দুই সূর্য

চঞ্চলকুমার ঘোষ

বহু বহু বছর আগেকার কথা। তখন আকাশে ছিল দুই সূর্য—একজন বড়ো ভাই, আর একজন ছোটো ভাই। প্রতিদিন ভোর হতেই বড়ো ভাই আকাশে উঠত। সারাদিন তার আলো দিয়ে সন্ধেবেলায় ঘুমাতে যেত। তখন তার জায়গায় আসত ছোটো ভাই। সারারাত আলো দিয়ে ভোর হতেই ঘুমিয়ে পড়ত।

তখন আর রাত বলে কিছু ছিল না। দুই ভাই-এর প্রচন্ড উত্তাপে পৃথিবীর সব কিছু গরম হয়ে থাকত। মানুষ ঘুমাতে পারত না। পশুপাখি একটুও বিশ্রাম পেত না। এত আলো কেউ আর সহ্য করতে পারত না। সবাই রাতের অন্ধকারের জন্য ছটফট করত।

একদিন মানুষ, পশুপাখিরা এক জায়গায় জড়ো হয়ে বলল, ‘একজন সূর্যকে মারতেই হবে, না-হলে আমরাই সবাই মরে যাব। অনেক বুদ্ধি পরামর্শ করা হল। কিন্তু কেউ আর সূর্যের কাছে যেতে সাহস পায় না।

শেষে উ থাং নামে এক শিকারি উঠে দাঁড়াল। যেমন তার শক্তি, তেমনি হাতের জোর। সেবলল, ‘আমি সূর্যকে মারব, তোমরা আমাকে একটা তির-ধনুক তৈরি করে দাও।’

সবাই মিলে তির-ধনুক তৈরি করতে শুরু করল। তিন দিন ধরে তির-ধনুক তৈরি হল। একশ জনে মিলে তা তুলতে পারে না।

উ থাং উনিশটা শুয়োরের মাংস খেয়ে এসে সেই তির-ধনুক তুলে ধরল আকাশের দিকে। সূর্যের ছোটো ভাই তখন মাঝ-আকাশে আলো দিচ্ছিল। উ থাং তার সমস্ত শক্তি দিয়ে সূর্যের বুক লক্ষ্য করে তির ছুড়ল। বজ্রের মতো সেই তির চোখের পলকে সূর্যের বুকের মধ্যে গিয়ে বিঁধল।

যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে মারা পড়ল সূর্য। সঙ্গে সঙ্গে তার সব আলো নিভে গেল; অন্ধকারে ঢেকে গেল পৃথিবী।

বড়ো ভাই তখন ঘুমিয়ে ছিল। হঠাৎ চারদিক অন্ধকার হয়ে যেতেই তার ঘুম ভেঙে গেল। চেয়ে দ্যাখে ছোটো ভাই মরে পড়ে রয়েছে। ছোটো ভাইকে খুব ভালোবাসত সূর্য। ভাই-এর শোকে সারা গায়ে কালোকাপড় জড়িয়ে গুহায় ঢুকে পড়ল।

আর আকাশে সূর্য ওঠে না। দিন-রাত সারা পৃথিবী অন্ধকার হয়ে থাকে। মানুষের সব কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গেল। গাছপালা মরতে আরম্ভ করল। একটু একটু করে চারদিকে বরফ জমতে থাকে। সারা পৃথিবী জুড়ে আর্তনাদ ওঠে। সূর্য না উঠলে আমরা সবাই মারা পড়ব।

আবার মানুষ-জন্তু-জানোয়ার-পশুপাখি সবাই জড়ো হয়। যেমন করেই হোক সূর্যের গায়ের কালো কাপড় খুলতেই হবে। কিন্তু অন্ধকারের মধ্যে পথ চিনে সূর্যের কাছে যাওয়া তো সহজ নয়। সবাই এ-ওর মুখের দিকে তাকাতে থাকে।

শেষে বাদুড় এগিয়ে এসে বলল, ‘আমি অন্ধকারে পথ চলতে পারি, আমি সূর্যের কাছে যাব। তবে আমারও উ থাং-এর মতো তির-ধনুক চাই।’

সবাই হেসে উঠল, ‘তুই তির-ধনুক নিয়ে কী করবি?’

বাদুড় বলল, ‘আমি সূর্যের সাথে লড়াই করব।’

তখন সবাই মিলে তাকে ছোটো একটা ধনুক তৈরি করে দিল। বাদুড় সেই ধনুক নিয়ে সূর্যের গুহার সামনে গিয়ে পা দিয়ে ধনুকের এক দিক নাক দিয়ে আর-এক দিক ধরে চেঁচিয়ে উঠল, ‘সূর্য তুমি বেরিয়ে এসো।’

বাদুড়ের ডাকে গুহার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল সূর্য। এদিক ওদিক তাকাতেই দেখল তির ধনুক হাতে বাদুড়। তার ভাবভঙ্গী দেখে সূর্য আর হাসি চাপতে পারল না। প্রাণ খুলে হেসে উঠল সঙ্গে সঙ্গে তার সব শোক দূর হয়ে গেল। গায়ের চাদর খসে পড়ল। আবার সারা পৃথিবী আলোয় ভরে উঠল।

লোকেরা তখন ভগবানকে বলে ছোটো ভাইকে রাতের চাঁদ করে দিল। দিনের আলো আর রাতের অন্ধকারে আবার সারা পৃথিবী আনন্দে ভরে উঠল।

সকল অধ্যায়
১.
ওঝা ও পাহাড়ি ভূত
২.
দুই সূর্য
৩.
মহিষ ও রাখালছেলে
৪.
তিন বন্ধু
৫.
বাঘ মামার কথা
৬.
কুঁজো আর অন্ধ
৭.
দেবতার অভিশাপ
৮.
সাতবোকা
৯.
বাহাদুর আর এক-পা-ওলা দৈত্য
১০.
সাধু ও মহাজন
১১.
চালাক ভোলানাথ
১২.
বামুন আর শেয়াল
১৩.
আকাশপুরীর রাজকন্যা
১৪.
অতি চালাকের গলায় দড়ি
১৫.
তিন জামাই
১৬.
শেয়ালবউ-এর বুদ্ধি
১৭.
শেয়াল আর বোকা বাঘ
১৮.
বুদ্ধিমান চোর
১৯.
শুয়োরের শিং
২০.
রাখালছেলে ও পরির দেশের রাজকন্যা
২১.
তাঁতির কুঁজ
২২.
চার চোর
২৩.
কাঠুরে নাপিত আর রাজকন্যা
২৪.
মহেশ্বর
২৫.
আয়না
২৬.
শেয়াল ও বুড়োবুড়ি
২৭.
এক দাঁত ফোকলা
২৮.
বুদ্ধি থাকলেই উপায় হয়
২৯.
ভীম আর জলদৈত্য
৩০.
চার ভাই
৩১.
সুরের জাদু
৩২.
ভূত ও ভূতনাথ
৩৩.
রসিক রাজু

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%