চঞ্চলকুমার ঘোষ
হিমালয় পাহাড়ের একেবারে উত্তরে কোনকার গ্রাম। অনেক অনেক দিন আগে সেই গ্রামে থাকত এক ওঝা, নাম ওয়াংপা। ওয়াংপার মতো বড়ো ওঝা সারা তল্লাটে কেউ ছিল না। যখনই কোথাও ভূতের উপদ্রব হত, ওয়াংপার ডাক পড়ত সেখানে। দূর দূর গ্রামে যেতে হত ওয়াংপাকে।
একদিন এক গ্রাম থেকে মোড়লের লোক এল। কিছুদিন হল সেই গ্রামে এক ভূত বড়ো জ্বালাতন শুরু করেছে। গ্রামের শেষে ভাঙা মন্দিরে ভূতের বাড়ি। অনেকদিন ধরেই সেখানে আছে ভূত। কোনোদিন কাউকে জ্বালাতন করেনি। হঠাৎ যে ভূতের কী হয়েছে রোজই কারো-না কারো ঘরে গিয়ে উপদ্রব করছে।
রাতের বেলায় লোকে ঘুমিয়ে আছে। ভূত গিয়ে ছাদে এমন লাফালাফি করে যে সবার ঘুম ভেঙে যায়। বৃষ্টির মধ্যে হঠাৎ জানালা দরজা খুলে দিয়ে যায়। খাবারের মধ্যে নোংরা ফেলে দেয়। মাঠের গোরু-ছাগল-ভেড়াগুলোকে যখন-তখন এদিক-ওদিক তাড়িয়ে দেয়।
গাঁয়ের লোকেদের আর সহ্য হয় না। শেষে সবাই মিলে ঠিক করল ভূতকে গ্রাম থেকে তাড়াতে হবে। খবর পাঠানো হল ওয়াংপার কাছে।
ওয়াংপা গ্রামে আসতেই ভূত ভয় পেয়ে গেল। মন্দির ছেড়ে দূরের এক পাহাড়ের গুহায় গিয়ে লুকিয়ে রইল।
ওয়াংপা গাঁয়ের মোড়লের বাড়ি গিয়ে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে জাদুদন্ড নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। গাঁয়ের মাঝখানে জাদুদন্ড দিয়ে গন্ডি কেটে মন্ত্র পড়তে আরম্ভ করল। আগুন জ্বালিয়ে তাতে ধুলো ছুড়তে শুরু করে দিল। যত ধুলো ছোড়ে, ততই ধোঁয়া বের হতে থাকে।
রাশি রাশি ধোঁয়া মাথার ওপরে জড়ো হতেই ওয়াংপা জাদুদন্ড দিয়ে আকাশের দিকে ঘোরাতে আরম্ভ করে দিল। আর সাথে সাথে সব ধোঁয়া ভূতের গুহার দিকে উড়তে আরম্ভ লাগল।
ধোঁয়ার গন্ধ পেতেই গুহা থেকে বেরিয়ে ভূত ছুটতে আরম্ভ করে দিল। ভূত যতই ছোটে, ধোঁয়া ততই তাকে তাড়া করে। ছুটতে ছুটতে চারদিক থেকে ভূতকে ঘিরে ফেলল ধোঁয়া আর পলকে তাকে উড়িয়ে নিয়ে এল ওয়াংপার কাছে।

ওয়াংপাকে দেখেই ভূত কান্নাকাটি শুরু করে দিল। তার পায়ে পড়ে বলল, ‘তুমি আমাকে ছেড়ে দাও, আমি আর কোনোদিন কারও কোনো ক্ষতি করব না।’
ওয়াংপা তার কোনো কথায় কান দিল না। জাদুদন্ড তুলে মারতে যেতেই ভূত বলল, ‘আজ থেকে আমি তোমার চাকর হয়ে থাকব। তুমি যা বলবে তাই করব।’
ভূতের কথা শুনে ওয়াংপা জাদুদন্ড নামিয়ে বলল, ‘তোর গলায় যে মালা আছে সেটা আমায় খুলে দে।’
ওই মালার মধ্যে ছিল ভূতের সব শক্তি। মালা খুলতে হবে শুনেই আবার কান্নাকাটি শুরু করে দিল ভূত। ওয়াংপা নাছোড়বান্দা। বলল, ‘মালা না দিলে এই জাদুদন্ড তোর মাথায় ভাঙব।’
ভূত আর কী করে, জাদুদন্ডের ভয়ে তার মালা খুলে দিয়ে উড়ে চলে গেল। গ্রামের লোকেরা খুব খুশি। তারা অনেক উপহার দিল। সব উপহার নিয়ে মালা গলায় পরে বাড়ি ফিরল ওয়াংপা।
এত উপহার দেখে বউ ভারি খুশি। ওয়াংপা বউকে বলল, ‘এ আর কী জিনিস—এমন জিনিস নিয়ে এসেছি আমাদের আর কাজ করে খেতে হবে না। যখন যা চাইব তাই পাব।’
তারপর থেকে ওয়াংপা আর তার বউ কোনো কাজ করে না। ভূত তাদের বাড়িতে চাকরের মতো খাটে, রান্না করে, জল তোলে, জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে আনে, ওয়াংপার জমিতে লাঙল দেয়। বীজ পোঁতে, ফসল কাটে। যখন কোনো কাজ থাকে না ওয়াংপার হাত-পা টিপে দেয়।
ওয়াংপাকে আর কিছু কাজ করতে হয় না। দিনরাত ঘরে বসে খায় আর ঘুমায়। কোনো গ্রাম থেকে কেউ ভূত তাড়াবার জন্যে ডাকতে এলেও আর যায় না।
এদিকে চাকরের মতো খাটতে খাটতে ভূতের প্রাণ যায় আর কী। শুধু ভাবে কী করে ওয়াংপার হাত থেকে পালিয়ে যাওয়া যায়। মালার জন্যে কোথাও যেতে পারে না।
একদিন ভূত ঝরনার ধারে গিয়েছে জল আনতে। এমন সময় আর-এক ভূতের সঙ্গে দেখা। সেথাকে ঝাউ গাছে। ঝাউ গাছের ভূত তাকে দেখেই বলল, ‘এ রকম চাকরের মতো কার জন্যে জল নিয়ে যাচ্ছিস?’
ভূত বলল, ‘কী আর বলব ভাই, সব আমার কপাল।’
ঝাউ গাছের ভূত তার সব কথা শুনে বলল, ‘তোকে আমি এই একপাত্র মদ দিলাম। এটা নিয়ে গিয়ে ওয়াংপাকে খেতে দিবি, তারপর দেখ না কী হয়।’
তার কথামতো ভূত মদ নিয়ে গিয়ে ওয়াংপাকে খেতে দিল। মদ খেয়ে ওয়াংপার খুব ভালো লেগে গেল। তারপর রোজই মদ খেতে চায়। মদ খেতে খেতে নেশা হয়ে গেল ওয়াংপার। মদ না হলে তার চলে না।
একদিন ভূত গিয়েছে কাঠ আনতে। এদিকে মদ না খেয়ে ছটফট করছে ওয়াংপো। কখন ভূত ফিরে আসবে ঠিক নেই। ধৈর্য না রাখতে পেরে নিজেই বেরিয়ে পড়ল। গ্রামের শেষে মদের দোকান। দোকানে বসে ওয়াংপা বলল, ‘কি ভালো মদ আছে দাও।’
দোকানি বার খুলে আঙুরের রসে তৈরি এক ভাঁড় মদ দেয়। এমন মদ আগে কোনোদিন খায় নি ওয়াংপা। ভাঁড় খালি হতেই বলে আরেক ভাঁড় দাও।
দোকানি বলে, ‘আগের মদের দাম দাও, তবেই আবার মদ দেব।’
ওয়াংপো বলে, ‘আমার কাছে পয়সা নেই।’
রাগে ফেটে পড়ে দোকানি বলে, ‘মদের দাম না দিলে তোমায় ছাড়ছি না।’
ওয়াংপা ভেবে পায় না কেমন করে দাম দেবে।
হঠাৎ দোকানদারের নজর পড়ল ওয়াংপার গলায় ভারি সুন্দর একটা হার। সেবলল, ‘তুমি যদি ওই হারটা দাও তবে আর পয়সা লাগবে না। তোমাকে আরও দু-ভাড় মদ খেতে দেব।’
ওয়াংপার তখন নেশা চেপে গিয়েছে। গলা থেকে হার খুলে দোকানদারকে দিয়ে দিল। দোকানদার তাকে আরও দু-ভাড় মদ খেতে দিল। মদ খেয়ে আর বাড়ি যেতে পারল না ওয়াংপা। দোকানেই ঘুমিয়ে পড়ল।
দোকানদার হার পাঠিয়ে দিল তার বউ-এর কাছে। ভূত জঙ্গল থেকে ফিরে ওয়াংপার খোঁজ করতে মদের দোকানে আসতেই সব জানতে পেরে গেল। এতদিন ধরে সেএই সুযোগই খুঁজছিল। তাড়াতাড়ি দোকানদারের রূপ ধরে তার বাড়িতে গিয়ে বউকে বলল, ‘বউ, শিগগির হারটা খুলে দে।’
দোকানদারের বউ গলায় হার পরেছিল। বলল, ‘এ হার আমি দেব না।’
ভূত বলল, ‘ওই হারটা ভূতের হার, ওই হার পরে থাকলে যদি ভূত এসে তোর গলা টিপে ধরে তখন কী হবে?’
ভূতের নাম শুনেই ভয় পেয়ে গেল দোকানদারের বউ। তাড়াতাড়ি হার খুলে ভূতকে দিয়ে দিল। হার পেয়ে ভূতের সেকী আনন্দ। সঙ্গে সঙ্গে হার গলায় পরে উড়ে গেল গ্রাম ছেড়ে অনেক দূরের পাহাড়ে।
ওদিকে ওয়াংপার জ্ঞান ফিরতেই হারের খোঁজ করতে শুরু করল। কোথাও হার না পেয়ে বুঝতে পারল ভূত তার হার নিয়ে চলে গিয়েছে। চেষ্টা করেও আর ভূতকে ধরতে পারল না ওয়াংপা। মদ খেতে খেতে সব মন্ত্র ভুলে গিয়েছিল সে।
বেচারা ওয়াংপা আর ভূত তাড়াতে পারে না। আর কোনো কাজও জানে না। কী আর করে। সংসার চালাতে মাঠে যায়, চাষ করে, জল তোলে, জঙ্গল থেকে কাঠ নিয়ে আসে আর পুরোনো দিনের কথা ভাবে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন