বাঘ মামার কথা

চঞ্চলকুমার ঘোষ

এক ছিল চাষি। চাষির তিন ছেলে, তিন ছেলের তিন বউ। বড়োবউ, মেজোবউ আর ছোটোবউ। বড়োবউ আর মেজোবউ-এর বাবা খুব বড়োলোক। সারা বছর মেয়েদের কত কিছু দেয়। ছোটোবউ-এর বাবা-মা কেউ নেই। মনে ভারি দুঃখ, রান্নাঘরে বসে কাঁদে আর বলে, আমার নিজের যদি কেউ থাকত তবে আমাকেও কত কিছু দিত।

একদিন চাষির রান্নাঘরের পেছনে বসেছিল এক বাঘ। ছোটোবউ-এর কথা শুনে বাঘের খুব দয়া হল, খানিক পরে চাষির দরজায় এসে কড়া নাড়ল বাঘ। ছোটোভাগনি বাড়ি আছিস নাকি?

সামনের ঘরে শুয়েছিল চাষি। ভাবল এত রাতে কে ডাকে? দরজা খুলতেই দেখে সামনে বাঘ। চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলছে। ভয়ে ঠক ঠক করে কাঁপতে আরম্ভ করল চাষি।

বাঘ বলল, ‘নমস্কার বেয়াইমশাই, আমি ছোটোবউ-এর মামা, তাকে মামারবাড়ি নিয়ে যেতে এসেছি।’

চাষি কী বলবে ভেবে পেল না। তাড়াতাড়ি ভেতরে গিয়ে খবর দিতেই সারা বাড়িময় কান্নাকাটি শুরু হয়ে গেল, বাঘ নিশ্চয়ই ছোটোবউকে খেতে এসেছে।

ছোটোবউ একবার একে বলে একবার ওকে বলে, ‘ওগো, তোমরা আমায় বাঘের কাছে পাঠিয়ো না।’

চাষি বলল, ‘তুমি যদি না যাও তাহলে বাঘ আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে।’ মেজোবউ বলল, ‘তোমার জন্য আমরা কেন মরব?’

ছোটোবউ আর কী করে, কাঁদতে কাঁদতে চলল। দরজার বাইরে পায়চারি করছিল বাঘ। ছোটোবউ আসতেই বাঘ বলল, ‘আয় ভাগনি তোকে মামারবাড়ি নিয়ে যেতে এসেছি আমার পিঠে উঠে বস।’

ছোটো বউ কাঁপতে কাঁপতে বাঘের পিঠে চেপে বসল। সঙ্গে সঙ্গে তিরের মতো ছুটতে আরম্ভ করে দিল বাঘ। জঙ্গলের মধ্য দিয়ে এ-রাস্তা সে-রাস্তা পেরিয়ে বাঘের বাড়ি এসে পৌঁছাল। ছোটোবউকে পিঠ থেকে নামিয়ে বাঘ বলল, ‘আমার ঘরে আয় ভাগনি।’

ছোটোবউ ভাবল, এইবার বাঘ আমাকে খাবে। ভয়ে ভ্যাঁক করে কেঁদে ফেলল। ছোটোবউকে কাঁদতে দেখে বাঘ বলল, ‘কী হল ভাগনি তুই কাঁদছিস কেন?’

পাছে বাঘ রেগে যায় তাই ছোটোবউ বলল, ‘মা-বাবার জন্যে বড্ড মন কেমন করছে মামা।’

বাঘ বলল, ‘মন খারাপ করিস না, আমি তো আছি। তুই ঘরে গিয়ে ঘুমো, আমি এখানে শুয়ে পড়ি।’

ঘরে গিয়ে ছোটোবউ দ্যাখে চারদিকে কত হাড়গোড় পড়ে আছে। সব পরিষ্কার করে মেঝের একপাশে শুয়ে পড়ল। বাইরে ঘড় ঘড় করে নাক ডেকে ঘুমোতে লাগল বাঘ। ঘরের মধ্যে ছোটোবউ-এর আর ঘুম হয় না। ভয় হয় এই বুঝি বাঘ এসে ধরে।

সকাল বেলায়, দাঁতন কাঠি দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে ঘরে ঢুকে বাঘ বলল, ‘কাল কেমন ঘুম হল ভাগনি?’

ভয়ে ভয়ে ছোটোবউ বলল, ‘খুব ভালো ঘুম হয়েছে মামা।’

বাঘ বলল, ‘ভয় করেনি তো?’

ছোটোবউ বলল, ‘মামারবাড়িতে আবার কীসের ভয়।’

বাঘ খুশি হয়ে বলল, ‘তবে তুই এখানে থাক, আমি হাট থেকে ঘুরে আসি। তার আগে বলত ভাগনি, আমায় দেখতে কেমন?’

ছোটোবউ বলল, ‘তোমায় দেখতে খুব সুন্দর।’

বাঘ বলল, ‘আচ্ছা ভাগনি, আমার চোখ দুটো কেমন?’

ছোটোবউ বলল, ‘ঠিক পদ্মফুলের মতো।’

বাঘ বলল, ‘আর আমার দাঁতগুলো?’

ছোটোবউ বলল, ‘মামা, তোমার দাঁতগুলো বঁাকা চাঁদের মতো।’

প্রশংসা শুনে বাঘ তো আহ্লাদে আটখানা। বলল, ‘আমার গায়ের গন্ধ কেমন বললি না তো ভাগনি?’

ছোটোবউ বলল, ‘ঠিক ফুলের মতো।’

বাঘ ভারি খুশি হয়ে বলল, ‘তুই এখানে থাক, আমি হাটে যাব আর আসব।’

নদীর ধারে হাট, কত লোকজন। বাঘ হালুম হুলুম করে হাটে গিয়ে ঢুকতেই সেএক হুলুস্থুল কান্ড। সারা হাটে হইচই। জিনিসপত্র ফেলে যে-যেদিকে পারল পালাল। ফাঁকা হয়ে গেল সব দোকান। বাঘ ঢুকে পড়ল এক দোকানে। পছন্দমতো জামাকাপড় নিয়ে চলল গহনার দোকানে। ওদিকে ছোটোবউ জঙ্গলে বসে বাড়ির জন্য কাঁদছিল। বাঘ থলে ভরতি জিনিস নিয়ে আসতেই তাড়াতাড়ি চোখ মুছে ফেলল ছোটোবউ। বাঘ থলে নামিয়ে বলল, ‘ভাগনি, দেখ তোর জন্যে কত কী নিয়ে এসেছি।’

ছোটোবউ মহাখুশি। বলল, ‘এত জিনিস সব আমার?’

বাঘ বলল, ‘হ্যাঁ রে ভাগনি সব তোর। জিনিসপত্র নিয়ে এবার আমার পিঠে উঠে বস, তোকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি।’

চাষির বাড়ির সবাই ভেবেছিল ছোটোবউকে বাঘে খেয়ে ফেলেছে। ছোটোবউ বাড়ি ফিরতেই সবার আনন্দ দেখে কে! শুধু মেজোবউ-এর হিংসেতে বুক জ্বলতে লাগল।

একদিন সন্ধেবেলায় রান্নাঘরে একা একা কাজ করছিল মেজোবউ, হঠাৎ নাকে বাঘের গন্ধ আসতেই বুঝতে পারল, ঘরের পেছনে বাঘ এসেছে। মেজোবউ ভাবল ছোটোবউ বাঘের কাছ থেকে যা নিয়েছে আমি তার চেয়েও বেশি জিনিস নেব। বাঘকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল, আমার যদি একটা মামা থাকত তবে আমায় কত জিনিস দিত।

বাঘ সব শুনল। রাত হতেই চাষির দরজায় এসে কড়া নেড়ে বলল, ‘মেজভাগনি বাড়ি আছিস নাকি, তোকে মামাবাড়ি নিয়ে যেতে এসেছি।’ মেজোবউ তৈরি হয়েই ছিল। তাড়াতাড়ি বাঘের পিঠে চড়ে বসল। বাঘ মেজোবউকে নিয়ে জঙ্গলে তার ঘরে আসতেই মেজোবউ বলল, ‘এ আমায় কোথায় নিয়ে এলে মামা? চারদিকে কী নোংরা?’

বাঘ সব পরিষ্কার করে বলল, ‘তুই এখানে ঘুমো ভাগনি, কাল সকালে আমি আসব।’

বাঘ বেরিয়ে পড়ল। সকালবেলায় দাঁত মাজতে মাজতে এসে বলল, ‘কাল কেমন ঘুম হল ভাগনি?’

মেজোবউ মুখ বেঁকিয়ে বলল, ‘বিছানা ছাড়া কী ঘুম হয়?’

বাঘ বলল, ‘তবে তুই একটু বস, আমি হাট থেকে বিছানা নিয়ে আসি। তার আগে বলত ভাগনি আমায় দেখতে কেমন?’

মেজোবউ বলল, ‘একটুও ভালো নয়।’

বাঘ ভাবল মেজোবউ ঠাট্টা করছে। হেসে বলল, ‘বলত আমার চোখ দুটো কেমন?’

মেজোবউ বলল, ‘আগুনের গোলার মতো।’

এবার বাঘের ভারি রাগ হল। তবু মিষ্টি করে বলল, ‘বলত ভাগনি আমার দাঁতগুলো কেমন?’

মেজোবউ মুখ ভেংচে বলল, ‘ঠিক মূলোর মতো।’

রাগে দাঁত কড়মড় করে উঠল বাঘ। বলল, ‘আর আমার গায়ের গন্ধ কেমন?’

নাক সিটকিয়ে মেজোবউ বলল, ‘তোমার গায়ে কী বেঁাটকা গন্ধ।’

আর সহ্য করতে পারল না বাঘ। হালুম করে ঝাঁপিয়ে পড়ল মেজোবউ-এর ওপর। তারপর ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে খেয়ে ফেলল তাকে।

সকল অধ্যায়
১.
ওঝা ও পাহাড়ি ভূত
২.
দুই সূর্য
৩.
মহিষ ও রাখালছেলে
৪.
তিন বন্ধু
৫.
বাঘ মামার কথা
৬.
কুঁজো আর অন্ধ
৭.
দেবতার অভিশাপ
৮.
সাতবোকা
৯.
বাহাদুর আর এক-পা-ওলা দৈত্য
১০.
সাধু ও মহাজন
১১.
চালাক ভোলানাথ
১২.
বামুন আর শেয়াল
১৩.
আকাশপুরীর রাজকন্যা
১৪.
অতি চালাকের গলায় দড়ি
১৫.
তিন জামাই
১৬.
শেয়ালবউ-এর বুদ্ধি
১৭.
শেয়াল আর বোকা বাঘ
১৮.
বুদ্ধিমান চোর
১৯.
শুয়োরের শিং
২০.
রাখালছেলে ও পরির দেশের রাজকন্যা
২১.
তাঁতির কুঁজ
২২.
চার চোর
২৩.
কাঠুরে নাপিত আর রাজকন্যা
২৪.
মহেশ্বর
২৫.
আয়না
২৬.
শেয়াল ও বুড়োবুড়ি
২৭.
এক দাঁত ফোকলা
২৮.
বুদ্ধি থাকলেই উপায় হয়
২৯.
ভীম আর জলদৈত্য
৩০.
চার ভাই
৩১.
সুরের জাদু
৩২.
ভূত ও ভূতনাথ
৩৩.
রসিক রাজু

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%