সিনেমা হল

স্মরণজিৎ চক্রবর্তী

বাটানগরে একটা সিনেমা হল ছিল। আম্পায়ারের টুপির সামনের মতো সেই হলের সামনে একটা শেড ছিল। আর ছিল গ্রিল দিয়ে ঘেরা বারান্দায় একটা বুকিং কাউন্টার। এটা ছিল রিয়ার স্টল আর ব্যালকনির টিকিট কাটার জায়গা। আর বাঁদিকে আরেকটা জায়গা ছিল টিকিট কাটার। তারজালি-ঘেরা লম্বাটে এই জায়গায় ছিল নব্বই পয়সার টিকিট কাউন্টার! মানে এককালে নব্বই পয়সা ছিল টিকিটের দাম। আমাদের সময়ে সেটা এক টাকা চল্লিশ পয়সা হয়ে গেলেও সবাই ওটাকে ‘নাইন্টি’-ই বলত!

এই নাইন্টির লাইনে প্রচণ্ড মারামারি হত। মাঝে মাঝে পুলিশ ডাকতে হত! আমাদের নার্সারি স্কুল তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গেলে বাসে করে ফেরার পথে জানলা দিয়ে দেখতাম নাইন্টির লাইনের ভিড়! শুনতাম মারামারি করতে না পারলে, আর ডানপিটে না হলে নাকি এই লাইনে টিকিট কেটে কেউ সিনেমা দেখতে পারে না!

বাটা সিনেমার পাশাপাশি নঙ্গী অঞ্চলেও একটা সিনেমা হল ছিল। সেটা ছিল নঙ্গী স্টেশন রোড যেখানে বজবজ ট্রাঙ্ক রোডের সঙ্গে গিয়ে মিশছে সেখানে। হলটার নাম ইন্দ্রধনু সিনেমা হল! বাটা হলটা উঠে গেলেও ইন্দ্ৰধনু সিনেমা হল এখনও রমরম করে চলছে।

আমাদের কাছে যদিও বাটা সিনেমাটাই ছিল বেশি কাছের। সিনেমা হলের সামনে বেশ বড় একটা সাজানো চত্বর ছিল। তাতে সন্ধের মুখ থেকেই নানান দোকানপাট বসত। তার মধ্যে বানওয়ারির ফুচকা, নেপালদার আলুকাবলি আর ফ্যামিলির চপ ছিল বিখ্যাত! সিনেমা দেখতে গেলে তো কথাই নেই, না গেলেও এমনি পথচলতি মানুষজন এইসব দোকানে ভিড় করত!

শুনেছিলাম, ফ্যামিলির চপ হল একাত্তরে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে আসা এক উদ্বাস্তু পরিবারের নিজের উদ্যোগে তৈরি চপের দোকান। একটা পরিবারের সবাই মিলে চপ বানাত এখানে। তাই নাম হয়ে গিয়েছিল 'ফ্যামিলির চপ'! কী ভিড় যে হত এখানে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। ওখানে চপ কিনতে গেলে পাক্কা চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ মিনিটের ধাক্কা! তাই সিনেমা শুরুর আগে সবাই অর্ডার দিয়ে যেত। আর তারপর সময় বুঝে চট করে বেরিয়ে এসে নিয়ে যেত!

নেপালদার আলুকাবলির মতো আলুকাবলি পৃথিবীতে কেউ বানাতে পারে কিনা সন্দেহ! আমার অন্তত সেই ক্লাস টু-থ্রিতে তাই মনে হত। যদিও তখন আমার পৃথিবী ছিল উত্তরে আগরপাড়া আর দক্ষিণে বজবজের মধ্যে সীমাবদ্ধ!

ছোটবেলা থেকেই সিনেমার প্রতি আমার সাংঘাতিক আগ্রহ ছিল। শনি আর রবিবার সিনেমা দেখাত দূরদর্শনে। আমাদের কখনও কখনও সেসব দেখতে দেওয়া হত। আর দেখতাম বাড়ির বড়রা মাঝে মাঝেই সিনেমা হলে যাচ্ছে! কিন্তু আমায় নিয়ে যাচ্ছে না।

তারপর সেবার একটা সিনেমা এল। ভূতের ছবি! বাঞ্ছারামের বাগান৷ ভূতের ছবি মানেই তখন সবার ধারণা ছিল যে এসব হল ছোটদের ছবি। তাই ছোটদাদু আমায় নিয়ে গিয়েছিল সিনেমাটা দেখাতে!

তখন আমি বেশ ছোট। সব কথা আর মনে নেই। শুধু মনে আছে ম্যাটিনি শো ছিল সেটা। ব্যালকনিতে সিট ছিল আমাদের। বাড়িতে সাদা কালো টেলিভিশন দেখে অভ্যস্ত আমি রঙিন ছবি দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। যদিও বাটা সিনেমার স্ক্রিন ছিল পঁয়ত্রিশ মিলিমিটারের। যা এখনকার দিনে পোর্টেবল টিভির মতো! কিন্তু তখন সেটাই আমার কাছে জায়ান্ট স্ক্রিন! কারণ আমার চোখ তখন তো সাদা কালো ‘সোনোডাইন’-এর স্ক্রিনে অভ্যস্ত! প্রথমে রঙিন ছবি দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েছিলাম। কিন্তু কী যে ঘটছিল তখনও বুঝতে পারিনি। আমি শুধু অপেক্ষা করছিলাম কখন ভূত আসবে, সেই সময়ের। ব্যাপারটা হল, ততদিনে এত ভূতের গল্প শুনেছি যে তাকে কেমন দেখতে সেটা জানার আগ্রহ ছিল প্রবল! আসলে তখনও তো বুঝতাম না যে সিনেমা হল গল্প, কল্পনা আর মিছিমিছির একটা জগৎ!

কিন্তু যেই ভূত এসেছিল পর্দায়, অমনি আমার কান্না শুরু! মানে এত ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম যে চিলচিৎকার লাগিয়ে বাবার কাছে যাব বলে সিটে উঠে দাঁড়িয়েছিলাম! আমি এমনিতে কান্নাকাটি করতাম না খুব একটা। তাই ছোটদাদু ভয় পেয়ে গিয়েছিল।

তাড়াতাড়ি আমায় নিয়ে বাড়ি চলে এসেছিল। আর আমি নিশ্চিত হলের লোকজনও হাঁপ ছেড়ে সিনেমায় মন দিতে পেরেছিল!

আসলে আরও ছোটবেলায় আমি সারাক্ষণ অসুস্থ থাকতাম। বাড়ির সবাই খুবই চিন্তিত থাকত আমায় নিয়ে। আমাদের বাড়িতে জ্যোতিষের খুব চল ছিল। আমার বাবার এক পিসেমশাই থাকতেন জামশেদপুরে। তিনি নাকি অব্যর্থ ভবিষ্যৎবাণী করতে পারতেন।

আমার মিষ্টিদাদু তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল, আমার শরীর কবে ঠিক হবে। তিনি নাকি বলেছিলেন, দেড় বছর না গেলে কিছু বলা যাবে না।

আমি শুনেছি যে রাতে দেড় বছর পূর্ণ হবে, আমার মিষ্টিদাদু নাকি ঘড়ি নিয়ে বসেছিল! তারপরেও আমার নানান অসুস্থতা ছিল। এমনকী মাঝে মাঝে নার্ভের অসুখের ‘সিজার’ হত! ওখানের মানুষজন বলত ‘তরকা’! ছোটবেলার ছবিতে দেখি আমার গলায় বেশ ক'টা মাদুলি আর তাবিজ!

তাই আমি অসুস্থ হলেই বাড়ির লোকজন ভয় পেয়ে যেত! তাই ভুতের ছবি দেখে কান্নাকাটি করায় ছোটদাদুও ভয় পেয়ে গিয়েছিল!

তারপর বেশ কিছুদিন আর আমার সিনেমা হলে যাওয়া হয়নি। স্বাভাবিক, কে নিয়ে যাবে আমায়! কে সামলাবে আমি আবার ঝামেলা শুরু করলে!

আবার পরের সিনেমাটা দেখেছিলাম সেই বিরাশি সাল নাগাদ! বাবা-মা দু'জনে গিয়ে সিনেমা দেখে এসেছিল একটা। আমায় নিয়ে যায়নি! আর সেই রাগে আমি চিৎকার-চেঁচামেচি আর জেদ করেছিলাম খুব। তাই সেদিনের ইভিনিং শো-তে আমায় পঙ্কার সঙ্গে পাঠানো হয়েছিল সিনেমাটা দেখতে! জীবনে সেই প্রথম আর সেই শেষ আমি কোনও কিছু চাই বলে জেদ করেছিলাম।

বাটানগরে থাকার সময়ে এই দুটি সিনেমা ছাড়া আমি আরও দুটি সিনেমা দেখেছিলাম। তখন ডিসেম্বরে, সবার পরীক্ষা হয়ে গেলে, ইন্দ্রধনু সিনেমা হলে রবিবার মাঝে মাঝে মর্নিং শো-তে ইংরেজি সিনেমা দেখানো হত!

তখনকার দিনে ইংরেজি সিনেমা দেখার কথা বললেই লোকজনের ভুরু কুঁচকে যেত! আমাদের মফস্সলের মধ্যে একটা সাধারণ ধারণা ছিল যে ইংরেজি সিনেমা মানে তাতে ভরপুর সেক্স থাকবেই থাকবে! কলকাতার বিভিন্ন হলে চলা দুপুরবেলার ইংরেজি সিনেমা দেখে এসে যারা বড়দের ঠেকে গল্প বলত তাদের অন্যরা সামনে খারাপ ছেলে বললেও পেছনে পেছনে হিংসে করত!

কিন্তু ইন্দ্রধনুতে যে ইংরেজি সিনেমা দেখানো হত তা মিষ্টিদাদুর ভাষায় ‘স্বচ্ছ ও নির্মল’। মানে ছোটরাও দেখতে পারে! দুটো সিনেমা দেখলেও নাম মনে আছে একটার। ইটি: দ্য এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল৷

সেই সাত-আট বছর বয়সে সিনেমাটা খুব যে কিছু বুঝতে পেরেছিলাম তা নয় । আসলে সে সময় সিনেমা দেখতে যে হলে যাচ্ছি— এটাই ছিল আসল! স্কুলের বন্ধুদের গিয়ে তো গল্প করতে পারব যে আমি হলে গিয়েছিলাম! আর এমন যারা হলে গিয়ে সিনেমা দেখত তাদের স্কুলে আলাদাই খাতির ছিল।

কলকাতায় গিয়ে সিনেমা দেখার কথা উঠলে মনে পড়ে যে সেটা বাটানগরে থাকার সময় একবারই হয়েছিল। তবে সেটা সিনেমা নয়, একটা ডকুমেন্টারি। ফুটবল নিয়ে।

আমাদের বাড়িতে পাড়ার অনেক কাকুরা আসত। তারা আমার কাকাদের বন্ধু ছিল। আমার মাকে সবাই দিদি বা বউদি বলে ডাকত। তেমনই ছিল বাচ্চুকাকা। রোগা, ফর্সা, সামান্য কুঁজো বাচ্চুকাকা পান খেত খুব। আর দারুণ কথা বলতে পারত। এ ছাড়াও বাচ্চুকাকা ছিল সাংঘাতিক সাহসী আর ডানপিটে।

আমাদের বাড়ির সবাই বাচ্চুকাকাকে খুব ভালবাসত। এই বাচ্চুকাকার সঙ্গেই মা আমায় পাঠিয়েছিল কলকাতায় ওই ফুটবলের ওপর ডকুমেন্টারিটা দেখতে!

সিনেমা হলটার নাম ছিল 'টাইগার’! না, হলটি এখন আর নেই। এখানেই এইটটি টু অব্ গোলস্ নামে ডকুফিচারটা দেখেছিলাম! বিরাশি সালের বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে ডকুমেন্টারি। প্লাতিনি, তিগানা, জিরেস, জিকো, সক্রেটিস, ফালকাও, জুনিয়র, রুম্যানিগে, পল ব্রাইটনার, দিনো জফ, বারেসি, পাওলো রসি, মারাদোনা! সে এক নক্ষত্রের হাট বটে!

এর আগে টিভিতে ফুটবল দেখেছি। তাও একটা নির্দিষ্টভাবে। কিন্তু ডকুমেন্টারিতে ক্যামেরার নানান শিফট, ক্লোজ-আপ। টপ শট। গোল! সেলিব্রেশন! দর্শকদের নানান অভিব্যক্তি! সব নিয়ে সে এক ধুন্ধুমার কাণ্ড!

তবে এই ডকুফিচারের আগে দেখিয়েছিল একটা অ্যানিমেশন ফিল্ম। ফুটবল নিয়ে। একটা র‍্যাগ-ট্যাগ টিম কীভাবে সব প্রতিকূলতা জয় করে একটা চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিল, তার গল্প! সে এক আশ্চর্য মজার ফিল্ম ছিল। বেশ কিছু বছর পরে এক রবিবার বিকেলে টিভিতেও দেখিয়েছিল সেই ছবিটা। কিন্তু পরে শত চেষ্টা করেও আমি ওর নামটা মনে করতে পারিনি। নানান নামে সার্চ করেছি ইন্টারনেটে, কিন্তু কিছুতেই খুঁজে পায়নি। মফস্সল শহরে সেই সময়ে সিনেমা দেখতে যাওয়াটা ছোটদের তো বটেই বড়দের কাছেও একটা আগ্রহ আর উত্তেজনার ব্যাপার ছিল।

আমার ছোটপিসিরা থাকত একদম কাছে। তাই ছোটপিসি অধিকাংশ সময়ে আমাদের বাড়িতেই সময় কাটাত। মনে আছে ছুটির দিনে এমনিতেই পিসি আমাদের তাড়া দিয়ে সকাল সাড়ে ন'টার মধ্যে স্নান করিয়ে দুপুর বারোটার মধ্যে খাইয়ে দিত। আর যেদিন সিনেমা দেখতে যেত? ওরে বাবা আমাদের স্নান করানো হত সকাল আটটার সময় আর সাড়ে এগারোটার মধ্যে খাইয়ে দেওয়া হত ।

পাড়ার কাউকে মা টাকা দিত টিকিট কেটে আনার জন্য। মা যে প্রতি সপ্তাহে সিনেমা দেখতে যেত তা নয়, কিন্তু যখন যেত ব্যালকনির টিকিটই কাটত! সেই টিকিটগুলো ছিল পাতলা ফিনফিনে গোলাপি কাগজের। লেটার প্রেসে শো-এর নাম আর সিট নাম্বার ছাপা

থাকত তাতে। দেখেই আমার কেমন যেন বোগেনভেলিয়া ফুলের কথা মনে পড়ত! দেখতাম, মা, ছোটপিসি, কাকুমা, পাড়ার মালাপিসি, মালাপিসির মা, মাম্মাম সবাই একসঙ্গে সিনেমা দেখতে যেত! আর সেইদিন সকাল থেকেই কেমন একটা সাজোসাজো রব পড়ে যেত বাড়িতে। আমাদের কীভাবে নাইয়ে-খাইয়ে দেওয়া হত সেটা তো বললামই। তারপর দেখতাম মা-পিসিরাও তাড়াতাড়ি দুপুরের খাওয়া সেরে পাটভাঙা শাড়ি পরে, ভাল করে চুল আঁচড়ে, গায়ে দেশি সেন্ট (পারফিউমকে সেন্ট বলা হত) মেখে আর লিপস্টিক লাগিয়ে সেজেগুজে বেরত। গরমকাল হলে নিমাইদাকে বলা থাকত। নিমাইদা বেশ কয়েকটা রিকশা নিয়ে এসে হাজির হত। আর শীতকাল হলে মায়েরা সবাই হাঁটতে হাঁটতে চলে যেত! বাটানগরের নির্জন, নানান পাখির ডাকের উসুম-কুসুম দুপুরের মধ্যে দিয়ে ওদের চলে যাওয়া দেখে কেন কে জানে আনন্দ হত আমার। মনে হত যাক আমার মাও তো আনন্দ করছে একটু!

আসলে মফস্সল টাউনে সেরকম কিছু বিনোদনের সুযোগ ছিল না। মায়েদের কাছে ওই সিনেমা দেখতে যাওয়াটুকুই ছিল আনন্দ আর বিনোদন! ওই হলে বসে সিনেমা দেখা। পাতলা পলিথিনের মধ্যে প্যাক করা চিপস খাওয়া। বড়জোর হাফ টাইমে একটা কাপ আইসক্রিম খাওয়া! আর ফেরার পথে বাড়ির সবার জন্য হয় নেপালদার থেকে আলুকাবলি নয়তো ফ্যামিলি চপের দোকান থেকে ছোট কিন্তু অসাধারণ স্বাদের পেঁয়াজি কিনে আনা! বড়রা সবাই সিনেমায় গেলে আমরা নিশ্চিত ছিলাম মা কিছু না কিছু কিনে আনবেই আমাদের জন্য! সেই খাবারের জিনিসগুলোই ছিল আমাদের নাকের বদলে নরুন!

সিনেমার ‘টিকিট শোয়ার’ ছিল তপাদার জেঠু। আমাদের দাদুর দোকানের কাছে ছিল তপাদার জেঠুর দোকান। সেখানে জামাকাপড় সেলাই করা আর রং ছোপানো হত। তপাদার জেঠুরা থাকত রবীন্দ্র সুইমিং ক্লাবের কাছে। দুই ছেলে ছিল তপাদার জেঠুর। নাম আর মনে নেই। কিন্তু বড়জন আমাদের চেয়ে বড় ছিল কিছুটা আর ছোটজন ছিল ছোট। ছোট ছেলেটি খুব ডানপিটে ছিল। বিকেলে কোয়ার্টারের মাঠে আমরা একসঙ্গে খেলতাম।

তপাদার জেঠু ছিল সামান্য মোটা। মাথায় বড় টাক। আর দুটো লোমশ হাত। সারাক্ষণ গম্ভীর হয়ে থাকত। হাতে একটা স্টিলের চকচকে টর্চ থাকত জেঠুর। সেটা এমনিতে যেমন ব্যবহার করত পথে হাঁটার সময়, আবার সেটাই সিনেমা হলে সিট দেখানোর সময়ও ব্যবহার করত। মফস্সলের পথ-ঘাটে স্ট্রিট লাইট বলে বিশেষ কিছু ছিল না। তাই সকলেই তখন টর্চ ব্যবহার করত! আমাদের বাড়িতেও একটা টর্চ ছিল। ভাইপোর প্রাইজ পাওয়া। নাম ছিল 'জীবন সাথী'!

সিনেমা হলের চাকরির পাশাপাশি তপাদার জেঠু দোকানও চালাত। তবে যখন জেঠু হলে থাকত তখন দোকান সামলাত কাকিমা!

তপাদার জেঠুর স্ত্রীকে আমরা জেঠিমা না বলে কিন্তু কাকিমা বলতাম। খুব হাসিখুশি ছিল কাকিমা। আমরা গেলেই কিছু না কিছু খেতে দিত! এখন ভাবি ছোটবেলায় আমরা বেশ খাওয়ার ব্যাপারে লোভী ছিলাম। শঙ্করদা বলত, 'এমন করতে নেই। লোকে ছোঁচা বলবে!’

দূর, বলুক ছোঁচা! খেতে ভাল লাগলে কী করব? তপাদার কাকিমার বাড়িতে মুড়ি খেতে গেলে চানাচুর আর বাদামের সঙ্গে কী দারুণ নারকোল কেটে দিত পিস পিস করে! কে কী ভাববে, বলবে ভেবে সেটা মিস করব নাকি? আমরা কি পাগল! জীবনে সব কাজেই কেউ না কেউ কিছু না কিছু বলে অন্যকে হেয় প্রতিপন্ন করতে চায়! তা বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে নাকি মানুষ!

তবে সিনেমা হলের একটা অন্ধকার দিকও ছিল। সিনেমা হলের টিকিট ব্ল্যাক করা নিয়ে মারামারি হত মাঝে মাঝে। দুই পক্ষের মধ্যে বোমাবাজি আর পাইপগান নিয়ে সে কী যুদ্ধ!

আমরা ভয়ে কোল্যাপসিবল গেট বন্ধ করে বসে থাকতাম। সিঁড়ির বা ছাদের জাফরি কাটা ফাঁক দিয়ে দেখতাম ছায়া ছায়া মানুষেরা সোর্ড আর পাইপগান হাতে দৌড়াদৌড়ি করছে। মাঝে মাঝে দূর থেকে বোমার আওয়াজও ভেসে আসত। সে এক গা ছমছমে ব্যাপার হত!

বিকেলবেলা কাছের আক্রা সন্তোষপুর থেকে প্রচুর মানুষ ট্রেনে করে আসত সিনেমা দেখতে! শুক্রবার করে ওই অঞ্চলে ছুটি থাকত। পাড়ায় বলাবলি হত ওদের জন্যই নাকি এই দুটো সিনেমা হল টিকে আছে!

মনে আছে, অনেক পরে স্টেশনে দাঁড়িয়ে শুনেছিলাম, জুরাসিক পার্ক সিনেমা দেখতে আসা, মুখে আচ্ছা করে পাউডার মাখা আর শ্যাম্পু করে চুল ফোলানো একজন মানুষ, নিজের সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী ও শালিকে নিয়ে রিকশায় উঠে, রিকশাচালককে বলেছিল, 'জুরাসিক বাগিচায় চলো!’

সেই হলগুলো এখনকার মাল্টিপ্লেক্সের থেকে হাজার যোজন দূরে বাস করত। রিয়ার স্টলে থাকত মূলত কাঠের চেয়ারের ওপর রেক্সিনের পাতলা গদি। ব্যালকনিতে সেই গদিটাই মোটা হত সামান্য। তবে শুনেছি ওই নব্বই পয়সা, মানে যা আসলে এক টাকা চল্লিশ, সেই টিকিটের চেয়ারগুলো নাকি ছিল নড়বড়ে আর কাঠের। আর তাতে নাকি ছারপোকাও থাকত!

সিনেমা হলে গরমের মোকাবিলা করার জন্য ছিল বেশ কয়েকটা ফ্যান! অনেক উঁচু সিলিং থেকে লম্বা রড দিয়ে ঝোলানো থাকত গদার মতো দেখতে সেই ফ্যান। একটু জোরে ঘুরলেই ল্যাগব্যাগে জিরাফের ঠ্যাঙের মতো কাঁপত সেই রড। আমার খালি ভয় হত, এই রে ফ্যানগুলো না ছিটকে, সুদর্শন চক্রের মতো কারও মাথায় গিয়ে পড়ে! আমি সিনেমা দেখার সময় মাঝে মাঝেই মাথা তুলে দেখতাম ফ্যান খুলে পড়ছে না তো মাথায়!

সে সময় আরেকটা জিনিস মনে আছে। সিনেমা হলের মধ্যে স্মোক করা যেত! আমি দেখতাম অনেকেই সিনেমা দেখতে দেখতে সিগারেট বা বিড়ি ধরাচ্ছে! চিরকাল আমার ধূমপানের ব্যাপারে একটা তীব্র বিরক্তি আছে। তাই সামান্য বড় হওয়ার পরে আমি এই কারণেও সিনেমা হলে যেতে চাইতাম না!

তবে সিনেমা হলে যে শুধু সিনেমা দেখানো হত তা নয়! আমাদের মফস্সলে মাঝে মাঝেই নানান গানের ফাংশান হত। সেসব হত মূলত বাটা সিনেমা হলেই। সেখানে মান্না দে এসেছেন বলে শুনেছি। আমি নিজে উৎপলেন্দু চৌধুরীর গান শুনেছি সেখানে। দেখেছি ‘উই শ্যাল ওভারকাম' গানের সঙ্গে কীভাবে গোটা হল এক হয়ে গলা মিলিয়ে গান গেয়েছে! সিনেমা হল ভাড়া নিয়ে মাঝে মাঝেই যে এমন গানের অনুষ্ঠান হত তাকে বলা হত 'চ্যারিটি শো'। সেই শো হওয়ার আগে টিকিট বিক্রি করাটা একটা ব্যাপার ছিল। কোনও কোনও শোয়ে লোক হতে চাইত না। তখন ইনসিয়োরেন্স করাবার মতো করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকিট বিক্রি করা হত। আর যে শোয়ের চাহিদা থাকত তার জন্য ভোর থেকে ক্লাবে ক্লাবে লম্বা লাইন পড়ত। আর সেই লাইনের পাশে এসে জমত গনেশদার ঘুগনি, তুহিনের আইসক্রিম, নেপালদার আলুকাবলি, লক্ষ্মীদার আচার! আমাদের কাছে ওইসব খাবারের আকর্ষণ ছিল অনেক বেশি!

বাটানগরের সেই হল আর নেই। নতুন শহর বানাবার জন্য সেটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। এখন ওই হলের সামনের রাস্তা দিয়ে গেলে কী যে মনখারাপ করে! মনে হয় এখানেই তো আমার সব ছিল। বাবা মা কাকা পিসি দাদু ভাই বোন। সবাই মিলে এই সিনেমা হলের সামনে এসেছি। ঘুরেছি। মজা করেছি! আমাদের জীবনের ছোটখাটো আনন্দের সঙ্গে কীভাবে যে সিনেমা হলটা জড়িয়ে ছিল! আর সেটাই নেই। সব ভাল আর আনন্দের জিনিস কেন শেষ হয়ে যায়! জীবন কেন এমন নিষ্ঠুর!

তাও স্মৃতি যেটুকু ধরে রেখেছে তাই সাধ্যমতো লিখে রাখলাম। আর লিখতে লিখতে বুঝলাম আশির দশকের সেই অনাড়ম্বর জীবনে হলে গিয়ে সিনেমা দেখার যে আনন্দ ছিল তা আজকের আলোঝলমলে হাজার সুযোগসুবিধে ঘেরা বড় হলগুলোতে আর নেই! সারল্য হারিয়ে মানুষ যেভাবে ছোট থেকে বয়সে বড় হয়ে ওঠে আমরাও আজ সেরকম হয়ে গিয়েছি! ঝাঁ-চকচকে সিঙ্গল স্ক্রিন বা মাল্টিপ্লেক্স অনেক আরাম এনে দিলেও আশির দশকের সেই উত্তেজনা আর ভালবাসার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে! তাও ভাবলে ভাল লাগে যে অন্তত সেটুকু তো আমরা পেয়েছিলাম! আজ এই প্লাস্টিকের শহরে সেটাই যথেষ্ট মনে হয়!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%