হাজার বছরের পুরনো পরোটা এনেছি আপনাদের জন্য!’
তখন ক্লাস থ্রি-ফোরে পড়লেও মোগলরা যে পাঁচ হাজার বছর আগে ছিল না, সে আমি জানতাম! আর অবাক হয়ে সেই জেঠুকে দেখে ভাবতাম যে কনফিডেন্টলি এভাবে ভুলভাল বলা যায় !
শঙ্করদা হাসতে হাসতে বলত, ‘পাঁচ হাজার বছরের পুরনো পরোটা খাস না, রাজা! কোথা থেকে কী হয়ে যাবে!”
এসবের বাইরে ছিল নানান ধরনের তাঁবুতে ঘুরে বেড়ানোর মজা। কোথাও পুতুলনাচ হচ্ছে। কোথাও আঁকা-বাঁকা আয়নার 'হাসির ঘর’! কোথাও চিড়িয়াখানা। কোথাও আবার মাকড়শা মেয়ে। দুই মাথাওলা মানুষ! ইত্যাদি। এই শেষেরটাতে আমি কোনওদিন ঢুকিনি! আমার কেমন যেন ভয় করত!
বাটানগরের এই পুজোর একটা বৈশিষ্ট্য ছিল কোল্ড ড্রিঙ্কের দোকান। আমাদের পরিচিত দাদা-কাকারাই এই দোকান দিত। তখন ছিল ক্যাম্পা কোলা, গোল্ড স্পট, আরও ঝাঁঝালো থামস আপ, থ্রিল আর লিমকার সময়! গোল্ড স্পট ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয়!
কিন্তু বিপদ ছিল অন্য। ওই দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় দাদারা বা কাকুরা জোর করে লোকজনকে তুলে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিত দোকানের সামনে রাখা কাঠের ফোল্ডিং চেয়ারে। সেখানে আরও কয়েকজন কোল্ড ড্রিঙ্কের বোতল খুলে দাঁড়িয়ে থাকত। আর শিকারকে চেয়ারে বসানোমাত্র তার হাতে গুঁজে দেওয়া হত স্ট্র-সমেত সেই বোতল।
বাটানগর ছোট টাউন হলেও আশপাশে অনেক গ্রাম ছিল। সেখানকার অনেক সহজ সরল মানুষজন এমন অত্যাচারের শিকার হত। তারা কিছু বোঝার আগেই দেখত হাতে বোতল ধরে তার স্ট্র-তে টান দিতে শুরু করেছে!
দুর্গাপুজোর সময় আমাদের শান্ত একমুঠো মফস্সল টাউনটা কেমন যেন ঝলমল করে উঠত! শরতের মেঘভাঙা সোনা রঙের আলোয় ডুবে যেত চারিপাশ! সবার মধ্যে কেমন যেন এক খুশি! কেমন যেন এক আনন্দ! তখন বাটানগরের লোকজন বাটানগর ছেড়ে কোথাও যেত না পুজোয়! আর যারা বাইরে থেকে আসত, তার পরেরবার থেকে প্রতি বছর আসত নিয়ম করে!
তবু এসবের মাঝেও দুর্গাপুজো এলেই আমার কেমন যেন একটা অস্বস্তি হত। খুব
সুক্ষ্ম মনখারাপ করত। কারণ পুজোয় এলেই আমার মায়ের জন্য কষ্ট হত খুব! আমার মা পুজোর আগে থেকেই সবার জন্য পুজোর বাজার করত। সেটা কখনও গড়িয়াহাটা থেকে আবার কখনও বাটানগরেরই বড় পুকুরপাড়ের বাজার থেকে। আমি দেখতাম আমাদের বিশাল বড় পরিবারের সবার জন্য খুঁটিনাটি নিজের হাতে কিনত মা! গুছিয়ে সবার জিনিসটা পুজোর ঠিক আগে পৌঁছেও দিত। তারপর যেই ষষ্ঠী আসত দেখতাম মা কেমন যেন হয়ে যেত! সকালে আমরা ঘুরতে বেরতাম। সন্ধেবেলা বাড়ির বড়রাও বেরত। কিন্তু মা কোথাও যেত না। সারাদিন রান্না করত। তারপর বাকি সময়টা পূজাবার্ষিকী পড়ে কাটিয়ে দিত!
সবার মা ঘুরতে বেরত। শুধু আমার মা বেরত না! তাই আমি বেরলেও আমার মনের একটা অংশ সারাক্ষণ বাড়িতেই পড়ে থাকত। শুধু মনে হত মা কী করছে এখন? সন্ধেবেলা আমরা তো এতকিছু খাচ্ছি, কিন্তু মা? মা কী খেল!
আমাদের ছোট বয়সটা খুব অসহায় হয়! বড়দের নানান গোলমাল আর মনখারাপের দিকটা জানতে পারলেও তার উপশম করার মতো উপায় সেই ছোট্টবেলার আমাদের থাকে না। তাই মায়ের মনখারাপ সারিয়ে দেবার ক্ষমতাও আমার ছিল না।
কেন মা বেরত না? সারা পৃথিবী যখন পুজোর দিনে-রাতে ঘুরতে বেরচ্ছে সেখানে আমার মা কেন ঘরে বসে থাকে বই মুখে করে? আমি জিজ্ঞেস করতাম মাকে। কিন্তু মা তার উত্তর দিত না। বরং প্রতিবারই কথা ঘুরিয়ে দিত!
পরে, অনেক পরে একদিন আচমকা বলে ফেলেছিল একটা কথা। যার থেকে আমি বুঝেছিলাম কোনও এক তীব্র অভিমানে মা নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল পুজোর আনন্দ থেকে। বড় হওয়ার পরে আমিও আর পুজোয় ঘুরতে বেরতাম না। মায়ের সঙ্গেই বাড়িতে থাকতাম।
আজও যখন ছোটবেলার সেই মফস্সল টাউনের পুজোর কথা মনে পড়ে আমার সব আনন্দের মাঝে মনে পড়ে ছোট্ট নিষ্প্রদীপ দ্বীপের মতো আমার মাকে! তাই সমস্ত ভাললাগার মাঝেও কেমন একটা মনখারাপ রঙের গাছ যেন দাঁড়িয়ে থাকে একা। আর সেই গাছের থেকে একটা একটা করে পাতা ঝরে পড়ে, ভেসে আসে আজও এত বছর পরের এই আমার কাছে!
দুর্গাপুজো এলে যখন বেরই, আমি সবকিছুর মাঝেও চেয়ে দেখি সারি সারি বাড়ির দিকে। কোথাও কোনও বারান্দায় একা কাউকে দেখলে আমার মনে পড়ে যায় আমার মায়ের কথা! অন্ধকারে বসে থাকা মানুষের কথা। মনে হয়, সেই সার্কাসের সার্চলাইটটাকে চাঁদ অবধি যেতে হবে না, জীবনের ছোট ছোট ভাললাগাগুলো নিয়ে সে শুধু এসে থামুক এই একাকী মানুষগুলোর জীবনে! ধুয়েমুছে যাক সব অভিমান! মা দুর্গার পুজো আরও বেশি করে সবার পুজো হয়ে উঠুক!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন