চঞ্চলকুমার ঘোষ
এক ছিল পুরোহিত। যেমন লোভী তেমনি শয়তান। সব সময় তার মাথায় দুষ্টুবুদ্ধি ঘুরে বেড়াত। সেইজন্যে কেউ তাকে পছন্দ করত না।
পুরোহিতের বাড়ি ছিল পাহাড়ের ধারে এক গ্রামে। সেই গ্রামে থাকত এক বিধবা বুড়ি। তার একটা মাত্র মেয়ে, নাম আয়না। আয়নার মতো সুন্দরী সারা তল্লাটে কেউ ছিল না।
পুরোহিতের খুব ইচ্ছে আয়নাকে বিয়ে করে। একদিন বুড়ির কাছে গিয়ে বলতেই বুড়ি ঝাঁটা নিয়ে এমন তাড়া করল, যে পুরোহিত আর পালাবার পথ পায় না।
তারপর থেকে পুরোহিত সুযোগ খুঁজতে লাগল কেমন করে আয়না আর তার মা-র ক্ষতি করা যায়। কিছুতেই আর সুযোগ পায় না।
কিছু দূরে ছিল আর-এক গ্রাম। সেই গ্রামের জমিদার একদিন নৌকা করে যাচ্ছিলেন। এমন সময় তার চোখে পড়ল নদীর ঘাটে আয়না জল নিতে এসেছে। আয়নাকে দেখে খুব ভালো লাগল জমিদারের। তার ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেবে বলে ঘটক পাঠাল।
জমিদারের ছেলের যেমন রূপ তেমনি গুণ। এক-কথায় রাজি হয়ে গেল আয়নার মা। কয়েকদিনের মধ্যেই ধুমধাম করে জমিদারের ছেলের সঙ্গে আয়নার বিয়ে হয়ে গেল। পুরোহিত তো রাগে জ্বলতে থাকে। সেসুযোগ খুঁজতে লাগল, কেমন করে আয়নার সর্বনাশ করা যায়।
বিয়ের পরদিন আয়না শ্বশুরবাড়ি যেতেই পুরোহিত সাধুর বেশ ধরে হাজির হল সেই গ্রামে।
সেই গ্রামের কেউ পুরোহিতকে চেনে না। পুরোহিত এমন মন্ত্র পড়তে আরম্ভ করল, সবাই ভাবল নিশ্চয়ই বড়ো কোনো সাধু। গ্রামের লোকেরা সাধুর কাছে আসতেই পুরোহিত হুংকার দিয়ে বলল, ‘তোদের গ্রামে ভগবানের অভিশাপ নেমে আসছে।’
পুরোহিতের কথা শুনে সবাই ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। গাঁয়ের মোড়ল হাতজোড় করে বলল, ‘আমরা তো কোনো অন্যায় করিনি, তবে কেন ভগবান আমাদের অভিশাপ দেবেন?’

‘তোমরা কোনো অন্যায় করোনি কিন্তু তোমাদের জমিদার অন্যায় করেছেন।’
সবাই বলল, ‘আমাদের জমিদার খুব ভালো লোক, ঠাকুরদেবতায় তাঁর খুব ভক্তি।’
‘তিনি যার সাথে ছেলের বিয়ে দিয়েছেন, সেনাস্তিক। তাই ভগবান অভিশাপ দিয়েছেন ওই মেয়ে যে-পরিবারে থাকবে, যে-সংসারে যাবে, তাদের সকলেরই মহা সর্বনাশ হবে।’
গাঁয়ের লোকেরা বলল, ‘তবে কী হবে সাধুবাবু?’
‘তোমরা গিয়ে জমিদারকে বলো যদি আমার আদেশমতো কাজ করেন, তবে কোনো ক্ষতি হবে না।’
তখনি সারা গ্রামের লোক গিয়ে হাজির হল জমিদারবাড়িতে। জমিদার তখন বৈঠকখানায় বসে ছেলের সঙ্গে জমিদারির খাতাপত্র দেখছিলেন। গ্রামের সব লোক জমিদারবাড়ি যেতেই জমিদার বেরিয়ে এসে বললেন, ‘কী হয়েছে তোমাদের?’
‘মহা বিপদ হুজুর, আপনি ছাড়া কেউই আমাদের রক্ষা করতে পারবে না।’
জমিদার প্রজাদের খুব ভালোবাসতেন। তাদের বিপদের কথা শুনে জমিদার বললেন, ‘তোমাদের কীসের বিপদ আমি তো কিছুই জানি না?’
‘আপনার ছেলের বউ মহাপাপী, তার জন্যে আপনার, আমাদের সবার অমঙ্গল হবে।’
জমিদার ছিলেন খুব ধর্মভীরু। প্রজাদের কথা শুনে ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন। তাদের বললেন, ‘এইসব কথা তোমাদের কে বলল?’
প্রজারা জমিদারকে বলল, ‘এক সাধুবাবা বটগাছতলায় বসে আছেন। তিনিই বলেছেন।’
জমিদার তখনি ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন পুরোহিতের কাছে।
জমিদারকে দেখেই পুরোহিত বলল, ‘বেটা তোরা জানিস না, আর তিন দিনের মধ্যে তোদের কী ভয়ংকর সর্বনাশ হবে। এই গাঁয়ের কেউ আর বঁাচবে না।’
জমিদার পুরোহিতের পায়ের ওপর লুটিয়ে পড়লেন, ‘আপনি আমাদের বঁাচান প্রভু।’
পুরোহিত গম্ভীর গলায় বলল, ‘আমি তোদের বঁাচাতে পারি, তবে আমি যা বলব তাই করতে হবে। তোর ছেলের বউকে নদীর জলে ভাসিয়ে দিতে হবে।’
দু-দিনেই আয়নাকে জমিদারবাড়ির সকলে ভালোবেসে ফেলেছিল। তাকে বিসর্জন দিতে হবে শুনে জমিদার আর তার ছেলের মন খারাপ হয়ে গেল।
জমিদার হাতজোড় করে বলল, ‘প্রভু, আয়নাকে বঁাচাবার আর কোনো পথ নেই?’
পুরোহিত মাথা নেড়ে বলল, ‘তাহলে তোমাদের সবাইকে মরতে হবে।’
জমিদার আর কী করেন! পুরোহিতের আদেশমতো আয়নাকে নদীতে ভাসিয়ে দেবেন ঠিক করলেন।
পরদিন বিরাট কাঠের বাক্স তৈরি করে তার মধ্যে আয়নাকে পুরে দেওয়া হল। গ্রামের পাশেই ছিল এক পাহাড়ি নদী। সেই নদীতে বাক্স ভাসিয়ে দেওয়া হল।
গ্রাম ছাড়িয়ে কিছু দূরেই ছিল একটা বাগান। সেই বাগানে ছিল নানান ফলের গাছ। পাখিরা এসে রোজ ফল নষ্ট করত। তাই বাগানের মালিক প্রত্যেক গাছে বড়ো বড়ো জাল বিছিয়ে রেখেছিল।
দুপুর বেলায় মালিক বাগানে আসতেই দ্যাখে, বিরাট এক হনুমান জালে আটকা পড়েছে। কিছুতেই আর জাল ছিঁড়ে বেরোতে পারছে না।
মালিক ভাবল হনুমানকে নদীর জলে ডুবিয়ে মারবে। নদীর ধারে এসে দাঁড়াতেই দেখল কাঠের বিরাট একটা বাক্স নদীর জলে ভাসতে ভাসতে চলেছে। তাড়াতাড়ি দড়ি ছুড়ে বাক্সটাকে তীরে টেনে নিয়ে এল। বাক্সের মুখ খুলতেই বাগানের মালিক তো অবাক। আয়নাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কে তুমি? কে তোমাকে এমন করে বাক্সে পুরে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে?’
আয়না কাঁদতে কাঁদতে সব কথা বলল। বাগানের মালিক পুরোহিতকে চিনত। সেবলল, ‘এসব পুরোহিতের শয়তানি। সেতোমাকে ধরবার জন্য আশেপাশেই কোথাও লুকিয়ে আছে। এইবার তাকে এমন জব্দ করব যে, আর কোনোদিন কারও ক্ষতি করতে সাহস পাবে না।’
বাগানের মালিক জাল থেকে হনুমানকে বের করে বাক্সের মধ্যে পুরে মুখ বন্ধ করে নদীতে ভাসিয়ে দিল আর আয়নাকে নিয়ে চলল তার মায়ের কাছে।
ওদিকে পুরোহিত সেখান থেকে কিছু দূরে বসে ছিল। বাক্স ভেসে আসতেই পুরোহিত ভাবল ওই বাক্সে নিশ্চয়ই আয়না আছে। তাড়াতাড়ি নদী থেকে বাক্সটা তুলে নিয়ে বাড়ি ফিরে চলল।
বাড়ি পৌঁছেই সবাইকে বলল, ‘আজ আমার বিয়ে।’
গাঁয়ের লোক বলল, ‘বিয়ের কনে কই?’
পুরোহিত বলল, ‘সেতোমরা কাল সকালে দেখতে পাবে।’
সন্ধে হয়ে এসেছিল। পুরোহিত তাড়াতাড়ি বাক্স নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। তার আর দেরি সইছিল না। তাড়াতাড়ি বাক্সের ডালা খুলে ফেলল আর সাথে সাথে হনুমান এক লাফে বাইরে বেরিয়ে এল। সামনে পুরোহিতকে দেখে আঁচড়ে-খামচে তাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিল।
পুরোহিতের তখন সেকী চিৎকার। তার চিৎকার চেঁচামেচিতে লোকজন ছুটে এসে দরজা ভাঙতেই হনুমান এক লাফে পালিয়ে গেল।
সবাই পুরোহিতকে বাইরে নিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার বউ কোথায়, এ তো হনুমান?’
পুরোহিত আর কিছুই বলতে পারে না।
বাগানের মালিক আয়নাকে নিয়ে এক জায়গায় লুকিয়ে ছিল। এইবার সামনে এসে সব কথা বলতেই গাঁয়ের লোকেরা রাগে ফেটে পড়ল। সবাই আয়নাকে খুব ভালোবাসত। তখনি পুরোহিত আর আয়নাকে নিয়ে চলল জমিদারবাড়িতে।
আয়নাকে নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে জমিদারের মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। গাঁয়ের লোকেরা আয়নাকে নিয়ে গিয়ে সব কথা বলতেই জমিদার নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। আয়নাকে আদর করে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন। আর পুরোহিতের মাথা কামিয়ে ঘোল ঢেলে চিরদিনের মতো গ্রাম থেকে দূর করে দিলেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন