চার ভাই

চঞ্চলকুমার ঘোষ

এক জমিদারের চার ছেলে। চারজনের খুব মিল। একসাথে থাকে, খায় দায়, কখনো তাদের ঝগড়াঝাটি হয় না। চার ছেলে আর তাদের চার বউকে নিয়ে জমিদারের সুখের সংসার।

একদিন জমিদার ছেলেদের ডেকে বললেন, ‘আমি বুড়ো হয়েছি আর ক-দিন বেঁচে থাকব জানি না, এবার থেকে তোমরাই জমিদারির সব কাজকর্ম দেখাশুনা করবে। নিজেরা মিলেমিশে থাকবে—যার যা সামর্থ্য, যোগ্যতা সেই ভাবে কাজ করবে। তাহলে কেউ তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আর যদি কখনো তোমাদের মধ্যে কোনো সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে তোমাদের মেসোর কাছে যেও। তিনি তোমাদের যা পরামর্শ দেবেন তাই মেনে নিও।’

চারছেলেই বাবার কথা মেনে নিল। তার কয়েকদিন পরেই জমিদার মারা গেলেন। চার ভাই তখন বাবার জমিদারি দেখাশুনা করতে আরম্ভ করল।

বড়োভাই জমিজমার কাজ ভালো বুঝত না। পড়াশুনা নিয়েই তার বেশি সময় কাটত। বাকি সময় জমিদারির কাগজ-পত্র দেখত। মেজোভাই-এর যেমন বুদ্ধি তেমনি বিচার করবার ক্ষমতা। যেখানেই কোনো গন্ডগোল হত, কোনো কিছু নিয়ে বিবাদ বিসংবাদ হত মেজোভাই-এর ডাক পড়ত। তাছাড়া, জমিদার বাড়িতে যত লোকজন আসত, কোথাও কোনো অসুবিধা হলে তা দেখাশুনার দায়িত্ব ছিল তার। সেজোভাই জমিদারির সব গোরু-ছাগল-ভেড়া-হাঁস দেখাশুনা করত। এ কাজে তার মতো দক্ষ কেউ ছিল না। ছোটোভাই জমিজমার কাজে খুব পটু। সে-ই জমিজমা, চাষবাস দেখাশুনা করত।

বড়ো আর মেজোভাই সকালে কয়েকঘণ্টা কাজ করেই সারাদিন বাড়িতে বসে থাকত। দুপুরে তারা আরাম করে ঘুমাত, নয়তো পড়াশুনা করত। ভালো ভালো জামাকাপড় পরত। বিকেল হলেই বেড়াতে বেরোত। ছোটো দুই ভাই ভোর হতে না হতেই মাঠে চলে যেত। সারাদিন রোদ-জল-ঝড়ে কাজ করে সন্ধেবেলায় বাড়ি ফিরত। ভালো কাপড় পরার সময়ই পেত না।

তাই নিয়ে চার ভাই কিছু মনে করত না। যে-যার মতো নিজের কাজ করত। ছোটো দুই ভাই-এর বউদের মন খারাপ হয়ে যেত। দুই ভাই বাড়ি ফিরলেই তারা বলত, ‘তোমরা সারাদিন এত পরিশ্রম করো, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করো আর বড়ো ভাইরা কিছুই করে না, খায় দায় আর পড়ে পড়ে ঘুমায়।’

প্রথম প্রথম দুই ভাই বউদের কথায় কান দিত না। কিছুদিন পর তাদের মনে হল বউরা ঠিক কথাই বলেছে। আমরা খেটে খেটে জমিদারির আয় বাড়াচ্ছি, বড়োভাইরা কিছুই করছে না, আমরা যদি কাজ না করি, তাহলে বড়োভাইদের খাবার জুটবে না। তারা গিয়ে বলল, ‘দাদা, আমাদের সব সম্পত্তি ভাগ করে দাও আমরা সবাই আলাদা থাকব, যে-যার সম্পত্তি দেখাশুনা করব।’

বড়ো দুই ভাই তাদের অনেক বোঝাল। একসঙ্গে থাকলে কেউ আমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, আমরা অনেক আয় বাড়াতে পারব।

ছোটো দুইভাই তাদের কোনো কথাই শুনল না। তখন বড়োভাই বলল, ‘বাবা বলেছিলেন আমাদের মধ্যে কোনো সমস্যা হলে মেসোর কাছে যেতে, সম্পত্তি ভাগ করবার আগে চল তার কাছে যাই, তিনি যা পরামর্শ দেবেন, যদি সবার মনোমতো হয় তাহলে সেইমতো কাজ করব না হলে সম্পত্তি ভাগ করে নেব।’

আর তিন ভাই বড়োভাই-এর কথায় রাজি হয়ে গেল।

মেসো খুব পন্ডিত লোক। চার ভাই একসঙ্গে তাঁর বাড়ি আসতেই তিনি সবকিছু অনুমান করতে পারলেন, কিন্তু কিছু না বলে তাদের খুব খাতির যত্ন করে ঘরে নিয়ে গেলেন। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করতেই ছোটোভাই বলল, ‘মেসো, আমরা আমাদের সম্পত্তি ভাগ করতে চাই। আপনি সবকিছু ভাগ করে দিন।’

মেসো বললেন, ‘তোমরা কেন সম্পত্তি ভাগ করতে চাইছ?’

ছোটো দুইভাই তখন সব কথা বলতেই মেসো বললেন, ‘ঠিক আছে আমি তোমাদের সম্পত্তি ভাগ করে দেব, তার আগে আমার ইচ্ছে তোমাদের চার ভাই আর চার বউকে নিয়ে কয়েকদিনের জন্যে তীর্থে ঘুরে আসি।’ চার ভাই মেসোর কথায় রাজি হয়ে গেল। পরদিনই তারা জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

একমাস ধরে নানান তীর্থে ঘুরে তারা বাড়ি ফেরার পথ ধরল। কিছুদূর আসতেই হঠাৎ তাদের খেয়াল হল, টাকার থলিটা কোথায় হারিয়ে গিয়েছে। কারও কাছেই আর কোনো টাকা নেই। সবাই মহাভাবনায় পড়ে গেল। গ্রাম এখনও বেশ কয়েকদিনের পথ। কি খাবে? কোথায় রাত কাটাবে? মেয়েদের মধ্যে কান্নাকাটি শুরু হয়ে গেল।

মেসো তাদের শান্ত করে বললেন, ‘যা হবার তা হয়েছে। সেনিয়ে তো মন খারাপ করে কোনো লাভ নেই, তার চেয়ে তোমরা চেষ্টা করে দ্যাখো কোথাও যদি কিছু খাবার পাওয়া যায়। আমি এখানে মেয়েদের দেখছি।’

চার ভাই মেসোর কথা শুনে চারদিকে বেরিয়ে পড়ল। ছোটোভাই গেল দক্ষিণদিকে। কিছু দূর যেতেই দেখতে পেল একজন চাষি লাঙল নিয়ে মাঠে চাষ করছে। এত শক্ত মাটি যে কিছুতেই মাটি খুঁড়তে পারছে না।

ছোটোভাই একটুখানি দাঁড়াতেই বুঝতে পারল, চাষি ভালো কাজ জানে না। সেএগিয়ে গিয়ে বলল, ‘আমি এক ঘণ্টায় তোমার জমি খুঁড়ে দেব।’

চাষি বলল, ‘তাহলে আমার খুব উপকার হয়। আমি দু-দিন ধরে চেষ্টা করেও মাটি খুঁড়তে পারিনি।’

ছোটোভাই বলল, ‘আমাকে পাঁচ সের চাল আর দু-দিনের খাওয়ার মতো তরকারি দিতে হবে।’

চাষি তার কথায় রাজি হয়ে গেল। ছোটোভাই তখন সেখানে চাষ করে চাল আর সবজি নিয়ে মেসোর কাছে ফিরে গেল।

ওদিকে তার পরের ভাই গেল পূর্ব দিকে। কিছু দূরে এক জায়গায় অনেক লোকের ভিড় দেখে সেইদিকে এগিয়ে গেল।

এক চাষির দুধের গোরু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কেউ কিছুই করতে পারছে না। চাষি হাউ হাউ করে কাঁদছে। সেজোভাই কাছে গিয়ে সব দেখল। পশুপাখি সম্বন্ধে তার এত জ্ঞান ছিল যে, এক পলক দেখেই বুঝতে পারল গোরুর কি হয়েছে। সেবলল, ‘আমি তোমাদের গোরুর অসুখ সারিয়ে দিতে পারব।’

চাষি তাড়াতাড়ি এসে তার হাত ধরে বলল, ‘তুমি যদি আমার গোরুর অসুখ সারিয়ে দিতে পার তবে আমি তোমাকে পাঁচ টাকা দেব।’

সেজোভাই তখন কাজ শুরু করে দিল। ওষুধ তৈরি করে খাইয়ে দিতেই অল্পক্ষণের মধ্যে গোরু সুস্থ হয়ে উঠল। চাষি খুশি হয়ে তাকে পাঁচ টাকা আর একসের দুধ দিল।

সেজোভাই তখন তিন টাকার খাবার কিনে মহানন্দে নিজের জায়গায় ফিরে গেল।

ওদিকে মেজভাই উত্তরদিকে হাঁটতে আরম্ভ করল। বেশ কিছুক্ষণ হাঁটবার পর এক গ্রামে এসে পৌঁছাল। সেই গ্রামের জমিদার কয়েকদিন আগে মারা গিয়েছেন। জমিদারের চার ছেলে, কোনোদিনই তাদের মধ্যে সদ্ভাব ছিল না। জমিদার মারা যেতেই সব সম্পত্তি ভাগ করে যে-যার মতো আলাদা হয়ে গেল।

বড়ো তিন ভাই যেমন চতুর তেমনি ধূর্ত। ছোটোভাই সরল সাদাসিদে, তার ভাগ্যেই সবচেয়ে কম সম্পত্তি পড়ল। ছোটোছেলে তাই নিয়েই সন্তুষ্ট। গন্ডগোল বেঁধেছিল একটা বেড়ালকে নিয়ে। চার জনেই বলে, ‘বেড়াল আমার।’ শেষে গাঁয়ের মোড়লের মধ্যস্থতায় ঠিক হল বেড়াল চার জনেরই সম্পত্তি। তখন থেকে বেড়াল খুশিমতো চার জনের বাড়িতে ঘুরে বেড়াত, খাওয়া দাওয়া করত।

একদিন ছোটোছেলের বাড়ির দরজায় চাপা পড়ে বেড়ালের পা গেল মচকে। আর তিন ভাই ছোটোভাইকে বলল, ‘তোর বাড়িতে যখন বেড়ালের পা ভেঙেছে তখন ভাঙা পায়ের দায়িত্ব তোর।’

ছোটোছেলে কী আর করে? বেড়ালের ভাঙা পায়ে ওষুধ লাগিয়ে কাপড় জড়িয়ে দিল। তাই নিয়েই বেড়াল ঘুরতে লাগল।

পাশের বাড়িতে সেদিন মাছ রান্না হচ্ছিল। মাছের গন্ধ পেয়ে বেড়াল জানলা দিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। জানালার গরাদে লেগে বেড়ালের পায়ের কাপড় খুলে গেল। ঘরের এক কোনে উনুন জ্বলছিল। সেই কাপড়ের আধখানা গিয়ে পড়ল উনুনের মধ্যে। আগুনে পড়তেই দাউ দাউ করে কাপড় জ্বলে উঠল। ভয় পেয়ে বেড়াল ছোটাছুটি শুরু করে দিল। দেখতে দেখতে সারা ঘরময় আগুন ছড়িয়ে পড়ল। লোকজন এসে যখন আগুন নেভাল, তখন বাড়ির অর্ধেক জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে।

বাড়ির মালিক গিয়ে জমিদারের চার ছেলেকে বলল, ‘তোমাদের বেড়াল আমার বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে, তোমরা আমায় ক্ষতিপূরণ দাও।’

বড়ো তিন ভাই বলল, ‘ছোটোভাই বেড়ালের ভাঙা পায়ে কাপড় জড়িয়ে দিয়েছিল, সেই কাপড় পুড়ে আগুন লেগেছে।’ ভাঙা পায়ের দায়িত্ব যখন ছোটোভাই-এর, সেই তোমার পুড়ে যাওয়া বাড়ির ক্ষতিপূরণ করবে।

গাঁয়ের লোকেরা তিন ভাই-এর কথা মেনে নিল। ছোটোছেলের তো মহাবিপদ, একা একা কেমন করে এত টাকার ক্ষতিপূরণ করবে। পথের ধারে এক গাছতলায় বসে ভাবতে থাকে।

সেই সময় সেইখান দিয়ে যাচ্ছিল মেজোভাই। ছোটোছেলের মুখের দিকে চোখ পড়তেই দাঁড়িয়ে পড়ল তারপর তার কাছে এসে বলল, ‘তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে তুমি খুব বিপদে পড়েছ?’

ছোটোছেলে তার দিকে চেয়ে বলল, ‘তুমি ঠিকই ধরেছ ভাই আমার খুব বিপদ, এখন যে কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না।’

মেজো ভাই বলল, ‘তুমি আমাকে সব কিছু বলো। আমি হয়তো তোমার কোনো উপকার করতে পারি।’

ছোটোছেলে তখন সব ঘটনা বলল। মেজোভাই খানিকক্ষণ চিন্তা করে বলল, ‘আমি তোমাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারি, তুমি তার বিনিময়ে আমাকে কী দেবে?’

‘আমি তোমাকে পাঁচশো টাকা দেব।’

‘তাহলে গাঁয়ে গিয়ে সব লোককে এক জায়গায় জড়ো করো। আমি সেখানে গিয়ে বিচার করব।’

ছোটোছেলে তক্ষুনি গিয়ে সারা গাঁয়ের লোককে মোড়লের বাড়িতে ডেকে নিয়ে গেল। খানিক পরেই মেজোভাই সেখানে গিয়ে হাজির। তার সুন্দর চেহারা, দামি সাজপোশাক দেখে সবাই বলল, ‘আমরা একটা সমস্যায় পড়েছি, আপনি তার মীমাংসা করে দিন।’

মেজোভাই সবকিছু শুনে গম্ভীরভাবে বলল, ‘জমিদারবাবুর বড়ো তিন ছেলে বলছে বেড়ালের ভাঙা পায়ের জন্যেই বাড়িতে আগুন লেগেছে আর ভাঙা পায়ের দায়িত্ব ছিল ছোটোছেলের।’

সবাই মাথা নেড়ে বলল, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন।’

মেজোভাই কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে গ্রামের লোকেদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আচ্ছা তোমাদের যখন পা ভাঙে তখন কি তোমরা সেই পায়ে হাঁটা চলা করতে পারো?’

সবাই বলল, ‘আমরা তখন হাঁটতেই পারি না।’

‘তাহলে বেড়াল কোন পায়ে ছোটোছেলের বাড়ি থেকে পাশের বাড়ির রান্না ঘরে ঢুকল? আগুন লাগার পর কোন পায়ে ছোটোছুটি করে সারা বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিল?’

সবাই চেঁচিয়ে বলল, ‘ভালো তিন পায়ে।’

‘বেড়াল যদি ভালো তিন পায়ে ছোটাছুটি করে পরের বাড়িতে আগুন লাগায় তাহলে কে সেই আগুন লাগার ক্ষতিপূরণ দেবে?’

সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল, ‘ভালো তিন পায়ের মালিক বড়ো তিন ছেলে।’

গাঁয়ের মোড়ল তখন আদেশ দিল বড়ো তিন জন প্রতিবেশীর বাড়ি আগুনে পুড়ে যা ক্ষতি হয়েছে সব ক্ষতিপূরণ দেবে। ছোটোছেলেকে কোনো ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না।

ছোটোছেলে তখন আনন্দে মেজোভাইকে জড়িয়ে ধরল। তার কাছ থেকে পাঁচশো টাকা নিয়ে মেজোভাই চলল ভাইদের কাছে।

তিন ভাই তো গিয়েছিল তিনদিকে। বড়োভাই গেল পশ্চিমদিকে। সারা সকাল পথ চলে দুপুর বেলায় বড়োভাই এসে পড়ল এক নগরে। অনেকক্ষণ পথ চলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। সামনে মস্ত বড়ো একটা বাড়ি দেখে তার বারান্দায় বসে পড়ল।

খানিকক্ষণ বসার পর তার কানে এল কেউ ভেতরে হা-হুতাশ করছে আর বলছে ‘কাল এই বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে তখন কোথায় থাকব, কী করব কে জানে?’

সেই কথা শুনে বড়োভাই-এর কৌতূহল হল। সেই সময় ঘর থেকে একজনকে বাইরে আসতে দেখে জিজ্ঞেস করল, ‘এ বাড়িতে মনে হচ্ছে কোনো বিপদ হয়েছে?’

লোকটা ছিল বাড়ির চাকর, সেবড়োভাই-এর সুন্দর চেহারা দেখে বলল, ‘হ্যাঁ বাবু এটা মন্ত্রীমশাইয়ের বাড়ি। রাজা মন্ত্রীমশাইকে হুকুম দিয়েছেন তিন দিনের মধ্যে তার পোষা হাতির ওজন বের করতে হবে। না হলে তার মন্ত্রীত্ব থাকবে না। আজই শেষদিন, এখনও মন্ত্রীমশাই হাতির ওজন জানতে পারেননি।’

বড়োভাই খানিক ভেবে চাকরকে বললে, ‘তুমি মন্ত্রীকে গিয়ে বলো আমি রাজার হাতির ওজন বলে দেব।’

চাকর গিয়ে মন্ত্রীকে খবর দিতেই মন্ত্রী ছুটতে ছুটতে বাইরে এসে বড়োভাইকে বলল, ‘তুমি যদি আমাকে রাজার হাতির ওজন বলে দিতে পারো তবে তোমাকে পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার দেব।’

বড়োভাই মন্ত্রীকে বলল, ‘আপনি একটা বড়ো নৌকা জোগাড় করুন।’

মন্ত্রীর বাড়ির কাছে ছিল নদী। সেখানে অনেক নৌকা দাঁড়িয়েছিল। তার মধ্যে একটা নৌকা পছন্দ করা হল। তারপর বড়োভাই মন্ত্রীকে বলল, ‘এবার আপনি রাজার হাতি নিয়ে আসুন।’

হাতি আসতেই তাকে নৌকায় চাপানো হল। হাতির ভারে নৌকা নদী-জলের অনেকখানি ডুবে গেল। যতখানি ডুবল নৌকার সেইখানে একটা দাগ দেওয়া হল। তারপর হাতিকে নৌকা থেকে নামিয়ে এনে নৌকার মধ্যে লোহার ওজন চাপাতে আরম্ভ করল। যতই ওজন চাপানো হয়, নৌকা ততই ডুবতে থাকে। ডুবতে ডুবতে যেই না সেই দাগের জায়গায় এল তখনই ওজন চাপানো বন্ধ করা হল।

বড়োভাই মন্ত্রীকে বলল, ‘এবার আপনি সব ওজন গুনে নিন যা হবে তাই হচ্ছে হাতির ওজন।’

গুনে দেখা গেল, হাতির ওজন একশো মন। মন্ত্রী তক্ষুনি রাজার কাছে গেল খবর দিতে। রাজাকে গিয়ে বলতেই রাজা খুশি হয়ে মন্ত্রীকে অনেক উপহার দিলেন।

মন্ত্রী সব উপহার নিয়ে এসে বড়োভাইকে বলল, ‘তুমি হাতির ওজন বের করে আমাকে মহাবিপদ থেকে বঁাচিয়েছ, এই সব উপহার তুমিই নাও। এর দাম পাঁচ হাজার টাকার অনেক বেশি।’

বড়োভাই সব উপহার পোঁটলায় বেঁধে ভাইদের কাছে ফিরে গেল। চার ভাই এক জায়গায় আসতেই সবার তখন সেকি আনন্দ। একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করে চারজনে বলতে লাগল, কে কেমন করে টাকা আয় করেছে। কেউ কিছুই গোপন করল না।

চার ভাই-এর কথা শেষ হতেই মেসো বললেন, ‘তোমরা চারজনের প্রত্যেকেই কিছু-না-কিছু আয় করেছ। যার যেমন সামর্থ্য সেতেমনি আয় করেছ। এ নিয়ে একে অপরকে হিংসে করে কোনো লাভ নেই। এখন যে যেমন আয় করলে সম্পত্তি ভাগ হলেও তোমরা এই রকমই আয় করবে। তাতে কারোরই কোনো লাভ হবে না, ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি।’

ছোটো দুই ভাই আর তাদের বউরা বুঝতে পারল বড়োভাইরা তাদের বুদ্ধি আর যোগ্যতার জন্যেই আরাম করে থাকে। কম পরিশ্রম করে। ভালো ভালো জামা কাপড় পরে। তাদের মন থেকে সব রাগ দূর হয়ে গেল। নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে বলল, ‘আমরা আমাদের সম্পত্তি ভাগ করতে চাই না। চারজনে একসঙ্গে থাকব।’

বড়োভাইরা তাদের বুকে জড়িয়ে ধরল।

তারপর থেকে চার ভাই একসঙ্গে সুখে স্বচ্ছন্দে বাস করতে লাগল।

সকল অধ্যায়
১.
ওঝা ও পাহাড়ি ভূত
২.
দুই সূর্য
৩.
মহিষ ও রাখালছেলে
৪.
তিন বন্ধু
৫.
বাঘ মামার কথা
৬.
কুঁজো আর অন্ধ
৭.
দেবতার অভিশাপ
৮.
সাতবোকা
৯.
বাহাদুর আর এক-পা-ওলা দৈত্য
১০.
সাধু ও মহাজন
১১.
চালাক ভোলানাথ
১২.
বামুন আর শেয়াল
১৩.
আকাশপুরীর রাজকন্যা
১৪.
অতি চালাকের গলায় দড়ি
১৫.
তিন জামাই
১৬.
শেয়ালবউ-এর বুদ্ধি
১৭.
শেয়াল আর বোকা বাঘ
১৮.
বুদ্ধিমান চোর
১৯.
শুয়োরের শিং
২০.
রাখালছেলে ও পরির দেশের রাজকন্যা
২১.
তাঁতির কুঁজ
২২.
চার চোর
২৩.
কাঠুরে নাপিত আর রাজকন্যা
২৪.
মহেশ্বর
২৫.
আয়না
২৬.
শেয়াল ও বুড়োবুড়ি
২৭.
এক দাঁত ফোকলা
২৮.
বুদ্ধি থাকলেই উপায় হয়
২৯.
ভীম আর জলদৈত্য
৩০.
চার ভাই
৩১.
সুরের জাদু
৩২.
ভূত ও ভূতনাথ
৩৩.
রসিক রাজু

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%