তাঁতির কুঁজ

চঞ্চলকুমার ঘোষ

এক তাঁতির পিঠে ছিল মস্ত একটা কুঁজ। এতবড়ো কুঁজ নিয়ে তাঁতির চলাফেরা করতে খুব কষ্ট হত। কী আর করে! কুঁজ নিয়েই সারাদিন তাঁত বুনত। হাটে গিয়ে কাপড় বিক্রি করত।

একদিন হাটে কাপড় বিক্রি করে বাড়ি ফিরছিল তাঁতি। অনেকটা পথ, আস্তে আস্তে হাঁটছিল। খানিক পথ এসে ক্লান্ত হয়ে এক গাছতলায় বসে পড়ল।

নি:ঝুম দুপুর। চারদিক ধু-ধু করছে মাঠ। কোথাও কোনো লোকজন নেই। সেখানে বসে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়ল তাঁতি, যখন ঘুম ভাঙল তখন সন্ধে হয়ে গিয়েছে। তাড়াতাড়ি উঠে বাড়ির ফেরবার পথ ধরতেই, তাঁতি দেখতে পেল মাঠের পথ ধরে একটা সাদা ঘোড়া একা একা ঘাস খাচ্ছে।

এমন সুন্দর ঘোড়া দেখে ভীষণ লোভ হল তাঁতির। ভাবল ঘোড়াটাকে যদি ধরতে পারি, তবে আর কষ্ট করে হাঁটাহাঁটি করতে হবে না। ঘোড়ার পিঠে চেপেই সব জায়গায় যেতে পারব।

যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। তাঁতি চুপি চুপি এগিয়ে গিয়ে এক লাফে ঘোড়ার পিঠে উঠে পড়ল।

সেই ঘোড়া ছিল স্বর্গের দেবদূতের ঘোড়া। ঘাস খেতে পৃথিবীতে এসেছিল। তাঁতি পিঠে চেপে বসতেই ভয় পেয়ে আকাশে উড়তে আরম্ভ করল।

তাঁতি ভাবল, লাফ দিয়ে নীচে নেমে পড়ি। নীচের দিকে চাইতেই দেখে ঘোড়া মাটি থেকে অনেক উপরে উঠে পড়েছে আর নামবার কোনো উপায় নেই।

তাঁতি কী আর করে! ঘোড়ার গলা শক্ত করে ধরে বসে রইল। ঘোড়া আকাশের মধ্যে দিয়ে উড়ে চলল। মেঘের রাজ্য পার হয়ে ঘোড়া এসে নামল স্বর্গের বাগানে।

তাঁতি এমন সুন্দর বাগান কোনোদিন দেখেনি। চারদিকে কত গাছ, তাতে রং-বেরঙের ফুল ফুটে রয়েছে। কী মিষ্টি তার গন্ধ। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে বাগানের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে লাগল তাঁতি। ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় এসে দ্যাখে সেখানে সব দেবদূতরা নাচগান করছে।

তাঁতি একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে দেবদূতদের নাচ দেখতে লাগল। নাচ দেখতে দেখতে তাঁতির ভীষণ নাচতে ইচ্ছে করল। গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে সে-ও দেবদূতদের সঙ্গে নাচতে আরম্ভ করল।

হাত ঘুরিয়ে, পা ঘুরিয়ে, কোমর বেঁকিয়ে সেকী নাচ!

এমন নাচ কোনোদিন দেখেনি দেবদূতেরা। সবাই ভীষণ খুশি। তারা খাতির করে তাঁতিকে স্বর্গে রেখে দিল।

স্বর্গে তাঁতির সেকী সুখ! কী যত্ন আত্তি। এমন কোনোদিন পায়নি। তবুও কদিন যেতে-না-যেতেই তাঁতির বাড়ির জন্যে মন কেমন করতে লাগল। বাড়িতে বউ-ছেলে মেয়ে রয়েছে। তারা কে কেমন আছে কে জানে?

তাঁতি দেবদূতদের বলল, ‘এবার আমাকে বাড়ি পৌঁছে দাও।’

দেবদূতেরা কেউ তাঁতিকে ছাড়তে চায় না। তারা বলল, ‘এখানে তোমার কীসের কষ্ট?’

‘বউ-ছেলেমেয়ের জন্য বড়ো মন কেমন করছে।’

‘তুমি যদি তাদের দেখে ফিরে আসবে বলো, তবেই তোমাকে যেতে দেব।’

তাঁতি মাথা নেড়ে বলল, ‘ঠিক আছে আমি ফিরে আসব।’

তাঁতির কথায় বিশ্বাস হল না দেবদূতদের। তারা তাঁতির পিঠ থেকে কুঁজটা তুলে নিয়ে বলল, ‘তুমি যেদিন স্বর্গে ফিরে আসবে, সেদিন তোমার কুঁজ ফেরত দেব।’

তাঁতি মহা খুশি। সেআর কিছু বলল না। সব দেবদূতদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঘোড়ার পিঠে চেপে বসল। ঘোড়া তাকে উড়িয়ে নিয়ে এল নিজের গ্রামে।

সেই গ্রামে ছিল আর-এক তাঁতি। তার পিঠেও ছিল মস্ত বড়ো এক কুঁজ।

কুঁজ ছাড়া তাঁতিকে দেখে তার মনে খুব হিংসে হল। তাঁতির বাড়ি এসে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার কুঁজ সারল কেমন করে?’

তাঁতি সরল বিশ্বাসে তাকে সবকিছু বলল।

কিছু না বলে কুঁজওলা তাঁতি সেখান থেকে চলে গেল। পরদিন দুপুর হতে-না -হতেই সেবাড়ি থেকে বেরিয়ে মাঠে গিয়ে বসে রইল। খানিক পরেই স্বর্গ থেকে দেবদূতের ঘোড়া মাঠে নেমে ঘাস খেতে আরম্ভ করল।

কুঁজো তো খুব খুশি। আর দেরি না করে চুপি চুপি গিয়ে ঘোড়ার পিঠে চেপে বসল। আর সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া উড়তে আরম্ভ করল। সোজা একেবারে স্বর্গে গিয়ে থামল।

তাঁতিকে ফিরে পেয়ে দেবদূতদের খুব আনন্দ। তাকে নিয়ে আবার সবাই নাচ-গান শুরু করে দিল।

তাঁতি কোনোদিন নাচ-গান করেনি। বার বার তার তাল কেটে যেতে লাগল।

শেষে দেবদূতরা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আর তোমাকে নাচতে হবে না, তোমার কুঁজ নিয়ে বাড়ি যাও।’

তাঁতি কিছু বলবার আগেই তারা আগের তাঁতির কুজ এনে তার পিঠের ওপর বসিয়ে দিল।

দু-দুটো কুঁজের ভারে তাঁতি আর দাঁড়াতেই পারে না। সেহাত-পা নেড়ে চিৎকার করতে থাকে, ‘আমার কুঁজ তুলে দাও, কুঁজ তুলে দাও।’

কেউ তার কথায় কান দিল না। ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে তাঁতিকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিল।

সকল অধ্যায়
১.
ওঝা ও পাহাড়ি ভূত
২.
দুই সূর্য
৩.
মহিষ ও রাখালছেলে
৪.
তিন বন্ধু
৫.
বাঘ মামার কথা
৬.
কুঁজো আর অন্ধ
৭.
দেবতার অভিশাপ
৮.
সাতবোকা
৯.
বাহাদুর আর এক-পা-ওলা দৈত্য
১০.
সাধু ও মহাজন
১১.
চালাক ভোলানাথ
১২.
বামুন আর শেয়াল
১৩.
আকাশপুরীর রাজকন্যা
১৪.
অতি চালাকের গলায় দড়ি
১৫.
তিন জামাই
১৬.
শেয়ালবউ-এর বুদ্ধি
১৭.
শেয়াল আর বোকা বাঘ
১৮.
বুদ্ধিমান চোর
১৯.
শুয়োরের শিং
২০.
রাখালছেলে ও পরির দেশের রাজকন্যা
২১.
তাঁতির কুঁজ
২২.
চার চোর
২৩.
কাঠুরে নাপিত আর রাজকন্যা
২৪.
মহেশ্বর
২৫.
আয়না
২৬.
শেয়াল ও বুড়োবুড়ি
২৭.
এক দাঁত ফোকলা
২৮.
বুদ্ধি থাকলেই উপায় হয়
২৯.
ভীম আর জলদৈত্য
৩০.
চার ভাই
৩১.
সুরের জাদু
৩২.
ভূত ও ভূতনাথ
৩৩.
রসিক রাজু

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%