সুরের জাদু

চঞ্চলকুমার ঘোষ

সাগরের কূলে সে—এক দেশ। নাম অবন্তিপুর। অবন্তিপুরের রাজা শুকদেব। তার শাসনে প্রজাদের সুখের সীমা ছিল না। জ্ঞানীগুণি অতিথির এত সমাদর আর কোনো দেশে ছিল না।

দেশ-দেশান্তর জুড়ে তাই অবন্তিপুরের খ্যাতি। প্রতিদিনই দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটক আসছে অবন্তিপুরে। বিশাল বিশাল অতিথিশালা সব সময় মানুষের ভিড়ে জমজম করে। রাজা শুকদেব নিজে তাদের তদারক করেন। মাঝে মাঝে রাজপুত্র কৌশিক গিয়ে তাদের সঙ্গে আলাপ করে বিদেশিদের কাছে শোনে দেশ-বিদেশের গল্প।

তার মন অবন্তিপুরের সীমানা ছাড়িয়ে চলে যায় দূর অজানা দেশে। আর মাকে বলে, ‘মা আমি দেশ পর্যটনে যাব।’

রানিমা কৌশিককে আদর করে বলেন, ‘তুমি নিশ্চয়ই যাবে বাবা, এখন যে তুমি ছোটো, আর কয়েক বছর পরে যখন বড়ো হয়ে উঠবে তখন তোমার বাবার আস্তাবলের সবচেয়ে বড়ো ঘোড়াটা নিয়ে বেরিয়ে পড়বে।’

কৌশিক ভাবে কবে আমি বাবার মতো বড়ো হব।

দেখতে দেখতে বছর পার হয়ে যায়। রাজপুত্র কৌশিক বড়ো হয়ে ওঠে।

একদিন রাজসভায় বসে আছেন শুকদেব। পাশে পাত্র-মিত্র-সভাসদ। এমন সময় প্রতিহারী এসে সংবাদ দিল, প্রতিবেশী রাজ্য চন্দনপুর থেকে রাজদূত এসেছেন।

চন্দনপুরের রাজা সত্যজিৎ। শুকদেবের ছেলেবেলাকার বন্ধু। একই গুরুর পাঠশালায় পড়াশুনা করেছে দু-জনে। সেই থেকে দু-জনের ভাব।

প্রতিহারী চন্দনপুরের দূতকে নিয়ে প্রবেশ করতেই রাজা শুকদেব নিজের সিংহাসন ছেড়ে উঠে গিয়ে অভ্যর্থনা করলেন রাজদূতকে।

রাজার পাশে নির্দিষ্ট আসনে বসে রাজদূত বললেন, ‘আমি বিশেষ প্রয়োজনে আপনার কাছে এসেছি।’ রাজা সত্যজিতের ইচ্ছে, আপনার পুত্র কৌশিকের সঙ্গে তার মেয়ে সুদেষ্ণার বিয়ে হোক।

আনন্দে রাজা শুকদেবের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সেতো আমারও ইচ্ছে রাজদূত। আমি শুভদিন দেখে রাজকন্যা সুদেষ্ণাকে আশীর্বাদ করে আসব।

সভায় আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল। রাজপুত্র কৌশিকের বিয়ে হবে রাজকন্যা সুদেষ্ণার সঙ্গে। বাতাসের মতো খবর ছড়িয়ে পড়ল, রাজ্যজুড়ে ঘরে ঘরে আনন্দ।

ওদিকে চন্দনপুরেও শুরু হয়ে গেল উৎসবের আয়োজন।

সখীরা ছুটে আসে রাজকন্যার কাছে। রাজকন্যা সুদেষ্ণা তখন বঁাশি বাজাচ্ছিল। সখীরা এসে দাঁড়াতেই বঁাশি থামিয়ে মুখ তুলে তাকাল রাজকন্যা। কী তার রূপ, যেন পূর্ণিমার চাঁদ তার সব কিরণ ছড়িয়ে দিয়েছে চারদিকে। আর তার বঁাশির সুর ভরিয়ে দেয় মানুষের মন।

রাজপুত্র কৌশিককে কখনো দেখেনি সুদেষ্ণা। ছেলেবেলা থেকেই জেনেছে তার সঙ্গেই বিয়ে হবে। সখীরা চলে যেতেই জানালার ধারে বসে রাজপুত্রের কথা ভাবে। আর নীচের সাগরের ঢেউ গোনে।

বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ রাজকন্যার চোখে পড়ল অদ্ভুত আকৃতির কালো রঙের এক ডিঙি নৌকো। দু-ধারে দু-জন মাঝি। মাঝখানে বসে একজন লোক বঁাশি বাজাচ্ছে। অপূর্ব সেই বঁাশির সুর। নেশার মতো তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

নৌকা দূরে যেতেই সুর মিলিয়ে গেল। চলতে চলতে নৌকা এসে ভিড়ল অবন্তিপুরে। তার থেকে নামল সেই বঁাশিওয়ালা।

তখন সন্ধে হয়ে এসেছে। বঁাশিওয়ালা রাজপথ দিয়ে হেঁটে চলল। পথে যে দ্যাখে সেই তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।

গায়ে অদ্ভুত আলখাল্লা। সারা আলখাল্লায় সাপের ছবি। বঁাশিওয়ালার মুখটাও সাপের মত ভয়ংকর। চোখে চোখ পড়লেই বুকের রক্ত হিম হয়ে আসে।

বঁাশিওয়ালা নগরের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে অতিথিশালায় এলে অতিথিশালার প্রধান রক্ষক চমকে উঠল। কতদিন ধরে দেশ-বিদেশের কত অতিথি এখানে এসেছে এমন কুৎসিত ভয়ংকর কোনো মানুষ তো আসেনি। রাজার আদেশ, কোনো অতিথিকেই যেন ফিরিয়ে দেওয়া না হয়।

বঁাশিওয়ালাকে ঘরে নিয়ে এসে অতিথিশালার রক্ষক জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কোন দেশ থেকে আসছেন?’

‘আমার কোনো দেশ নেই। জন্মেছিলাম সমুদ্রের ওপারে ছোট্ট এক দ্বীপে। বাবা ছিলেন সাপুড়ে। বাবা মারা যেতেই পথে বেরিয়ে পড়লাম। তারপর থেকে দেশে দেশে ঘুরছি। সঙ্গের এই ঝোলা-ঝুলি আর বঁাশি আমার সাথি। পথ আমার বন্ধু আর যে দেশে যাই, সেই দেশের মানুষ আমার বন্ধু।’

সাপুড়ের চেহারা যত কুৎসিত, কন্ঠস্বর তত মধুর আর আশ্চর্য ক্ষমতা তার কথা বলবার। কিছুক্ষণের মধ্যেই চারপাশের সব মানুষকে বশ করে ফেলল। কত দেশের কত বিচিত্র গল্প বলতে থাকে। রাত হতেই কথা শেষ করে ঝোলা থেকে বঁাশি বের করল। তারপর বঁাশিতে ফুঁ দিল। মুহূর্তে সুর ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। কী বিচিত্র সে-সুর। কখনো মনে হচ্ছে, হিংস্র সাপের মতো ভয়ংকর হয়ে উঠছে সে-সুর। আবার কখনো সুরের মায়ায় মন-প্রাণ ভরিয়ে দিচ্ছে।

রাজপ্রাসাদ থেকে সে-সুর শুনতে পায় রাজকুমার কৌশিক। পরদিন সকাল হতেই রাজপ্রতিহারীকে জিজ্ঞাসা করল, ‘কাল রাতে কে বঁাশি বাজাচ্ছিল?’

প্রহরী বলে, ‘অতিথিশালায় এক সাপুড়ে এসেছে।’

‘তুমি তাকে ডেকে নিয়ে এসো।’

বেলা হতেই প্রহরীর সঙ্গে সাপুড়ে এসে দাঁড়াল। বিস্ময়ে চোখের পলক পড়ে না রাজপুত্রের। এমন কুৎসিত মানুষ এমন সুন্দর বঁাশি বাজায়! কথা বলতেই অবাক হয়ে গেল রাজপুত্র। সাপুড়ের কথায় যেন জাদু আছে। সারা দুনিয়ার সব খবর তার নখদর্পণে। সাগর, পাহাড়, জঙ্গল, মরুভূমি—ছবির মতো বর্ণনা করে সাপুড়ে।

গল্প আর শেষ হয় না। সাপুড়েকে ছাড়াও রাজপুত্রের সময় যেন আর কাটে না। দেখতে দেখতে বেশ কয়েকটা দিন কেটে গেল। একদিন সাপুড়ে কৌশিককে বলল, ‘তুমি যাবে নীল পাহাড়ের দেশে? সমুদ্রের পথ ধরে গেলে দুই প্রহরে পৌঁছে যাবে সেখানে। ছোট্ট দ্বীপের মাঝখানে সেই পাহাড়। আলো পড়লেই এক অদ্ভুত নীল রং ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। এমন তার সৌন্দর্য যে চোখ ফেরানো যায় না।’

রাজপুত্র বলল, ‘আমি সেখানে যাব।’

সাপুড়ে চাপা গলায় বলল, ‘আর এক মাস বাদেই যে তোমার বিয়ে, এখন কি মহারাজ তোমাকে যেতে দেবেন?’

কৌশিক বলল, ‘বাবা কোনো কিছুই জানতে পারবে না। আমরা গোপনে যাব গোপনেই ফিরে আসব।’

‘তাহলে কাল ভোরে তুমি প্রস্তুত হয়ে থেকো। আমি ঠিক সময়ে তোমাকে নিয়ে যাব।’

পরদিন ভোর হতেই রাজপুত্র সাপুড়ের সঙ্গে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে পড়ল। তীরেই বঁাধা ছিল নৌকা। সাপুড়ে নিজেই নৌকার হালে গিয়ে বসল।

ঢেউয়ের তালে তালে নৌকা ভেসে চলল। কুল ছেড়ে নৌকা যত দূরে যায় ততই সাপুরের মুখ ভয়ংকর হয়ে উঠতে থাকে।

ভয়েতে রাজপুত্র বলে ওঠে, ‘তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে চলেছ?’

নীল পাহাড়ের দেশে।

কৌশিক বলে, ‘তোমার মুখ এত ভয়ংকর হয়ে উঠছে কেন?’

হাসিতে ফেটে পড়ল সাপুড়ে। আতঙ্কে শিউরে ওঠে কৌশিক। তারপরই জ্ঞান হারিয়ে ফেলল রাজপুত্র।

অবন্তিপুরের রাজপ্রাসাদে তখন খোঁজাখুঁজি শুরু হয়ে গিয়েছে। ভোর থেকে রাজপুত্রের কোনো সন্ধান নেই। প্রহরীরা চারদিকে বেরিয়ে পড়েছে। হঠাৎ কে একজন বলল, ‘সেই সাপুড়েকে তো দেখছি না কোথাও?’

সত্যি তো! তবে কি ওই সাপুড়েই মায়ার ফাঁদে ভুলিয়ে নিয়ে গেছে রাজপুত্রকে।

রাজা হুকুম দিলেন, ‘যে যেখানে আছে বেরিয়ে পড়ো। যেমন করে হোক, রাজপুত্রকে উদ্ধার করে নিয়ে আসতেই হবে।’

সৈন্যরা ঘোড়া ছুটিয়ে চলল, পাহাড়-জঙ্গল-নগর-বন্দরে। কোথাও রাজপুত্র নেই।

চন্দনপুরেও গিয়ে পৌঁছাল সে-সংবাদ। তখন বঁাশি বাজাচ্ছিল রাজকন্যা। সখীরা গিয়ে তাকে সংবাদ দিতেই চমকে উঠল সুন্দরী রাজকন্যা সুদেষ্ণা। রাজপুত্রকে ছাড়া কেমন করে সেবঁাচবে। কান্নায় ভেঙে পড়ল সুদেষ্ণা।

ওদিকে এক দিন দু দিন করে বেশ কিছুদিন কেটে গেল। যারা রাজপুত্রের সন্ধানে গিয়েছিল একে একে সবাই ফিরে এল।

রাজকন্যার মন উথাল পাথাল করতে থাকে। সখীরা বলল, ‘এখন কী হবে রাজকন্যা?’

রাজকন্যা বলল, ‘আমি যাব রাজপুত্রকে উদ্ধার করতে।’

‘তুমি কোথায় যাবে রাজকন্যা? এত লোক যার সন্ধান পেল না, তুমি তাকে কোথায় খুঁজে পাবে?’

‘জানি না, তবে যতদিন না রাজপুত্রকে খুঁজে পাব ততদিন আর ফিরব না।’

সখীরা কত বোঝাল। কত ভয় দেখাল। কেউ সুদেষ্ণার মন টলাতে পারল না।

একদিন গভীর রাতে ছেলেদের মতো সাজ করে বেরিয়ে পড়ল সুদেষ্ণা। পোশাকের মধ্যে নিল ধারালো ছুরি আর কোমরে বঁাশি।

সবাই ঘুমিয়ে ছিল, কেউ জানতে পারল না কোথায় গেল সুদেষ্ণা।

চন্দনপুরের সীমানা ছাড়িয়ে এগিয়ে চলল রাজকুমারী সুদেষ্ণা। চলতে চলতে এসে পড়ল এক নির্জন প্রান্তরে। মানুষজন কেউ নেই। চারদিক খাঁ খাঁ করছে। ক্লান্ত হয়ে গাছতলায় বসে পড়ল আর অল্পক্ষণেই দু-চোখে ঘুম নেমে এল।

যখন ঘুম ভাঙল দুপুর হয়ে গিয়েছে। হঠাৎ তার মনে হল দূরে কে যেন বঁাশি বাজাচ্ছে। খুব চেনা সুর। সুদেষ্ণা চেয়ে দেখে ডিঙিতে বসে বঁাশি বাজাচ্ছে এক সাপুড়ে। সুদেষ্ণাকে দেখেই সাপুড়ে বলল, ‘কে তুমি?’

গম্ভীর গলায় সুদেষ্ণা বলল, ‘আমি চন্দনপুরের রাজপুত্র।’

সাপুড়ের চোখ দুটো চকচক করে উঠল, ‘তুমি একা একা কোথায় চলেছ?’

‘আমি দেশভ্রমণে বেরিয়েছি।’

‘আমিও তো দেশভ্রমণে চলেছি। এখান থেকে যাব নীল পাহাড়ের দেশে। একজন সঙ্গী খুঁজছি, তুমি যাবে আমার সঙ্গে?’

সুদেষ্ণার কী মনে হল কে জানে। মাথা নেড়ে বলল, ‘যাব তোমার সঙ্গে?’

সাপুড়ের নৌকায় উঠে ভেসে চলল। কিছুদূর যেতেই সাপুড়ে বঁাশিতে সুর ধরল। বিচিত্র সেসুর। সুদেষ্ণার দু-চোখে ঘুম নেমে আসে। আর বসে থাকতে পারে না। নৌকার ওপরেই শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

সাপুড়ের নৌকা তরতর করে এগিয়ে চলল। দিনের শেষে নৌকা এসে ভিড়ল এক নির্জন দ্বীপে।

সুদেষ্ণাকে কাঁধে নিয়ে নৌকা থেকে নেমে এল সাপুড়ে। দ্বীপের চারদিকে ছোটো ছোটো পাহাড়। সেই পাহাড়ের পথ ধরে একটা গুহার সামনে এসে দাঁড়াল সাপুড়ে।

সেখানে পাহারা দিচ্ছিল একজোড়া সাপ। মাথায় তাদের নীলকান্তমণি। দুই চোখে আগুন ঠিকরে পড়ছে। লক লক করছে ফণা।

সাপুড়ে তার বঁাশির সুর তুলতেই সাপেরা পথ ছেড়ে সরে দাঁড়াল। গুহার মধ্যে সরু রাস্তা, দু-পাশে পাথরের দেওয়াল, সেখানে অসংখ্য হীরে-মুক্তা-মাণিক্য বসানো। তাদের আলোয় চারদিক ঝলমল করছে।

সেই আলোয় ঘুম ভেঙে যায় সুদেষ্ণার। চারদিকে চোখ মেলে তাকিয়ে ভয়ে চিৎকার করে ওঠে, ‘ও সাপুড়ে, এ তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে এলে?’

নীল পাহাড়ের দেশে। আগামী অমাবস্যায় আমার সর্পযজ্ঞ। এক রাজপুত্রকেও বন্দি করে এনেছি। তার সঙ্গে তোমাকে সর্পদেবতার কাছে নিবেদন করব। আজ থেকে তুমি এই গুহায় বন্দি থাকবে। বাইরে পালাবার চেষ্টা করলেই কালনাগিনীর ছোবলে মারা পড়বে।

মুহূর্তে সুদেষ্ণার মনে হল তবে কি রাজপুত্র কৌশিককে এখানে বন্দি করে নিয়ে এসেছে সাপুড়ে। যেমন করেই হোক তাকে উদ্ধার করতেই হবে।

সাপুড়ে চলে যেতেই গুহার মধ্যে খুঁজতে আরম্ভ করল সুদেষ্ণা। কোথাও রাজপুত্র নেই। গুহার বাইরে যাবারও কোনো উপায় নেই। সেখানে পাহারা দিচ্ছে ভয়ংকর দুই কালনাগিনী।

সাপুড়ে রোজ বঁাশির সুর তুলে গুহায় আসে। সুদেষ্ণা কান পেতে শোনে আর মনে মনে সুর তুলে নেয়। যখন সাপুড়ে চলে যায় বঁাশিতে সেই সুর বাজায়।

দেখতে দেখতে তিনদিন কেটে যায়। সুদেষ্ণা ভাবে, আর নয়, এইবার গুহার বাইরে যেতে হবে। দুপুর বেলায় চারদিক নিস্তব্ধ। নি:শব্দে গুহার মুখে এসে দাঁড়াল সুদেষ্ণা। সামনে দুই সাপ।

সাথে সাথে বঁাশিতে সুর ধরল সুদেষ্ণা। তার সমস্ত মন প্রাণ ঢেলে দিল সেই সুরে। ধীরে ধীরে সুরের আবেশে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল দুই বিষধর সাপ। সন্তর্পণে তাদের পাশ কাটিয়ে গুহার বাইরে বেরিয়ে এল সুদেষ্ণা।

কিছুদূর যেতেই দেখতে পেল আরেকটা গুহা। তার চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে ভয়ংকর সব সাপ। সুদেষ্ণার মনে হল নিশ্চয়ই ওই গুহার মধ্যেই আছে রাজকুমার কৌশিক। বঁাশিতে সুর তুলে সেএগিয়ে গেল। বঁাশির সুরে সাপেরা পথ ছেড়ে দিতেই গুহার মধ্যে ঢুকে পড়ল সুদেষ্ণা।

গুহার শেষপ্রান্তে বসেছিল রাজপুত্র কৌশিক। সুদেষ্ণা তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই বলল, ‘কে তুমি?’

‘আমি রাজকুমারী সুদেষ্ণা।’

‘আমি রাজপুত্র কৌশিক।’

রাজকন্যার মুখ খুশিতে ঝলমল করে ওঠে। ‘আমি তোমারই সন্ধানে এসেছি। এসো আমার সঙ্গে, সাপুড়ে আসবার আগেই আমাদের এখান থেকে পালাতে হবে।’

বঁাশিতে সুর তুলে গুহার বাইরে আসতেই শুনতে পায় সাপুড়ের বঁাশির সুর। একটা পাথরের আড়ালে দু-জনে লুকিয়ে পড়ে।

সাপুড়ে বঁাশি বাজাতে বাজাতে আসছে আর তার পেছনে অসংখ্য সাপ।

সুদেষ্ণা বলল, ‘সাপুড়ে আমাদের খুঁজতে বেরিয়েছে। এখন যদি আমাদের সন্ধান পায় তাহলে কেউ আর আমাদের বঁাচাতে পারবে না।’

সাপুড়ে যে এদিকেই আসছে।

চলো আমরা এই পাহাড়ের ওপরে উঠে যাই। সাপুড়ে ওর ভারি শরীর নিয়ে ওপরে উঠতে পারবে না।

দু-জনে পাহাড়ে উঠতেই সাপুড়ে তাদের দেখতে পেয়ে চিৎকার করে ওঠে, ‘নেমে আয় বলছি নয়তো সাপেদের লেলিয়ে দেব তোদের দিকে।’

বঁাশিতে ভয়ংকর সুর তুলে কী যেন ইঙ্গিত করে সাপুড়ে। সাপেরা দলে দলে চারদিক থেকে পাহাড়ে উঠতে থাকে। ভয়ে রাজপুত্রের গলা শুকিয়ে আসে, ‘এখন কী হবে সুদেষ্ণা?’

কোমর থেকে বঁাশি বের করে সুদেষ্ণা বলল, তোমার কোনো ভয় নেই এই বঁাশির সুরেই তোমাকে বঁাচাব।

বঁাশিতে সুর ধরে সুদেষ্ণা। কী মোহময় সেসুর। সাপের দল নিস্তেজ হয়ে আসে। ওদিকে সাপুড়েও বঁাশি বাজিয়ে চলেছে।

দু-জনেই প্রাণপণে বঁাশি বাজাতে থাকে। এক জনের বঁাশিতে আগুন ঝরে পড়ছে। আরেক জনের যেন বৃষ্টি নেমেছে। সাপেরা দিশেহারা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।

সুদেষ্ণার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরে পড়ে। গলা ধরে আসে তবুও যেমন করেই হোক সাপুড়ের সাথে বঁাশি বাজিয়ে যেতে হবে, থামলেই মৃত্যু।

সাপুড়ের শক্তিও ফুরিয়ে আসে। ওইটুকু মেয়ের বঁাশিতে এত শক্তি কল্পনাও করতে পারেনি সে। বুকের মধ্যে তাঁর কাঁপন ওঠে। বঁাশি থামলেই তো মৃত্যু। আতঙ্কে গলা ধরে আসে। আর পারে না সাপুড়ে। বঁাশি ফেলে পালাতে থাকে।

সুদেষ্ণা চিৎকার করে ওঠে, ‘সাপুড়ে পালাচ্ছে।’

বঁাশি বাজাতে বাজাতে পাহাড় থেকে নেমে আসে সুদেষ্ণা আর কৌশিক। সামনেই সাপুড়ে। তাকে তাড়া করে নিয়ে চলেছে সাপের দল।

পাহাড় পেরিয়েই সমুদ্র। পালাবার সব পথ বন্ধ। সাগরেই ঝাঁপ দেয় সাপুড়ে। পলকে বিরাট ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায় তাকে।

আনন্দে চিৎকার করে ওঠে সুদেষ্ণা, ‘আর ভয় নেই, ওই দ্যাখো ঘাটে সাপুড়ের নৌকা বঁাধা রয়েছে। চলো এ নৌকা করেই আমরা চন্দনপুরে ফিরে যাব।’

সুদেষ্ণার হাত ধরে নৌকায় উঠে বসল কৌশিক। তারপর নৌকা ভাসিয়ে দিল সমুদ্রে। তরতর করে নৌকা ভেসে চলল চন্দনপুরের দিকে।

সকল অধ্যায়
১.
ওঝা ও পাহাড়ি ভূত
২.
দুই সূর্য
৩.
মহিষ ও রাখালছেলে
৪.
তিন বন্ধু
৫.
বাঘ মামার কথা
৬.
কুঁজো আর অন্ধ
৭.
দেবতার অভিশাপ
৮.
সাতবোকা
৯.
বাহাদুর আর এক-পা-ওলা দৈত্য
১০.
সাধু ও মহাজন
১১.
চালাক ভোলানাথ
১২.
বামুন আর শেয়াল
১৩.
আকাশপুরীর রাজকন্যা
১৪.
অতি চালাকের গলায় দড়ি
১৫.
তিন জামাই
১৬.
শেয়ালবউ-এর বুদ্ধি
১৭.
শেয়াল আর বোকা বাঘ
১৮.
বুদ্ধিমান চোর
১৯.
শুয়োরের শিং
২০.
রাখালছেলে ও পরির দেশের রাজকন্যা
২১.
তাঁতির কুঁজ
২২.
চার চোর
২৩.
কাঠুরে নাপিত আর রাজকন্যা
২৪.
মহেশ্বর
২৫.
আয়না
২৬.
শেয়াল ও বুড়োবুড়ি
২৭.
এক দাঁত ফোকলা
২৮.
বুদ্ধি থাকলেই উপায় হয়
২৯.
ভীম আর জলদৈত্য
৩০.
চার ভাই
৩১.
সুরের জাদু
৩২.
ভূত ও ভূতনাথ
৩৩.
রসিক রাজু

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%