শেয়াল আর বোকা বাঘ

চঞ্চলকুমার ঘোষ

শেয়ালবউ বাঘকে ফাঁকি দিয়ে ওষুধ নিয়ে এল তারপর শেয়ালের পায়ে ওষুধ বেঁধে দিতেই কয়েকদিনের মধ্যে শেয়ালের পা ভালো হয়ে গেল। শেয়াল বলল, ‘অনেকদিন ঘরে বসে আছি এবার একটু বেরোব।’

শেয়ালবউ বলল, ‘সাবধানে যেও, বাঘ আমাদের ওপর খুব রেগে আছে।’

শেয়াল বলল, ‘গিন্নি, তোমার কোনো চিন্তা নেই। বাঘ আমার কিচ্ছু করতে পারবে না।’

শেয়াল বেরিয়ে পড়ল শিকারে। খানিক পথ যেতেই পা-টা টনটন করে উঠল। একটু বিশ্রাম নিয়ে শেয়াল আবার হাঁটতে শুরু করে দিল। কয়েক পা যেতেই চোখে পড়ল ঝোপের আড়ালে একটা খরগোশ বসে আছে। গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে লাফ মারল শেয়াল। সঙ্গে সঙ্গে পা এমন টনটন করে উঠল সোজা হড়কে গিয়ে পড়ল এক গর্তে। আর এক ছুটে পালিয়ে গেল খরগোশ।

গর্তের মধ্যে পড়ে যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠল শেয়াল। দু-হাতে পা চেপে ধরে বসে রইল মাটিতে। কিছুক্ষণ পরে যন্ত্রণা কমতেই মাথা তুলে তাকাল শেয়াল। দেখল চারপাশে উঁচু দেয়াল। কত চেষ্টা করল বেরোতে, কিছুতেই আর গর্তের বাইরে আসতে পারল না।

ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল শেয়ালের। ভাবল আর বোধহয় কোনোদিন এই গর্ত থেকে বেরোতে পারব না। বউ-ছেলে-মেয়েকেও দেখতে পাব না। এখানেই মরতে হবে। হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে দিল শেয়াল।

সেই সময় গর্তের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল বাঘ যাকে শেয়ালবউ ঠকিয়েছিল। যেতে যেতে গর্তের ভেতর থেকে শেয়ালের কান্না শুনে দাঁড়িয়ে পড়ল। গর্তের ধারে এসে বলল, ‘ভেতরে কে কান্নাকাটি করছে?’

শেয়াল মুখ তুলে দেখল বাঘ ওপর থেকে উঁকি মারছে। সঙ্গে সঙ্গে মনে একটা ফন্দি আঁটল। কান্না না থামিয়ে আরও জোরে কেঁদে উঠল শেয়াল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘তোমাদের কথা ভেবেই আমি কাঁদছি মামা।’

বাঘ অবাক হয়ে বলল, ‘আমাদের জন্য কেন কাঁদছিস ভাগনে?’

শেয়াল বলল, ‘কেন তুমি শোনোনি, কাল রাজামশাই-এর ছেলের জন্মদিন। আজ রাজামশাই লোকজন নিয়ে জঙ্গলের সব বাঘ ধরতে আসবেন। এবার বাঘের মাংস রান্না করে লোকদের খাওয়ানো হবে।’

বাঘ বলল, ‘এমন খবর তো আমি শুনিনি ভাগনে, তুই কোথা থেকে শুনলি?’

শেয়াল নীচে থেকে বলল, ‘কাল রাজবাড়ির পেছনে খাবার চুরি করতে গিয়েছিলাম সেখানেই শুনলাম।’

বাঘ বলল, ‘তাহলে কী হবে ভাগনে?’

শেয়াল একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘একটা উপায় আছে মামা কিন্তু তুমি কী তা পারবে?’

সঙ্গে সঙ্গে বাঘ বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ ভাগনে পারব। তুই শুধু বল কী করতে হবে?’

শেয়াল বলল, ‘তুমি এই গর্তের মধ্যে লুকিয়ে থাকো, একটু পরেই যখন রাজার লোকেরা আসবে তখন কেউ আর তোমাকে দেখতে পাবে না। আমি সামনে থাকব।’

বাঘ বলল, ‘সেই ভালো।’

শেয়াল বলল, ‘তবে নেমে এসো মামা।’

বাঘ একলাফ দিয়ে গর্তে নেমে এল। একপলক চারদিকে দেখে নিয়ে বলল, ‘আর কোনো ভয় নেই তো ভাগনে?’

শেয়াল বলল, ‘আমি যতক্ষণ আছি তোমার কোনো চিন্তা নেই।’

এমন সময়ে উপরে কিছুর আওয়াজ হতেই শেয়াল বলল, ‘ওই বোধহয় রাজার লোকেরা এসে পড়ল।’

ভয়েতে বাঘের মুখে আর কোনো কথা নেই। শেয়াল বলল, ‘মামা, উপরে উঠে একটু দেখবে নাকি রাজার লোকেরা এসে পড়ল কি না?’

সঙ্গে সঙ্গে বাঘ বলে উঠল, ‘না না ভাগনে আমি উপরে উঠছি না, উপরে উঠি আর রাজার লোকেরা আমায় দেখতে পাক আর কী!’

শেয়াল বলল, ‘তবে আমি একটু দেখি মামা?’

বাঘ বলল, ‘যদি মরতে চাস তবে দ্যাখ।’

শেয়াল বলল, ‘না না মামা, আমি একটু উঁকি মেরেই নেমে আসব। তুমি মাঝখানে দাঁড়াও আমি তোমার পিঠের ওপর একটু উঠি।’

বাঘ গর্তের মাঝখানে দাঁড়াতেই শেয়াল তার পিঠের ওপর উঠে মারল মস্ত এক লাফ আর সোজা এসে পড়ল গর্তের ওপর। গর্তের ভেতর থেকে বাঘ বলল, ‘ভাগনে, রাজার লোকেরা কি এসে পড়েছে?’

ওপর থেকে শেয়াল বলল, ‘না না মামা, এখনো আসেনি তবে এসে পড়বে পড়বে করছে। তুমি চুপচাপ ভেতরে বসে থাকো।’

এই বলে শেয়াল খোঁড়াতে খোঁড়াতে ফিরে চলল বাড়ির দিকে।

সকল অধ্যায়
১.
ওঝা ও পাহাড়ি ভূত
২.
দুই সূর্য
৩.
মহিষ ও রাখালছেলে
৪.
তিন বন্ধু
৫.
বাঘ মামার কথা
৬.
কুঁজো আর অন্ধ
৭.
দেবতার অভিশাপ
৮.
সাতবোকা
৯.
বাহাদুর আর এক-পা-ওলা দৈত্য
১০.
সাধু ও মহাজন
১১.
চালাক ভোলানাথ
১২.
বামুন আর শেয়াল
১৩.
আকাশপুরীর রাজকন্যা
১৪.
অতি চালাকের গলায় দড়ি
১৫.
তিন জামাই
১৬.
শেয়ালবউ-এর বুদ্ধি
১৭.
শেয়াল আর বোকা বাঘ
১৮.
বুদ্ধিমান চোর
১৯.
শুয়োরের শিং
২০.
রাখালছেলে ও পরির দেশের রাজকন্যা
২১.
তাঁতির কুঁজ
২২.
চার চোর
২৩.
কাঠুরে নাপিত আর রাজকন্যা
২৪.
মহেশ্বর
২৫.
আয়না
২৬.
শেয়াল ও বুড়োবুড়ি
২৭.
এক দাঁত ফোকলা
২৮.
বুদ্ধি থাকলেই উপায় হয়
২৯.
ভীম আর জলদৈত্য
৩০.
চার ভাই
৩১.
সুরের জাদু
৩২.
ভূত ও ভূতনাথ
৩৩.
রসিক রাজু

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%