স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
সারা বছরের সব রকমের ছুটির মধ্যে আমাদের গরমের ছুটির আনন্দটা ছিল সবচেয়ে বেশি। গরমের ছুটির একমাস আগে থেকে আমাদের মর্নিং স্কুল শুরু হত। তারপর সেই মর্নিং স্কুলের শেষদিনে রবীন্দ্র জয়ন্তীর অনুষ্ঠান হয়ে স্কুল ছুটি পড়ে যেত! আসল রবীন্দ্র জয়ন্তী আগে হয়ে গেলেও তার উদযাপনটা হত স্কুলে ছুটি পড়ার দিন।
মে মাসের কুড়ি বা একুশ তারিখ নাগাদ ছুটি পড়ত আমাদের। আর স্কুল খুলত জুনের কুড়ি বা একুশ তারিখ। মানে আমার জন্মদিনটা বরাবর গরমের ছুটির মধ্যেই পড়ত। তাই অন্যান্য অনেকে স্কুলে নিজেদের জন্মদিনে টফি নিয়ে গেলেও আমার সেই টফি নিয়ে যাওয়ার সুযোগ কোনওদিন হয়নি।
আমাদের মফস্সল শহরের নঙ্গী অঞ্চলটা ছিল বেশ ঘিঞ্জি। ছোট বড় নানান বাড়িঘর যত্রতত্র পরিকল্পনাহীনভাবে ছড়িয়েছিটিয়ে ছিল। তাই যতটা হাওয়া বাতাস খেলার কথা ততটা খেলত না। বেশ গরম থাকত। শুধু বিকেলের দিকে হাওয়া দিত আমাদের বাড়ির দক্ষিণদিকের বড় পুকুরের দিক থেকে! বাকি গোটা দিন বেশ হাঁস-ফাঁসে ভ্যাপসা থাকত। আর তার সঙ্গে ছিল লোডশেডিং। আমরা বলতাম কারেন্ট অফ! তাও গরমের ছুটির নিজের যে আনন্দ ছিল তাতে ঢাকা পড়ে যেত সব।
গরমের ছুটির পরপরই শুরু হত হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষা। তাই ছুটিতে পড়াশুনো করতে হত বেশ। সকালে সাড়ে সাতটা থেকে দশটা, দুপুরে কমপক্ষে এক প্রশ্নমালা অঙ্ক, আর সন্ধেবেলা সাড়ে ছ'টা থেকে ন'টা! এই ছিল পড়ার রুটিন! আর তার বাইরে ছিল খেলা। শুধুই খেলা। ফুটবল থেকে শুরু করে বিকেলে বাটার কোয়ার্টারের মাঠে আরও ছেলেমেয়েদের সঙ্গে লুকোচুরি, ছোঁয়াছুয়ি পার করে রাতে বাড়িতে সবাই মিলে ক্যারাম! খেলাধুলো ছাড়া আর কিছু ছিলই না জীবনে।
ছোটবেলায় খুব একটা ঘুরতে যাওয়ার সুযোগ হয়নি আমার। সেই ক্লাস টু-তে পড়ার সময় দেহরাদুন-মুসৌরি যাওয়া ছাড়া আর কোথাও আমি যাইনি। তাও ছুটির সময়ে আমার দাদুর বাড়িতে যেতাম দিন দশেকের জন্য!
বেলঘড়িয়ায় ছিল আমার দাদুর বাড়ি। জায়গাটার নাম নিমতা, জোড়া গমকল। বেলঘড়িয়া বললেও জায়গাটা থেকে বিরাটিও খুব কিছু দূর ছিল না।
গরমের ছুটিতে দাদুর বাড়িতে যাওয়ার একটা অন্য মজা ছিল। আমার দাদু যাকে আমি দাদুভাই বলতাম, ছিল জমিদারবাড়ির ছেলে। পূর্ববঙ্গের সৈঙ্গরে ছিল তাঁদের জমিদারি। দেশভাগের আগেই তারা যতটা সম্ভব সবকিছুর ব্যবস্থা করে এদিকে চলে এসেছিল। তারপর নিমতার চৌধুরীপাড়ায় একটা বড় বাড়ি আর অনেকখানি জমি কিনে বসবাস শুরু করেছিল।
আমার দাদুর বাড়িটা সত্যি বিশাল ছিল। আমাদের বাটানগরের সাড়ে সাতশো স্কোয়্যার ফুটের মধ্যে ঠেসেঠুসে বারো পনেরোজন মিলে থাকায় অভ্যস্ত আমি-র ওই বড় বাড়িটায় গেলে কেমন যেন অবাক লাগত!
এত বড় বড় ঘর! এত উঁচু সিলিং! তাতে কড়িবরগা! বড় বড় দুটো ছাদ! তার একটা আবার জলছাদ! পেঁচানো সিঁড়ি! পুরনো কুয়ো! দেওয়ালে ঝোলানো হরিণের মাথা! আরও কত কী!
বাড়ির সামনে ছিল বিরাট জায়গা। দাদুভাই পুরোটাই পাঁচিল দিয়ে ঘিরে দিয়েছিল। গেট দিয়ে ঢুকে বাঁদিকে ছিল ফলের বাগান। আর বাগানের পাশে, বাড়ির সোজাসুজি ফাঁকা ঘাস-বোনা লন। আর তার ডানদিকে জমি যেখানে ঢালু হয়ে গিয়েছে, সেখানে ছিল তরকারি বাগান!
ফলের বাগানে আম, কাঁঠাল, জামরুল, লিচু, পেয়ারা, জাম, আখ থেকে শুরু করে আরও কত কী যে ছিল! তরকারি বাগানেও ছিল প্রায় সবরকম তরকারি। এ ছাড়াও নারকেলগাছ, তালগাছ, কুলগাছ তো ছিলই। ছিল নানান রকমের ফুল!
ওই বাড়িতে গেলে রাত দশটার মধ্যে শুয়ে পড়তে হত আর সকাল সাড়ে ছ'টার মধ্যে উঠে পড়তে হত। আসলে চারিদিকে এত বড় বড় জানলা ছিল যে সকালে সেগুলো দিদুন যেই খুলে দিত অমনি হইহই করে আলো ঢুকে আসত ঘরে! আর আলোর মধ্যে কোনওদিন আমার ঘুম আসে না!
দাদুর বাড়িতেও পড়ার বই নিয়ে যেতে হত। আমার দিদুন ছিল খুব কড়া। তাই ফাঁকি দেওয়ার উপায় ছিল না। কিন্তু পড়া হয়ে গেলে সেখানেও খেলাই ছিল সব।
দাদুর বাড়িতে মনোজ নামে একটা ছেলে থাকত। সেই ছিল আমার খেলার সঙ্গী! ওর সঙ্গে মূলত ক্রিকেট খেলতাম। তারপর এমনি একা একা এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতাম!
নিমতা অঞ্চলে খুব পুরনো পুরনো সব বাড়িঘর ছিল। তার মধ্যে বেশ কিছু ছিল পরিত্যক্ত আর ভাঙাচোরা! আর ছিল বড় বড় ঝিল। একটা ঢিবি ছিল যার আশপাশে খুব পুরনো শ্বেত পাথরের থাম আর পাথর পড়ে থাকত!
জোড়া গমকলের সামনের রাস্তা দিয়ে কিছুটা দূরে গেলেই দেখা যেত বেশ বড় এক মন্দির! বন্ধু বিহারীর মন্দির! আমার দাদুভাই-দিদুন যেহেতু বৈষ্ণব ছিল, তারা ওই মন্দিরে প্রায়ই যেত। সেই মন্দিরে যাওয়ার পথেও খুব পুরনো বাড়িঘর আর ধ্বংসাবশেষ পড়ত! নিমতার সেই পুরনো বাড়িঘর, পুকুর, ঝিল, ছোটবড় বাঁশবন, ছোট ছোট জঙ্গল, ছায়াচ্ছন্ন রাস্তাঘাটের মধ্যে কীসের যেন এক রহস্য খেলা করত। হাওয়ায় জড়িয়ে থাকত ফিসফিস! সন্ধের মুখে খয়েরি অন্ধকারে কেমন যেন ঝুম হয়ে থাকত চারিপাশ! অকারণে, সম্পূর্ণ অকারণে গা ছমছম করত আমার! আবছাভাবে মনে হত এখানে কি আরও কিছু ছিল? কে এমন বিশাল সব বাড়িঘর তৈরি করে গিয়েছিল যা এখন খন্ডহর! কে কাটিয়েছিল এমন বাঁধানো ঘাটওলা ঝিল! ওই দূরে সায়রের পাশে যেখানে শীতকালে পরিযায়ী পাখিরা আসে তার পাশের ভাঙা নারায়ণের মন্দির তৈরি করেছিল কারা!
কিন্তু এসব কাউকে জিজ্ঞেস করতাম না। শুধু শুনতাম চৌধুরীপাড়াটা নাকি আগে আরও বড় ছিল। এখানে চৌধুরী উপাধিধারী জমিদাররা থাকতেন!
পরে, অনেক পরে, বেলঘড়িয়ার সঙ্গে আমাদের সব সম্পর্ক শেষ হওয়ার পরে জেনেছিলাম যে এইখানে, এই নিমতা বিরাটি অঞ্চলে বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার বসতি স্থাপন করে নিজের জমিদারির কাজকর্ম শুরু করেন! তাঁর ও তাঁর উত্তরপুরুষের সময়কার বানানো সব বাড়িঘর পরবর্তীকালে এমন খন্ডহর হয়ে গিয়েছে! ইতিহাসবিস্মৃত ও বিমুখ বাঙালি জানেও না তারা কীসব অমূল্য ঐতিহ্য হেলায় নষ্ট করে ফেলেছে!
সেই যে বন্ধু বিহারীর মন্দির, সেখানে একটা ছোটখাটো চিড়িয়াখানাও ছিল। এক গরমের ছুটিতে দাদুর বাড়িতে গিয়ে, ওই চিড়িয়াখানায় রাখা লালমুখো বাঁদরের হাতে আমি মার খেয়েছিলাম!
তখন আমার বয়স বড়জোর পাঁচ। বোধ পাকেনি। তাই খাঁচার বাইরে দাঁড়িয়ে একটা বাঁদরকে নানানভাবে জ্বালাতন করছিলাম! বুঝতে পারিনি যে খাঁচার ফাঁক দিয়ে বাঁদরের হাতটা গলে বেরিয়ে আসতে পারে! ব্যাস, বাঁদরটা আমায় অনেকক্ষণ সহ্য করার পরে আচমকা এগিয়ে এসে এক চড় মেরেছিল আমার গালে!
সেই ছোট বয়সে বুঝেছিলাম যে কখনও কাউকে উত্ত্যক্ত করতে নেই! পেছনে লাগতে নেই! সবাইকে তাঁর মতো করে শান্তিতে থাকতে দিতে হয়!
এখন এই বয়সে এসে দেখি, আশপাশের অনেকেরই ছোট বয়সে অমন একটা শিক্ষার দরকার ছিল!
নিমতায় থাকার একটা ভয় ছিল। সেটা হল সাপ! গরমকালে ওই বড় বাড়ি আর তার পাশের ছড়ানো বড় জায়গা থেকে নানানরকম সাপ বেরত! তার মধ্যে কেউটে আর গোখরোও ছিল। এই ব্যাপারে আমি খুব ভয় পেতাম। তাই খুব ঘন জঙ্গুলে এলাকা এড়িয়ে চলতাম। এখানে আরেকটা বিপদ ছিল। সেটা হল বিচুটিপাতা! কতবার যে হাতেপায়ে আমার এই পাতা লেগেছে! আর সেকি বিচ্ছিরি জ্বালা আর চুলকানি!
তবে এসব বাদ দিলে দাদুর বাড়িতে ওই সাত-দশদিনের ঘুরে আসাটা ভালই লাগত। গরমের ছুটিতে একটা আলাদা আকর্ষণ ছিল ওটা।
বাড়িতে ফিরে আবার সেই একই রুটিন! সকালে পড়া। দুপুরে অঙ্ক! সন্ধেবেলা আবার পড়া! শেষের দিকে গরমের ছুটি ক্রমশ একঘেয়ে লাগত। মনে হত কবে আবার স্কুল খুলবে কে জানে!
এই গরমের ছুটির আরেকটা দিক ছিল গল্পের বই! কিন্তু আট-নয় বছর বয়স অবধি আমার গল্পের বই বলতে ছিল বাঁটুল দি গ্রেট, হাঁদা ভোঁদা আর নন্টে ফন্টে! তার বাইরে ভাইপোর থেকে মাঝে মাঝে গোয়েন্দা গল্প শুনতাম। ভাইপো নিজের মতো করে বলত গোয়েন্দা দীপক চ্যাটার্জি আর তার অ্যাসিস্ট্যান্ট রতনলালের গল্প! কিন্তু সেই বয়সে গল্পের বইও যে বেশিক্ষণ পড়তে ভাল লাগত তা নয়।
এর মধ্যে কখনও সখনও বাবার সঙ্গে অফিস যেতাম। সেই লোকাল ট্রেন। বালিগঞ্জ স্টেশন। ট্রাম! কিন্তু সেটাও তো এক বা দু'দিন! তারপর? মাঝে মাঝে খেলা দেখা থাকত! কিন্তু বর্ষা আসার আগে সেসময় খুব কিছু টুর্নামেন্ট শুরু হত না! আর এত গরমে খেলবেই বা কে!
জুনের প্রথম সপ্তাহ থেকেই আর ভাল লাগত না। বন্ধুদের জন্য মনকেমন করত! স্কুলের খেলার জন্য মনখারাপ করত! রোজ সকালে উঠে দেখতাম আজ কত তারিখ! শুনতাম আর ক'দিন বাকি আছে স্কুল খোলার
তারপর আসত জন্মদিন! না আমার তাতে একদমই আনন্দ হত না। আমার আনন্দ হত এই ভেবে যে এবার স্কুল খুলবে! ছুটি অবশেষে তার গুরুত্ব হারাত !
আজ আমি ছুটি-হীন জীবন কাটাই। তাই হয়তো বড্ড মনে পড়ে ছোটবেলার সেইসব গরমের ছুটির সময়গুলো! কিছু না করে অলসভাবে পুকুরের দিকে তাকিয়ে বসে থাকার সময়গুলো! আর এটাও বুঝি, আমরা যখন যা পাই তখন তার সঠিক গুরুত্ব আমরা দিতে পারি না! আর এই না পারাটাই হয়তো আমাদের, মানুষদের চিরকাল অতৃপ্ত রাখে! অসুখী রাখে!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন