চঞ্চলকুমার ঘোষ
এক ছিল বুড়ো। তার দুই ছেলে। বড়োছেলে যেমন চালাক ছোটোছেলে তেমনি বোকা। বড়োছেলে সব সময়েই ছোটোছেলেকে ঠকাত। হঠাৎ একদিন বুড়ো মারা গেল। বড়োছেলে বলল, ‘বাবার যা-কিছু আছে আমরা সব ভাগ করে নেব।’
গাঁয়ের মোড়ল এসে বুড়োর যা-কিছু ছিল সব দুই ভাই-এর মধ্যে ভাগ করে দিল। শুধু একটা আমগাছ, একটা গোরু আর একখানা লেপ ভাগ করা গেল না। বড়োভাই বলল, ‘এ আমরা নিজেরাই ভাগ করে নেব।’
মোড়ল চলে যেতেই বড়োভাই ছোটোভাইকে বলল, ‘আমগাছের নীচের দিকটা তুই নে আর ওপরের দিকটা থাক আমার।’
ছোটোভাই মাথা নেড়ে বলল, ‘আর গোরুটার কী হবে দাদা?’
বড়োভাই বলল, ‘গোরুর সামনের দিকটা তোর আর পেছনের দিকটা আমার।’
ছোটোভাই বড়োর চালাকি বুঝতে পারল না। মহানন্দে আমগাছের গোড়া পরিষ্কার করে, গাছে জল দেয়। কিছুদিন পর আমগাছে আম ধরল। পেকে টুকটুকে লাল হল। বড়োভাই এসে সব আম পেড়ে নিয়ে গেল।
ছোটোভাই বলল, ‘দাদা, আমায় একটাও আম দিলি না?’
বড়োভাই বলল, ‘আম তো হয়েছে গাছের উপরে, তোকে কেন দেব?’
বড়োভাই-এর কথা শুনে ছোটোভাই-এর মন খারাপ হয়ে গেল। এতদিন ধরে আমগাছের এত যত্ন করে একটাও আম পাওয়া যাবে না! কী করবে কিছুই তার মাথায় এল না। গাছের তলায় চুপচাপ বসে রইল।
সেই সময় সেইখান দিয়ে যাচ্ছিল গ্রামের নাপিত। ছোটোভাইকে বসে থাকতে দেখে বলল, ‘তুই এমন মনমরা হয়ে বসে আছিস কেন?’

ছোটোভাই বলল, ‘আমার দুঃখের কথা আর কী বলব ভাই।’
সব শুনে নাপিত বলল, ‘আমি যা বলি সেইমতো কাজ কর, তাহলে সব ঠিক হয়ে যাবে।’
পরদিন সকালে ছোটোভাই মস্ত এক কুড়ুল নিয়ে চলল বাগানে। বড়োভাই জিজ্ঞেস করল, ‘কুড়ুল নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস?’
ছোটোভাই বলল, ‘আমার উনুনের কাঠ নেই, আমগাছের গোড়া কেটে কাঠ করব।’
বড়োভাই ভাবল গোড়া কাটলে তো গোটা গাছটাই মরে যাবে। সেতাড়াতাড়ি বলল, ‘গাছ কাটিস না। আজ থেকে যা আম হবে তার অর্ধেক তোর, অর্ধেক আমার।’
ছোটোভাই মহা খুশি। ঝুড়ি ভরে আম নিয়ে ঘরে ফিরল। বেলা হতেই ছোটোভাই গোরু নিয়ে চলল মাঠে। সারাদিন গোরু চরাল, ঘাস খাওয়াল। বিকেলবেলায় গোরু নিয়ে বাড়ি ফিরে এল। সন্ধেবেলায় বড়োভাই এসে গোরুর সব দুধ দুয়ে নিয়ে ঘরে চলে গেল। গোবর দিয়ে ঘুটে দিল, ছোটভাই কিছুই পেল না।
ভারি রাগ হল তার। পরদিন সকালে নাপিতের বাড়ি গিয়ে বলল, ‘নাপিতভাই, তুমি একটা কিছু করো।’
সব কথা শুনে নাপিত বলল, ‘আমার কথামতো কাজ কর, সব ঠিক হয়ে যাবে।’
বাড়িতে ফিরে গিয়ে গোরুকে আর কিছু খেতে দিল না ছোটোভাই। তার গলায় দড়ি বেঁধে সারাদিন গোয়ালে আটকে রেখে দিল। সন্ধেবেলায় বড়োভাই ছুটতে ছুটতে এসে বলল, ‘তুই গোরুকে খেতে দিসনি কেন?’
ছোটোভাই বলল, ‘আমার ইচ্ছে হয়েছে তাই খেতে দিইনি।’
বড়োভাই বলল, ‘না খেলে যে গোরু মরে যাবে।’
ছোটোভাই বলল, ‘আমি গোরুর মুখে খাবার দেইনি, গোরুর পেছনে তো কিছু করিনি।’
বড়োভাই বুঝতে পারল ছোটোভাই-এর চালাকি। সেতখন বলল, ‘ঠিক আছে, তুই খেতে দে আজ থেকে যা দুধ পাব তার অর্ধেক দুধ তোকে দেব আর অর্ধেক আমি নেব।’
ছোটোভাই মহাখুশি। তখনি গোরুর খাবার নিয়ে গেল গোয়ালে।
দেখতে দেখতে শীতকাল এসে গেল। বড়োভাই বাক্স থেকে লেপ বার করে ছোটোভাইকে দিয়ে বলল, ‘দিনেরবেলায় তুই লেপ রাখ, রাতের বেলায় আমার কাছে থাক।’
ছোটোভাই দাদার দুষ্টুবুদ্ধি না বুঝেই বলল, ‘ঠিক আছে দাদা।’ সেলেপ নিয়ে চলল রোদে দিতে। সন্ধেবেলা গরম লেপ ঘরে নিয়ে আসতেই বড়ো ভাই এসে লেপ নিয়ে চলে গেল। সারা রাত সেগরম লেপের তলায় আরাম করে ঘুমাল আর ছোটোভাই ঠাণ্ডায় ঠক ঠক করে কাঁপতে লাগল।
পরদিন সকাল হতে-না-হতেই ছোটোভাই গেল নাপিতের বাড়ি। বলল, ‘একটা কিছু বুদ্ধি দাও নাপিতভাই, নইলে ঠাণ্ডায় মরে যাব।’
নাপিত বলল, আমার কথামতো কাজ কর সব ঠিক হয়ে যাবে।
বাড়ি গিয়ে সারাদিন ধরে রোদে দিয়ে লেপ গরম করল ছোটোভাই। বিকেল হতেই লেপ নিয়ে চলল পুকুরে। ভালো করে পুকুরের জলে লেপ ভিজিয়ে বাড়ি ফিরে এল। বড়োভাই রোজ গরম লেপের তলায় আরাম করে ঘুমায়। ভিজে লেপ দেখেই তার মাথায় হাত পড়ে গেল। ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে সারা রাত কাটিয়ে দিল।
পরদিন সকাল হতে-না-হতেই বড়োভাই ছোটোভাইকে ডেকে বলল, ‘আমার খুব শিক্ষা হয়েছে। আর কোনোদিন তোকে ঠকাব না। এখন থেকে এক লেপেই দু-জন ঘুমাব।’

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন