দেবতার অভিশাপ

চঞ্চলকুমার ঘোষ

পাহাড়ের বুকে ছোট্ট এক গ্রাম। গ্রামের নাম লাহুল। সেই গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ছোটো একটা নদী। গ্রামের লোকেরা সেই নদীর নাম দিয়েছে চন্দ্রা। নদী পেরিয়ে চারদিকে মাঠ তারপর পাহাড় আর পাহাড়। বছরে ছয় মাস মাঠ, পাহাড় বরফে ঢেকে থাকে। যেদিকে চোখ যায় সাদা দুধের মতো বরফ। লোকজন ঘরের বাইরে বেরোতে পারে না। ঘরে জমানো থাকে ছয় মাসের খাবার, তাই খায় আর অপেক্ষা করে কখন শীত শেষ হবে।

দেখতে দেখতে শীত চলে যায়। বসন্ত আসে, চারদিকের বরফ গলতে আরম্ভ করে, সূর্যের আলোয় মাঠঘাট সব সবুজ হয়ে ওঠে। গ্রামের লোকজন কাজকর্ম শুরু করে দেয়। চাষিরা চাষ করে, ছাগল-গোরু-ভেড়া নিয়ে বেরিয়ে পড়ে রাখাল।

দেখতে দেখতে গরমের দিন শেষ হয়, আবার শীত আসে। চারদিক বরফে ঢেকে যায়। এমনি করেই বছরের পর বছর পার হয়। একবার শীত আর যায় না, বরফও আর গলে না। লোকেরা ভাবে বসন্তের দিন এল তবু তো শীত গেল না, বরফ গলল না।

সবাই অপেক্ষা করে। মাস পার হয়ে যায় বছর ঘুরে যায়, সবাই মহাচিন্তায় পড়ে গেল। কারও ঘরেই আর খাবার নেই। গোরু-ছাগল-ভেড়ার খাওয়ার মতো ঘাস নেই।

গাঁয়ের মোড়ল বলল, ‘নিশ্চয়ই পাহাড়ের দেবতা আমাদের ওপরে রাগ করেছেন নইলে এমন তো কোনোদিন হয় না।’ সকলে মিলে গেল লামার কাছে।

লামা তাদের দুঃখের কথা শুনে বলল, ‘তোমরা নিশ্চয়ই দেবতার পুজোয় অবহেলা করেছ, তাই তোমাদের তিনি শাস্তি দিচ্ছেন।’

সবার মনে পড়ল আগের বছর আনন্দ উৎসবে সবাই এত মেতে উঠেছিল যে পাহাড়ে গিয়ে মেষ বলি দিতে ভুলে গিয়েছিল। মোড়ল হাতজোড় করে বলল, ‘তবে এখন আমাদের কী হবে প্রভু?’

লামা বলল, ‘এখন আর মেষ বলি দিলে দেবতা সন্তুষ্ট হবে না। তোমাদের মধ্যে থেকেই কাউকে চন্দ্রা নদীতে প্রাণ বিসর্জন দিতে হবেন। তবেই দেবতা সন্তুষ্ট হবে।’

সারা গ্রামময় কান্নাকাটি পড়ে গেল। কাকে দেবতার কাছে পাঠানো হবে? একে একে সবাইকে জিজ্ঞেস করা হল। কেউ রাজি হয় না। গাঁয়ের মোড়ল মহাভাবনায় পড়ে গেল। গোয়ালে তার গোরু-মেষগুলো যে মরো মরো। হঠাৎ তার নজরে পড়ল লোকজনের ভিড় থেকে দূরে একটা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছে লায়লি। মা-বাপ মরা মেয়ে কাকার কাছে থাকে। দিনরাত ঘরের কাজ করে, তবুও কাকা-কাকিমা তাকে দু-চোখে দেখতে পারে না।

মোড়ল রাতের বেলায় লায়লির কাকার কাছে গিয়ে বলল, ‘আমি তোমাকে অনেক টাকা দেব তুমি লায়লিকে দেবতার কাছে দান করো।’

টাকার লোভে লায়লির কাকা এক কথায় রাজি হয়ে গেল। লায়লি কিছুই জানে না। পরদিন সারা গ্রামের লোক এসে জড়ো হল লায়লির কাকার বাড়ি। লায়লিকে ভালো কাপড় পরানো হল। সবাই বাজনা বাজাতে বাজাতে লায়লিকে নিয়ে চলল চন্দ্রা নদীর তীরে। লায়লির মহা আনন্দ। সবাই তাকে বলেছে আজ তার বিয়ে। হঠাৎ একটা ছোটো ছেলে লায়লির কানে কানে বলল, ‘না রে, আজ তোর বিয়ে নয়, তোকে মেরে ফেলবে বলে নিয়ে যাচ্ছে।’

লায়লি কাকাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমরা কি আমাকে দেবতার কাছে বলি দেবে বলে নিয়ে যাচ্ছ?’

কাকা কোনো কথা বলল না। মুখ ফিরিয়ে নিল অন্য দিকে। মোড়ল বলল, ‘গ্রামের সব লোককে বঁাচাতে তোমাকে মরতেই হবে।’

লায়লি বুঝতে পারল তাকে বঁাচাবার কেউ নেই। কাঁদতে কাঁদতে নদীর ধারে গিয়ে দাঁড়াল, তারপর হাতজোড় করে প্রার্থনা করে ঝাঁপিয়ে পড়ল নদীর জলে।

সঙ্গে সঙ্গে অলৌকিক কান্ড! নদীর জল ফুলে উঠল। শূন্যে ভেসে উঠল লায়লির দেহ। আকাশ থেকে উজ্জ্বল আলো নেমে এল। একটু একটু করে লায়লির দেহটা আলোয় ঢেকে গেল, তারপরই সব শূন্যে মিলিয়ে গেল।

সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল ঝড়। ঘন কালো মেঘে আকাশ ঢেকে গেল। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল। বজ্র পড়তে লাগল। প্রাণের ভয়ে যে-যেদিকে পারল ছুটতে আরম্ভ করল। সবাই যে-যার বাড়িতে পৌঁছে গেল। শুধু পৌঁছাতে পারল না গাঁয়ের মোড়ল আর লায়লির কাকা। দু-জনে অন্ধকারে পথ হারিয়ে পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়ল বহু নীচে। কেউ আর কোনোদিন তাদের সন্ধান পায়নি।

পরদিন সকালে সবাই ঘুম থেকে উঠতেই দ্যাখে অবাক কান্ড, কোথাও আর শীতের চিহ্ন মাত্র নেই। চারদিকে বরফ সরে গিয়ে সবুজ ঘাস ফুটে উঠেছে। সূর্যের সোনালি আলোয় সারাটা লাহুল লায়লির মিষ্টি হাসির মতো ঝলমল করছে।

সকল অধ্যায়
১.
ওঝা ও পাহাড়ি ভূত
২.
দুই সূর্য
৩.
মহিষ ও রাখালছেলে
৪.
তিন বন্ধু
৫.
বাঘ মামার কথা
৬.
কুঁজো আর অন্ধ
৭.
দেবতার অভিশাপ
৮.
সাতবোকা
৯.
বাহাদুর আর এক-পা-ওলা দৈত্য
১০.
সাধু ও মহাজন
১১.
চালাক ভোলানাথ
১২.
বামুন আর শেয়াল
১৩.
আকাশপুরীর রাজকন্যা
১৪.
অতি চালাকের গলায় দড়ি
১৫.
তিন জামাই
১৬.
শেয়ালবউ-এর বুদ্ধি
১৭.
শেয়াল আর বোকা বাঘ
১৮.
বুদ্ধিমান চোর
১৯.
শুয়োরের শিং
২০.
রাখালছেলে ও পরির দেশের রাজকন্যা
২১.
তাঁতির কুঁজ
২২.
চার চোর
২৩.
কাঠুরে নাপিত আর রাজকন্যা
২৪.
মহেশ্বর
২৫.
আয়না
২৬.
শেয়াল ও বুড়োবুড়ি
২৭.
এক দাঁত ফোকলা
২৮.
বুদ্ধি থাকলেই উপায় হয়
২৯.
ভীম আর জলদৈত্য
৩০.
চার ভাই
৩১.
সুরের জাদু
৩২.
ভূত ও ভূতনাথ
৩৩.
রসিক রাজু

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%