চঞ্চলকুমার ঘোষ
এক ছিল মহাজন। সেছিল ভীষণ লোভী আর কৃপণ। গরিব-দুঃখী লোকেদের ঠকিয়ে কত যে টাকা আয় করেছিল তার হিসেব ছিল না।
একদিন এক সাধু এল মহাজনের বাড়ি। সাধুর কাছে অনেক ধনরত্ন ছিল। মন্দির তৈরি করবে বলে সাধু সেই ধনরত্ন নিয়ে যাচ্ছিল। এত ধনরত্ন দেখে লোভ সামলাতে পারল না মহাজন। রাতের বেলায় যখন সাধু ঘুমিয়ে ছিল, তাকে মেরে সব ধনরত্ন চুরি করে নিল। কেউ আর কিছু জানতেই পারল না।
সাধুর ধনরত্ন পেয়ে আরও বড়োলোক হয়ে গেল মহাজন। তবুও মহাজনের মনে কোনো সুখ ছিল না। ঘরে তার কোনো ছেলেমেয়ে নেই। সাধু মারা যাওয়ার দশ মাস বাদে মহাজনের বউ এর ফুটফুটে একটা ছেলে হল। যেমন তার স্বাস্থ্য, তেমনি সুন্দর দেখতে।
মহাজনের খুব আনন্দ। তার এতদিনের দুঃখ দূর হল। একদন্ডও ছেলেকে ছেড়ে থাকতে পারে না। ব্যাবসা আর ছেলেকে নিয়ে তার সময় কেটে যায়। দেখতে দেখতে বড়ো হয়ে উঠল ছেলে।
হঠাৎ একদিন সেই ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়ল। তাড়াতাড়ি কবিরাজকে ডাকা হল। কত চিকিৎসা চলল। মহাজন অনেক টাকাপয়সা খরচ করল। তবুও তার ছেলে সুস্থ হল না। যত দিন যায় ততই তার অসুখ বেড়েই চলল।
সবাই বলল, এ ছেলে আর ভালো হবে না। মহাজন হতাশ হয়ে তার চিকিৎসা বন্ধ করে দিল। ছেলে তখন মহাজনকে বলল, ‘বাবা, তুমি আমাকে আর কিছুদিন চিকিৎসা করাও, আমি সেরে উঠব।’
মহাজন আবার ছেলের চিকিৎসা শুরু করল। দেশ-বিদেশের বড়ো বড়ো কবিরাজ এল, হাকিম এল, সাধুসন্তের কাছে পুজো দেওয়া হল, তবু ছেলে আর ভালো হল না। ওদিকে মহাজনের জমানো সব টাকাপয়সাও শেষ হয়ে এল।
ছেলে বলল, ‘বাবা, তুমি আর কিছুদিন চিকিৎসা করাও, আমি নিশ্চয়ই ভালো হয়ে যাব।’

ছেলের মায়ায় মহাজন তার জমিজমা বিক্রি করে দিয়ে আবার নতুন করে চিকিৎসা শুরু করল। তবুও কিছু হল না। শুধু মহাজনের সব টাকাপয়সা ফুরিয়ে গেল। ছেলের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মহাজন বলল, ‘আর আমি তোর চিকিৎসা করাতে পারব না।’
ছেলে বলল, ‘বাবা, এই শেষবার বলছি তুমি আমার চিকিৎসা করাও, আমি সুস্থ হয়ে উঠব।’
মহাজন চারদিক থেকে টাকা ধার করে ছেলের জন্যে ওষুধ নিয়ে আসে। নিজের বলে আর কিছুই থাকল না মহাজনের। ধারদেনা করে গরিব হয়ে পড়ল।
একদিন ছেলের কাছে এসে দাঁড়াতেই ছেলে বলল, ‘বাবা, এইবার আমার যাওয়ার সময় হল, তার আগে তোমার কাছে একটা সত্যি কথা বলে যেতে চাই। আমিই সেই সাধু, যাকে তুমি দশ বছর আগে খুন করেছিলে। আমি তোমার সব টাকাপয়সা নষ্ট করে তোমার পাপের শাস্তি দিয়ে গেলাম।’
তারপরই ছেলে মারা গেল।
ছেলের শোকে আর নিজের পাপের কথা ভাবতে ভাবতে কয়েক দিনের মধ্যেই মারা গেল মহাজন।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন