মহেশ্বর

চঞ্চলকুমার ঘোষ

কোনো এক গাঁয়ে ছিল এক ব্রাহ্মণ আর এক জেলে। দু-জনেরই কোনো ছেলেমেয়ে ছিল না। সেই জন্যে তাদের মনে খুব দুঃখ।

গাঁয়ের উত্তর দিকে ছিল বহু প্রাচীন এক শিবমন্দির। দূরদূরান্ত থেকে লোক এসে সেখানে পুজো দিত। সবাই বলত, এমন জাগ্রত দেবতা আর কোথাও নেই।

ব্রাহ্মণ আর জেলে রোজ সেই মন্দিরে পুজো দিত, সন্তানের জন্য প্রার্থনা করত। তারা ভাবত নিশ্চয়ই শিবঠাকুর তাদের মনস্কামনা পূর্ণ করবেন। দিনের পর দিন কেটে গেল। মাস পার হল। বছর ঘুরে এল। তাদের প্রতি ভগবানের কোনো দয়া হল না। তবুও ব্রাহ্মণ নিয়মিত পুজো করত আর জেলে হতাশ হয়ে তার পুজো করত না। মাঝে মাঝে যখন সেই পথে যেত বাইরে থেকে প্রণাম করত।

একদিন জেলে মাছ ধরে বাড়ি ফিরছিল। পথের ধারেই ছিল এক মদের দোকান। দোকানি জেলের মাথায় মাছের ঝুড়ি দেখে বলল, ‘আজ তো অনেক মাছ পেয়েছ, দুটো মাছ দিয়ে যাও।’

সেদিন জেলের মন খুব ভালো ছিল। মদের দোকানদারকে সেদুটো মাছ দিল। মাছ পেয়ে দোকানদার বলল, ‘সারা রাত জেগে মাছ ধরেছ, দু-গ্লাস মদ খেয়ে যাও, শরীর চাঙ্গা হবে।’

সত্যি সত্যিই জেলের খুব ক্লান্তি লাগছিল। মাছের ঝুড়ি নামিয়ে সেমদের দোকানে বসে পড়ল।

জেলের খুব বেশি মদ খাওয়ার অভ্যেস ছিল না। দু-গেলাস খেতেই তার নেশা হয়ে গেল। পাছে কোনো গোলমাল করে সেই ভয়ে দোকানদার তার মাথায় ঝুড়ি চাপিয়ে একটা মদের বোতল দিয়ে বলল, ‘এবার বাড়ি যাও জেলেভাই, অনেক বেলা হল।’

জেলে মাছের ঝুড়ি নিয়ে টলতে টলতে বাড়ির দিকে চলল। সামনেই শিবের মন্দির। মন্দিরের সামনে আসতেই জেলের মনে হল কতদিন মন্দিরে যাইনি, আজ গিয়ে বাবার কাছে পুজো দেব।

তখন মন্দিরে কোনো লোকজন নেই। মাছের ঝুড়ি নিয়ে জেলে মন্দিরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। সামনেই শিবঠাকুরে মূর্তি। জেলে তাঁর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘শিবঠাকুর, আমি রোজ এসে তোমাকে পুজো করি, তোমার মাথায় জল ঢালি। ফুল দিই, একটা ছেলের জন্যে কত ডাকি তুমি সাড়া দাও না। আজ তোমাকে সাড়া দিতেই হবে।’

শিবঠাকুর যেমন ছিলেন, তেমনিই বসে রইলেন। জেলের ডাকে সাড়া দিলেন না।

আবার জেলে বলল, ‘সাড়া দাও বাবা।’

তবু শিবঠাকুর যেমন চুপ করে বসেছিলেন, তেমনিই চুপ করে রইলেন। এবার জেলের ভীষণ রাগ হল। চেঁচিয়ে বলল, ‘এই শেষবার বলছি যদি আমার ডাকে সাড়া না দাও, তবে এই ঝুড়ির সব মাছ তোমার মাথায় ঢালব। এই মদ দিয়ে তোমাকে স্নান করাব।’

শিব তখন সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠে চুপ করে বসেছিলেন। জেলের চেঁচামেচিতে চোখ মেলে তাকাতেই তাঁর চক্ষুস্থির। এখন যদি জেলে ওই মাছের ঝুড়ি আর বোতলের মদ তাঁর মাথায় ঢেলে দেয় তবে তো গন্ধে প্রাণ যাবার জোগাড় হবে। ভয়েতে শিবের হৃৎকম্প শুরু হয়ে গেল।

ওদিকে জেলে তখনও চিৎকার করছে আর টলতে টলতে এগিয়ে আসছে। শিবঠাকুর দিশেহারা। এখন এই মাতাল জেলেকে কেমন করে সামলানো যায়। দেরি করলে মহাবিপদ হয়ে যাবে।

সঙ্গে সঙ্গে শিবঠাকুর বলে উঠলেন, ‘থাম থাম, তোর ওই মাছ আর মদ আমার মাথায় ঢালিস না। আমি বর দিচ্ছি তোর সাতটা ছেলে হবে।’

শিবের বর পেয়ে জেলে আনন্দে আত্মহারা। বাইরে এসে সবটুকু মদ খেয়ে দু-হাত তুলে নাচতে শুরু করে দিল, ‘শিবঠাকুর আমাকে বর দিয়েছে আমার সাতটা ছেলে হবে, আমার সাতটা ছেলে হবে।’

ছুটতে ছুটতে বাড়ি গিয়ে বউকে বলতেই, বউ তার কথায় কান দিল না। ভাবল, জেলে মদ খেয়ে এইসব কথা বলছে। নেশা কেটে যেতে যখন বউকে সব কথা বলল, বউ-এর তখন সেকী আনন্দ! এতদিনে শিবঠাকুর মুখ তুলে তাকালেন।

ওদিকে বেলা হতেই অন্যদিনের মতো ব্রাহ্মণ মন্দিরে এল পুজো দিতে। শিবঠাকুর তখন কৈলাসে বসে পার্বতির সঙ্গে পাশা খেলছিলেন। ব্রাহ্মণের পুজোয় তাঁর কোনো ভ্রূক্ষেপ ছিল না। হঠাৎ পার্বতী খেলা থামিয়ে বললেন, ‘প্রভু, এ তোমার কেমন পক্ষপাতিত্ব?’

শিব তাড়াতাড়ি বললেন, ‘কেন পার্বতী, আমি তো কখনো কারও প্রতি পক্ষপাতিত্ব করি না।’

‘তবে সকালবেলায় ওই জেলেকে কেন সন্তানের বর দিলে?’

শিব আমতা আমতা করে বললেন, ‘কী করব পার্বতী। বর না দিলে যে জেলে আমার মাথায় মদ আর মাছ ঢেলে দিত।’

জেলের ভয়ে তুমি তাকে বর দিলে আর ওই ব্রাহ্মণ বছরের পর বছর রোজ তোমার পুজো করছে, সন্তানের জন্যে কত কাকুতিমিনতি করছে, তুমি তার দিকে ফিরেও তাকাও না।

শিব বললেন, ‘ব্রাহ্মণের ভাগ্যে যে কোনো সন্তান নেই তা আমি কী করব।’

পার্বতী হাতজোড় করে বলল, ‘সেআমি জানি না প্রভু, ব্রাহ্মণকে বর দিতেই হবে।’

‘তা হয় না পার্বতী। আমি ব্রাহ্মণকে বর দিতে পারব না।’

শিবের কথায় পার্বতীর ভীষণ রাগ হল, খেলা ছেড়ে উঠে পড়ে বলল, ‘তুমি যদি ব্রাহ্মণকে বর না দাও তবে আমি বাপের বাড়ি চলে যাব আর কৈলাসে ফিরব না।’

পার্বতী বাপের বাড়ির কথা বলতেই শিব ভয় পেয়ে গেলেন। পার্বতীর যা রাগ সত্যি সত্যি যদি বাপের বাড়ি চলে যায়। তাড়াতাড়ি পার্বতীকে শান্ত করে বললেন, ‘আমি এক্ষুনি ব্রাহ্মণকে বর দিচ্ছি। তবে আমি ব্রাহ্মণকে বর দিলেও তার ছেলে বারো বছরের বেশি বঁাচতে পারবে না।’

পার্বতী বললেন, ‘তা হোক, তুমি বর দাও।’

ব্রাহ্মণ তখন চোখ বুজে প্রার্থনা করছিল। হঠাৎ তার কানে এল এক অপূর্ব কন্ঠস্বর, ‘ব্রাহ্মণ, আমি তোমার পুজোয় সন্তুষ্ট হয়েছি, আমার আশীর্বাদে তোমার এক ছেলে হবে। কিন্তু যেদিন তার বারো বছর উত্তীর্ণ হবে সেইদিনই সেমারা যাবে।’

শিবের কথা শুনে মন খারাপ হয়ে গেল ব্রাহ্মণের। তার ছেলে মাত্র বারো বছর বঁাচবে। তারপরই মনে হল বারো বছর সেঅনেক দেরি। ততদিন হয়তো আমরা বঁাচবই না, তখন যা হবার হবে। আগে তো ছেলের মুখ দেখি।

আনন্দে ঠাকুরকে প্রণাম করে বাড়িতে গেল বউকে খবর দিতে। ছেলে হয় না বলে ব্রাহ্মণীরও মনে খুব দুঃখ। ব্রাহ্মণের কথা শুনে আনন্দে তার বুক ভরে উঠল।

কিছুদিন পর ব্রাহ্মণীর ফুটফুটে একটা ছেলে হল। চাঁদের আলোর মতো তার রূপ দেখে চোখ ফেরানো যায় না। শিবের আশীর্বাদে ছেলে হয়েছে বলে তার নাম রাখা হল মহেশ্বর।

ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণীর আদর-যত্নে মহেশ্বর বড়ো হয়ে উঠল। দেখতে দেখতে এগারো বছরে পা দিল। একদিন ব্রাহ্মণী ব্রাহ্মণকে বলল, ‘এবার ছেলের বিয়ে দাও। ঘরে আমাদের বউ আসুক।’

ব্রাহ্মণীর কথায় ব্রাহ্মণ রাজি হয়ে গেল। ঘটককে খবর পাঠানো হল। ঘটক রোজই একটা-না-একটা মেয়ের সন্ধান নিয়ে আসে। কাউকেই ব্রাহ্মণের পছন্দ হয় না।

ব্রাহ্মণের গ্রাম থেকে তিন ক্রোশ দূরে ছিল আর-একটা গ্রাম। সেই গ্রামে থাকত এক পুরোহিত। তার একটা মাত্র মেয়ে, নাম সীতা। যেমন তার রূপ তেমনি গুণ।

পুরোহিতের ঘরের সামনে ছিল তুলসীমঞ্চ। সীতা রোজ সেই তুলসীমঞ্চ পরিষ্কার করত। তাতে গোবর দিত। সন্ধেবেলায় প্রদীপ দিত।

একদিন সন্ধেবেলায় লক্ষ্মীঠাকুর সেইখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় তার চোখে পড়ল সীতা তুলসীতলায় পুজো করছে। এইটুকু ছোট্ট মেয়ের এমন ভক্তি দেখে লক্ষীঠাকুরের খুব ভালো লাগল। তিনি প্যাঁচার পিঠে চেপে সীতার কাছে এসে তাকে আশীর্বাদ করে বললেন, ‘তোমার ভক্তি দেখে আমি খুব সন্তুষ্ট হয়েছি। আমি আশীর্বাদ করছি তুমি স্বামী-পুত্র নিয়ে বহুদিন সুখে ঘরকন্না করবে।’

তার কয়েকদিন বাদে ঘটক গিয়ে ব্রাহ্মণকে সীতার কথা বলতেই ব্রাহ্মণের তাকে খুব পছন্দ হয়ে গেল। শুভদিন দেখে সীতার সঙ্গে মহেশ্বরের বিয়ে হয়ে গেল।

দিন যায় মাস পার হয়। এতদিন ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী ভুলেই গিয়েছিল তাদের মহেশ্বরের আয়ু মাত্র বারো বছর। এগারো বছর এগারো মাস হতেই ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণীর মনে হল, মহেশ্বরের জীবনের আর মাত্র এক মাস বাকি।

দুজনের মন খারাপ হয়ে গেল। এত তাড়াতাড়ি বারোটা বছর কেটে গেল। এখন এই ছেলেকে ছাড়া কেমন করে বঁাচব। যত দিন যায় ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী ততই ভেঙে পড়ে।

মহেশ্বর দ্যাখে তার বাবা-মা কিছুই খায় না, ঘুমায় না, দিনরাত শুধু কাঁদে। তার মনে হল নিশ্চয়ই খারাপ কিছু একটা ঘটতে চলেছে। বাবাকে জিজ্ঞেস করে, মাকে জিজ্ঞেস করে, ‘কী হয়েছে তোমরা আমাকে বলো।

ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী কিছুই বলতে পারে না। দেখতে দেখতে শেষ দিন এসে যায়। ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী আর বিছানা ছেড়ে ওঠে না। দু-জনেই বুক চাপড়ে কাঁদতে আরম্ভ করে।

বাবা-মার ওই অবস্থা দেখে মহেশ্বর আর থাকতে পারে না। তাদের কাছে এসে বলল, ‘মা, তোমরা কীসের জন্যে এমন করে কাঁদছ। আমাকে যদি না বলো তাহলে আমি আত্মহত্যা করব।’

ব্রাহ্মণ তখন কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘আমাদের দুভার্গ্যের কথা কী আর বলব বাবা, ভগবান মহাদেব তোর জন্মের আগেই বলেছিলেন তোর আয়ু মাত্র বারো বছর। আর আজ তার শেষ দিন।’

বাবার কথা শুনে মহেশ্বর বলল, ‘তোমরা কেন কাঁদছ মা। জন্মালে তো মরতেই হবে। তার জন্যে দুঃখ করে কী লাভ! তার চেয়ে চলো আমরা মহাদেবের মন্দিরে যাই, যেটুকু সময় বঁাচব তাঁর পুজো করব এতে যদি শিবের দয়া হয়।’

ব্রাহ্মণ বলল, ‘তুই ঠিক বলেছিস, চল সবাই মিলে মন্দিরে যাই।’

ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী, মহেশ্বর আর সীতা মন্দিরে গিয়ে শিবের পায়ের কাছে বসে পুজো করতে আরম্ভ করল। সারা দিনরাত ধরে পুজো চলল।

ওদিকে রাত শেষ হতেই চিত্রগুপ্ত খাতা খুলে যাদের জীবনের আয়ু শেষ হয়েছে তাদের বাড়িতে যমদূতদের পাঠিয়ে দিল। দুই যমদূত মহেশ্বরের বাড়ি এসে তাকে না পেয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল। খুঁজতে খুঁজতে তারা এসে পড়ল মহাদেবের মন্দিরে। সেখানে দ্যাখে মন্দিরের মধ্যে বসে আছে মহেশ্বর।

মন্দিরের ভেতরে ঢোকবার কোনো ক্ষমতা নেই যমদূতদের। বাইরে থেকেই তারা ডাক দিল, ‘মহেশ্বর, বাইরে বেরিয়ে আয় আমরা তোকে নিতে এসেছি।’

মহেশ্বর যমদূতদের কথা শুনতে পেয়েও গ্রাহ্য করল না, যেমন পুজো করছিল তেমনিই পুজো করতে লাগল।

যমদূতেরা আবার ডাক দিল, ‘মহেশ্বর এবারও কোনো সাড়া দিল না। এবার যমদূতরা রেগে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, মহেশ্বর, যদি ভালো চাস তো এখনও বেরিয়ে আয় বলছি।’

কে শোনে কার কথা! রাগে যমদূতেরা মন্দির ঘিরে লাফালাফি শুরু করে দিল। কত ভয় দেখাল, কত লোভ দেখাল। মহেশ্বর যেমন বসে ছিল তেমনিই বসে রইল।

যমদূতেরা মহা ভাবনায় পড়ে গেল। এমন ঘটনা তাদের জীবনে কোনোদিন ঘটেনি। এখন যদি খালিহাতে ফিরতে হয়, তবে যম তাদের মাথাতেই ডাঙসের বাড়ি মারবে। ছোটো যমদূত ভ্যাঁক করে কেঁদে ফেলল, ‘এখন কী হবে?’

বড়ো যমদূত তার চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলল, ‘তুই কাঁদিস না ভাই, পৃথিবীর মানুষগুলো কী ভাববে বলত, চল চিত্রগুপ্তের কাছে যাই।’

চোখের পলকে দু-জনে গিয়ে হাজির হল চিত্রগুপ্তের কাছে, চিত্রগুপ্ত তখন ইয়া মোটা খাতায় হিসাব লিখছিল। দুই যমদূত সামনে এসে দাঁড়াতেই বলল, ‘কী ব্যাপার তোরা যে খালিহাতে এসেছিস?’

বড়ো যমদূত মুখ কাচুমাচু করে বলল, ‘কী বলব, বেটা মহেশ্বর শিবের মন্দিরে গিয়ে পূজা করছে, আমরা চেষ্টা করেও তাকে বাইরে আনতে পারলাম না।’

চিত্রগুপ্ত তার খাতা সরিয়ে লাফ দিয়ে উঠে পড়ল, ‘তোরা বলিস কী, এখনও সেবেঁচে আছে। চল তো গিয়ে দেখি।’

একবার হাততালি দিতেই তারা শিবের মন্দিরের সামনে এসে নামল। চিত্রগুপ্ত দরজার সামনে গিয়ে হাঁক মারল, ‘মহেশ্বর বেরিয়ে আয়, আমি চিত্রগুপ্ত বলছি, তোর কোনো শাস্তি হবে না, তোর মাথায় ডাঙসের বাড়ি মারব না। তোকে পুকুরে চোবাব না।’

তবুও মহেশ্বর তার কথায় কান দিল না, যেমন পূজা করছিল তেমনি পুজা করতে লাগল। চিত্রগুপ্ত সারাদিন ধরে রোদে পুড়ে চিৎকার চেঁচামেচি করেও মহেশ্বরকে বাইরে আনতে পারল না। সন্ধেবেলায় হাঁপাতে হাঁপাতে গিয়ে হাজির হল যমের বাড়িতে। যম তখন রাতে ঘুমাবার জন্যে তোড়জোড় করছিল।

চিত্রগুপ্ত তার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ল, ‘প্রভু, বারো বছরের একটা ছেলের কাছে আমাদের মানসম্মান সব গেল, এখন আপনি যা-হোক কিছু করুন।’

অসময়ে বিরক্ত করাতে যমরাজ রেগে বলল, ‘কান্নাকাটি থামিয়ে কী হয়েছে বলো।’

চিত্রগুপ্ত সব বলতেই রাগে যমের চোখ দুটো জ্বলে উঠল, ‘কোথায় আমার ষাঁড়, আমি এক্ষুনি মন্দিরে যাব।’

ষাঁড় আসতেই চিত্রগুপ্তকে নিয়ে যম তার পিঠে চেপে রওনা হল পৃথিবীতে। সারাদিন মন্দিরে বসে থেকে ঘুম এসে গিয়েছিল সকলের। যমের ভয়ংকর ডাক শুনতেই ঘুম ভেঙে গেল। ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী আর সীতা ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে। মহেশ্বর তাদের সাহস দিয়ে বলল, ‘তোমাদের কোনো ভয় নেই, দেখি না যম কী করে।’

ওদিকে যম হুংকার দিয়ে বলল, ‘ভালো চাস তো বেরিয়ে আয় বলছি।’

সকাল থেকে চুপ করে ছিল মহেশ্বর। এইবার সেও চেঁচিয়ে উঠল, ‘যমরাজ, আমি বাইরে যেতে পারব না, যদি দরকার হয় তুমি ভেতরে এসো।’

এমন কথা জীবনে কোনোদিন শোনেনি যম। রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘আমি দেবরাজ ইন্দ্রের কাছে চললাম, তিনিই তোর ব্যবস্থা করবেন।’

ইন্দ্র তখন ঘুমোচ্ছিলেন। যম গিয়ে ডাকতেই তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। যম ঘরে আসতেই তাঁর মনে হল নিশ্চয়ই কোথাও কোনো বিপদ ঘটেছে, নইলে এত রাতে কেন যম এসেছে। জিজ্ঞেস করতেই যম বলল, ‘আর আমার পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। আপনি আমার জায়গায় অন্য কোনো লোক নিন।’

ইন্দ্র বললেন, ‘সেকী কথা যম, তোমার মতো কাজের লোক আমি কোথায় পাব?’

দেবাদিদেব মহাদেবের জন্য আমার কাজকর্ম সব বন্ধ হবার জোগাড়।

ইন্দ্র তো অবাক! মহাদেবের মতো শান্ত ব্যোম ভোলানাথ আবার কী করল?

যম সব বলতেই ইন্দ্র বললেন, ‘তবে চলো মহাদেবের কাছে যাই, তিনি নিশ্চয়ই একটা কিছু ব্যবস্থা করবেন।’

চোখের পলকে তিনজনে গিয়ে হাজির হলেন কৈলাসে। শিব তাঁদের দেখেই বললেন, ‘কী ব্যাপার, এই সাতসকালে তোমরা সকলে এমন শুকনো মুখে আমার কাছে এসেছ?’

ইন্দ্র হাতজোড় করে বললেন, ‘প্রভু মর্তে এক ব্রাহ্মণের ছেলে যমের ভয়ে আপনার মন্দিরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে, তার আয়ু শেষ হয়ে গিয়েছে অথচ যম কিছুতেই সেখানে ঢুকতে পারছে না।’

যমের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল চিত্রগুপ্ত। হাতে তার মোটা খাতা। শিব সেইদিকে তাকিয়ে বলল, ‘চিত্রগুপ্ত, আগে তোমার খাতা খুলে দেখাও ব্রাহ্মণের ছেলের আয়ু কতদিন, তারপর দেখছি কী করা যায়।’

চিত্রগুপ্ত খাতা খুলতেই সবাই দেখল মহেশ্বরের নামের পাশে স্পষ্ট করে বারো লেখা রয়েছে। শিব মাথা নেড়ে বললেন, ‘আয়ু যখন শেষ হয়েছে তখন তো ব্রাহ্মণের ছেলেকে যমরাজের কাছে যেতেই হবে। নন্দি-ভৃঙ্গি তোমরা এক্ষুনি যমের সঙ্গে মর্তে যাও।’

নন্দি-ভৃঙ্গি তখন আফিং খেয়ে ঝিমুচ্ছিল, শিব ডাকতেই তাদের নেশা কেটে গেল। যমের সঙ্গে পৃথিবীতে উড়ে চলল।

শিবমন্দিরে দু-দিন ধরে পুজো করে ঘুমিয়ে পড়েছিল মহেশ্বর। তার বউ সীতা তখন পুজো করছিল। যমকে বাইরে রেখে নন্দি-ভৃঙ্গি মন্দিরে দরজার কাছে আসতেই সামনে মা লক্ষ্মী। নন্দি-ভৃঙ্গি তাঁকে প্রণাম করে বলল, ‘মা, তুমি সরে দাঁড়াও, আমরা ব্রাহ্মণের ছেলেকে নিয়ে গিয়ে যমের হাতে দেব।’

লক্ষ্মী ঠাকুর মাথা নেড়ে বললেন, ‘তা তো হবে না বাবা। সীতা রোজ আমাকে পুজো করে, আমি তাকে বিধবা হতে দেব না, তোমরা যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে ফিরে যাও।’

লক্ষ্মী ঠাকুরের মুখের ওপর কথা বলতে সাহস হল না নন্দি-ভৃঙ্গির। যমকে নিয়ে তক্ষুনি ফিরে গেল শিবের কাছে। সব শুনে শিব বললেন, ‘তবে তো আমার কিছু করবার নেই, চলো নারায়ণের কাছে যাই। নারায়ণ যদি তাঁর বউ লক্ষ্মীকে বোঝাতে পারেন, তবেই ব্রাহ্মণের ছেলেকে যমপুরীতে আনা যাবে।’

শিব তাঁর দলবল নিয়ে নারায়ণের কাছে যাওয়ার আগেই লক্ষ্মী তাঁর প্যাঁচার পিঠে চেপে পৌঁছে গেলেন নারায়ণের কাছে। অসময়ে লক্ষ্মীকে দেখে নারায়ণ বললেন, ‘কী ব্যাপার লক্ষ্মী, তুমি এত তাড়াতাড়ি পৃথিবী থেকে ফিরে এলে?’

‘কী করব প্রভু, আমি একটা মেয়েকে বর দিয়েছিলাম যে স্বামী-পুত্র নিয়ে দীর্ঘদিন ঘরসংসার করবে। সবেমাত্র তাদের বিয়ে হয়েছে, এক্ষুনি যম এসে তার বরকে নিয়ে যেতে চায়।’

‘যদি তার আয়ু ফুরিয়ে গিয়ে থাকে, তবে তো যম তাকে নিয়ে যাবেই।’

লক্ষ্মী কাঁদো-কাঁদো হয়ে বললেন, ‘তবে যে প্রভু আমার কথা মিথ্যে হয়ে যাবে। পৃথিবীর আর কোনো লোক কোনোদিন কী আমাকে পুজো করবে? আপনি যা-হোক একটা কিছু করুন প্রভু, নয়তো আমার মানসম্মান সব নষ্ট হয়ে যাবে।’

এমন সময় বাইরে থেকে শিবের গলা শোনা গেল। নারায়ণ লক্ষ্মীকে বললেন, ‘তুমি ভেতরে যাও, আমি দেখি কী করা যায়।’

লক্ষ্মী ভেতরে যেতেই ঘরে ঢুকলেন শিব, ইন্দ্র, যম ও চিত্রগুপ্ত। নারায়ণ তাঁদের সবাইকে অভ্যর্থনা করে আসন দিতেই শিব বললেন, ‘নারায়ণ, আমরা মহাবিপদে পড়ে তোমার এখানে এসেছি, তুমি যদি এখন রক্ষা না করো, তবে যে পৃথিবীর সব নিয়মকানুন নষ্ট হয়ে যায়।’

নারায়ণ গম্ভীর গলায় বললেন, ‘আমি তো কিছুই জানি না দেবাদিদেব।’

এক ব্রাহ্মণ সন্তানের আয়ু শেষ হয়েছে কিন্তু মাতা লক্ষ্মী তাকে রক্ষা করেছেন।’

নারায়ণ সব কিছু না জানার ভান করে বললেন, ‘এটা তো লক্ষ্মীর ঠিক কাজ হয়নি দেবাদিদেব।’

সঙ্গে সঙ্গে ইন্দ্র বললেন, ‘সেইজন্যে তো প্রভু আমরা তাকে যমালয়ে আনতে পারিনি। দু-দিন আগে তার আয়ু শেষ হয়েছে অথচ এখনও সেজীবিত রয়েছে।’

নারায়ণ খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘ব্রাহ্মণের পুত্রের আয়ু কতদিন?’

চিত্রগুপ্ত তাড়াতাড়ি খাতা খুলে নিয়ে নারায়ণের কাছে এসে বললেন, ‘এই দেখুন মাত্র বারো বছর।’

নারায়ণ খানিক তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘আজকাল আমি খালিচোখে ভালো দেখতে পাই না। চিত্রগুপ্ত, তোমার খাতাটা দাও ঘরে গিয়ে চশমা পরে ভালো করে দেখি।’

চিত্রগুপ্তের কাছ থেকে খাতা নিয়ে নারায়ণ ঘরে চলে গেলেন। একটু পরেই চশমা পরে নারায়ণ বাইরে এসে বললেন, ‘কোথায় বারো লেখা রয়েছে চিত্রগুপ্ত? তোমারও কি আমার মতো চোখ খারাপ হয়েছে? চশমা পরে ভালো করে দ্যাখো একশো কুড়ি লেখা রয়েছে।’

চিত্রগুপ্ত চশমা পরে দ্যাখে সত্যি সত্যিই একশো কুড়ি লেখা রয়েছে। শিব তাড়াতাড়ি চিত্রগুপ্তের কাছ থেকে চশমা নিয়ে চোখে পরে নিলেন। তারপর খাতাটা টেনে নিয়ে ভালো করে দেখে বললেন, ‘একশো কুড়িই লেখা রয়েছে। শূন্যটা একটু আবছা এই যা। আগে তো আমিও দেখলাম বারো লেখা রয়েছে। এখন বুঝতে পারছি আমারও চোখ খারাপ হয়েছে। চিত্রগুপ্ত, তাহলে তোমার ভুলেই একটা ব্রাহ্মণসন্তান অকালে মরতে বসেছিল আর সেই ব্রহ্মহত্যার পাপ গিয়ে লাগত আমার।’

ইন্দ্র, যম, চিত্রগুপ্তের মুখে আর কোনো কথা নেই। নারায়ণ একটু হেসে বললেন, ‘যা হবার হয়েছে, চিত্রগুপ্ত, তুমি আমার চশমাটা নিয়ে যাও। এবার থেকে এই চশমাটা পরে কাজ করবে।’

সবাই লজ্জায় মাথা নীচু করে চলে যেতেই লক্ষ্মী বেরিয়ে এলেন। তাঁকে দেখেই নারায়ণ হেসে বললেন, ‘আজ তোমার জন্যে সবার সাথে চালাকি করতে হল।’

লক্ষ্মী হেসে বললেন, ‘সেকী রকম প্রভু?’

চিত্রগুপ্তের খাতায় দেখি সত্যি সত্যি ব্রাহ্মণের ছেলের আয়ু বারো বছর। তখন আর কী করি। ঘরের ভেতরে খাতা নিয়ে গিয়ে হালকা করে তার পাশে একটা শূন্য বসিয়ে দিলাম। সবাই ভাবল আগে খালিচোখে শূন্য দেখতে পায়নি, চশমা পরে এখন দেখতে পাচ্ছে।

নারায়ণেও কথা শুনে লক্ষ্মীর তখন সেকী হাসি!

মর্তে শিবের মন্দিরে সীতার কানে সেই হাসি পৌঁছোতেই সেবলল, আর কোনো ভয় নেই এবার চলো ঘরে ফিরে যাই।

লক্ষ্মীর দয়ায় প্রাণ পেয়ে মহেশ্বর মা-বাবা আর বউকে নিয়ে বাড়ি ফিরে গেল। তারপর তারা সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে ঘর-সংসার করতে লাগল।

সকল অধ্যায়
১.
ওঝা ও পাহাড়ি ভূত
২.
দুই সূর্য
৩.
মহিষ ও রাখালছেলে
৪.
তিন বন্ধু
৫.
বাঘ মামার কথা
৬.
কুঁজো আর অন্ধ
৭.
দেবতার অভিশাপ
৮.
সাতবোকা
৯.
বাহাদুর আর এক-পা-ওলা দৈত্য
১০.
সাধু ও মহাজন
১১.
চালাক ভোলানাথ
১২.
বামুন আর শেয়াল
১৩.
আকাশপুরীর রাজকন্যা
১৪.
অতি চালাকের গলায় দড়ি
১৫.
তিন জামাই
১৬.
শেয়ালবউ-এর বুদ্ধি
১৭.
শেয়াল আর বোকা বাঘ
১৮.
বুদ্ধিমান চোর
১৯.
শুয়োরের শিং
২০.
রাখালছেলে ও পরির দেশের রাজকন্যা
২১.
তাঁতির কুঁজ
২২.
চার চোর
২৩.
কাঠুরে নাপিত আর রাজকন্যা
২৪.
মহেশ্বর
২৫.
আয়না
২৬.
শেয়াল ও বুড়োবুড়ি
২৭.
এক দাঁত ফোকলা
২৮.
বুদ্ধি থাকলেই উপায় হয়
২৯.
ভীম আর জলদৈত্য
৩০.
চার ভাই
৩১.
সুরের জাদু
৩২.
ভূত ও ভূতনাথ
৩৩.
রসিক রাজু

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%