চঞ্চলকুমার ঘোষ
এক গাঁয়ে থাকত এক চাষি, তার বউ আর তাদের ছেলে ভীম। বড়োই অভাবের সংসার। পর পর দু-বছর বৃষ্টি হয় না। চাষ আবাদ বন্ধ। কারও ঘরেই খাবার নেই। একদিন চাষি তার বউকে বলল, ‘দ্যাখো এই গাঁয়ে থাকলে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে। চল আমরা অন্য কোথাও চলে যাই।’
গ্রাম ছেড়ে যেতে চাষিবউ-এর মন চাইছিল না। কী আর করে? ঘরে সামান্য যেটুকু খাবার ছিল তাই নিয়ে তিন জনে বেরিয়ে পড়ল। গ্রাম ছাড়িয়ে তারা চলেছে তো চলেছেই। অনেক পথ পার হয়ে তারা এসে পড়ল বিরাট এক জঙ্গলের মধ্যে। সকলেই ক্লান্ত। তেষ্টায় গলা শুকিয়ে গিয়েছে। চাষি বলল, ‘তোমরা এখানে বসো, আমি দেখছি কাছে কোথাও জল পাওয়া যায় কিনা?’
চাষি ঘটি নিয়ে জলের খোঁজে গেল। কিছুদূর যেতেই দেখতে পেল মস্ত বড়ো একটা পুকুর, টলটল করছে জল। জল দেখে চাষির স্নান করতে ইচ্ছে হল। গায়ের কাপড় আর ঘটিটা পাড়ে রেখে জলে নামল।
সেই পুকুরে থাকত এক জলদৈত্য। তার ভয়ে পশুপাখি জন্তু-জানোয়ার জঙ্গলের লোকজন কেউ সেই পুকুরে নামত না। চাষি সেকথা জানে না। জলে নামতেই জলদৈত্য চাষিকে মেরে ফেলল।
ওদিকে চাষিবউ তার ছেলেকে নিয়ে বসে আছে। অনেকক্ষণ কেটে গেল। চাষি আর আসে না। শেষে চাষিবউ ছেলেকে নিয়ে চলল চাষিকে খুঁজতে। জঙ্গলের মধ্যে সরু পায়ে চলা পথ। পথের ধারে বসেছিল এক সাধু। তাকে দেখে চাষিবউ বলল, ‘এখান দিয়ে কাউকে যেতে দেখেছ?’
সাধু বলল, ‘না মা, আমি তো কাউকে দেখিনি। কিন্তু এই জঙ্গলের মধ্যে তুমি কাকে খুঁজছ?’
চাষিবউ সব কথা বলতেই সাধু বলল, কাছেই একটা ভয়ংকর পুকুর আছে চলোতো সেখানে গিয়ে খুঁজে দেখি।
পুকুরপাড়ে চাষির কাপড় আর ঘটিটা পড়েছিল। সাধু বলল, ‘সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে মা। পুকুরের জলদৈত্য নিশ্চয়ই চাষিকে মেরে ফেলেছে নইলে ঘটি আর কাপড় রেখে কোথায় যাবে চাষি?’
চাষিকে হারিয়ে চাষিবউ-এর সেকী কান্না। সাধু তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, ‘কেঁদে কী হবে মা, তুমি আমার সঙ্গে চলো, কিছু দূরেই একটা গ্রাম আছে তুমি সেখানে থাকবে।’
গ্রামের জমিদার খুব ভালো লোক। সাধুর কথায় চাষিবউ আর ভীমকে গ্রামে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। চাষিবউ সাধুকে প্রণাম করে বলল, ‘সাধুবাবা, আপনি আশীর্বাদ করে যান, কেউ যেন আমার ছেলের কোনো ক্ষতি করতে না পারে।’
সাধু ঝোলা থেকে একটা শিকড় বের করে চাষিবউকে দিয়ে বলল, ‘এটা বেটে তোমার ছেলেকে খাইয়ে দেবে, তাহলে কেউ আর তোমার ছেলের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।’
সাধুর কথামতো শিকড় বেটে ছেলেকে খাইয়ে দিল চাষিবউ। তারপর যতদিন যায় ভীম-এর শক্তি ততই বাড়তে থাকে। বড়ো বড়ো লোকেরাও তার সঙ্গে কুস্তি লড়তে পারে না।
একদিন বন্ধুদের সঙ্গে খেলা করছিল ভীম। একজন বলল, ‘আমাদের সবার বাবা আছে, তোর বাবা কোথায়?’
ভীম কিছু বলতে পারল না। সবাই তার বাবাকে নিয়ে ঠাট্টা করতে শুরু করে দিল। বাড়িতে ফিরে মাকে জিজ্ঞেস করল। তার মা-ও কিছু বলল না। শুধু বলল, ‘আগে বড়ো হ বাবা, তারপর সব বলব।’
ভীম শুধু ভাবে কবে বড়ো হব। দেখতে দেখতে আরও কয়েক বছর কেটে গেল। ভীম-এর যে কী শক্তি আর সাহস যে দ্যাখে সে-ই অবাক হয়ে যায়। তবুও ভীম-এর মনের দুঃখ দূর হয় না। সব সময় বাবার কথা ভাবে।
সেদিন গ্রামের উৎসব। গ্রামের সব ছেলেমেয়েরা সেখানে জড়ো হয়েছে। ভীম-এর বাবা নেই বলে কেউ তাকে ডাকেনি। ভীম মা-র কাছে এসে বলল, ‘মা, আজ তোমাকে বলতেই হবে আমার বাবা কোথায় গিয়েছে।’
ভীম-এর মা কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘তুই যখন ছোটো ছিলি, এক জলদৈত্য তোর বাবাকে মেরে ফেলেছে।’
ভীম রাগে চিৎকার করে উঠল, ‘আমি এখনি যাব মা। জঙ্গলে গিয়ে সেই জলদৈত্যকে মেরে বাবাকে মারার প্রতিশোধ নেব।’
মা ভীমকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘না বাবা তুই সেখানে যাস না। সেই জলদৈত্য বড়ো ভয়ংকর, তুই তার সঙ্গে লড়াই করতে পারবি না।’
ভীম বলল, ‘তুমি কোনো চিন্তা করো না মা। সেই জলদৈত্য আমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।’
মাকে শান্ত করে ভীম রওনা হল জঙ্গলের দিকে। সঙ্গে নিল মোটা একগাছা দড়ি। যেতে যেতে দ্যাখে পথের ধারে একটা ছাগল ঘুরে বেড়াচ্ছে। কী মনে হল ভীম-এর ছাগলটাকে কাঁধে তুলে নিল। জঙ্গলের মধ্যে বিরাট পুকুর। চারদিক শান্ত, কোথাও কোনো মানুষজন নেই। শুধু বিরাট একটা বাক্স পুকুর পাড়ে পড়ে রয়েছে। কোনো লোক বাক্স রেখে জলে নেমেছিল, দৈত্য তাকে মেরে ফেলেছে। ভীম বুঝতে পারল, জলে নেমে জলদৈত্যের সঙ্গে লড়াই করা যাবে না। পুকুর পাড়ে ছাগলটাকে বেঁধে গাছের আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল।
এদিকে জলের মধ্যে ঘুমিয়ে ছিল জলদৈত্য। ছাগলের ডাক কানে যেতেই ঘুম ভেঙে গেল। ভাবল কোনো ছাগল জল খেতে এসেছে। পুকুরের পাড়ে গিয়ে ঘাপটি মেরে বসে রইল। অনেকক্ষণ কেটে গেল। ছাগল আর জলে নামে না। ভীষণ রেগে গেল জলদৈত্য। ছাগল না-নামলে আমিই ওকে টেনে নামাব। জল ছেড়ে ডাঙায় উঠে এল জলদৈত্য। ছাগলের দড়িতে হাত দিতেই ছাগল এক ঢুঁ মারল জলদৈত্যের পেটে। জলেই জলদৈত্যের যত শক্তি। ডাঙায় উঠলেই সব শক্তি হারিয়ে ফেলে। ছাগলের গুঁতো খেয়ে মাটিতে পড়ে যেতেই গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল ভীম। এক লাফে ঝাঁপিয়ে পড়ল জলদৈত্যের ওপর।
ভীম-এর হাত ছাড়িয়ে পালাবার জন্যে ছটফট করতে লাগল জলদৈত্য। সব শক্তি দিয়ে তাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলল ভীম। প্রাণভয়ে জলদৈত্য তখন কান্না জুড়ে দিল, ‘আমাকে ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও।’
ভীম বলল, ‘তুই আমার বাবাকে মেরেছিস। গ্রামে গিয়ে সব লোকের সামনে তোকে শূলে চড়াব।’
প্রাণের ভয়ে জলদৈত্য কাঁদতেই থাকে। ভীম-এর মন টলল না। তাকে বাক্সে পুরে কাঁধে নিয়ে বাড়ি চলল। বাড়িতে ভীম-এর মা ছিল না। মন্দিরে গিয়েছিল পুজো দিতে। ভীম বাক্সটা ঘরের এক কোনে রেখে পুকুরে গেল স্নান করতে। ভাবল বিকেলবেলায় গ্রামের সব লোক জড়ো করে বাক্স খুলব।
ভীম চলে যাওয়ার খানিক পরেই তার মা মন্দির থেকে পুজো দিয়ে ফিরল। ঘরের কোনে বাক্সটা দেখে ভাবল এখানে এই বাক্সটা কে নিয়ে এল। তাড়াতাড়ি গিয়ে বাক্স খুলতেই চমকে উঠল। ভেতরে হাত পা বঁাধা জলদৈত্য।
চাষিবউকে দেখেই জলদৈত্যের মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। সেবলল, ‘আমাকে চিনতে পারছ চাষিবউ?’
জলদৈত্যের কথা শুনে চাষিবউ তো অবাক! বলল, কে তুমি?
জলদৈত্য বলল, ‘আমি চাষি, পুকুরে নেমেছিলাম বলে পুকুরের জলদৈত্য আমাকে এই রকম করে দিয়েছে। তোমার ছেলে আমাকে চেনে না, তাই মারবে বলে বেঁধে নিয়ে এসেছে।’
চাষিবউ জলদৈত্যের কথা বিশ্বাস করল। সেবলল, ‘আমি ভীমকে বলব, তাহলে সেতোমাকে মারবে না।’
ভীম-এর নাম শুনেই ভয় পেয়ে গেল জলদৈত্য। তাড়াতাড়ি বলল, ‘না না ভীমকে কিছু বলো না। সেতোমার কথা বিশ্বাস করবে না।’
চাষিবউ কেঁদে ফেলল, ‘তবে কী হবে?’
জলদৈত্য ভাবল ভীমকে যদি মেরে ফেলা যায় তবে চাষিবউকে মিথ্যে কথা বলে পালিয়ে যেতে পারবে। সেকিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘তুমি যদি একটা কাজ করতে পারো, তবে আমি আবার আগের রূপ ফিরে পাব।’
চাষিবউ বলল, ‘কী কাজ বলো, আমি নিশ্চয়ই করব।’

জলদৈত্য বলল, ‘শুনেছি ভীম-এর যেমন সাহস তেমনি শক্তি। তাকে বলো জঙ্গল থেকে বাঘের দুধ নিয়ে আসতে। সেই দুধ খেলে আমি মানুষ হয়ে যাব। তখন ভীম আমাকে বাবা বলে চিনতে পারবে।’
চাষিবউ বলল, ‘ভীম এলেই আমি তাকে তোমার জন্যে বাঘের দুধ নিয়ে আসতে বলব।’
জলদৈত্য বলল, ‘ভীম যেন এসব কথা জানতে না পারে, তাহলে হয়তো কোনোদিনই আমি আর মানুষ হতে পারব না।’
চাষিবউ বলল, ‘তোমার কোনো চিন্তা নেই, আমি কাউকে এ কথা বলব না।’
এমন সময় বাইরে ভীম-এর পায়ের শব্দ হতেই তাড়াতাড়ি বাক্স বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল চাষিবউ। ভীম ঘরে ঢুকেই দ্যাখে বিছানায় শুয়ে মা ছটফট করছে। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার কী হয়েছে মা?’
চোখ-মুখ ফুলিয়ে মা বলল, আমার বুকের মধ্যে ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে। ভীম বলল, ‘আমি এখনই কবিরাজের কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে আসছি।’
ভীম-এর হাত ধরে মা বলল, না বাবা, কবিরাজের ওষুধে এ যন্ত্রণা কমবে না, একমাত্র বাঘের দুধ খেলেই এ যন্ত্রণা কমবে।
ভীম বলল, তুমি কোনো চিন্তা করো না মা, কাল সকাল হওয়ার আগেই আমি বাঘের দুধ নিয়ে আসব।
ভীম ঘর থেকে একটা পুরোনো ঘটি আর তিরধনুক নিয়ে জঙ্গলে চলল। যেতে যেতে গভীর জঙ্গলের মধ্যে এসে পড়ল ভীম কিন্তু কোথাও বাঘের দেখা নেই। হঠাৎ তার কানে এল ঝোপের আড়ালে কারা যেন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। কাছে যেতেই দেখল দুটো বাঘের ছানা। মাংস খেতে গিয়ে গলায় মাংসের হাড় ফুটেছে। তাড়াতাড়ি তির দিয়ে দু-জনের গলার হাড় বের করে দিল।
বাঘের বাচ্চারা বলল, ‘তুমি আমাদের প্রাণ বঁাচিয়েছ। আমাদের মা এলে তোমাকে অনেক কিছু দেবে।’
খানিক পরে বাঘ এসে হাজির। ভীমকে দেখেই বাঘের জিভে জল এসে গেল। গর গর করে যেই না লাফ দিতে যাবে তার দুটো বাচ্চা এসে সামনে দাঁড়াল, ‘মা, ওকে তুমি মেরো না ও আমাদের প্রাণ বঁাচিয়েছে।’
বাচ্চাদের কথা শুনে বাঘ খুশি হয়ে বলল, ‘তুমি এই জঙ্গলে এসেছ কেন?’
ভীম সব কথা বলতেই বাঘ বলল, ‘আমি তোমাকে দুধ দেব।’
ভীম ঘটি ভরে দুধ নিয়ে বাড়ি ফিরে চলল। খানিকটা পথ যেতেই দ্যাখে বাঘের একটা বাচ্চা আসছে। ভীম-এর কাছে এসে বাঘের বাচ্চা বলল, ‘আমি তোমার সঙ্গে যাব।’
ভীম খুশিমনে তাকে কোলে তুলে নিল। বাড়ি আসতেই দ্যাখে মা তখনও শুয়ে আছে। যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। ভীম তাকে ঘটি ভরতি দুধ দিয়ে বলল, ‘মা, তোমার জন্যে বাঘের দুধ নিয়ে এসেছি। তুমি খেয়ে নাও, সব যন্ত্রণা কমে যাবে।’
মা বলল, ‘আমি খাচ্ছি বাবা তুই জঙ্গল থেকে ঘুরে এলি, আগে গিয়ে পুকুর থেকে স্নান সেরে আয়, আমি তোর খাবার ব্যবস্থা করছি।’
ভীম স্নান করতে যেতেই তার মা উঠে পড়ল। বাক্সের ডালা খুলে জলদৈত্যকে বলল, ‘এই নাও তোমার জন্যে বাঘের দুধ নিয়ে এসেছি।’
জলদৈত্য ভেবেছিল ভীম বুঝি বাঘের হাতে মারা পড়েছে। তাকে ফিরে আসতে দেখে আর-এক ফন্দি করল। বলল, ‘শুধু বাঘের দুধ হলে হবে না। এর সঙ্গে ভালুকের দাঁত মেশাতে হবে।’
চাষিবউ বলল, ‘ভালুকের দাঁত কোথায় পাব?’
জলদৈত্য বলল, ‘কেন ভীম নিয়ে আসবে।’
চাষিবউ-এর মন চাইছিল না আবার ছেলেকে বিপদের মধ্যে পাঠায়। চাষিকে বঁাচাবার আশায় শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেল। ভীম স্নান করে ফিরে আসতেই দ্যাখে তখনও তার মা বিছানায় শুয়ে ছটফট করছে। ভীম জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার কষ্ট কমেনি মা?’
চাষিবউ বলল, ‘বাঘের দুধে পুরো যন্ত্রণা কমবে না। ভালুকের দাঁত ধুয়ে জল খেলে তবেই এ যন্ত্রণা কমবে।’
ভীম বলল, ‘কোনো চিন্তা করো না মা, সন্ধে হওয়ার আগেই আমি ভালুকের দাঁত নিয়ে আসব।’
ভীম বাইরে আসতেই বাঘের বাচ্চা বলল, ‘আমিও তোমার সঙ্গে যাব।’
ভীম বলল, ‘তুই বাড়িতে থেকে মাকে দেখিস, আমি সন্ধের আগেই জঙ্গল থেকে ফিরে আসব।’
মস্ত জঙ্গল ঘুরতে ঘুরতে ভীম এসে পড়ল বিরাট এক বটগাছের তলায়। সারা গাছে অসংখ্য মৌচাক। ভীম ভাবল, মধু খেতে নিশ্চয়ই ভালুক এখানে আসবে। গাছের আড়ালে তিরধনুক নিয়ে বসে রইল। অনেকক্ষণ পর এক ভালুক এসে হাজির। থাবা মেরে যেই না গাছে উঠতে যাবে ভীম তার বুক লক্ষ্য করে তির ছুঁড়ল। বুকে তির বিঁধতেই চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল ভালুক। সঙ্গে সঙ্গে ভীম তলোয়ার নিয়ে এক কোপে তার মাথাটা কেটে দাঁত তুলে নিয়ে বাড়ি ফিরে চলল।
বাড়ির সামনে আসতেই বাঘের বাচ্চা ভীম-এর কাছে ছুটে এল। তার পিঠ চাপড়ে ভীম বলল, ‘আমার মা কেমন আছে?’
বাঘের বাচ্চা বলল, ‘তোমার মা ভালো আছে। কতকিছু রান্না করে দুপুরে আমাকে খেতে দিল।’
ভীম-এর গলার আওয়াজ পেতেই মা তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ল। ভীম ঘরে ঢুকে দ্যাখে মা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। থলে থেকে ভালুকের দাঁত বার করে বলল, ‘মা, তুমি জল দিয়ে ধুয়ে খেয়ে নাও এখনই সব যন্ত্রণা কমে যাবে।’
মা বলল, ‘আমি খাচ্ছি বাবা, তুই জঙ্গল থেকে ঘুরে এলি যা পুকুর থেকে স্নান করে আয়।’
ভীম ঘরের বাইরে এসে বাঘের বাচ্চাকে বলল, ‘কী রে তুই মিথ্যে কথা বললি কেন? মা তো এখনও ভালো হয়নি।’
বাঘের বাচ্চা বলল, ‘তুমি চলে যাওয়ার পরেই মা ভালো হয়ে গিয়েছিল।’
ভীম বলল, ‘ঠিক আছে চল মাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করি।’
ফিরে গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়াতেই ভীম শুনতে পেল মা কার সঙ্গে কথা বলছে। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখল মা বাক্সের ডালা তুলে জলদৈত্যের সঙ্গে কথা বলছে। ভীম বুঝতে পারল এ সব শয়তান জলদৈত্যের কাজ। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল। ভীমকে দেখেই জলদৈত্য ভয়ে কাঁপতে আরম্ভ করল।
চাষিবউ ভাবল, এইবার বুঝি ভীম চাষিকে মেরে ফেলবে। ভয়ে ভয়ে বলল, ‘ভীম এ তোর বাবা।’
ভীম মা-র কাছে গিয়ে বলল, ‘সব মিথ্যে কথা মা, এ হল শয়তান জলদৈত্য যে আমার বাবাকে মেরেছে। তারপর আমাকে মারবে বলে, তোমার কাছে মিথ্যে কথা বলছে।’
ভীম-এর কথা শুনে জলদৈত্য কান্নাকাটি শুরু করে দিল। ভীম তাকে ধমক দিয়ে বাক্স বন্ধ করে নিয়ে চলল জমিদারবাড়ি। সেখানে তখন উৎসব হচ্ছিল। গ্রামের সব লোকজন জড়ো হয়েছিল। ভীম গিয়ে বাক্স নামাতেই সবাই অবাক হয়ে গেল। জমিদার জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই বাক্সে কী আছে ভীম?’
ভীম বাক্স থেকে জলদৈত্যকে বের করে বলল, ‘হুজুর, এই হচ্ছে সেই জলদৈত্য যে আমার বাবাকে মেরেছে। জঙ্গলের পুকুরে যারা জল খেতে নামত তাদের সকলকে মেরেছে, এখন বলুন একে কী শাস্তি দেব?’
জমিদার বললেন, ‘ওকে মেরে ফেলো।’
তখুনি গ্রামের সব লোক একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল জলদৈত্যের ওপর। মারতে মারতে তাকে টুকরো টুকরো করে ফেলল। জলদৈত্য মরে যেতেই সবাই ভীম-এর জয়ধ্বনি করতে আরম্ভ করল।
জমিদার খুশি হয়ে ভীমকে এত টাকা পয়সা দিলেন যে, তাদের সব দুঃখ-কষ্ট ঘুচে গেল, সুখের দিন শুরু হল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন