নতুন বাড়ি, পুরনো শহর

স্মরণজিৎ চক্রবর্তী

উনিশশো সাতাশি সালে আমরা আমাদের নঙ্গী বাটানগরের পাট উঠিয়ে কলকাতায় চলে আসি। সেটা ছিল এপ্রিল মাস। আমি তখন বাবার সঙ্গে বিহারে ধোরি বলে একটা কোলিয়ারি অঞ্চলে গিয়েছিলাম। আমাদের ব্যবসার নানান প্রজেক্টের কাজ হত বিহারের নানান কোলিয়ারিতে। যাকে বলে ‘সাইট’, সেই সাইট চলত। আমি কখনও সেই সাইটে যেতাম। ঘুরতে। তখনও গিয়েছিলাম। আর সেই অবসরেই কলকাতায় চলে আসার গোটা ব্যাপারটা সামলেছিল আমার মা ।

এপ্রিল মাসের এক সকালে আমি হাওড়া স্টেশনে নেমে অজিতকাকার সঙ্গে লাল সরকারি বাসে করে এসে পৌঁছেছিলাম দক্ষিণ কলকাতার মুদিয়ালি অঞ্চলের লালপাড়ায়, আমাদের ভাড়াবাড়িতে! এই সেই বাড়ি যেখানে মায়ের মামারা থাকত। আর তারা ছেড়ে দেওয়ার পরে আমরা নিয়েছিলাম ভাড়া!

এই বাড়িটা ছিল বিশাল বড়! তিনতলা। এর একতলাটা আমরা ভাড়া নিয়েছিলাম। মানে আমাদের নঙ্গীর বাড়ির চারটে মতো বাড়ি এখানে ঢুকে যেতে পারত।

এই নতুন বাড়িটায় উঁচু সিলিং-ওলা বড় বড় চারটে ঘর ছিল। তার সঙ্গে ছিল একটা ডাইনিং কাম কিচেন। চওড়া সিঁড়ি দিয়ে নেমে গিয়ে উঠোন। উঠোনে কাঁঠালগাছ। সেই গাছের পাশে ছিল একটা আলাদা ছোট ঘর আর বাসন মাজার জন্য চৌবাচ্চা। এ ছাড়াও একটা আশ্চর্য জিনিস ছিল। মেজানাইন ফ্লোরের ঘর! এমন ঘর আমি মফস্সল শহরে কোথাও দেখিনি। সরু শ্বেতপাথরের সিঁড়ি দিয়ে উঠে যাওয়া যেত সেই ঘরে। এই ঘরের ছাদটা সামান্য নিচু। কিন্তু ঘরটা বেশ বড়। এই ঘরটা ছিল আমার খেলার ঘর। সঙ্গে ঠাকুরঘরও করা হয়েছিল এটাকে।

এই বাড়ির পেছনের গলিতে ছিল একটা গঙ্গা জলের কল। আর গ্যাসের লাইন। একসময় নাকি সেই কলে জল আসত। গ্যাস লাইনে গ্যাসও আসত!

বাড়ির বাথরুমটাও ছিল অদ্ভুত সুন্দর। সেখানে একটা সাদা সিমেন্টের ওপর মোজাইক পাথর বসানো বাথটব ছিল। যদিও সেটাকে চৌবাচ্চা হিসেবেই ব্যবহার করা হত। আর ছিল ঝরনা! মানে শাওয়ার! আমাদের নঙ্গীর বাড়ির সেই ছোট্ট, শ্যাওলা-ধরা টিমটিমে আলোর বাথরুমের পাশে এটা যেন ছিল রাজপ্রাসাদ!

বাড়িটা এত বড় ছিল যে সব ঘরে রাখার মতো আসবাবপত্র আমাদের ছিল না।

একটা ঘর তো সম্পূর্ণ ফাঁকা পড়ে ছিল কয়েকমাস। আর অন্য একটা লম্বা বিশাল ঘরে আমি আর পঙ্কা ব্যাডমিন্টন খেলতাম! বাড়িটার সামনে একটা বারান্দা ছিল। আমার মায়ের খুব শখ ছিল একটা বারান্দাওলা বাড়িতে থাকার। সাড়ে তিন বছরের জন্য সেই শখটা পূরণ হয়েছিল মায়ের।

আমার মনে আছে আমি সেই বারান্দার চওড়া সিমেন্টের রেলিং বেয়ে উঠে বসে থাকতাম। পাড়ার ছেলেরা পিচের রাস্তায় খেলত। আর আমি দেখতাম। আমারও খুব খেলতে ইচ্ছে করত। কিন্তু নিজে মুখে বলতে পারতাম না। তবে আমার অবাকও লাগত। এরা রাস্তায় খেলে কেন? এখানে মাঠ নেই?

আসলে বাটানগরে তো আমরা বড় বড় মাঠ পেতাম। ফলে ফুটবল, ক্রিকেট থেকে শুরু করে এমনি দৌড়াদৌড়ি করা, কোনও কিছুই রাস্তায় করতে হত না। সেখানে কলকাতায় সবাই রাস্তায় খেলে! দেখতাম একবার পড়ে গেলে হাত-পা কেটে যেত ছেলেপিলেদের। এমনকী বলে শট মারতে গেলেও পা পিচের রাস্তায় ঘষটে রক্ত বেরিয়ে যেত।

আগে মফস্সল থেকে মাঝে মাঝে কলকাতায় আসতাম আমি। আর এখন সেখানে আমি কলকাতাতেই থাকি! এটা ভাবতেই কেমন যেন লাগত। রাতে মিষ্টিদাদুর পাশে ঘুমোতাম। দাদু ঘুমিয়ে পড়লেও আমার ঘুম আসত না। সেই ছোট্ট বাড়িটার কথা মনে পড়ত। সেই ঘর, ঘরের পাশে উঠোন। তার গায়ে লাগোয়া সবুজ জলের পুকুর। রাতে ঘরের জানলা দিয়ে দেখা আকাশ আর ঝকঝকে তারার সংসার! কেমন একটা কষ্ট হত বুকের মধ্যে! গলার মধ্যে! মনে হত সকালে উঠে সেই উঠোনে দাঁড়িয়ে আর দেখা হবে না দূরের বাঁশবনে কেমন আলো ঘুরে যাচ্ছে বোসবাড়ির দিকে। মাছরাঙা এসে বসেছে পুকুরপাড়ের নুয়ে পড়া গাছের ডালে। টিট্টিটিট্টি বলে যে পাখিটা রোজ ডাকত তার ডাক আর শোনা হবে না কোনওদিন! শঙ্করদা আর দোতলা থেকে ‘রাজা, এই রাজা' বলে ডাকবে না। সোমাদির গলার গান ভেসে আসবে না। ভাইবোনেদের সঙ্গে আর বিকেলে কোয়ার্টারের মাঠে যাওয়া হবে না। সেখানে পিঙ্কা, সঞ্জয়, ছোটকু, বুড়া, বিরূপাক্ষ বা লালমোহনের সঙ্গে দেখা হবে না আর! অরুণাচল সঙ্ঘের থেকে বাচ্চুকাকা, বাবুকাকা, কাঠিকাকা, বিধানকাকা আর আসবে না ফ্রিজের ঠান্ডা জল খেতে! অরুণ পাল এসে বলবে না, ‘চল, ফুটবল খেলি! খোল বাজিয়ে যে বৈষ্ণবদাদু আসত, সে এসে দেখবে বাড়ি শূন্য! সেই ইটের ছায়া ছায়া রাস্তা দিয়ে শনিবারের দুপুরে ছোটপিসির বাড়িতে যাওয়ার পথে আশেপাশের বাড়ি থেকে আর ভেসে আসবে না ‘ডিভাইস কেমিক্যাল প্রযোজিত শনিবারের বারবেলা!’ সেই শিরশিরে ভয়! ফুল ফোটার মতো বুকের মধ্যেকার আনন্দ! বিশাল খোলা আকাশের নীচে পুজোর রোদের মতো মন ভাল হয়ে ওঠা আর কোনওদিন হবে না! মনে হত আমার মনের গাছটা মরে গিয়েছে! দাদু বলত, 'শুধু ফুল পাতা ঝরে গেলেই গাছ মরে না! গাছের মৃত্যু তখনই হয় যখন তার কাছে প্রজাপতি আর পাখি আসা বন্ধ হয়ে যায়!’

আমার মনের পাখি আর প্রজাপতিরা অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। কলকাতায় রাত বাড়ত। কিন্তু আমার ঘুমই আসত না। সেই দশ-এগারো বছর বয়সের আমি যেন সেই প্রথম স্পষ্ট করে বুঝতে পেরেছিলাম বিচ্ছেদ কাকে বলে।

কলকাতায় থাকতে এসে বুঝতে পারলাম এখানে একতলা বাড়িতে রোদ ঢোকে না। দিনেরবেলায় আলো জ্বালিয়ে রাখতে হয়। এখানে পাশের বাড়ি থেকে কেউ দুপুরে গল্প করতে আসে না। কিছু রান্না করলে এবাড়ি ওবাড়িতে দেওয়া-নেওয়া হয় না! কেউ কারও বাড়ির ফ্রিজে খাবার রাখে না। ঠান্ডা জল খেতে আসে না! এখানে পাড়ায় মাঠ নেই। সেখানে ম্যারাপ বেঁধে কেউ ফাংশান করে না। এখানে কেউ কাউকে দেখে হাসে না। কিছু জিজ্ঞেস করে না। একজন যেন অন্যজনের অস্তিত্বটাই স্বীকার করে না। কেমন যেন একটা অবহেলার ভাব! ‘তুমি কেউ নও' ভাব! এখানে মানুষজন বাড়িতে হাওয়াই চটি পরে থাকে। বাংলা বাক্যের মধ্যে জোর করে ইংরেজি গুঁজে দেয়! ঘরে রোদ ঢোকে না বলেই যেন কলকাতার মানুষগুলো একটু ফর্সা। একটু বেশি গম্ভীর! আর কেমন পাথরের মতো স্থির চোখ সবার! সবাই যেন গোপনে সবাইকে মাপছে। সবাই যেন সবার সঙ্গে এক অদৃশ্য রেসে নেমেছে! এসব দেখে আমার কী যে অদ্ভুত লাগত! মনে হত কেউ যেন আমাকে অন্য কোনও দেশে ছেড়ে দিয়ে গিয়েছে!

তখন কলকাতায় চওড়া রাস্তার মাঝখান দিয়ে ঘাসে মোড়া আইল্যান্ড ছিল। সেখান দিয়ে টং টং করে ট্রাম চলত। বিকেলে মিষ্টিদাদুর সঙ্গে সেই ট্রামলাইন পেরিয়ে লেকে যেতাম আমি। দেখতাম বেশ পুরনো বড় বড় বাড়িঘর চারিদিকে। মুদিয়ালি মোড়ের কাছে যেখানে একটা গ্রিন্ডলেয়স ব্যাঙ্ক ছিল, তার পাশে অনেকটা জায়গা নিয়ে খুব পুরনো একটা বাড়ি ছিল। মানে একটা বাড়ি না, অনেকগুলো বাড়ি একটা বিশাল উঠোন আর বাগান ঘিরে তৈরি হয়েছিল। পুরো কমপ্লেক্সটা সবুজ গেট দিয়ে ঢাকা থাকত। ব্রিটিশ আমলে এটা তৈরি হয়েছিল বলে শুনেছিলাম। নাম ছিল ‘মোহিনী ম্যানসন'!

আর ছিল বিশাল বড় একটা বাড়ি! একদম মুদিয়ালি মোড়েই। সেটা নাকি রাজরাজড়াদের প্রাসাদ ছিল। তাদের বিশাল কম্পাউন্ড ঘিরে থাকত উঁচু পাঁচিল। বড় বটগাছ সেই পাঁচিল টপকে ঝুরি নামিয়ে আনত বাসস্টপের কাছে। আমি দূর থেকে দেখতাম সেই বাড়ির ঝুলবারান্দা! ঢালাই লোহার রেলিং। সিংহের মুখওলা ড্রেনপাইপ। দেখতাম দরজার কারুকার্য করা আর্চ। নানা রঙের কাচ লাগানো জানলার বাহার!

তখন এই অঞ্চলে ‘চন্দ্রালোক' বলে একটা উঁচু বাড়ি ছিল। এখনও আছে! সেটার তলা দিয়ে যাওয়ার সময় কী যে হাওয়া দিত! আমি ঘাড় উঁচু করে তাকিয়ে দেখতাম— কত্ত লম্বা বাড়িটা! গুনতাম। বাব্বা দশতলা! আমাদের বাটানগরে সাহেব কলোনির চৌহদ্দির বাইরে যে অ্যাবসলমেন্ট কোয়ার্টার ছিল সেগুলো ছিল দোতলা। তবে এমন উঁচু ছিল তার সিলিং যে মনে হত তিন-সাড়ে তিনতলা! সেখানে দশতলা বাড়ি!

আগে বাবার সঙ্গে কলকাতায় এসে দেখেছি ‘চ্যাটার্জি ইন্টারন্যাশনাল' নামে একটা বাড়িকে। চব্বিশতলা! তখন ওটাই ছিল কলকাতার সবচেয়ে উঁচু বাড়ি। তার চেয়ে বেশ কিছুটা ছোট হলেও ‘চন্দ্রালোক’ও দশতলা! সেটাই-বা কম কী!

আর দেখতাম কলকাতার স্কুলের ছাত্রদের। নবনালন্দা, সাউথ পয়েন্ট! সেখানে ছেলেরা সব টাই পরে স্কুলে যেত! আমাদের মফস্সলের স্কুলে দরিদ্র বাড়ি থেকে এমন ছেলেও আসত যাদের জুতো কেনার অবস্থাও ছিল না!

এর সঙ্গে আমাদের নতুন বাড়ির কাছে লেক! কাছে মেট্রো রেল! মফস্সলের ছোট্ট গলি থেকে যেন একদম আক্ষরিক অর্থেই রাজপথ !

সেই মফস্সলি চোখে আমার সবকিছুই আশ্চর্য লাগত। আমি কিছুতেই যেন সহজ হতে পারতাম না। কীসের এক মনখারাপ আর একাকিত্ব সেই থেকে আমার মধ্যে একটু একটু করে জায়গা করতে শুরু করেছিল! মনে হত সবাই তো শহরে আসতে চাইত বাটানগর থেকে! আমরা চলে আসব জেনে কত লোক বলেছিল তাদেরও এমন ইচ্ছে। কিন্তু আমার কলকাতা ভাল লাগছে না কেন!

আমি দেখতাম আমার বাবা-মা খুশি। আমার মিষ্টিদাদুও প্রকাশ্যে অখুশি নয় । পঙ্কাও খুশি। আমাদের বাড়ির পোষা ছোট্ট তুলোর বলের মতো কুকুর টোপরকে এখানে গলায় চেন না দিয়ে এমনি ছেড়ে রাখা হত বলে সেও খুশি! শুধু আমার যেন কিছুতেই ভাল লাগত না। আমি একা একা বই পড়তাম। খেলতাম। বিকেলে মাঝে মাঝে লেকে যেতাম দাদুর সঙ্গে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতাম! কিন্তু তার মধ্যেই আমার ছোট্ট বাটানগরের জন্য মনখারাপ করত খুব। মনে হত আমার যে ছিল সে আর আজ থেকে আমার নয়! ‘প্রিয় মানুষটি আর আমার নয়' এই অনুভূতিটা যে কী কষ্টের সেই বয়স থেকেই বুঝতে শুরু করেছিলাম আমি!

তাও জীবন কাটে। মানুষ ধীরে ধীরে নিজের অজান্তেই মানিয়ে নেয় সব। তার শিকড় নতুন মাটির গভীরে প্রবেশ করে। তার মনের শুকনো ডালপালায় রসের সঞ্চার হয়। নতুন পাতা আসে। ফুল ফোটে। আস্তে আস্তে সে দেখে নতুন মাটিতে তার জীবন বেঁচে উঠেছে! সে প্রাণ ফিরে পেয়েছে!

তাই বছরখানেক পরে এক সকালে ঘুম ভেঙে উঠে মাথার কাছে রাখা দাদুর চালানো রেডিয়োর প্রভাতী গান শুনে, ওই সামনের বারান্দায় এসে পড়া আলোর টুকরো দেখে, আর রাস্তা দিয়ে যাওয়া আখের রসের গাড়ির ঝুমুর ঝুমুর শব্দ পেয়ে আচমকা, একদম আচমকাই মনে হল এসব কিছু আমার বাটানগরের মতো না হলেও, এও সুন্দর! যেন বুঝলাম জীবনের সৌন্দর্য নানানরকমের হয়! জীবনের আনন্দের প্রকারও নানান ধরনের হয়!

সেদিন থেকে বাটানগরের জন্য আমার ভালবাসা থাকলেও মনখারাপটা কেটে গেল। নতুন শহরটার প্রতি ভালবাসা বাড়তে লাগল! সেদিন থেকে আমি কলকাতার ছেলে হয়ে উঠতে শুরু করলাম। এবং আমার গাছেও পাখি আর প্রজাপতি আসতে শুরু করল আবার!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%