চার চোর

চঞ্চলকুমার ঘোষ

এক ছিল রাজা। রাজা তাঁর প্রজাদের খুব ভালোবাসতেন। তাদের সুখ-সুবিধে, অভাব-অভিযোগের দিকে তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিল। রাজকর্মচারীরা সবকিছু দেখাশুনা করত তবুও প্রায়ই রাজা গোপনে বেরিয়ে পড়তেন। ছদ্মবেশে প্রজাদের মধ্যে ঘুরে ঘুরে তাদের খোঁজ নিতেন। তখন এমন সাজ করতেন, যে তাঁর বিশ্বস্ত কর্মচারীরাও তাঁর ছদ্মবেশ দেখে চিনতে পারত না।

একদিন রাতে রাজা নগরে ঘুরতে বেরিয়েছেন। মাথায় লাল কাপড় বঁাধা, ঝাঁটার মতো গোঁফ, মুখে চাপদাড়ি, গায়ে চাদর জড়ানো, হাতে লাঠি।

নি:ঝুম রাত। পথঘাট ফাঁকা। কোথাও কোনো লোকজন নেই। রাজা একা হেঁটে চলেছেন। হঠাৎ তাঁর নজরে পড়ল বটগাছের তলায় বসে তিনজন লোক কথা বলছে। রাজা তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তাদের মধ্যে একজন বলল, ‘কে তুমি? এত রাতে এখানে কী করছ?’

রাজা বললেন, ‘তোমাদেরই মতো কাজ খুঁজতে বেরিয়েছি।’

‘তুমি কী কাজ করতে পার?’

‘যে-কোনো কাজ। দলে নিলেই বুঝতে পারবে। কিন্তু তোমরা কে, কী কাজ করতে পার?’

‘তুমি যদি আমাদের দলে যোগ দাও, তবেই বলব।’

রাজা হেসে বললেন, ‘ঠিক আছে আমি তোমাদের দলে যোগ দেব।’

‘তাহলে হাত মেলাও।’

রাজা তাদের সঙ্গে হাত মেলাতেই প্রথমজন বলল, ‘আমি যে-কোনো তালা খুলতে পারি। চোখের পলকে যে-কোনো বন্ধ দরজা ভাঙতে পারি। কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকলেও কেউ কিছু টের পাবে না।’

দ্বিতীয়জন তখন বলল, ‘আমি গন্ধ শুঁকে কার বাড়ির কোথায় কী কী ধনরত্ন আছে, সব নির্ভুলভাবে বলে দিতে পারি।’

তৃতীয়জন বলল, ‘আমি যদি কোনো মানুষের চোখের দিকে একবার তাকাই পরে হাজার মানুষের ভিড়েও তাকে দেখলে ঠিক চিনতে পারি।’

রাজা বললেন, ‘তোমাদের মতো আমার কোনো গুণ নেই, তবে আমি ইচ্ছে করলে কাউকে ফাঁসি দিতে পারি, আবার ইচ্ছে করলে ফাঁসির আসামিকে খালাস করে দিতে পারি।’

তিনজন বলল, ‘তবে তো ভালোই হল, তুমি আমাদের সঙ্গে থাকলে আমাদের আর ফাঁসির ভয় থাকবে না।’

দ্বিতীয়জন বলল, ‘এতদিন আমরা ছিলাম তিন চোর, তোমাকে নিয়ে হলাম চার চোর। আজ তুমিই বলো, আমরা কোথায় চুরি করতে যাব?’

রাজা বললেন, ‘আজ রাতে রাজবাড়িতে চুরি করতে যাব।’

চারজন চলল রাজবাড়িতে চুরি করতে। সামনের ফটকে দাঁড়িয়ে দুই পাহারাদার। চারজনে রাজবাড়ির পেছনের দরজার কাছে গিয়ে দেখে দরজা বন্ধ।

প্রথম চোর এগিয়ে গেল। হাত দিয়ে একটু নাড়াচাড়া করে চাপ দিতেই দরজা খুলে গেল।

খোলা দরজা দিয়ে রাজবাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ল চারজন।

দ্বিতীয় চোর তখন নাক তুলে গন্ধ শুঁকল। তারপর এগিয়ে চলল। খানিক দূরেই আর-একটা দরজা। দরজার সামনে ঘুমাচ্ছিল এক চাকর।

দ্বিতীয় চোর আঙুল তুলে ইশারায় সেই দরজা দেখাতেই প্রথম চোর চাকরকে টপকে গিয়ে দরজা খুলে ফেলল। বাকি সবাই তখন চাকরকে ডিঙিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল।

ঘরের মাঝখানে মস্ত বড়ো একটা সিন্দুক। তার পাশে ছোটো ছোটো আরও পাঁচটা সিন্দুক। বড়ো সিন্দুকের সামনে গিয়ে গন্ধ শুঁকে দ্বিতীয় চোর বলল, ‘এতে সোনা আছে।’ তার পরেরটার কাছে গিয়ে বলল, ‘এতে হীরে, তারপরে মুক্তো, মাণিক্য, চুনি, পান্না।’

প্রথম চোর একটা সিন্দুকের সামনে গিয়ে চাপ দেয় আর সিন্দুকের ডালা খুলে যায়। আর তিনজন তার থেকে হীরে-মুক্তো-চুনি-পান্না তুলতে থাকে।

সবকটা থলি ভরতি হতেই তৃতীয় চোর বলল, ‘এবার চল।’

সবাই যে দরজা দিয়ে ঢুকেছিল, সেই দরজা দিয়ে বেরিয়ে ফিরে চলল বটগাছের গোড়ায়।

প্রথম চোর বলল, ‘যা কিছু পাওয়া গেছে এবার সব চার ভাগ করা হোক।’

অন্য তিনজন সেকথায় রাজি হয়ে গেল। রাজার ওপর ভার পড়ল সব কিছু ভাগ করবার।

রাজা সব ধনরত্ন চার ভাগ করে তিনজনকে তিন ভাগ দিয়ে নিজে এক ভাগ নিলেন।

সবাই যে-যার পোঁটলা বেঁধে নিতেই প্রথম চোর বলল, ‘কাল রাতে আবার তোমাদের সঙ্গে দেখা হবে। সবাই ঠিক এক প্রহরে এইখানে আসবে।’

রাজা বললেন, ‘আমি ঠিক সময়েই আসব। কিন্তু তোমাদের নাম-ধাম তো কিছু জানলাম না।’

সবাই যে-যার নাম বলল, কে, কোথায় থাকে বলল। রাজাও তার একটা মিথ্যে নাম-ঠিকানা বলল।

ভোর হয়ে আসছিল। সবাই যে-যার বাড়ি ফিরে গেল।

পরদিন রাজা রাজসভায় গিয়েই বললেন, ‘কাল রাজপুরীতে চুরি হয়েছে।’

মন্ত্রী-সেনাপতি-পাত্র-মিত্র-কোটাল সবাই তো অবাক। মন্ত্রী বলল, ‘রাজপুরীর দরজা খুলে কেমন করে চোর ঢুকল?’

সেনাপতি বলল, ‘ঘরে ঢুকলেও সিন্দুক ভাঙল কেমন করে?’

কোটাল বলল, ‘মনে হচ্ছে এ সাধারণ চোর নয়, এদের সন্ধান পাব কেমন করে?’

রাজা গম্ভীরভাবে বললেন, ‘আমি তাদের সন্ধান জানি। নগরকোটাল, তোমার লোকজন নিয়ে এক্ষুনি চলে যাও। খুব সাবধানে যাবে, তারা যেন কোনোভাবেই টের না পায়। তাদের বাড়িতেই সব ধনরত্ন খুঁজে পাবে।’

রাজা চোরদের নাম-ঠিকানা, কার কাছে কী কী ধনরত্ন আছে সব বলে দিলেন।

নগরকোটাল তখনই চোর ধরতে রওনা হল।

তিন চোর রাজপুরীর ধনরত্ন পেয়ে মনের আনন্দে ঘুমাচ্ছিল। নগরকোটাল গিয়ে তাদের সবাইকে বন্দি করল। তাদের ঘরেই সব ধনরত্ন পাওয়া গেল।

তিন চোরকে নিয়ে নগরপাল রাজসভায় আসতেই রাজা বললেন, ‘মন্ত্রী, আজ আপনি চোরদের বিচার করবেন, আমি শুধু দেখব।’

মন্ত্রী বলল, ‘তোমরা রাজপুরীতে চুরি করেছ?’

তিন চোর মাথা নেড়ে তাদের অপরাধ স্বীকার করল।

‘কিন্তু তোমরা কেমন করে রাজপুরীতে ঢুকে সিন্দুক খুলে সব ধনরত্ন চুরি করলে?’

তিন চোর কোনো জবাব দিল না।

মন্ত্রী তাদের আরও অনেক প্রশ্ন করল। কিন্তু কারও মুখ থেকেই কোনো উত্তর পাওয়া গেল না।

মন্ত্রী বললেন, ‘চোরেদের শাস্তি হাজতবাস। তোমাদের মতো ভয়ংকর চোরদের হাজতে রাখলে, একদিন-না-একদিন হাজত থেকে পালাবে। আবার নতুন করে চুরি শুরু করবে। তাই তোমাদের মৃত্যুদন্ড দিলাম।’

মন্ত্রী বিচার শেষ করে মৃত্যুদন্ডের আদেশ দিতেই তৃতীয় চোর বলল, ‘হুজুর, আমার একটা নিবেদন আছে। আমাদের সঙ্গে আরও একজন ছিলেন তিনিও চুরির ভাগ পেয়েছিলেন। আমাদের শাস্তি হলে তারও তো শাস্তি হওয়া উচিত।’

মন্ত্রী বলল, ‘কে সেই চোর?’

তৃতীয় চোর রাজার দিকে আঙুল তুলে বলল, ‘স্বয়ং মহারাজ।’

সবাই তো অবাক! মন্ত্রী তাকে ধমক দিয়ে বলল, ‘তোমার সাহস তো কম নয়, স্বয়ং মহারাজকে চোর বলছ!’

চোর মন্ত্রীর কথার জবাব না দিয়ে রাজার দিকে ফিরে বলল, ‘মহারাজ, আপনি ন্যায় বিচার করুন।’

কারও মুখে আর কোনো কথা নেই। মন্ত্রী কী বলবে কিছুই ভেবে পেলেন না। চোর হেসে বলল, ‘মহারাজ, আপনি বলেছিলেন আমি ইচ্ছে করলে কাউকে ফাঁসি দিতে পারি, আবার ইচ্ছে করলে ফাঁসির আসামীকে বেকসুর খালাস করে দিতে পারি। আপনি যদি সেই কথামতো কাজ করেন, তাহলে আমাদের মৃত্যুদন্ড রোধ হবে। আপনিও শাস্তির হাত থেকে রক্ষা পাবেন।’

এবার রাজা হেসে বললেন, ‘আমি আমার ক্ষমতার পরিচয় দিতে রাজি আছি কিন্তু তোমাদের শপথ করতে হবে আর কোনোদিন চুরি করবে না।’

তিন চোর বলল, ‘আমরা শপথ করছি মহারাজ, আর কোনোদিন চুরি করব না। সুযোগ দিলে আমরা সৎভাবে জীবন কাটাব।’

রাজা মন্ত্রীর দিকে চেয়ে বললেন, ‘আমি তোমাদের মৃত্যুদন্ডের আদেশ প্রত্যাহার করছি।’

তিন চোর রাজাকে প্রণাম করতেই রাজা তৃতীয় চোরের দিকে চেয়ে বললেন, ‘তুমি আমাকে চিনতে পারলে কেমন করে? কাল রাতে আমি তো ছদ্মবেশে ছিলাম।’

চোর হাতজোড় করে বলল, ‘মহারাজ, আমি বলেছিলাম আমি যদি কোনো মানুষের চোখের দিকে একবার তাকাই পরে হাজার মানুষের ভিড়েও তাকে দেখলে ঠিক চিনতে পারি। রাজসভায় ঢুকে আপনার দিকে তাকাতেই আপনাকে চিনতে পেরেছি।’

রাজা বললেন, ‘সত্যিই তোমাদের গুণের কোনো তুলনা নেই, আজ থেকে তোমাদের নগরপালের অধীনে চোর ধরার কাজে নিযুক্ত করলাম।’

চোরেরা আনন্দে রাজার জয়ধ্বনি করে উঠল।

সকল অধ্যায়
১.
ওঝা ও পাহাড়ি ভূত
২.
দুই সূর্য
৩.
মহিষ ও রাখালছেলে
৪.
তিন বন্ধু
৫.
বাঘ মামার কথা
৬.
কুঁজো আর অন্ধ
৭.
দেবতার অভিশাপ
৮.
সাতবোকা
৯.
বাহাদুর আর এক-পা-ওলা দৈত্য
১০.
সাধু ও মহাজন
১১.
চালাক ভোলানাথ
১২.
বামুন আর শেয়াল
১৩.
আকাশপুরীর রাজকন্যা
১৪.
অতি চালাকের গলায় দড়ি
১৫.
তিন জামাই
১৬.
শেয়ালবউ-এর বুদ্ধি
১৭.
শেয়াল আর বোকা বাঘ
১৮.
বুদ্ধিমান চোর
১৯.
শুয়োরের শিং
২০.
রাখালছেলে ও পরির দেশের রাজকন্যা
২১.
তাঁতির কুঁজ
২২.
চার চোর
২৩.
কাঠুরে নাপিত আর রাজকন্যা
২৪.
মহেশ্বর
২৫.
আয়না
২৬.
শেয়াল ও বুড়োবুড়ি
২৭.
এক দাঁত ফোকলা
২৮.
বুদ্ধি থাকলেই উপায় হয়
২৯.
ভীম আর জলদৈত্য
৩০.
চার ভাই
৩১.
সুরের জাদু
৩২.
ভূত ও ভূতনাথ
৩৩.
রসিক রাজু

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%