স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
ছোটবেলায় সকাল হত মায়ের মুখ দেখে। জানলা দিয়ে চৌকো রোদ এসে পড়ত বিছানায়। ভেসে আসত পাশের সবুজ পুকুরের হাওয়া। দূরের বাঁশবনের মর্মর! আমি উঠে বসতাম বিছানায়। জানলা দিয়ে দেখতাম পাশের উঠোন পেরিয়ে সেই সবুজ জলের পুকুরে ঝিলমিল করছে আলো! সোনালি রাংতার কুচি! মা বলত, ‘এবার ওঠ। অনেক বেলা হয়ে গেছে, স্কুল যাবি না!’
আমাদের বাড়ির পাশেই গলি। ছায়া ছায়া। ইটপাতা। তাতে শোনা যেত মানুষজনের চলাচল। সকালবেলার আওয়াজ। সেই গলি দিয়েই ঝরঝরে সাইকেল করে খবর কাগজ দিতে আসত ইয়া মোচওলা পণ্ডিতজি। মিঠুনকাকা আসত দুধের প্যাকেট দিতে। রোগা বৈষ্ণবদাদু আসত শ্ৰীখোল বাজিয়ে গান করতে। মনে আছে, দাদু গাইত, ‘সব হবে, আজ সব হবে । ও ভোলা মন তোমার জোরে সব হবে!’
আমার কাজ ছিল গান শেষ হওয়া অবধি তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা। আর গান শেষ হলেই একটা চারআনা পয়সা দাদুর হাতে দেওয়া। পয়সাটা নিয়ে আলুঝালু কাঁচাপাকা গোঁফ-দাড়ির মাঝে দাদু হাসত। তারপর আলতো করে আমায় মাথায় হাত দিয়ে কী যেন বলত মনে মনে! দাদুর গায়ের থেকে কেমন যেন কর্পূরের গন্ধ পেতাম আমি। সারাদিন সেই গন্ধটা পোষা পাখির মতো উড়ে বেড়াত আমার চারিপাশে!
সকালবেলাতেই দেখতাম মিষ্টিদাদু থলি হাতে মল্লিকবাজারে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। তারপর মায়ের থেকে জেনে নিচ্ছে কী কী জিনিস কিনে আনতে হবে। দেখতাম বাবা স্নান সেরে এসে ঠাকুর প্রণাম করছে। সোয়া ন'টার ট্রেন ধরতে হবে যে এবার!

রোজ সকালবেলা আমাদের বাড়িওয়ালা জেঠুর মেয়ে সোমাদি হারমোনিয়াম বাজিয়ে গলা সাধতে বসত ওদের ওই ছোট লাল মেঝের ঘরটায়। আমাদের বাড়ি উপচে আশপাশের বাড়িতেও সোমাদির গান ছড়িয়ে পড়ত রোদ্দুরের মতো! মাকে কাজে সাহায্য করত যে দিদি সেও দেখতাম কাজের ফাঁকে ফাঁকে সোমাদির গানে গলা মেলাচ্ছে!
বাড়িতে বাড়িতে গুল দিত মেটে বাড়ির মনুদা। প্রায় রোজ সকালবেলা এই মনুদাও আসত আমাদের বাড়ি মায়ের কাছে সকালের চা-জলখাবার খাবে বলে। আমাদের নিম্নমধ্যবিত্ত জীবনে যা সামান্য জুটত মা সেই সবই ভাগ করে দিত সবার মধ্যে।
এমন সারাদিন কতজন যে আসত মায়ের কাছে! কারও একটু চিনির দরকার! কেউ চাল নেবে! কারও আবার প্রয়োজন একবাটি ডাল !
মাঝে মাঝে খঞ্জনি বাজিয়ে এক বৃদ্ধা আসত হায়েতপুর গ্রাম থেকে। মা তাকে একবার তার নাতনির বিয়ের জন্য দিয়েছিল দুটো নতুন শাড়ি, আলতা-সিঁদুর, পাঁচশো টাকা আর নিজের দুটো সোনার চুড়ি!
সেই বৃদ্ধা কিছুদিন পরে মায়ের জন্য বুনে এনে দিয়েছিল শীতলপাটি। মায়ের মাথায় হাত দিয়ে বলেছিল, 'তুমি সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা! আমি গরিব মানুষ, তাই আর কী দেব তোমায় মা! তাই এটা বুনে এনেছি!’ সেই শীতলপাটি কতদিন যে ছিল আমাদের বাড়িতে!
এমন সব ঘটনার ফাঁক দিয়ে দেখতে দেখতে সকাল গড়িয়ে যেত স্কুলের সময়ের দিকে। উঠোনের পাশের টিউবওয়েলের থেকে জল নিয়ে স্নান সেরে খেতে বসতাম। তারপর ব্যাগ আর ওয়াটার বটল নিয়ে দৌড়!
নিউল্যান্ড বাসস্ট্যান্ডে আমাদের স্কুলবাস আসবার কথা। সেখানে লাইন দিতে হবে! দেরি হলে জানলার ধারের সিট মিস হয়ে যাবে যে!
আমাদের স্কুলবাসটা ছিল পুরনো দিনের একটা গাড়ি। সামনেটা কেমন যেন বের করা। দু'পাশে ভাঁজ করা বনেট। বাসের গায়ে উজ্জ্বল নীল রং করা। স্টিয়ারিঙের মাঝে একটা বোতাম। চাপ দিলেই উঁ উঁ শব্দে হর্ন বাজত। আমাদের সবার ইচ্ছে হত একবার অন্তত ওই হর্নটা বাজাবার! কিন্তু খিটখিটে ড্রাইভারকাকু কাউকেই বাজাতে দিত না।
চওড়া টমাস বাটা এভিনিউয়ের দু'পাশে সার দেওয়া কৃষ্ণচূড়ার তলায়, সেই নিউল্যান্ড বাসস্ট্যান্ডে আমরা দাঁড়িয়ে থাকতাম কখন সেই নীল ছোট্ট স্কুলবাস অভিমানী বাচ্চার মতো হর্ন দিতে দিতে আসবে, তার অপেক্ষায়।
ছোটবেলাটা ছিল অপেক্ষা দিয়ে মোড়া একটা জীবন। কবে মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার আসবে আর আমি সেজকাকার সঙ্গে প্লেয়ার্স মেস-এ খেতে যাব! কবে অরুণাচল সঙ্ঘের মাঠে সেভেন-আ-সাইড ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু হবে! কবে সন্ত রুইদাসের জন্মদিনে বাটা ফ্যাক্টরি থেকে আমাদের দেওয়া হবে রঙিন মুখোশ, বেলুন আর কমলা সবুজ সব লজেন্স! কবে দুর্গাপুজো আসবে আর মেলে রাখা বাসন্তী শাড়ির মতো রোদের নীচে সেজে উঠবে আমাদের ছোট্ট ঝুলনের মতো অমলিন বাটানগর! আর কবে বর্ণালী আমায় আবার বলবে, ‘কাল বিকেলে খেলতে এলি না কেন রে!’
ছোটবেলার কথা বলতে গেলে বড্ড এদিক ওদিকের কথাও চলে আসে। যেমন সকাল পেরিয়ে চলে আসত সেই গরম ডালের মতো ফুটন্ত দুপুর!
আচ্ছা, কী এমন ছিল সেই ছোটবেলার সকালগুলোয়? সবই তো ছিল খুব সাধারণ। ছোট্ট মফস্সল শহরের আরেকটা দিনের মতোই তো ছিল সেইসব দিন। সেই গুপ্তদার হার্ডওয়ার স্টোর্স! মনীন্দ্রদার মুদিখানার দোকানের পাতলা ভিড়। ‘দি লাইফ’ ওষুধের দোকানে কানে ট্রানজিস্টার ধরে বসে থাকা আশিসকাকা! ঘোষ বাইন্ডিং-এর ঘোষজেঠুর মাথা নিচু করে একমনে কাজ করে যাওয়া! বা কাঠগোলার কাঠের টালের ওপর যেখানে এলোমেলো রোদ এসে পড়ে, সেখানে গুটি মেরে শুয়ে থাকা সাদা বেড়াল! কী ছিল পুকুরপাড়ের সেই সবুজ ছায়া ঘেরা বাঁশঝাড়ের মধ্যে? দূরে চ্যাটার্জিপাড়ার জল ট্যাংকের ওপর আকাশ বেয়ে উঠতে থাকা ভোরের আলোর মধ্যে? কী ছিল ঢালীদাদুদের বাড়ির ওপর দিয়ে বয়ে আসা সকালবেলার হাওয়ায় ভাসতে থাকা কাগজফুলের মধ্যে? সবই তো খুব সাধারণ! সবই তো সামান্য! চোখে না পড়ার মতো ছোট্ট ঘাসফুল যেন!
আজ এই শহরে অনিশ্চিত রোদের সকালবেলায় বসে তবু সেইসব দিনকেই রূপকথার মতো মনে হয়! মনে হয় এই মনখারাপ, অস্থির আর অনিশ্চয়তার দিন ঠিক কেটে যেত যদি ছোটবেলার মতো মা এসে দাঁড়াত মাথার কাছে। বলত, ‘এবার ওঠ। অনেক বেলা হয়ে গেছে, স্কুল যাবি না!’
আমাদের সবারই সকালবেলাগুলো কেমন যেন আলাদা হয়েও কোথায় আবার এক! আমাদের সবারই সেইসব সকালবেলাগুলো যেন আজও মনে মনে বেঁচে থেকেও আর সত্যি সত্যি বেঁচে নেই কোথাও ৷
কুড়ি বছর হল মা হারিয়ে গিয়েছে অনন্তে। সেই হায়েতপুর গ্রামের বৃদ্ধা, মনুদা, ইয়া মোচওলা পণ্ডিতজি— সবাই মিলিয়ে গিয়েছে সকালবেলার শিশিরের মতো! তবু রোজকার কঠিন আর মনখারাপের দিনগুলো পার করতে আমি বাকি সবার মতোই সেই ছোটবেলার সকালগুলোর হাতই ধরি। মনে মনে দেখি রোগা বৈষ্ণবদাদু আবার আজ এসেছে আমাদের পাড়ায়। দেখি, পঁচিশ পয়সা মুঠোর মধ্যে ধরে ছোট্ট আমি আবার দাঁড়িয়ে রয়েছি। আর দাদু শ্রীখোল বাজিয়ে গাইছে সেই গান। দেখি পাখির ডানায়, ধুলোয়, ঝরে পড়া গাছের পাতায় ভেসে আছে— ‘সব হবে, আজ সব হবে/ ও ভোলা মন তোমার জোরে সব হবে!’ দেখি কাজের দিদি আজও নানান কাজের ফাঁকে গলা মেলাচ্ছে সেই গানে, সেই সুরে!
আর সেই সুরেই ছোট্ট ঘাসফুল মাথা দোলাচ্ছে হাওয়ায়। প্রজাপতি উড়ছে! আর হাসিখুশি সময়ের বাতাসে বইছে বড় অমূল্য, বড় সাধারণ একটা দিন!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন