চঞ্চলকুমার ঘোষ
এক গাঁয়ে ছিল এক বুড়ি। বুড়ির এক ছেলে, নাম হারাধন। হারাধন যেমন বুদ্ধিমান তেমনি চালাক। গাঁয়ের লোকেরা আপদে বিপদে দরকারে সব সময় হারাধনের পরামর্শ নিত। হারাধন তাদের বুদ্ধি দিত।
একদিন গাঁয়ের মোড়ল বলল, ‘হারাধন, এত বুদ্ধি নিয়ে এই গাঁয়ে থাকলে তোর কিছুই হবে না। তুই রাজদরবারে যা, সেখানে গেলে অনেক টাকা আয় করতে পারবি।’
হারাধন বলল, ‘তুমি ঠিক বলেছ, এই গাঁয়ে থাকলে আমার কিছুই হবে না। আমি শহরে যাব।’
শুভদিন দেখে বেরিয়ে পড়ল হারাধন। গ্রাম থেকে রাজবাড়ি তিন দিনের পথ। যখন হারাধন রাজবাড়িতে এসে পৌঁছোল, তখন রাজসভা শেষ হয়ে গিয়েছে। রাজা তাঁর মন্ত্রীদের সঙ্গে গল্প করছিলেন। হারাধন প্রণাম করে দাঁড়াতেই রাজা বললেন, ‘কি চাই তোমার?’
হারাধন বলল, ‘আমি মহারাজের দরবারে কাজ করব বলে এসেছি।’
হারাধনের মুখের ভাব দেখে রাজার তাকে বুদ্ধিমান বলেই মনে হল। বললেন, ‘কী কাজ চাও তুমি?’
‘আজ্ঞে মহারাজ, আমি সব কাজই করতে রাজি আছি।’
রাজা মন্ত্রীকে বললেন, ‘মন্ত্রী কোনো কাজ খালি আছে? ’
মন্ত্রী একটু ভেবে বললেন, ‘কোনো কাজ খালি নেই মহারাজ, তবে ঘণ্টাঘরের ঘণ্টাদার বড্ড বুড়ো হয়ে গিয়েছে, আমার কাছে ছুটি চাইছিল, তার জায়গায় একে নিতে পারেন।’
রাজা হারাধনকে বললেন, ‘তুমি কি ঘণ্টাদারের কাজ করতে রাজি আছ?’
হারাধন হাতজোড় করে বলল, ‘মহারাজ যে কাজ দেবেন আমি সেই কাজই করতে রাজি আছি।’
মন্ত্রী বললেন, ‘দ্যাখো বাপু এ কাজে বেতন বেশি নয়, পরে কিছু বলতে পারবে না।’
হারাধন বলল, ‘বেতনের জন্যে আমি চিন্তা করি না হুজুর।’
রাজা তো অবাক! বললেন, ‘বলো কী তুমি?’
হারাধন বলল, ‘মহারাজ, বুদ্ধি থাকলে সব কাজ থেকেই টাকা আয় করা যায়।’
রাজা বললেন, ‘ঠিক আছে দেখি তুমি ঘণ্টা বাজিয়ে কেমন করে টাকা আয় করতে পারো!’
পরদিন সকাল থেকে কাজ শুরু হল হারাধনের। রাজবাড়ির সামনে উঁচু ঘরে বিরাট ঘণ্টা টাঙানো। একঘণ্টা পরপর হারাধন ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজায়। তাই শুনে লোকে বুঝতে পারে কটা বাজল। সারা দিন ধরে ঘণ্টা বাজায় আর ভাবে কেমন করে টাকা আয় করা যায়।
সেই দেশের রাজার দুই রানি। ছোটোরানি আর বড়োরানি। দু-জনের খুব ঝগড়া। প্রত্যেকেই অন্যকে খুব হিংসে করত। দুই রানি থাকত দুই মহলে। সারাদিন রাজা নানা কাজে ব্যস্ত থাকতেন। রাতে রাজা আসতেন রানিদের কাছে। দু-জনেই বেশি সময় রাজার কাছে থাকতে চায়। তাই নিয়ে প্রায়ই ঝগড়াঝাটি হত। শেষে রাজা ঠিক করেছিলেন একজনের কাছে থাকবেন সন্ধে থেকে মাঝরাত অবধি, আরেকজনের কাছে মাঝরাত থেকে সকাল। মাঝরাতে রোজ ঘণ্টাদার ঘণ্টা বাজাত। সেই শুনে রাজা এক রানির কাছ থেকে আরেক রানির কাছে যেতেন।
হারাধন ভাবল আজ একটু আগে ঘণ্টা বাজাব তারপর দেখি না কী হয়।
সেদিন সন্ধেবেলায় রাজা ছিলেন বড়োরানির ঘরে। খাওয়া-দাওয়া করে সবে ঘুমিয়ে পড়েছেন তার একটু পরেই ঘণ্টা বেজে উঠল। রাজা ঘুম থেকে উঠে ভাবলেন মাঝরাত হয়ে গিয়েছে, তাড়াতাড়ি চললেন ছোটোরানির ঘরে।
বড়োরানির কেমন সন্দেহ হল আজ যেন বড়ো তাড়াতাড়ি ঘণ্টা বাজল। অন্যদিন অনেকক্ষণ পরে ঘণ্টা বাজে। এ নিশ্চয়ই ছোটোরানির কারসাজি। সারারাত রাগেতে ভালো করে ঘুমাতে পারল না বড়োরানি। পরদিন সকাল হতেই দাসীকে ডেকে বলল, ‘তুই গিয়ে খোঁজ নে কাল রাতে কে ঘণ্টা বাজিয়েছে।’
দাসী ঘুরে এসে বলল, ‘মহারানি, একজন নতুন ঘণ্টাদার এসেছে, কাল রাতে সেঘণ্টা বাজিয়েছে।’
বড়োরানি বলল, ‘এবার সব বুঝতে পেরেছি। ছোটোরানি তাকে হাত করে আগে আগে ঘণ্টা বাজিয়েছে। তুই গিয়ে ঘণ্টাদারকে বলবি, আজ দুপুরে আমার সঙ্গে যেন দেখা করে।’
হারাধন তো অবাক। বড়োরানি তাকে ডেকে পাঠিয়েছে। নিশ্চয় এর মধ্যে কোনো ব্যাপার আছে। দুপুরবেলায় হারাধন গিয়ে হাজির হল বড়োরানির ঘরে। বড়োরানি তাকে দেখেই বলল, ‘তুমি ছোটোরানির কাছ থেকে কত টাকা নিয়েছ?’
বড়োরানির কথা শুনে হারাধন কিছুই বুঝতে পারল না। সেবলল, ‘আমি ছোটোরানিকে কখনো দেখিইনি মহারানি।’
বড়োরানি রেগে গিয়ে বলল, ‘তুমি মিথ্যে কথা বলছ, নইলে কাল এত সকাল-সকাল ঘণ্টা বাজালে কেন?’

হারাধন কিছু বলল না। তাকে চুপ করে থাকতে দেখে বড়োরানি বলল, ‘আজ থেকে তুমি আর আগে ঘণ্টা বাজাবে না, অনেক দেরি করে ঘণ্টা বাজাবে। তার জন্যে তোমাকে পাঁচ হাজার টাকা দেব।’
মহারানি সিন্দুক খুলে টাকার থলে বের করে হারাধনকে দিয়ে বলল, ‘আমার কথা মনে থাকবে তো?’
হারাধন টাকার থলেটা পকেটে পুরে নিয়ে বলল, ‘আপনার কথা মনে থাকবে মহারানি।’
সেইদিন মাঝরাতে আর ঘণ্টা বাজাল না হারাধন। রাত বাড়তে থাকে। ছোটোরানির ঘুম ভেঙে গেল। এত রাত হল রাজা তো এল না। এদিক-ওদিক তাকাতে থাকে রানি। একটা মোমবাতি জ্বলে শেষ হয়ে গেল। আরেকটা মোমবাতি ধরাল। অন্যদিন তো এমন হয় না, একটা মোমবাতি জ্বলতে জ্বলতেই রাজা এসে পড়েন।
ছোটোরানি আর কী করে, চুপচাপ বসে কাঁদতে থাকে। এমন সময় ঢং ঢং করে ঘণ্টা বেজেউঠল। রাজা ঘুম থেকে উঠে ছোটোরানির ঘরে আসতেই রানি বলল, ‘আজ এত দেরি করে এলেন কেন মহারাজ?’
রাজা ঘুম জড়ানো চোখে বলল, ‘ঘণ্টা বাজতেই তো আমি চলে এলাম, দেরি কোথায় হল?’
ছোটোরানি আর কিছু বলল না। পরদিন সকাল হতেই দাসীকে বলল, ‘দেখত কাল রাতে কে ঘণ্টা বাজিয়েছে, তাকে আমার কাছে নিয়ে আসবি। দেখিস বড়োরানি যেন টের না পায়।’
দাসী হারাধনকে নিয়ে আসতেই ছোটোরানি বলল, ‘বড়োরানি তোমাকে কত টাকা দিয়েছে?’
হারাধন বলল, ‘বড়োরানি তো আমাকে কোনো টাকা দেননি।’
‘টাকা না নিলে পরে কেন ঘণ্টা বাজালে?’
হারাধন আর কোনো কথা বলল না। তাকে চুপ করে থাকতে দেখে সিন্দুক খুলে একটা বড়ো টাকার থলে বের করে হারাধনকে দিয়ে বলল, ‘এতে দশ হাজার টাকা আছে। আজ থেকে তুমি আগে আগে মাঝরাতের ঘণ্টা বাজাবে।’
হারাধন আর সেখানে দাঁড়াল না। বড়োরানি আর ছোটোরানির দেওয়া টাকার থলে নিয়ে রাজার কাছে হাজির হল। রাজার পায়ের কাছে টাকার থলে নামিয়ে বলল, ‘মহারাজ, ঘণ্টা বাজিয়ে আমি এই টাকা আয় করেছি।’
রাজা তো অবাক! বললেন, ‘ঘণ্টা বাজিয়ে তুমি কেমন করে এত টাকা আয় করলে?’
হারাধন সব কথা বলতেই রাজা হেসে উঠলেন, ‘তোমাকে আর ঘণ্টা বাজাবার কাজ করতে হবে না। তাহলে দু-দিনেই আমার সংসারের সব শান্তি নষ্ট হয়ে যাবে। কাল থেকে তোমাকে অন্য কাজ দেব। এবার দেখি তুমি কেমন করে টাকা আয় করতে পারো।’
রাজা মন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে বললেন, ‘হারাধন, এ নগরে কত রাস্তা আছে, কত লম্বা কত চওড়া তার সব হিসেব তৈরি করে তিন দিনের মধ্যে আমাকে জানাবে।’
হারাধন একটু ভেবে বলল, ‘মহারাজ, আমার কয়েকজন লোক আর কিছু জিনিসপত্র লাগবে।’
মন্ত্রী বললেন, ‘তোমার যা লাগবে সব পাবে, তবে ঠিক সময়ে কাজ চাই।’
রাজা মনে মনে ভাবলেন, ‘দেখি এবার হারাধন কেমন করে টাকা আয় করে।’
হারাধন মস্ত বড়ো দড়ি আর লোকজন নিয়ে রাস্তা মাপার কাজ শুরু করতেই লোকজনের ভিড় জমে গেল। সবাই জিজ্ঞেস করে রাস্তা মেপে কী হবে?
হারাধন গম্ভীরভাবে বলল, ‘রাস্তা চওড়া করা হবে। রাজার আদেশ তাই আমি মাপছি।’
রাস্তার দু-পাশে যাদের বাড়ি তাদের ভয় হল, রাস্তা চওড়া করতে গিয়ে যদি তাদের বাড়ি ভাঙা পড়ে। সবাই রাতেরবেলায় হারাধনের কাছে গিয়ে বলল, ‘তুমি যা হোক একটা কিছু ব্যবস্থা করো।’
হারাধন গম্ভীর মুখে বলল, ‘এ রাজার আদেশ, ঠিকমতো কাজ না করলে আমার চাকরি চলে যাবে। তখন খাব কী?’
‘তোমাকে সেজন্যে চিন্তা করতে হবে না, তার ব্যবস্থা আমরা করছি।’
একজন লোক বিরাট একটা টাকার থলে তার সামনে দিয়ে বলল, ‘এতে পঁচিশ হাজার টাকা আছে।’
হারাধন টাকার থলে বিছানার তলায় রেখে বলল, ‘ঠিক আছে আমি এমনভাবে রাস্তা মাপব, যাতে তোমাদের কারও বাড়ি ভাঙা পড়বে না।’
সবাই খুশি হয়ে চলে গেল। হারাধন তিন দিন পরে রাস্তা মাপার কাজ শেষ করে, কুলির মাথায় টাকার বস্তা চাপিয়ে রাজার কাছে গিয়ে হাজির। এত টাকা দেখে রাজা তো অবাক! মন্ত্রী বলল, ‘এবার কেমন করে টাকা আয় করলে?’
হারাধন সব কথা বলতেই রাজা বললেন, ‘সত্যি তোমার বুদ্ধি আছে। এবার তোমাকে এমন কাজ দেব দেখি তুমি কেমন করে টাকা আয় করতে পারো।’
রাজা মন্ত্রীদের সঙ্গে অনেক শলাপরামর্শ করে বললেন, ‘কাল সারাদিন নদীতে কত ঢেউ ওঠে তোমাকে গুনে বলতে হবে।’
হারাধন বলল, ‘এ আর এমন কী কঠিন কাজ, তবে নদীর সব জায়গায় তো ঢেউ মাপা যাবে না। ফেরি ঘাটের আগে যে বটগাছ আছে সেইখান দিয়ে যত ঢেউ যাবে সব গুনব।’
পরদিন সকালে লোকজন জিনিসপত্র নিয়ে নদীর ঘাটে গিয়ে হাজির হল হারাধন। নদীর এপার থেকে ওপারে মস্ত দড়ি টানা হল। হারাধন বটগাছ তলায় বসে ঢেউ গুনতে আরম্ভ করল।
সেইদিন গঞ্জের হাট। একের পর এক নৌকা আসছে। হারাধনের লোকজন দড়ি পার হয়ে কাউকে ঘাটের কাছে আসতে দেবে না। রাজার হুকুম, নদীর ঢেউ গোনা হচ্ছে। নৌকা এলেই ঢেউ ভেঙে যাবে।
নৌকার লোকজনের মাথায় হাত। সারাদিন মাঝনদীতে মালপত্র নিয়ে এভাবে আটকা পড়ে থাকলে মহাক্ষতি হবে। হারাধনকে সেকথা বলতেই সেবলল, ‘আমি যেতে দিতে পারি তবে ঢেউ ভাঙলে জরিমানা দিতে হবে।’
সবাই বলল, ‘আমরা জরিমানা দেব।’
হারাধনের লোকেরা দড়ি তুলে ধরল, তারপর একটা করে নৌকা পার হয় আর হারাধন জরিমানা আদায় করে। কাউকে বলে তুমি পাঁচটা ঢেউ ভেঙেছো পাঁচ টাকা জরিমানা। কাউকে বলে তুমি দশটা ঢেউ ভেঙেছো তোমার দশ টাকা জরিমানা।
এমনি করে সারাদিনে দশ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করে পোঁটলায় পুরে রাজার কাছে গেল। রাজা তাকে দেখে বললেন, ‘আজ কত ঢেউ গুণলে হারাধন?’
হারাধন একতাড়া কাগজ বের করে বলল, এতে সব হিসেব আছে মহারাজ।
রাজা চেয়ে দেখলেন কাগজ ভরতি অসংখ্য সংখ্যা। হারাধন বলল, ‘সারাদিনে মোট ঢেউ গিয়েছে নয়কোটি নব্বই লক্ষ নব্বই হাজার নশো...’
তাড়াতাড়ি রাজা তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘থাক থাক আর বলতে হবে না, এই নাও তোমার কাগজ।’
হারাধন কাগজ নিয়ে টাকার থলি রাজার সামনে দিয়ে বলল, ‘মহারাজ, এতে দশ হাজার টাকা আছে।’
রাজা বললেন, ‘নদীর ঢেউ গুনে টাকা আয় করলে এতো আশ্চর্য ব্যাপার!’
হারাধন সব কথা বলতেই রাজা বললেন, তাহলে তো তোমার ঢেউ-এর হিসেব ঠিক হয়নি। কত ঢেউ ভেঙে গিয়েছিল তাতে তো তোমার ঢেউ-এর সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে।
হারাধন মাথা নেড়ে বলল, না মহারাজ, আমার হিসেব ঠিকই আছে, যখনই ঢেউ ভেঙেছে সেই ভাঙা ঢেউ যোগ করে এক করে নিয়েছি। আমার কথা বিশ্বাস না হয় কালকে আর কাউকে ঢেউ গুনতে পাঠান।
রাজা হেসে বললেন, ‘সত্যি সত্যিই তুমি জানো কেমন করে টাকা করতে হয়, তবে এবার একটা কঠিন কাজ দেব যদি পারো, তবে তোমাকে খুব ভালো একটা চাকরি দেব।’
সারা রাত ধরে ভাবতে থাকেন রাজা। সকালবেলায় রাজসভায় বেরোতে যাবেন এমন সময় তাঁর চোখে পড়ল দরজার সামনে দুটো ইঁদুর ছুটে বেড়াচ্ছে। তাঁর মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। রাজসভায় গিয়ে হারাধনকে বললেন, ‘সাত দিনের মধ্যে এ নগরে যত ইঁদুর আছে, সব তোমাকে মারতে হবে।’
হারাধন কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করে বলল, ‘মহারাজ, আপনি আমাকে পরোয়ানা লিখে দিন। আমার কাজে কেউ বঁাধা দিতে পারবে না।’
রাজা কোনো ভাবনাচিন্তা না করেই পরোয়ানা লিখে দিলেন। হারাধন পরোয়ানা নিয়ে কয়েকজন কুলি যোগাড় করল। তাদের হাতে কিছু টাকা দিয়ে বলল, ‘তোমরা কাল সকালে কোদাল-শাবল-লাঠি নিয়ে আমার কাছে আসবে।’
পরদিন সকালে কুলিরা আসতেই হারাধন তাদের নিয়ে গেল মন্ত্রীর বাড়িতে। মন্ত্রী হারাধনকে দেখে বললেন, ‘আমার বাড়িতে কী চাই তোমার?’
হারাধন বলল, ‘রাজার আদেশে আমি ইঁদুর মারতে এসেছি এই দেখুন পরোয়ানা।’ মন্ত্রী আর কী করেন। হারাধনকে নিয়ে গেলেন বাড়ির মধ্যে। খানিকক্ষণ এদিক-ওদিক করে হারাধন বলল, ‘মন্ত্রীমশাই, আপনার বাড়ির নীচে সব ইঁদুরের বাসা। আমরা ঘরের মেঝে খুঁড়ব।’
পাথরের নক্সা করা মেঝে। এমন সুন্দর মেঝে খোঁড়াখুঁড়ি করে নষ্ট হয়ে যাবে ভেবে মন্ত্রী বললেন, ‘তোমাকে মেঝে খুঁড়তে হবে না, আমার বাড়িতে একটাও ইঁদুর নেই।’
হারাধন বলল, ‘মুখের কথা মহারাজ বিশ্বাস করবেন না। আপনি আমাকে কাগজে লিখে দিন আপনার বাড়ির সব ইঁদুর আমি মেরে ফেলেছি আর কোনো ইঁদুর নেই।’
মন্ত্রী তাড়াতাড়ি কাগজে লিখে দিলেন। হারাধন সেখান থেকে গেল সেনাপতির বাড়ি। সেনাপতিও বাড়ি ভাঙার ভয়ে, হারাধনকে কাগজ লিখে দিলেন। এমনি করে নগরের সব বাড়ি ঘুরে ঘুরে কাগজ আদায় করে নিল। রাজার পরোয়ানার ভয়ে কেউ আর কোনো আপত্তি করল না।
ছয়দিন ধরে সারা নগর ঘুরে হারাধন এল রাজার বাড়ি। দুপুরের খাওয়াদাওয়া করে রাজা বিশ্রাম করছিলেন। এমন সময় লোকজনকে দরজার বাইরে রেখে হারাধন এসে দাঁড়াল রাজার কাছে। রাজা বললেন, ‘হারাধন, রাজ্যের সব ইঁদুর কি মারা পড়েছে?’
হ্যাঁ মহারাজ, এই নগরের কারও বাড়িতে আর একটাও ইঁদুর নেই। শুধু এই প্রাসাদের ইঁদুর মারার কাজ বাকি। আপনার কোনো চিন্তা নেই মহারাজ, বিকেল হওয়ার আগেই আমরা সব ইঁদুর মেরে ফেলব।
হারাধন তার লোকজন নিয়ে ইঁদুর মারতে শুরু করল। খানিকক্ষণ এদিক-সেদিক প্রাসাদের এ-ঘর সে-ঘর ঘুরে রাজার ঘরের সামনে একটা বড়ো থামের সামনে এসে দাঁড়াল। লোকজনদের বলল, ‘এসো সবাই মিলে থামটা ভেঙে ফেলি।’
বিরাট থাম। সারা গায়ে কত নক্সা। সবাই মিলে থামের গায়ে শাবলের ঘা মারতেই রাজা ছুটে এলেন, ‘কী ব্যাপার, তোমরা থাম ভাঙছো কেন?’
‘একটা ইঁদুর ঢুকেছে এর তলায়।’
‘একটা ইঁদুরের জন্যে এত সুন্দর থামটা ভেঙে ফেলবে?’
হারাধন বলল, ‘না হলে যে আমরা ইঁদুরটাকে মারতে পারব না।’
‘তোমাদের ইঁদুর মারতে হবে না।’
হারাধন রাজার দেওয়া পরোয়ানা বের করে বলল, ‘মহারাজের আদেশ নগরের সব ইঁদুর মারতে হবে আর আমাদের কাজে কেউ বঁাধা দেবে না।’
নিজের আদেশে নিজেই বিপদে পড়ে গেলেন রাজা। হাসতে হাসতে বললেন, ‘আমার আদেশ আমি প্রত্যাহার করে নিলাম। তুমি শুধু আমার প্রজাদের নয় আমাকেও ঠকালে। তোমার মতো বুদ্ধিমান ছেলেকে কাজে লাগাতে না পারলে, আমাকে আরও বেশি ঠকতে হবে। আজ থেকে তুমি হবে আমার নতুন মন্ত্রী। আমার প্রধান পরামর্শদাতা।’
আনন্দে হারাধন রাজাকে প্রণাম করল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন