স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
বাবার কাছে শুনেছি বাবা যখন সেই ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে যাদবপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ত তখন লোকাল ট্রেন চলত কয়লার ইঞ্জিনে। আর ট্রেনে বগি থাকত চারটে। তবে তার প্রায় দুই দশক পরে, আমি আমার ছোটবেলায়, এখনকার মতোই সবুজ আর হলুদ ট্রেন দেখেছি। তবে তখন ট্রেনের বগি থাকত আটটা।
বাটানগর ছেড়ে কলকাতায় চলে আসার পরে লোকাল ট্রেন হয়ে উঠল আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এর একটা কারণ আছে। সবাই সাধারণত মফস্সল থেকে শহরের স্কুলে পড়তে আসে। কিন্তু আমার বেলায় হল উল্টোটা। আমি শহর থেকে মফস্সলের স্কুলে পড়তে যেতাম।
ছিয়াশি সালে নার্সারি স্কুল থেকে পাশ করে, সাতাশি সালের জানুয়ারিতে আমি হাই স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। আমার নতুন স্কুলের নাম নঙ্গী হাই স্কুল। আর এই স্কুলে ভর্তি হওয়ার মাস চারেকের মধ্যেই আমরা চলে এসেছিলাম কলকাতায়। তাই স্কুলে যাওয়ার জন্য ট্রেন ছাড়া গতি ছিল না।
আমার বাড়ির কাছে টালিগঞ্জ রেল স্টেশন। সেখান থেকে লোকাল ট্রেন ধরলে আধঘণ্টা লাগত নঙ্গীতে পৌঁছতে। স্টেশন থেকে পাড়ার ভেতর দিয়ে মিনিট পনেরো হাঁটলে আমার স্কুল। আমি বাড়ি থেকে সোয়া ন'টায় বেরলে সব মিলিয়ে সোয়া দশটার মধ্যে স্কুলে ঢুকে যেতে পারতাম।
এই শহর থেকে মফস্সলে স্কুলে পড়তে যাওয়ার জন্যই লোকাল ট্রেন আমার জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠল।
তখন টালিগঞ্জ স্টেশনে একটাই প্ল্যাটফর্ম ছিল। স্টেশনের মাঝখানে ছিল শেড দেওয়া টিকিটঘর। তার সঙ্গে চায়ের দোকান। সরাসরি টিকিটঘরে ওঠার জন্যও একটা কাঠের সিঁড়ি ছিল যা অন্যদিকের রাস্তা দিয়ে উঠে আসত।
এই স্টেশনে একটা ভয়ঙ্কর অমানবিক জিনিস আমি বছরের পর বছর দেখেছি। টালিগঞ্জ স্টেশনে তখন প্ল্যাটফর্ম ছিল একটা এবং প্ল্যাটফর্মের তলাটা ছিল ফাঁকা! আর সেইখানে মানুষজন বসবাস করত। এমনিতে লাইনের ধারে অনেক জায়গাতেই ছোট নড়বড়ে বাড়িতে অনেকে বাস করত। কিন্তু এমন করে প্ল্যাটফর্মের তলায় ওইটুকু জায়গার মধ্যে যে মানুষ থাকতে পারে সেটা না দেখলে বিশ্বাস হত না! প্ল্যাটফর্মের গা ঘেঁষেই তো রেললাইন! মনে আছে যারা ওই প্ল্যাটফর্মের তলা দিয়ে বেরত তারা আগে মাথাটা বের করে দেখে নিত কোনওদিক থেকে ট্রেন আসছে কিনা!
রেললাইনের ওপরেই বাচ্চারা বসে থাকত। ট্রেন আসত যখন তারা অলসভাবে লাইনের থেকে সরে যেত! কখনও কখনও দু’-আড়াই বছরের বাচ্চারা সরতও না! মানে বুঝত না তো যে ট্রেন আসছে! তখন যাত্রীরা প্ল্যাটফর্মের ওপর থেকে চিৎকার করত! আর ওই লাইনের পাশে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা মানুষজনের মধ্যে থেকে কেউ এসে বাচ্চাটাকে সরিয়ে নিয়ে যেত!
আরেকটা জিনিস দেখে খুব কষ্ট হত। আপ ট্রেনে করে অনেক চাল আসত তখন। দেখতাম ট্রেন থামলেই ভেন্ডার থেকে পরের পর বস্তা নামছে। তারপর প্ল্যাটফর্মের তলায় যারা থাকত তাদের মধ্যে থেকে কেউ কেউ কুলি হিসেবে সেই বস্তাগুলো মাথায় করে নিয়ে স্টেশন থেকে চলে যেত।
ওরা চলে যাওয়ার পরে প্ল্যাটফর্মে অনেক চাল পড়ে থাকত। তখন বেশ কিছু মহিলা আসত। হাতে তাদের ঝাঁটা আর প্লাস্টিকের ব্যাগ থাকত। তারা ওই প্ল্যাটফর্মের ওপর পড়ে থাকা চাল ঝাঁট দিয়ে প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরত। রান্না হবে যে! দুপুরের খাবার ছিল সেই চাল!
এই মানুষগুলো এত দারিদ্রের মধ্যেও কিন্তু অসৎ কাজ করত না! পরিশ্রম করে, কষ্ট করে যেটুকু জোটাতে পারত সেটুকু নিয়েই ওই প্ল্যাটফর্মের নীচের ভয়াবহ অবস্থায় বেঁচে থাকার চেষ্টা করত!
এখন এসবের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যখন খবরে দেখি বা পেপারে নানান দুর্নীতির কথা জানি তখন যে কী খারাপ লাগে তা লিখে বোঝানো সম্ভব নয়! মানুষের মতো দেখতে হলেই যে সবাই মানুষ হয় না সেটা বুঝি!
ট্রেনে করে যেহেতু রোজ যেতে হত তাই আমায় মান্থলি করে দেওয়া হয়েছিল। আর একজনকে ঠিক করে দেওয়া হয়েছিল যে আমায় নিয়ে যাওয়া-আসা করবে। তার নাম ছিল আশিস ঘোষ। আমি বলতাম আশিসকাকা (এ কিন্তু পঙ্কার বন্ধু সেই আশিসকাকা নয়)।
আশিসকাকা বাটা থেকে কিছু বাচ্চাকে নিয়ে আসত নবনালন্দা স্কুলে। আর তারপর ফেরার সময় আমায় নিয়ে যেত বাটায়। বিকেলেও স্কুল ছুটির পরে আমি আশিসকাকার বাড়ি চলে যেতাম। সেখান থেকে আশিসকাকা আমায় সঙ্গে করে নিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিত!
ক্লাস ফাইভেই মোটামুটি এমন হয়েছে। তারপর ক্লাস সিক্স থেকে আমি একাই যাতায়াত করতাম।
আমি যে লাইনে ট্রেনে করে যেতাম সেটা ছিল শিয়ালদা-বজবজ লাইন। তখনও ডাবল লাইন হয়নি। সেটা ছিল সিঙ্গল লাইন আর ক্রসিংয়ের যুগ!
মানে যেহেতু একটা লাইন দিয়েই ট্রেন যেত তাই মাঝে মাঝে স্টেশনে একটা ট্রেন দাঁড় করিয়ে অন্য একটা ট্রেনকে উলটোদিকে পার করে যেতে দেওয়া হত। কারণ একমাত্র স্টেশনেই থাকত ডাবল লাইন। এই দুটো ট্রেনকে একটা স্টেশন ‘ক্রস' করতে দেওয়াকে বলা হত ক্রসিং! আর যে ট্রেনটা আগে এসে স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকত তার গার্ড একটা বড় লোহার রিং দিত স্টেশনের একজন কর্মীকে। সেই রিঙের মধ্যে একটা ধাতুর বল থাকত। এবার অন্য ট্রেনটা এসে দাঁড়ালে তার গার্ডকে ওই ধাতুর গোলাসহ রিঙটা হাতে ধরিয়ে দেওয়া হত। একটা ট্রেন থেকে অন্য ট্রেন যতক্ষণ না এই গোলাটা পাবে ততক্ষণ দ্বিতীয় ট্রেনটা ছাড়তে পারবে না। এই গোলা ট্রান্সফারটা কেন হত কে জানে! কেউ কেউ বলত এর মানে নাকি ওইদিকে লাইন ক্লিয়ার! কিন্তু আসল কারণটা কী আমি জানতে পারিনি!
তখন ট্রেন লেট হত খুব। শিয়ালদা বজবজের দূরত্ব বেশি ছিল না, তাতেও ট্রেনের কুড়িপঁচিশ মিনিট লেট হওয়াটা জলভাত ছিল। আর খারাপ দিনে তো একঘণ্টাও লেট হত ট্রেন! আর সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, যাত্রীরাও সেসব মেনেও নিত।
স্কুল বসত এগারোটার সময়ে। পৌনে এগারোটায় শুরু হত প্রেয়ার। তার আগে স্কুলে ঢুকতে না পারলে হেডস্যার খুব বকতেন। এমনকী কানমলাও খেতে হত! ফলে ট্রেন লেট হলে আমার খুব টেনশন হত! ছোট থেকেই আমার টেনশন করার একটা প্রবণতা আছে। নানান ছোটখাটো কারণে আমার উদ্বেগ বেড়ে যেত। তার মধ্যে একটা ছিল ট্রেন লেট করা। আমার মনে আছে পরীক্ষার সময় আমি অন্তত দু'ঘণ্টা আগে বাটায় গিয়ে বসে থাকতাম।
যেহেতু সেখানে তখন আমার আত্মীয়দের বাড়ি ছিল ফলে বাটায় গিয়ে থাকার অসুবিধে হত না৷
তখন ট্রেনের মান্থলি ছিল হলদে আর্ট পেপারের মতো একটা কাগজের তৈরি। তাতে হাতে করে লিখে দেওয়া হত নাম। আর টিকিট ছিল মোটা খাকি রঙের এক ধরনের কাগজের। অনেকটা যেন কার্ডবোর্ডের কাগজ। তাতে স্টেশনের নাম লেখা থাকত। আর টিকিট কাটার সময় টিকিট কাউন্টারে বসা লোকটি একটা যন্ত্রের মধ্যে টিকিটটা ঢুকিয়ে ঘটাংঘট শব্দ করে সেটাকে পাঞ্চ করে দিত! ওটা ছিল টিকিটের গায়ে তারিখ ছাপাবার প্রক্রিয়া! মাঝে মাঝে সেটা কালিতে ছাপানো হত আর মাঝে মাঝে শুধু ইম্প্রেশন' দিয়ে দেওয়া হত!
তখন টিকিটের দাম খুব অল্প ছিল। কিন্তু তাও দেখতাম প্রচুর মানুষ টিকিট না কেটে ট্রেনে যাচ্ছে। একে বলা হত উইদাউট টিকিটের যাত্রী! আমি অবাক হয়ে দেখতাম এই যে টিকিট না কেটে রেল কোম্পানিকে ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে সেটাও বড় মুখ করে, যেন খুব কৃতিত্বের ব্যাপার, সেভাবে বেশ কিছু লোক শো অফ করত! আমারই এক পিসেমশাই ছিল যে কিছুতেই টিকিট কাটত না। এমন করে সে কত টাকা জমিয়েছিল আমার জানতে ইচ্ছে করত খুব।
সে সময় টিকিট চেকিং হত না খুব একটা। দু' বছর-তিন বছরে একদিন হয়তো চেকিং হত। ‘রানিং চেকিং’ বলত সবাই। তবে সেটারও খবর হয়ে যেত। আর টিকিট না-কাটা লোকজন সেদিন ঝাঁপিয়ে পড়ে টিকিট কাটত। তার মধ্যেও কেউ কেউ ধরা পড়ত। তবে তার সংখ্যা ছিল বেশ কম।
আরও পরের দিকে দেখতাম স্পেশাল ট্রেন দেওয়া হত চেকিং-এর জন্য। সেই ট্রেনের নাম ছিল ‘চেতনা’! যেদিন অমন ট্রেন দেওয়া হত, দেখতাম একদিকের ট্রেন থামলেই পরোপকারী লোকজন ‘এই চেতনা দিয়েছে, চেতনা দিয়েছে' বলে চিৎকার করতে শুরু করত! তবে তাতে যে লোকজনের খুব চেতনা ফিরত তেমন অপবাদ কেউ দিতে পারবে না।
লোকাল ট্রেনে চড়ার একটা বড় ব্যাপার হল হকার! কত রকমের হকার যে ট্রেনে দেখেছি আজ ভাবলে অবাক লাগে। তবে তার মধ্যে লজেন্স বিক্রিওলা ছিল সবচেয়ে বেশি। একটা কুড়ি পয়সা, তিনটে পঞ্চাশ আর টাকায় ছ'টা! এখনও কানের মধ্যে লজেন্সের হকারদের সুর করে বলা এই কথাগুলো বাজে! তখন ছ’কোনা কুড়ি পয়সার মূল্য ছিল। থিন অ্যারারুট বিস্কিটের মতো ঢেউখেলানো দশ পয়সাতেও হজমি পাওয়া যেত!
এই লজেন্স ছাড়াও গরমকালে ট্রেনে বিক্রি হত ‘পেপসি’! না কোনও কোল্ড ড্রিঙ্কের কথা বলছি না। এটা হল সরু স্বচ্ছ প্লাস্টিকের প্যাকেটে ভরা লম্বাটে, রঙিন ও মিষ্টি বরফ! মানে অনেকটা সেই বরফের কাঠি আইসক্রিমকে কেউ যদি লম্বা আর সরু করে প্যাকেটে ভরে বিক্রি করে, তেমন। হকাররা থার্মোকলের বাক্সে ওই পেপসি ভরে নিয়ে বিক্রি করত। এক টাকায় একটা পাওয়া যেত। গরমকালে দেখতাম এই পেপসি হু হু করে বিক্রি হচ্ছে!
আর ছিল বাদাম! ‘সল্টেস বাদাম’! ‘সল্টেড' কথাটাকে সবাই বলত ‘সল্টেস’! লম্বা মালার মতো বাদামের প্যাকেট। যে কিনত তাকে ছোট্ট একটা কাঁচি দিয়ে প্যাকেট কেটে হাতে ধরিয়ে দেওয়া হত। একই ভাবে চানাচুর আর সবুজ রঙের মটরও বিক্রি হত।
দাদ হাজার মলম, ইঁদুর মারার বিষ, অম্বল ও অজীর্ণ রোগের ওষুধ-চূর্ণসহ আরও কত কী যে বিক্রি হত ট্রেনে। আর একেক জনের ছিল একেক রকম সুর করে বিক্রি করার পদ্ধতি। কখনও কখনও দু'জন ভিন্ন ধরনের জিনিস নিয়ে ওঠা হকারের সুর করে ডাক মিশে যেত! তখন অদ্ভুত শুনতে লাগত!
দাদ হাজার মলম বিক্রি করছে যে সে হয়তো বলল, ‘আপনার যদি দাদের কারণে চুলকায় তা হলে....' ঠিক তখনই পাশের থেকে পেপসি বিক্রেতা ছেলেটা বলে উঠল, ‘পেপসি খান! টাকায় একটা!”
ফলবিক্রেতারাও উঠত। মোসাম্বি, কমলালেবু, আপেল, কলা, সবেদা, আনারস, আম, লিচু, জাম! সবকিছু উঠত! আর সবাই একটাই কথা বলত, ‘চিনির মতো মিষ্টি! না হলে পয়সা ফেরত!’ যদিও আমি কাউকে কোনওদিন পয়সা ফেরত নিতে দেখিনি!
আরেকজন কাকু উঠত পেন নিয়ে। ছোট বড় নানান আকারের রংবেরঙের পেন! সে সবার কাছে গিয়ে বলত, “কী, হবে নাকি? চলবে নাকি? আপনি না চললেও আমার পেন চলবে!’
একজন জোয়ানের আরক আর হজমি বিক্রেতা উঠত। সে সবাইকে হজমির ফ্রি স্যাম্পল দিত। কিন্তু আমি নিতাম না। আমার লজ্জা লাগত খুব। কারণ আমার কাছে তো টাকা নেই! লোকটা ফ্রি দিচ্ছে এই আশাতেই, যে কেউ খেয়ে তারপর নিশ্চয়ই কিনবে! কিন্তু আমার পক্ষে তো কেনা সম্ভব নয়! তা হলে ফ্রি নেব কেন?
আসলে মা আমায় একটা দশ টাকার নোট দিয়ে রাখত প্রতি মাসে। কারণ মাঝপথে যদি ট্রেন বন্ধ হয়ে যায় তা হলে কিছু একটা উপায় করে তো বাড়ি ফিরতে হবে! তাই ওই টাকাটা ছিল আমার বিপদের মধুসূদন! এমনি খরচ করা বারণ! তাই আমার কাছে টাকা থাকলেও আসলে সেটা ছিল না থাকার মতোই!
টাকা ওইভাবে খরচ না করার আরেকটা কারণ ছিল। একবার ক্লাস সিক্সে পড়ার সময়ে আমি লোভে পড়ে স্কুলের কাছের 'কমলা পুস্তকালয়' থেকে ওই টাকা দিয়ে অনেকগুলো অরণ্যদেবের স্টিকার কিনেছিলাম। ওইভাবে ওই দশ টাকা খরচ করায় মা এমন বকেছিল যে তারপর থেকে আর জীবনে আমি জিজ্ঞেস না করে কিছু কিনিনি!
হকারদের কথা বলতে গিয়ে এটাও বলতে হবে যে মেন লাইনের মতো মুড়ি মাখা, শিঙাড়া, চা বা এমন খাবারদাবারের হকার কিন্তু তখন বজবজ লাইনের ট্রেনে উঠত না।
যাতায়াত করতে করতে অনেক হকারকাকু আমার চেনাশুনো হয়ে গিয়েছিল। একজন ছিল সে খবর কাগজ বিক্রি করত। লোকটি লম্বা, চাপদাড়ি, ঘাড় অবধি চুল। লোকটির নিজস্ব একটা স্টাইল ছিল। বেশ গম্ভীরভাবে ‘পেপার পেপার’ বলে কারও দিকে বিশেষ না তাকিয়ে কামরার একদিক থেকে অন্যদিকে যেত। ব্রেসব্রিজ স্টেশনের পরে ট্রেনটা এতটাই ফাঁকা হয়ে যেত যে আমার মাঝে মাঝে মনে হত এখানে বেশ দৌড়ে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা যায়৷ লোকটি এই সময়ে আমার পাশে এসে বসত। আমি বরাবর ট্রেনে গল্পের বই নিয়ে যেতাম। লোকটি আমার হাতের থেকে বই নিয়ে উলটে পালটে দেখত! তারপর ছোট করে বলত, ‘পড়ছ? ভাল, ভাল।’
শুধু যে হকার তা নয়। ট্রেনে উঠলে কত রকমের যে ভিখিরি দেখা যেত! টালিগঞ্জ স্টেশনেই একজন বসত। ওই যে টিকিটঘরের লম্বা শেড ছিল, তার একপাশের ছোট্ট জায়গাটায় বসত লোকটা।
মানুষটা অন্ধ ছিল। কালো চশমা পরত। আর সারা মুখে বসন্তের দাগ। বসন্ত রোগেই নাকি দৃষ্টি হারিয়েছিল ছোটবেলায়! লোকটার গলা সামান্য ভাঙা। কিন্তু বেশ সুর ছিল গলায়। লোকটা রফির গান গাইত! আমি রোজ শুনতাম দাঁড়িয়ে! দেখে কেমন কষ্ট লাগত আমার। এখন সেই মানুষটির কথা মনে পড়লেই রণজিৎ দাশের কবিতার সেই লাইনটা মনে পড়ে— 'যে কোনও গরিব দেশে ভিখারিরা সুগায়ক হয়।’
সেই লোকটার সঙ্গে একটা বাচ্চা ছেলেও থাকত! সে চুপচাপ বসে থাকত লোকটার পাশে। কেউ কিছু দিতে চাইলে সামান্য হেসে মাথা নাড়ত। নিত না! আমি ভাবতাম যে মানুষটি ভিক্ষে করে তার ছেলেটি কারও থেকে কিছু নেয় না কেন? তা হলে কি ওর মানে লাগে? হতেই পারে! জীবন তো বৈপরীত্যে ভরা!
ট্রেনে একজন বয়স্ক মানুষ উঠত। কথা বলত না লোকটি। লোকটির দুটো হাত কব্জির কিছুটা ওপর থেকে কাটা। লোকটির ওই কাটা হাতেই একটা কালো চামড়ার ব্যাগ ঝুলত। সেই ব্যাগের গায়ে সাদা রং দিয়ে লেখা থাকত মানুষটির জীবনের দুর্ভাগ্যের কথা। কাপড়ের মিলে কাজ করতে গিয়ে মানুষটির দুটি হাতই কাটা পড়ে। আমি দেখতাম কেউ তাকে ভিক্ষে দিলে মানুষটি কপালের কাছে দুটি অসমাপ্ত হাত জড়ো করে নিজের মনে মানুষটির মঙ্গল কামনা করত।
আরেকজন অন্ধ মানুষ উঠত ট্রেনে। ছেলের হাত ধরে গান গাইতে গাইতে ভিক্ষে করত। এত বছর হয়ে গেল তবু মানুষটির নিজের রচিত দুটি লাইন আমার মনে আছে! মানুষটি গাইত, ‘একটি পয়সা দ্যান গো বাবু/ একটি পয়সা দ্যান!/ দয়া করে দ্যান গো বাবু! দয়া করে দ্যান!’ মানুষটির বলার মধ্যে এমন একটা কিছু ছিল যে আজও আমার এই কথাগুলো মনে রয়ে গিয়েছে!
একজন বাঁশি বাজাত। সেও অন্ধ! তার মুখেও বসন্তের দাগ। তবে লোকটার যেটা বৈশিষ্ট্য ছিল তা হল লোকটি নাক দিয়ে বাঁশি বাজাত! আমি অবাক হয়ে দেখতাম! শুনতাম! লোকটি বাজাত, ‘একদিন বিক জায়েগা মাটিকে মোল/ জগ মে রহ জায়েঙ্গে পেয়ারে তেরে বোল!
বাবাকে বলে আমি মাঝে মাঝে এই লোকটার জন্য আট আনা পয়সা নিয়ে যেতাম। লোকটি রোজ আসত না। আমি আমার পেনসিল বক্সে পয়সাটা রেখে দিতাম। যেদিন আসত আমি সেই পয়সাটা খুব সংকোচের সঙ্গে তার বাড়ানো হাতে রাখতাম! আমার মনে হত এই গুণী মানুষটিকে এত সামান্য কিছু দিয়ে তার অপমানই করা হচ্ছে! কিন্তু আমার যে এর বেশি কিছু দেওয়ারই ক্ষমতা নেই! আমি ওই সামান্য আধুলির মধ্যে দিয়েই আমার প্রণাম জানিয়ে রাখতাম!
একজন ছিল যে হাতে ভর করে, কোমর ছেচড়ে, এ কামরা ও কামরায় ঘুরত। আর কেউ কিছু দিলে উচ্চস্বরে বলত, ‘ভগবানের জয়! ভগবান আপনার সকল ইচ্ছে পূর্ণ করুন!’ আমি অবাক হতাম খুব। যার পা নেই। যে এভাবে হাতে ভর দিয়ে এত কষ্ট করে এ কামরা ও কামরা করে সে এখনও ভগবানের ওপর এমন ভরসা রাখে কী করে!
তিরিশ-পঁয়ত্রিশ মিনিটের সফরে এমন কত রকমের মানুষ যে উঠত ট্রেনে। ভাবলে অবাক লাগে কী অপার দারিদ্র্য রয়েছে আমাদের চারিদিকে! এই বড় বড় বাড়ি, দামি গাড়ি, পোশাকআশাকের পাশে কী গভীর অন্ধকার! দুঃসহ কষ্ট! এসবের বাইরে ট্রেনে নানান রকম ঘটনা ঘটত!
আমি যে সময়ের কথা বলছি তখন ড্রাগস, মানে হেরোইন, ব্রাউন সুগারের উপদ্রব খুব বেড়ে গিয়েছিল। ফেরার পথে বিকেলে ট্রেনে এই সব ড্রাগ অ্যাডিক্টরা উঠত। আক্রা আর সন্তোষপুর থেকেই তারা উঠত মূলত। অপরিচ্ছন্ন জামাকাপড়। কালো পুড়ে যাওয়ার মতো মুখের চামড়া। চোখের তলায় পোড়া হাঁড়ির তলার মতো কালি! তারা কেমন যেন ঘোরের মতো থাকত সবসময়! চোখ অর্ধেক খোলা। তাকিয়ে আছে, তাও যেন তাকিয়ে নেই! কেমন যেন জম্বির মতো মানুষজন! কতদিন হয়েছে এমন লোক আমার পাশে বসেই গোটা পথ এসেছে! আমি ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়েছি একদম! তবে এমন মানুষরা কারও কোনও ক্ষতি করত না! নিজের মতো কেমন একটা অন্য জগতে যেন থাকত!
তবে পরে একবার বেশ ভয়ঙ্কর একটা কাণ্ড ঘটেছিল! সেটা ছিল বিরানব্বই সাল। আমি ক্লাস টেনে পড়ি। দেশে অস্থিরতা চলছে। আর পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে কারফিউ ঘোষণা করা হয়েছে। আমার মাধ্যমিকের টেস্ট ছিল বলে বাটাতেই আমি আমার বড়পিসির বাড়িতে ছিলাম। কারণ ওই সময়ে ট্রেনে করে যাতায়াত করার প্রশ্নই ছিল না। কিন্তু পরিস্থিতি এমন হয়ে যায় যে টেস্ট পরীক্ষা তখনকার মতো বাতিল হয়ে যায়। তাই একদিন ঘণ্টাচারেক কারফিউ শিথিলের সময় আমি ঠিক করি যে ট্রেনে করে বাড়িতে ফিরে যাব। কারণ খবর পেয়েছিলাম যে ওই সময়টুকুর মধ্যে তিন জোড়া ট্রেন চালানো হবে!
ট্রেন সেদিন বেশ ফাঁকাই ছিল। নঙ্গী থেকে উঠে আরাম করেই বসেছিলাম জানলার ধারে। আর দেখেছিলাম যে ট্রেনের কামরাটা একদম ঝাঁ চকচকে, নতুন! কিন্তু কেলেঙ্কারি ঘটল একটু পরেই। নঙ্গীর পরের স্টেশন আক্রা। সেখান থেকে ট্রেন ছাড়ামাত্র ময়লা জামাকাপড় পরা পাঁচজন দ্রুত চলন্ত ট্রেনে উঠে পড়ল। তারপর সে কী চিৎকার! দেখলাম দু'জনের হাতে বড় বড় চপার! একজনের হাতে একটা দা! আমরা যে ক'জন ছিলাম বলা হল তারা যেন একদিকে চুপ করে বসি। লোকগুলোর চোখমুখ অস্বাভাবিক! পাগলাটে দৃষ্টি। চোখের নীচে সেই পোড়া হাঁড়ির তলার মতো কালচে ভাব!
আমরা যে ক'জন যাত্রী ছিলাম একদিকে জড়োসড়ো হয়ে বসলাম। আমাদের বলা হল যে আমাদের থেকে কিছু নেওয়া হবে না। আমরা যেন মাথা নিচু করে বসে থাকি! ট্রেনের দুলুনির সঙ্গে লোকগুলো নড়ছিল। বেসামাল হচ্ছিল। তিনজন আমাদের পাহারা দিচ্ছিল আর বাকি দু'জন হাতে কাঠের খাটো বাটামের মতো জিনিস দিয়ে দমাদ্দম করে জানলা ভাঙছিল। অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেমের জানলা! টাফড গ্লাস উড়ছিল চারিদিকে। মাটিতে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল। লোকগুলো খালি পায়ে সেসবের ওপর দিয়েই হাঁটছিল। আক্রার পরের স্টেশন সন্তোষপুর। ট্রেনে যেতে মিনিট পাঁচেকের মতো লাগত তখন। আমি দেখেছিলাম ওইটুকু সময়ের মধ্যেই ওরা আটটা জানলা ভেঙে তার ফ্রেমগুলো বস্তার মধ্যে ভরে ফেলেছিল। তারপর সন্তোষপুর স্টেশনে ট্রেন থামামাত্র যেদিকে প্ল্যাটফর্ম তার উল্টোদিক দিয়ে রেললাইনে লাফিয়ে পরে ওইদিকের প্ল্যাটফর্মে উঠে পালিয়ে গিয়েছিল!
মোটে পাঁচ-ছ' মিনিটের অপারেশন কিন্তু আমরা সবাই ভয়ে কাঁপছিলাম। একজন মাঝবয়েসি ভদ্রমহিলার চোখে কাচের গুঁড়ো ঢুকেছিল। বয়স্ক এক ভদ্রলোক বলেছিল, 'এরা পাতাখোর! এতদিন কারফিউয়ে কিছু করতে পারেনি। টাকা পায়নি। তাই দুপুরের ফাঁকা ট্রেন পেয়ে এমন করল। এবার এই অ্যালুমিনিয়ামের ফ্রেমগুলো বিক্রি করে পাতা খাবে।’
পাতা মানে যে ড্রাগস সে তো এখন সবাই জানে! আমি শুধু ভাবছিলাম আমাদের এখানে এমন জিনিস কেনার লোকও আছে! মানে কারও কি কোনও বিবেক-বুদ্ধি বলে কিছু নেই! চোরাই মাল বিক্রির জায়গা না পেলে তো চুরিই হত না!
আজও সেই দুপুরের পাঁচ-ছ' মিনিটের কথা মনে পড়লে আমার কেমন যেন লাগে! মনে হয় সেদিন যদি আমাদের থেকে লুঠপাট করত? তা হলে?
ক্লাস টুয়েলভ পাশ করার পরে টানা আট বছরের ডেলি প্যাসেঞ্জারির জীবন শেষ হয় আমার! আর এখন তো কোনও কোনও বছর আর ট্রেনে করে নঙ্গী যাওয়াই হয় না। তবু যখনই ট্রেন দেখি আমার সেই পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে যায়। সেই ক্রসিঙের গোলা! পেপসি! রফির গান! মনে পড়ে গরমের নিরালা দুপুরে ট্রেনের জানলার গ্রিলে গাল চেপে পাগল হাওয়ায় এলোমেলো হয়ে যাওয়ার সময়! ব্রেসব্রিজে ঢোকার মুখে সেই দীর্ঘ এক ঝিল! মাঝপথে সিগনাল না পেয়ে গ্রামের মাঝে দাঁড়িয়ে যাওয়া ট্রেনের মধ্যে ঢুকে পড়া টুনটুনি পাখি! আর মনে পরে সেই লম্বা কাকুকে যে আমার জন্য জানলার ধারে সিট রেখে দিতেন রোজ! আজ বুঝি এ সবের কাছে আমার ঋণ শোধ হওয়ার নয়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন