বামুন আর শেয়াল

চঞ্চলকুমার ঘোষ

এক গাঁয়ে ছিল এক বামুন। একদিন বামুন দূর এক গাঁয়ে গিয়েছে পুজো করতে। সেই গাঁয়ে যাবার পথে ছিল বিরাট এক জঙ্গল। বামুন পুজো সেরে মস্ত এক পোঁটলা বেধে জঙ্গলের পথ ধরে বাড়ি ফিরছিল। মনে মনে ভাবছিল আজ অনেক খাবার পেয়েছি, বাড়ি গিয়ে বেশ ভালো করে খাওয়া যাবে। খানিক দূর যেতেই হঠাৎ কোথা থেকে বিরাট এক শেয়াল এসে দাঁড়াল তার সামনে। শেয়ালকে দেখেই বুক শুকিয়ে গেল বামুনের, তবু সাহস করে বলল, ‘শেয়ালভায়া চললে কোথায়?’

শেয়াল বলল, ‘যাব আর কোথায়। এপথেই যাচ্ছিলাম, খাবারের গন্ধ নাকে আসতেই তোর কাছে চলে এলাম।’

শেয়ালের কথায় বামুনের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। তাড়াতাড়ি পোঁটলাটাকে আড়াল করতে করতে বলল, ‘খাবার কোথায় শেয়ালভায়া, এ তো পুজোর জিনিস।’

‘পুজোর জিনিসে বুঝি খাবার গন্ধ বেরোয়?’ চেঁচিয়ে উঠল শেয়াল, ‘ভালো চাস তো সব খাবার দিয়ে যা নয়তো তোকেই খাব।’

ভয়ে ভয়ে বামুন বলল, ‘ঠিক আছে তোমাকে সব খাবার দিয়ে দিচ্ছি কিন্তু তুমি খাবে কেমন করে?’

শেয়াল বলল, ‘কেন মুখ দিয়ে খাব।’

বামুন বলল, ‘আমি সেকথা বলছি না, এতো শুকনো খাবার, জলে ভিজিয়ে খেতে হয়। তুমি কুমোরবাড়ি থেকে এক ভাঁড় জল নিয়ে এসো, আমি ততক্ষণ এখানে বসে আছি। তুমি এলে আমি যাব।’

শেয়াল বলল, ‘তুই ঠিক বলছিস তো, আমি গেলে তুই পালিয়ে যাবি না তো?’

বামুন বলল, ‘না না আমি পালাব না।’

শেয়াল একছুটে কুমোরবাড়িতে গেল আর বামুন তখন করল কী, সব খাবার এক জায়গায় লুকিয়ে রেখে গাছের বুনো ফল পেড়ে গামছায় ভরে রাখল। শেয়াল ভাঁড় ভরতি জল নিয়ে আসতেই বামুন পোঁটলা থেকে সব বুনো ফল জলে ফেলে দিয়ে বলল, ‘শেয়ালভাই, সব খাবার জলে ভিজিয়ে দিলাম, যতক্ষণ না ভেসে ওঠে ততক্ষণ কিন্তু খেয়ো না। খেলেই নাড়িভুঁড়ি শুকিয়ে মরে যাবে।’

বামুন রওনা হল নিজের বাড়ি। কিছুটা গিয়ে লুকানো খাবার বের করে নিয়ে জোর পায়ে হাঁটতে আরম্ভ করল। আর শেয়াল চুপচাপ বসে দেখতে লাগল কখন খাবার জলে ভেসে ওঠে। খাবার আর জলে ভেসে ওঠে না। শেয়াল আর থাকতে পারল না। জলে মুখ ডোবাতেই বুঝতে পারল বামুন তাকে ঠকিয়ে গাছের বুনো ফল রেখে গিয়েছে। রাগে গরগর করতে করতে চলল নিজের গর্তে।

কয়েকদিন পর একদিন আমগাছের গোড়ায় বসেছিল শেয়াল। এমন সময় দেখল বনের পথ দিয়ে বামুন কোথায় যেন যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে বিরাট এক লাফ দিয়ে শেয়াল এসে দাঁড়াল বামুনের সামনে। তারপর বলল, ‘আগের বার আমায় খুব ফাঁকি দিয়েছিলি, এবার যাবি কোথায়? যখন হাতের কাছে পেয়েছি এবার তোকে খাবই।’

বামুন বলল, ‘শেয়ালভাই, তুমি যখন আমায় খাবেই ঠিক করেছ, তখন একটুখানি দাঁড়াও। কাল রাতে দুটো কুকুর খেয়েছি। এখনো হজম হয়নি। পেটের মধ্যে কুকুর দুটো কুঁই কুঁই করছে। আগে ওদের বমি করে বের করি তারপর আমায় খেও।’

কুকুরের কথা শুনেই শেয়ালের সেকী ভয়। বামুনকে ফেলেই ঊর্ধ্বশ্বাসে দিল দৌড়। শেয়ালকে দৌড়োতে দেখে নেকড়ে বাঘ জিজ্ঞেস করল, ‘শেয়াল ভায়া দৌড়চ্ছ কেন?’

শেয়াল হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘কুকুরে তাড়া করেছে।’

নেকড়ে চারদিকে চেয়ে বলল, ‘কুকুর কোথায়? আমি তো কোথাও কুকুর দেখতে পাচ্ছি না।’

শেয়াল পেছন ফিরে দেখল সত্যি সত্যি কুকুর কোথাও নেই। বলল, ‘জানো নেকড়েদাদা কী ভয়টাই না পেয়েছিলাম, বামুনের পেটে যে-কুকুর আছে, আমি কী করে জানব বলো? বামুনকে মারতে গিয়েই তো এই বিপত্তি।’

নেকড়ে বাঘ ফিক করে হেসে ফেলল, ‘তুই কী বোকা, মানুষের পেটে আবার কুকুর থাকে না কী!’

শেয়াল গম্ভীর হয়ে বলল, ‘ঠিকই তো, এই নিয়ে বামুন আমায় দু-বার ঠকালো। এবার পেলে আর ছাড়ছি না।’

শেয়াল আর বামুনকে খুঁজে পায় না। একদিন শেয়াল দুপুরবেলায় নদীর ধারে বসে রোদ পোয়াচ্ছিল, এমন সময় দেখতে পেল বামুন নদীতে চান করে উঠে আসছে। আর যায় কোথায়, বিরাট হাঁ করে লাফ দিয়ে পড়ল বামুনের সামনে। বলল, ‘আগের দু-বার তুই আমাকে খুব ফাঁকি দিয়েছিস। এবার আর তোকে কেউ বঁাচাতে পারবে না। তোর হাড়-মাংস সব আজ খাব।’

বামুন একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘আমায় যখন খাবে ঠিক করেছ তখন আর কী করা যাবে, কিন্তু আমার বউ, ছেলেমেয়ের কী হবে?’

শেয়াল মাথা চুলকে বলল, ‘কেন তাদের কী হল?’

বামুন বলল, ‘আমি মারা গেলে আমার শোকে বউ মারা যাবে। মা-র শোকে আমার ছেলে-মেয়ে মারা যাবে, আমরা চারজন মারা যাব আর তুমি শুধু আমাকেই খাবে, তার চেয়ে আমাদের চারজনকেই খাও।’

বামুনের কথা শুনে শেয়ালের জিভ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। জিভ চেটে বলল, ‘ঠিক আছে, তোদের চারজনকেই খাব।’

বামুন বলল, ‘তবে আমার বাড়িতে চলো, সেখানেই বউ-ছেলেরা আছে।’

শেয়ালকে নিয়ে বামুন এসে হাজির হল নিজের বাড়িতে। বামুনের বউ গিয়েছিল বাপের বাড়ি। বামুন রান্নাঘরে দরজার সামনে গিয়ে আস্তে আস্তে বলল, ‘তুমি এই ঘরে ঢুকে যাও, বউ রান্না করছে।’

শেয়াল আর লোভ সামলাতে পারল না। একলাফে রান্নাঘরে ঢুকে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে দরজা বন্ধ করে বাইরে থেকে শেকল আটকে দিল বামুন। তারপর গাঁয়ের লোকদের খবর দিতেই সবাই লাঠি দা কুড়ুল নিয়ে এসে হাজির হল। চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে সবাই মিলে পিটিয়ে মেরে ফেলল শেয়ালকে। শেয়ালের আর বামুনের মাংস খাওয়া হল না।

সকল অধ্যায়
১.
ওঝা ও পাহাড়ি ভূত
২.
দুই সূর্য
৩.
মহিষ ও রাখালছেলে
৪.
তিন বন্ধু
৫.
বাঘ মামার কথা
৬.
কুঁজো আর অন্ধ
৭.
দেবতার অভিশাপ
৮.
সাতবোকা
৯.
বাহাদুর আর এক-পা-ওলা দৈত্য
১০.
সাধু ও মহাজন
১১.
চালাক ভোলানাথ
১২.
বামুন আর শেয়াল
১৩.
আকাশপুরীর রাজকন্যা
১৪.
অতি চালাকের গলায় দড়ি
১৫.
তিন জামাই
১৬.
শেয়ালবউ-এর বুদ্ধি
১৭.
শেয়াল আর বোকা বাঘ
১৮.
বুদ্ধিমান চোর
১৯.
শুয়োরের শিং
২০.
রাখালছেলে ও পরির দেশের রাজকন্যা
২১.
তাঁতির কুঁজ
২২.
চার চোর
২৩.
কাঠুরে নাপিত আর রাজকন্যা
২৪.
মহেশ্বর
২৫.
আয়না
২৬.
শেয়াল ও বুড়োবুড়ি
২৭.
এক দাঁত ফোকলা
২৮.
বুদ্ধি থাকলেই উপায় হয়
২৯.
ভীম আর জলদৈত্য
৩০.
চার ভাই
৩১.
সুরের জাদু
৩২.
ভূত ও ভূতনাথ
৩৩.
রসিক রাজু

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%