চঞ্চলকুমার ঘোষ
এক ছিল রাখাল। বাবা মা কেউ ছিল না তার। গাঁয়ের লোকেদের গোরু চরাত। লোকে খুশি হয়ে যে যা দিত, তাতেই তার দিন চলে যেত।
একদিন রাখাল মাঠে গিয়েছে গোরু চরাতে। মাঠের পাশেই জঙ্গল। হঠাৎ জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এল বিরাট একটা বাঘ। মাঠের গোরু দেখে বাঘের জিভে জল এসে গেল। গুটিগুটি পায়ে এগোতেই রাখাল চিৎকার শুরু করে দিল। রাখালের চিৎকারে গোরুর পাল ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালিয়ে গেল।
গোরু না পেয়ে বাঘ ভীষণ রেগে গেল। সোজা গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল রাখালের ওপর। বেচারা রাখাল চেষ্টা করেও পালাতে পারল না। বাঘ তাকে মুখে করে নিয়ে চলল জঙ্গলে।
সেই জঙ্গলে থাকত একদল মহিষ। যেমন বিশাল তাদের চেহারা, তেমনি তাদের শক্তি। বাঘের সঙ্গে একটুও বনিবনা হত না তাদের। দেখা হলেই মারামারি শুরু হয়ে যেত।
বাঘ যে-পথ দিয়ে যাচ্ছিল সেই পথ দিয়ে আসছিল মহিষের দল। মুখোমুখি হতেই তারা দাঁড়িয়ে পড়ল। বাঘ মুখে শিকার নিয়ে লড়াই করতে চাইছিল না। মহিষেরা শিং নেড়ে তেড়ে আসতেই বাঘ আর কী করে রাখালকে ছেড়ে দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল মহিষদের ওপর। শুরু হয়ে গেল তাদের মারামারি। কেউ কারোর চেয়ে কম যায় না। তবুও বাঘ বেশিক্ষণ মহিষদের সঙ্গে লড়াই করতে পারল না। মহিষেরা শিং দিয়ে বাঘের পেট ফুটো করে নাড়িভুড়ি বের করে দিল। ছটফট করতে করতে মরে গেল বাঘ।
বাঘ আর মহিষদের সঙ্গে যখন লড়াই চলছিল সেই সুযোগে পালিয়ে গিয়ে একটা গাছে উঠে পড়েছিল রাখাল। বাঘকে মেরে মহিষরা চলে যেতেই রাখাল গাছ থেকে নেমে এল। জঙ্গলের পথঘাট কিছুই চেনে না। এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করতে করতে একটা নদীর পাড়ে এসে পড়ল। অন্ধকার হয়ে এসেছিল। রাখাল আর কী করে। নদীর জল আর গাছের ফল খেয়ে একটা গাছের ওপর উঠে ঘুমিয়ে পড়ল।
সেই গাছের তলায় এসে রোজ রাতে মহিষরা বিশ্রাম করত। সকালবেলায় রাখাল গাছ থেকে নেমে দ্যাখে সারাটা জায়গা নোংরা হয়ে আছে। গাছের পাতা দিয়ে পরিষ্কার করে জল ছিটিয়ে আবার গাছে উঠে পড়ল। রাতের বেলায় মহিষরা সেখানে এসে দ্যাখে একটুও নোংরা নেই কোথাও।
পরদিন মহিষরা চলে যেতেই রাখাল গাছ থেকে নেমে পড়ল। নদীর জল আর গাছের ফল খেয়ে চারদিক পরিষ্কার করতে শুরু করে দিল।
একটা মহিষ আড়াল থেকে সব দেখছিল। রাখাল কাজ শেষ করে যেই গাছে উঠতে যাবে এমন সময় মহিষ তার সামনে এসে দাঁড়াল। মহিষকে দেখেই রাখাল ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। মহিষ তাকে সাহস দিয়ে বলল, ‘তোমার কোনো ভয় নেই, আজ থেকে তুমি আমাদের বন্ধু হলে।’
রাখালের সঙ্গে জঙ্গলের সব মহিষের ভাব হয়ে গেল। রাখাল জঙ্গলের ফল খায়, মহিষের দুধ খায়, তাদের সঙ্গেই ঘুরে বেড়ায়। মাঝে মাঝে তার গ্রামের কথা মনে হয়। একদিন রাখাল মহিষদের বলল, ‘বহুদিন আমি গ্রাম ছেড়ে এসেছি, এইবার আমি গ্রামে যাব।’
মহিষরা কেউ তাকে যেতে দেবে না। রাখাল বলল, ‘আমি কয়েকদিন বাদেই ফিরে আসব।’
রাখালের গ্রামের লোকেরা ভেবেছিল রাখালকে বাঘে খেয়েছে। রাখাল ফিরে আসতেই সবার কী আনন্দ। কেউ আর রাখালকে ছাড়তে চায় না। সবাই বলল, ‘তুই আবার আগের মতো গোরু চরা।’
রাখাল বলল, ‘জঙ্গলে আমার সব বন্ধুরা রয়েছে, আমি না গেলে তাদের মন খারাপ হয়ে যাবে।’
ওদিকে রাখাল চলে যাওয়ার পরদিনই জঙ্গলে একদল শিকারি এসে হাজির। তারা ফাঁদ পেতে সব মহিষকে ধরে ফেলল। তারপর মহিষদের নিয়ে রাজার কাছে বিক্রি করে দিল।
রাস্তার মস্ত খাটাল। তার মধ্যে সব মহিষদের আটকে রাখা হল। কেউ আর মহিষদের কাছে যাওয়ার সাহস পায় না। যে যায় তাকেই শিং দিয়ে মহিষেরা এমন তেড়ে আসে যে, সেআর পালাবার পথ পায় না। রাজার লোকজন ভেবে পায় না কেমন করে মহিষদের পোষ মানানো যায়। তার আগে কেউ কখনও মহিষদের ধরেনি। মহিষরা তখন জঙ্গলে থাকত। লোকেরা শুধু গোরু পুষত। রাজা মন্ত্রীকে বলল, ‘যেমন করে পারো এদের পোষ মানাও। এদের যদি পোষ মানাতে পারো, তবে এদের দিয়ে অনেক কাজ করানো যাবে।’
মন্ত্রী চারদিকে ঢেড়া পিটিয়ে দিল। যে রাজার মহিষদের পোষ মানাতে পারবে তাকে অনেক পুরস্কার দেওয়া হবে। অনেকে সাহস করে এল। কিন্তু মহিষদের দেখেই আর কাছে যেতে সাহস হল না।
ওদিকে রাখাল জঙ্গলে গিয়ে মহিষদের খুঁজে বেড়ায়। কোথাও মহিষদের দেখতে পায় না। ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল তার। অনেক খোঁজাখুঁজি করে শেষে আবার গ্রামে ফিরে চলল। যেতে যেতে শুনতে পেল, শিকারিরা জঙ্গল থেকে অনেক মহিষ ধরে রাজার কাছে বিক্রি করছে। তার সেইসব মহিষ এখন রাজার খাটালে রয়েছে। কেউ তাদের পোষ মানাতে পারছে না, কাছে গেলেই তেড়ে আসছে। মহারাজ তাই ঘোষণা করেছেন, যে এই মহিষদের পোষ মানাতে পারবে তাকে অনেক ধনরত্ন দেওয়া হবে।

রাখালের মন খুব খারাপ হয়ে গেল। বুঝতে পারল তার জঙ্গলের মহিষরা। রাজার লোকেরা বন্দি করে রেখেছে। আর গ্রামে যাওয়া হল না তার। সোজা চলল রাজবাড়ির দিকে।
আগে কোনোদিন রাজবাড়ি আসে নি। ফটকের সামনে গিয়ে প্রহরীদের সব কথা বলতেই তারা রাখালকে মন্ত্রীর কাছে নিয়ে গেল।
মন্ত্রী বললেন, ‘তুমি এই মহিষদের পোষ মানাতে পারবে?’
রাখাল বলল, ‘পারব মহামন্ত্রী।’
রাখালের কথা শুনে সকলে হেসেই অস্থির। মন্ত্রী বলল, ‘কত পালোয়ান এসে মহিষদের কাছেই যেতে পারল না আর তুই মহিষদের পোষ মানাবি!’
রাখাল নাছোড়বান্দা। শেষে মন্ত্রী তাকে নিয়ে চলল খাটালে। প্রহরী দরজা খুলে দিতেই মহিষরা সব তেড়ে এল। রাখাল তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই মহিষরা তাকে চিনতে পারল। সঙ্গে সঙ্গে শান্ত হয়ে লেজ নাড়তে শুরু করে দিল।
রাখাল তাদের পিঠ চাপড়ে আদর করে রাজবাড়ির মাঠে নিয়ে চলল। সেখানে সব মহিষদের ছেড়ে দিয়ে রাখাল মন্ত্রীর কাছে এল। মন্ত্রী তো অবাক! রাখালকে নিয়ে গেল রাজার কাছে।
রাজা খুশি হয়ে রাখালকে অনেক টাকা-পয়সা দিলেন আর মহিষদের দেখাশুনার ভার দিলেন।
সেই থেকে মহিষরা মানুষের পোষ মেনে গেল।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন