চঞ্চলকুমার ঘোষ
এক গাঁয়ে থাকত এক বুড়ি আর তার ছেলে ভোলানাথ। বুড়ি সারাদিন খেটেখুটে যা আয় করত তাতেই দু-জনের সংসার চলে যেত। একদিন বুড়ি ভোলানাথকে বলল, ‘আর যে পারি না বাবা, আমার বয়স হল। এবার তুই একটা কাজকর্মের চেষ্টা করে দেখ।’
ভোলানাথ বলল, ‘আমি ওইসব কাজকর্ম করতে পারব না মা।’
বুড়ি রেগে বলল, ‘তবে কি আমি সারাদিন খাটব আর তুই বসে বসে খাবি?’
ভোলানাথ বলল, ‘তুমি কোনো চিন্তা করো না মা, আমি কাজ না করেই এত টাকা আয় করব যে তোমাকে আর কষ্ট করতে হবে না।’
বুড়ি ভোলানাথের কথায় বিশ্বাস করতে পারল না। ভোলানাথ বলল, ‘ঠিক আছে মা এই আমি বেরিয়ে পড়লাম, টাকা আয় করে তবেই ফিরব।’
এক কাপড়ে বেরিয়ে পড়ল ভোলানাথ। গ্রাম পেরিয়ে মাঠের রাস্তা ধরল। বেলা বাড়তে থাকে। সেই কোন সকালে দুটো পান্তাভাত খেয়েছে। খিদেতে আর হাঁটতে ইচ্ছে করে না। পথের ধারেই ছিল বিরাট এক বটগাছ। তার তলায় গিয়ে বসে পড়ল ভোলানাথ। গাছের ছায়ায় বসে থাকতে থাকতে ঝিমুনি এসে গিয়েছিল ভোলানাথের। হঠাৎ কেউ তার গায়ে হাত দিয়ে ডাকতেই চোখ মেলে তাকাল। নামাবলি গায়ে এক বামুন। হাতে মুখ আঁটা কলসি।
বামুন বলল, ‘আমার এই কলসিটা বাড়িতে পৌঁছে দিবি?’
ভোলানাথ বলল, ‘কী আছে এই কলসিতে?’
বামুন বলল, ‘কিছু নয়, কাঁকড়া। হাটে সস্তায় পেয়ে গেলাম তাই কিনে নিলাম।’
ভোলানাথ কিছু না বলে কলসিটা মাথায় তুলে নিল। আগে আগে বামুন চলল, পেছনে ভোলানাথ। কিছুটা যেতেই হঠাৎ ভোলানাথের মনে হল বামুন বলল হাট থেকে কাঁকড়া কিনে নিয়ে আসছে। নামাবলি গায়ে দিয়ে তো লোকে হাটে যায় না, পুজো করতে যায়। নিশ্চয়ই বামুন তাকে মিথ্যে কথা বলেছে। এই কলসির মধ্যে কাঁকড়া নয়, অন্য কিছু আছে। কিন্তু আছেটা কী?
বামুন জোরে জোরে হাঁটছিল। এবার ভোলানাথ আস্তে আস্তে হাঁটতে আরম্ভ করল। খানিক পথ গিয়ে একটা গাছের আড়ালে কলসিটা নামিয়ে নিল। মুখের কাপড়টা সরিয়ে দিতেই দেখে কলসি-ভরতি রসগোল্লা। জিভে জল এসে গেল ভোলানাথের।
ওদিকে বামুন পেছন ফিরে ভোলানাথকে দেখতে না পেয়ে ডাক দিতেই তাড়াতাড়ি কলসিটা মাথায় তুলে নিয়ে গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বলল, ‘বড়ো রোদ ঠাকুরমশাই, তাই গাছের ছায়ায় একটু দাঁড়িয়েছিলাম।’
‘এই তো এসে গিয়েছি, আর এক ক্রোশ গেলেই গ্রামে পৌঁছে যাব,’ বলেই বামুন আবার হাঁটতে আরম্ভ করল। ভোলানাথ তার পেছনে যায় আর ফাঁক পেলেই কলসি থেকে রসগোল্লা বের করে খায়। বামুন কিছুই জানতে পারে না। গাঁয়ের কাছাকাছি আসতেই কলসি একেবারে খালি হয়ে গেল।
ভোলানাথ ভাবল বামুন যদি জানতে পারে তবে মহা অনর্থ করবে, তার আগেই একটা কিছু ব্যবস্থা করতে হবে। গাঁয়ে ঢোকবার মুখেই পথের ধারে ছোটো একটা পুকুর।
বামুন ভোলানাথের দিকে ফিরে বলল, ‘জানিস এই পুকুর জমিদারবাবু আমাকে দান করেছে।’
ভোলানাথ একগাল হেসে বলল, ‘তবে আপনার পুকুরে একটু হাতমুখ ধুয়ে আসি।’
বামুন কিছু বলবার আগেই পুকুরঘাটে নেমে গেল ভোলানাথ। একেবারে শেষ সিঁড়িতে এসেই দড়াম করে কলসিটা ফেলে দিল। কলসি ভাঙার আওয়াজ পেতেই বামুন চিৎকার করে ছুটে এল, ‘আমার রসগোল্লা?’
ভোলানাথ চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, ‘রসগোল্লা কোথায় ঠাকুরমশাই, আমি তো দেখলাম ভাঙা কলসি থেকে কাঁকড়া বেরিয়ে এল আর সব পুকুরে নেমে গেল।’
বামুন বুঝতে পারল এসবই ভোলানাথের চালাকি। কলসির রসগোল্লা খেয়ে তার কথাতেই তাকে জব্দ করে গেল। কী আর করে, রাগে গজগজ করতে করতে বাড়িতে চলে গেল বামুন। অন্য রাস্তা ধরে পাশের গ্রামের দিকে চলল ভোলানাথ।
যখন সেই গ্রামে গিয়ে পৌঁছাল তখন রাত্রি হয়ে গিয়েছে। ভোলানাথ ভাবল এখানে রাত্রিটা কাটিয়ে কাল সকালে শহরের দিকে যাব। সামনেই এক চাষির বাড়ি। ভোলানাথ বাড়ির দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ভেতরে চাষি আর তার বউ কথা বলছিল। ভোলানাথের কানে গেল চাষিবউ বলছে, ‘এবার একটা গোরু কেন, নিজেদের গোরু থাকলে পরের বাড়ি থেকে আর দুধ চাইতে হয় না।’
চাষি বলল, ‘গোরু কিনতে দশ টাকা লাগবে, অত টাকা পাব কোথায়?’
চাষিবউ বলল, ‘আমার কাছে দশ টাকা আছে, গতবছর যখন বাবার বাড়ি গিয়েছিলাম মা দিয়েছিল।’
চাষি বলল, ‘কই সে-কথা তো আমায় কোনোদিন বলোনি।’

চাষিবউ হেসে বলল, ‘তোমাকে বললে কবেই তো তুমি সে-টাকা নিয়ে নিতে, তাই বিছানার তলায় পুঁটলি করে রেখে দিয়েছি।’
চাষি বলল, ‘ঠিক আছে, তবে কাল বিকেলে হাটে গিয়ে ভালো দেখে একটা গোরু নিয়ে আসব।’
চাষি আর চাষিবউ-এর কথা শেষ হতেই ভোলানাথ আর সেখানে দাঁড়াল না, অন্য একজনের বাড়িতে গিয়ে রাত কাটাল। পরদিন সকালবেলায় ভোলানাথ চাষির বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াতেই দেখল চাষি লাঙ্গল কাঁধে নিয়ে মাঠে চলেছে। বাড়ি থেকে খানিক দূর যেতেই ভোলানাথ বলল, ‘চাষিভাই, একটু জল পাওয়া যাবে?’
চাষি বলল, ‘আমার কাছে তো জল নেই, ওই যে সামনেই আমার ঘর তুমি গিয়ে আমার বউ-এর কাছে জল চাইলেই সেদেবে।’
ভোলানাথ মুখ কাঁচুমাঁচু করে বলল, ‘যদি আমায় জল না দেয়, তার চেয়ে তুমি এখানে দাঁড়াও, তোমার বউ জল না দিলে তুমি দিতে বলে দিও।’
চাষি বলল, ‘ঠিক আছে তুমি যাও, আমি দাঁড়িয়ে আছি।’
ভোলানাথ গিয়ে ডাক দিতেই চাষিবউ বেরিয়ে এল। ভোলানাথ তাকে দেখে বলল, ‘চাষি আমার কাছ থেকে একটা গোরু কিনেছে, তোমাকে বলল টাকা দিয়ে দিতে।’
চাষিবউ কোনোদিন ভোলানাথকে দেখেনি, তার কথা শুনে বিশ্বাস করতে পারল না। ভোলানাথ তা বুঝতে পেরে বলল, ‘তোমার বিছানার তলায় পুঁটলি বাধা যে-টাকাটা আছে সেই টাকাটা দিতে বলল।’
এবার ভোলানাথের কথায় চাষিবউ-এর বিশ্বাস হল, তার টাকার কথা চাষি ছাড়া আর কেউ জানে না। তবুও বলল, ‘তুমি একটু বসো, আমি চাষিকে খবর পাঠাচ্ছি। চাষি এলেই তোমাকে টাকা দিয়ে দেব।’
ভোলানাথ তাড়াতাড়ি বলল, ‘সেঅনেক দেরি হয়ে যাবে, ওই তো চাষি দাঁড়িয়ে আছে আমি বলছি।’
বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল চাষি। ভোলানাথ সেইদিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলল, ‘চাষিভাই, তোমার বউ আমাকে দিচ্ছে না।’
সে-কথা কানে যেতেই চাষি চেঁচিয়ে উঠল, ‘চাষিবউ, ও যা চাইছে দিয়ে দাও। আমি আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকব।’
চাষির কথা শুনে চাষিবউ-এর মনে আর কোনো সন্দেহ থাকল না। সেবলল, ‘ঠিক আছে তুমি যাও, আমি দিয়ে দিচ্ছি।’
চাষি চলে গেল। চাষিবউ ঘর থেকে টাকা নিয়ে এসে ভোলানাথকে বলল, ‘ভালো দেখে গোরু দিও কিন্তু।’
ভোলানাথ একগাল হেসে বলল, ‘তোমার কোনো চিন্তা নেই, খুব ভালো গোরু দেব। এখন আমি চলি। ঘরে গিয়েই তোমার গোরু পাঠাবার ব্যবস্থা করছি।’
ভোলানাথ আর সেখানে দাঁড়াল না। তাড়াতাড়ি গ্রাম ছেড়ে চলল শহরের দিকে। সারাদিন পথ চলবার পর ভোলানাথ এসে পড়ল এক জঙ্গলের ধারে। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পথ চলে গিয়েছে। ভোলানাথ ভাবল তাড়াতাড়ি হেঁটে জঙ্গলটা পার হয়ে যাবে। খানিকটা পথ যেতে-না-যেতেই সন্ধে হয়ে এল। অন্ধকারে ভালো করে পথ দেখা যায় না। আরও জোর পায়ে হাঁটতে আরম্ভ করল। খানিকটা পথ যেতেই দেখতে পেল জঙ্গলের মধ্যে বিরাট এক মন্দির। সামনে অনেকটা ফাঁকা জায়গা। চারদিক নিস্তব্ধ, কোথাও কোনো লোকজন নেই।
মন্দিরের মধ্যে বিরাট এক কালীমূর্তি। ভোলানাথ ভাবল, অন্ধকারের মধ্যে এই জঙ্গলে পথ খুঁজে পাব না। তার চেয়ে এই মন্দিরেই রাতটা কাটাই, সকাল হলে বেরিয়ে পড়ব।
মন্দিরের এক কোনায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল ভোলানাথ। মাঝরাতে হঠাৎ অনেক লোকের কথাবার্তা শুনে ঘুম ভেঙে গেল তার। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখল ভয়ংকর চেহারার ডাকাতের দল। হাতে বর্শা, তলোয়ার, জ্বলন্ত মশাল। ডাকাতি করতে যাবার আগে মা কালীর মন্দিরে পুজো দিতে এসেছে।
কালীমূর্তির পিছনে লুকিয়ে পড়ল ভোলানাথ। একটু পরেই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল ডাকাতের দল। সামনে সর্দার, মশালের আলোয় তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। হাতজোড় করে বলল, ‘মা, আজ আমরা রতনপুরের জমিদারবাড়ি ডাকাতি করতে যাচ্ছি, আশীর্বাদ করো যেন অনেক ধনদৌলত নিয়ে ফিরতে পারি।’
ডাকাতসর্দার-এর প্রার্থনা শেষ হতে-না-হতেই গম্ভীর গলায় আওয়াজ ভেসে এল, ‘সর্দার, তোর প্রার্থনায় আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। তোর ধনদৌলতের আর কোনো অভাব থাকবে না, তবে আমি যে আদেশ দেব তা মানতে হবে।’
ডাকাতসর্দার কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিল না মা কালী তার প্রার্থনায় সন্তুষ্ট হয়ে নিজে মুখে আশীর্বাদ করছেন। সকলে আনন্দে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। একসাথে বলে উঠল, ‘তুমি আদেশ দাও মা, তুমি যে আদেশ দেবে আমরা তাই করব।’
আবার আওয়াজ ভেসে এল, আজ রাতে ডাকাতি করে যা পাবি, সব আমার পায়ে নিবেদন করবি। কাল থেকে যা পাবি, সব তোদের থাকবে।
সর্দার হাতজোড় করে বলল, ‘তাই হবে মা।’
ডাকাতের দল ‘হা-রে-রে’ করে বেরিয়ে পড়ল ডাকাতি করতে। কালীমূর্তির পেছনে অন্ধকারের মধ্যে চুপটি করে বসে রইল ভোলানাথ। শেষরাতে ডাকাতের দল মন্দিরে ফিরতেই ভোলানাথ গম্ভীর গলায় বলল, ‘যা এনেছিস এখানে রেখে চলে যা।’
ডাকাতসর্দার বিরাট একটা পোঁটলা মা কালীর পায়ের কাছে রেখে দলবল নিয়ে ফিরে গেল। ডাকাতরা চলে যেতেই ভোলানাথ বেরিয়ে এল। পোঁটলা খুলতেই তার চোখ দুটো চকচক করে উঠল। পোঁটলা ভরতি টাকাপয়সা আর গয়না।
একটু বেলা হতেই ভালো করে পোঁটলা বেধে নিয়ে ভোলানাথ ফিরে চলল নিজের গাঁয়ে। তারপর ভোলানাথ আর তার মায়ের সেকী সুখ, বলে শেষ করা যায় না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন