চঞ্চলকুমার ঘোষ
অনেক অনেক দিন আগে এক গাঁয়ে ছিল এক কাঠুরে। গাঁয়ের শেষ প্রান্তে নদীর ধারে কাঠুরের বাড়ি। বাড়িতে কাঠুরের সঙ্গে থাকত তার বুড়িমা।
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কাঠুরে কুড়ুল নিয়ে জঙ্গলে চলে যেত। সারা সকাল জঙ্গলের গাছ কাটত। তারপর কাটা ডালপালা কুড়িয়ে নিয়ে যেত বাজারে। সেখানে কাঠ বিক্রি করে যা পেত, তাই দিয়ে চাল-ডাল কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরত।
একদিন জঙ্গলের কাঠ কেটে বাজারে চলেছে কাঠুরে। এমন সময় শুনতে পেল, সেই দেশের রাজকন্যাকে এক ভয়ংকর হাতি ধরে নিয়ে গিয়েছে। রাজার লোকেরা অনেক চেষ্টা করেও তার সন্ধান পায়নি। তাই রাজা ঘোষণা করেছেন, ‘যে রাজকন্যাকে উদ্ধার করে আনতে পারবে তার সঙ্গে রাজকন্যার বিয়ে দেবেন আর অর্ধেক রাজত্ব উপহার দেবেন।’
কাঠুরে তাড়াতাড়ি কাঠ বিক্রি করে বাড়ি ফিরে গেল। মাকে বলল, ‘মা, আমি জঙ্গলে গিয়ে রাজকন্যাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসব।’
মা বলল, ‘রাজার লোকেরা সেই ভয়ংকর হাতির সন্ধান পেল না, তুই কেমন করে তার খোঁজ পাবি?’
কাঠুরে বলল, ‘আমি জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই, আমি জানি হাতিরা কোথায় থাকে।’
মা ভয়ে ভয়ে বলল, ‘তুই কি ওই হাতির সঙ্গে লড়াই করতে পারবি?’
‘তুমি ভয় পেও না মা, তোমার আশীর্বাদে আমি ঠিক হাতিকে মেরে রাজকন্যাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসব।’
মাকে প্রণাম করে মস্ত এক বর্শা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল কাঠুরে।
পথে যেতে যেতে নাপিতের সঙ্গে দেখা। কাঠুরেকে দেখে নাপিত বলল, ‘বর্শা নিয়ে কোথায় চলেছ কাঠুরেভাই?’
‘রাজকন্যার সন্ধানে জঙ্গলে চলেছি।’
‘আমিও তোমার সঙ্গে যাব।’
কাঠুরে ভাবল ভালোই হল, একজন সঙ্গী পাওয়া গেল। নাপিতকে নিয়ে কাঠুরে জঙ্গলে চলল।
গ্রাম ছাড়িয়ে কিছু দূরে বিরাট এক পাহাড়। সেই পাহাড় পেরিয়ে জঙ্গল। তিনদিন তিনরাত চলবার পর তারা জঙ্গলের মাঝখানে এক গুহার সামনে এসে পৌঁছোল। সেই গুহায় হাতির বাসা।
কাঠুরে গুহার দিকে যেতেই নাপিত ভয় পেয়ে গেল। সেবলল, ‘তুমি ভেতরে যাও আমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছি।’
কাঠুরে গুহার মধ্যে ঢুকে পড়ল। বিরাট গুহা। তার ভেতরে ঘুমিয়ে ছিল বিরাট চেহারার এক হাতি। ঠিক যেন একটা কালো পাহাড়। তার পেছনে বসে অঝোরে কাঁদছিল রাজকন্যা।
কাঠুরেকে দেখেই রাজকন্যা বলল, ‘কে তুমি?’
‘আমি কাঠুরে, তোমাকে রাজপ্রাসাদে নিয়ে যেতে এসেছি।’
‘যদি হাতি জানতে পারে?’
‘হাতি ঘুমিয়ে আছে, কিছুই জানতে পারবে না।’
রাজকন্যা বলল, ‘তাহলে আর দেরি না করে চলো আমরা পালিয়ে যাই।’
কাঠুরে রাজকন্যাকে হাতির পাশ থেকে তুলে নিয়ে গুহার বাইরে বেরিয়ে এল।
রাজকন্যাকে নিয়ে কাঠুরে বাইরে আসতেই দ্যাখে একটা বেড়াল নাপিতকে তাড়া করেছে আর নাপিত ভয়ে গাছে উঠে ঠকঠক করে কাঁপছে।
তাই দেখে কাঠুরের সেকী হাসি! বেড়ালকে তাড়িয়ে কাঠুরেকে গাছ থেকে নামিয়ে আনবার পর তার কাঁপুনি থামল।
তারপর তিনজনে ফিরে চলল নগরের দিকে। কিছুদূর যেতে-না-যেতেই হঠাৎ রাজকন্যা দাঁড়িয়ে পড়ল।
কাঠুরে বলল, ‘কী হল রাজকন্যা?’
রাজকন্যা বলল, ‘আমার সব গয়না যে হাতির গুহায় রয়ে গেছে। এখন কী হবে?’
কাঠুরে বলল, ‘নাপিতভাই, তুমি রাজকন্যাকে নিয়ে এগোও, আমি গুহা থেকে গয়না নিয়ে আসছি।’
কাঠুরে রাজকন্যা আর নাপিতকে রেখে ফিরে চলল গুহার দিকে।
ততক্ষণে হাতির ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। কাঠুরে গুহার মধ্যে ঢুকতেই দেখে হাতি রাজকন্যাকে খুঁজছে।
কাঠুরেকে দেখেই হাতি গর্জন করে উঠল, ‘কোথায় গেল রাজকন্যা?’
কাঠুরে হেসে বলল, ‘আমি তাকে উদ্ধার করে রাজপ্রাসাদে পাঠিয়ে দিয়েছি।’

কাঠুরের কথা শুনে হাতি রাগে চিৎকার করে উঠল। মনে হল আকাশে যেন মেঘ ডেকে উঠল। মাটি কাঁপিয়ে কাঠুরের দিকে ছুটে যেতেই কাঠুরে তার সব শক্তি দিয়ে বর্শা ছুড়ে মারল। বর্শা সোজা গিয়ে বিঁধল হাতির মাথায়। যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল হাতি। তারপর টলতে টলতে কাটাগাছের মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
হাতি মাটিতে পড়ে যেতেই কাঠুরে রাজকন্যার সব গহনা নিয়ে পোঁটলায় পুরে ফেলল। আর হাতির মাথা থেকে বর্শা তুলে নিয়ে ফিরে গেল রাজকন্যা আর নাপিতের কাছে।
নাপিত রাজকন্যাকে নিয়ে এক গাছতলায় বসে ছিল। দিনও শেষ হয়ে এসেছিল। কাঠুরে রাজকন্যাকে তার সব গয়না ফেরত দিয়ে বলল, ‘এখানে এক ভয়ংকর দৈত্য থাকে। সন্ধে হওয়ার আগেই আমাদের এই অঞ্চল ছেড়ে যেতে হবে।’
পথ চলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল রাজকন্যা। সেবলল, ‘আমি আর এক-পাও চলতে পারছি না। আজ রাতে এখানে বিশ্রাম নিয়ে কাল সকালে যাব।’
কাঠুরে আর কী করে! সেখানেই রাত কাটাবার ব্যবস্থা করল। রাত হতেই কাঠুরে নাপিতকে বলল, ‘তুমি আর আমি পালা করে রাজকন্যাকে পাহারা দেব। যখন আমি ঘুমাব তখন কেউ এসে তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করলে বলবে, আমি কাঠুরে। তাহলে কেউ আর রাজকন্যার কোনো ক্ষতি করতে সাহস পাবে না।’
সেইখানেই ছিল দৈত্যের বাড়ি। শিকার করে বাড়ি ফিরছিল দৈত্য। সেই সময় গাছতলায় ঘুমিয়েছিল রাজকন্যা আর কাঠুরে। ঘন জঙ্গলের মধ্যে সুন্দরী রাজকন্যাকে দেখে দৈত্য তো অবাক। তাকে বিয়ে করবার ইচ্ছে হল তার। ভাবল এমন সুন্দরী মেয়ে, একে কোথাও যেতে দেব না। আমিই বিয়ে করব।
সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল নাপিত। দৈত্য বলল, ‘তুই কে রে?’
নাপিত ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, আমি কাঠুরে।
কাঠুরের নাম শুনেই দৈত্য ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল। খানিকক্ষণ পর আবার দৈত্য এসে জিজ্ঞেস করল, ‘তুই কে রে?’
নাপিত বলল, ‘আমি কাঠুরে।’
কাঠুরের নাম শুনে এবারও দৈত্য ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল।
দৈত্য চলে যেতেই নাপিত ভাবল আমি কষ্ট করে পাহারা দেব আর বার বার কাঠুরের নাম করব।
খানিক পরে আবার দৈত্য এসে জিজ্ঞেস করল, ‘তুই কে রে?’
এবার নাপিত বুক ফুলিয়ে বলল, ‘আমি নাপিত।’
নাপিতের নাম শুনেই দৈত্যের ভয় ভেঙে গেল। চোখের পলকে রাজকন্যাকে তুলে নিয়ে জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।
দৈত্য রাজকন্যাকে নিয়ে যেতেই ঘুম ভেঙে গেল কাঠুরের। নাপিতের মুখে সব শুনে তক্ষুনি রাজকন্যার খোঁজে বেরিয়ে পড়ল।
সারারাত পথ চলে সকালবেলায় তারা এসে পৌঁছোল দৈত্যের বাড়িতে। মাটি থেকে অনেক উঁচুতে দৈত্যের বাড়ি। সিঁড়ি বেয়ে সেই বাড়িতে উঠতে হয়। দৈত্য রাজকন্যাকে ঘরে বন্দি করে রেখে, সিঁড়ি নামিয়ে রেখে জঙ্গলে গিয়েছে শিকার করতে।
কাঠুরে সেই সিঁড়ি তুলে দৈত্যের ঘরে গিয়ে দেখে রাজকন্যা কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে। তাকে ঘুম থেকে তুলে কাঁধে করে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এল।
নীচে নেমে তিনজন ফিরে চলল রাজপ্রাসাদের দিকে। খানিক দূর যেতেই হঠাৎ রাজকন্যার মনে পড়ে গেল দৈত্যের ঘরে তার সাতনড়ি হীরের হার পড়ে রয়েছে।
কাঠুরেকে সেকথা বলতেই কাঠুরে বলল, ‘তুমি চিন্তা কোরো না, আমি এক্ষুনি গিয়ে সে-হার নিয়ে আসছি।’
এদিকে রাজকন্যাকে দেখে নাপিতের খুব ভালো লেগে গিয়েছিল। সেমনে মনে ভাবল, ‘যদি কাঠুরেকে মেরে ফেলতি পারি, তাহলে আমিই রাজকন্যাকে বিয়ে করব।’ সেরাজকন্যাকে বলল, ‘তুমি এখানে দাঁড়াও, আমি কাঠুরের কোনো বিপদ হল কি না দেখে আসি।’
কাঠুরে দৈত্যের বাড়িতে গিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতেই নাপিত তাড়াতাড়ি সিঁড়িটা নামিয়ে নিল। কাঠুরে তো কিছুই জানে না। রাজকন্যার হার নিয়ে নীচে নামতে যেতেই দেখে সিঁড়ি নেই। নামবার সব পথ বন্ধ। দৈত্যের ঘরে আটকা পড়ে গেল কাঠুরে।
নাপিত আর সেখানে দাঁড়াল না। রাজকন্যার কাছে গিয়ে বলল, ‘কাঠুরে দৈত্যের হাতে মারা পড়েছে, তাড়াতাড়ি চলো এখান থেকে পালিয়ে যাই।’
কাঠুরের জন্য রাজকন্যার মন খুব খারাপ হয়ে গেল। দৈত্যের হাতে ধরা পড়ার ভয়ে তারা তাড়াতাড়ি ফিরে চলল নগরে।
নাপিত রাজকন্যাকে নিয়ে প্রাসাদে ফিরতেই চারদিকে হুলুস্থুল। হারানো মেয়েকে ফিরে পেয়ে রাজারানির তখন সেকী আনন্দ! পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল নাপিত। রাজাকে প্রণাম করে বলল, ‘মহারাজ, আমিই রাজকন্যাকে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছি।’
রাজা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। সারা রাজ্যজুড়ে উৎসব শুরু হল।
ওদিকে জঙ্গলে সারাদিন শিকার করে সন্ধেবেলায় ঘরে ফিরে আসতেই দৈত্য দ্যাখে তার বিছানায় কাঠুরে শুয়ে আছে। রাজকন্যা নেই।
রাগে ফেটে পড়ল দৈত্য। কাঠুরের চুলের মুঠি ধরে টান দিতেই তার ঘুম ভেঙে গেল। এক লাফে বিছানা থেকে উঠে এক ঘুষি মারল দৈত্যের বুকে।
ঘুষি খেয়ে দৈত্য আছড়ে পড়ল মাটিতে। তারপরই লাফ দিয়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল দৈত্যের ওপর। শুরু হয়ে গেল লড়াই। তিনদিন, তিনরাত ধরে লড়াই চলবার পর কাঠুরের হাতে মারা পড়ল দৈত্য। দৈত্য মারা পড়তেই কাঠুরে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এল। যেখানে রাজকন্যা আর নাপিত ছিল সেখানে এসে দেখে কোথাও কেউ নেই। চারদিকে কত খুঁজল রাজকন্যা আর নাপিতকে কোথাও খুঁজে পেল না। ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল তার। কি আর করে! আবার গ্রামে ফিরে চলল।
গ্রামে ফিরতেই কাঠুরে শুনতে পেল রাজকন্যার সাথে নাপিতের বিয়ে। সেবুঝতে পারল, এসব নাপিতের শয়তানি। কাউকে কিছু না বলে চাদরে মুখ ঢেকে বেরিয়ে পড়ল।
সারা রাজ্যজুড়ে উৎসব চলেছে। পরদিন রাজকন্যার বিয়ে। কাঠুরে চুপিসাড়ে রাজপ্রাসাদে ঢুকে পড়ল।
রাজপ্রাসাদে ভোজসভা বসেছে। রাজকন্যা চারদিকে ঘুরে ঘুরে সব তদারকি করছিল। এক কোনায় ঘোমটা টেনে বসে পড়ল কাঠুরে। মুখ ঢাকা, তাই কেউ আর তাকে চিনতে পারল না।
রাজকন্যা ঘুরতে ঘুরতে তার সামনে এসে দাঁড়াতেই কাঠুরে তাঁর পোঁটলা থেকে একখানা গয়না বের করল। গয়নার দিকে চোখ পড়তেই অবাক হয়ে গেল রাজকন্যা। এ তো তারই গয়না। তারপরই মনে হল হয়তো-বা ভুল হতে পারে। কিছু না বলে অন্যদিকে চলে গেল।
আবার কাঠুরের কাছে ফিরে আসতেই কাঠুরে এবার রাজকন্যার সাতনড়ি হীরের হার বের করল।
হার দেখে আর চুপ করে থাকতে পারল না রাজকন্যা। কাঠুরেকে জিজ্ঞেস করল, ‘কে তুমি? আমার এই গয়না কোথায় পেলে?’
কাঠুরে তার মুখের কাপড় সরাতেই রাজকন্যা তাকে চিনতে পারল।
কাঠুরে তখন রাজকন্যার সব গয়না ফেরত দিয়ে বলল, ‘দৈত্যকে মেরে তোমার গয়না উদ্ধার করে এনেছি। নাপিত আমাকে মেরে ফেলবার জন্য মই নামিয়ে নিয়েছিল।’
রাজকন্যা তক্ষুনি গিয়ে রাজার কাছে সব বলল। রাজা কাঠুরের বীরত্বের কথা শুনে খুশি হয়ে বললেন, ‘তুমি আমার মেয়েকে উদ্ধার করেছ, তোমার সাথেই রাজকন্যার বিয়ে দেব। আর আমার মৃত্যুর পর তুমিই হবে এই দেশের রাজা।’
পরদিন মহা ধুমধাম করে কাঠুরের সঙ্গে রাজকন্যার বিয়ে হয়ে গেল।
আর নাপিত—রাজার আদেশে তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হল গভীর জঙ্গলে। সেখানে বাঘ-সিংহ তাকে ছিড়ে টুকরো টুকরো করে খেয়ে ফেলল।
কাঠুরে সুখে শান্তিতে রাজকন্যাকে নিয়ে ঘর-সংসার করতে লাগল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন