শেয়াল ও বুড়োবুড়ি

চঞ্চলকুমার ঘোষ

এক গ্রামে থাকত এক বুড়ো আর এক বুড়ি। তাদের কোনো ছেলেমেয়ে ছিল না। গ্রাম থেকে কিছু দূরে ছিল বুড়োর একফালি জমি। সেই জমি চাষ করে যা ফসল পেত তাতেই দু-জনের সারা বছর চলে যেত।

বুড়ি সংসারের কাজ করত, ঘরদোর পরিষ্কার করত। রোজ দুপুরে রান্না করে বুড়োর জন্যে মাঠে খাবার নিয়ে যেত। মাঠে যাওয়ার পথের ধারে ছিল ছোটো জঙ্গল। সেই জঙ্গলে থাকত একদল শেয়াল। রোজ তারা বুড়িকে দেখত পোঁটলা নিয়ে যাচ্ছে।

একদিন একটা শেয়াল বলল, ‘বুড়ি পোঁটলায় করে রোজ কী নিয়ে যায় বলত?’

আরেকটা শেয়াল বলল, ‘নিশ্চয়ই বুড়োর জন্য খাবার নিয়ে যায়। চল আজকে গিয়ে দেখতে হবে।’

বুড়ি কিছুই জানে না। অন্য দিনের মতো খাবার নিয়ে চলেছে। জঙ্গলের ধারে আসতেই হুক্কা-হুক্কা করে শেয়ালের পাল চারদিক থেকে বুড়িকে ঘিরে ফেলল। একসঙ্গে এত শেয়াল দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে গেল বুড়ি। শেয়ালের সর্দার বলল, ‘বুড়ি তোমার হাতে ওটা কি?’

বুড়ি তাড়াতাড়ি খাবারের পোঁটলা কাপড়ের আড়ালে লুকিয়ে ফেলে বলল, ‘ও কিছু নয় বাবা।’

শেয়ালের সর্দার বলল, ‘তুমি মিছে কথা বলছ বুড়িমা, আমরা জানি তোমার ওই পোঁটলায় খাবার আছে।’

বুড়ি আর কী করে, শেয়ালের ভয়ে সব খাবার দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মাঠে চলে গেল।

বুড়িকে কাঁদতে দেখে বুড়ো জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কাঁদছ কেন?’

বুড়ি সব কথা খুলে বলতেই বুড়ো বলল, ‘ঠিক আছে, কাল শেয়ালদের এমন জব্দ করব, যে কোনোদিন আর তোমার খাবার কেড়ে নিতে সাহস পাবে না।’

পরদিন সকাল বেলায় বুড়িকে চাষা সাজিয়ে মাঠে পাঠিয়ে দিল বুড়ো আর একটু বেলা হতেই বুড়োবুড়ির মতো কাপড় পরে বেরিয়ে পড়ল। কাপড়ের মধ্যে নিল একটা লাঠি।

জঙ্গলের ধারে শেয়ালের দল লুকিয়ে ছিল। আগের দিন বুড়ির খাবার খেয়ে সবার ভীষণ লোভ হয়ে গিয়েছিল। বুড়ো কাছে আসতেই সব শেয়াল একসঙ্গে হুক্কা হুয়া করে লাফ দিয়ে পড়ল তার সামনে।

শেয়াল সর্দার বলল, ‘বুড়িমা, আজ কী খাবার নিয়ে এসেছ?’

বুড়ো বলল, ‘খুব ভালো খাবার নিয়ে এসেছি, এই নে।’

বলেই বুড়ো কাপড়ের ভেতর থেকে লাঠি বের করে মারতে শুরু করে দিল। লাঠির বাড়ি খেয়ে শেয়ালের পাল যে-যেদিকে পারল পালিয়ে গেল। জঙ্গলের মধ্যে এসে শেয়াল সর্দার বলল, ‘বুড়োকে এমন জব্দ করব কোনোদিন আর আমাদের পেছনে লাগবে না।’

মাঠ ভরতি বুড়োর পাকা ধান। বুড়ো মাঠে গিয়ে বুড়িকে বলল, ‘আজ সব ধান কেটে নিতে হবে, নইলে শেয়ালে ধান নষ্ট করে দেবে।’

বুড়ো-বুড়ি দু-জনে সন্ধের আগেই মাঠের সব ধান কেটে নিল। মাঠের ধারেই ছিল অনেক কাঁটা গাছ। বুড়ো সব কাঁটা গাছ কেটে এনে মাঠের মধ্যে ছড়িয়ে দিল।

রাতের বেলা সব শেয়াল মাঠে এসে হাজির। অন্ধকারের মধ্যে কাঁটাগাছ দেখে ভাবল বুড়োর ধান গাছ। সবাই একসঙ্গে লাফিয়ে পড়ল কাঁটা গাছের উপর। আর সঙ্গে সঙ্গে প্যাঁক প্যাঁক করে কাঁটা ফুটে গেল সারা গায়ে।

অনেক কষ্টে কাঁটা ছাড়িয়ে রাগে গজ গজ করতে করতে শেয়াল সর্দার, বলল, ‘এবারও বুড়ো আমাদের ঠকাল, কাল রাতে গিয়ে বুড়োর সব মুরগি খেয়ে ফেলব, তখন বুড়ো বুঝবে কেমন মজা।’

বুড়োর ঘরের পাশেই ছিল মুরগির ঘর। সন্ধেবেলায় বুড়ো দ্যাখে গ্রামের পাশে শেয়াল ঘোরাঘুরি করছে। বুড়ো এসে বুড়িকে বলল, ‘আজ শেয়ালরা আমার মুরগি খাবে বলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তুমি আমার বড়ো কাস্তেটা দাও দেখি।’

বুড়ি কাস্তে এনে দিল। বুড়ো অন্ধকারের মধ্যে মুরগির ঘরে জানলার পাশে গিয়ে বসল। খানিক পরেই সব শেয়াল সেখানে এসে জড়ো হল। শেয়াল সর্দার বলল, ‘তোরা এক-এক করে জানালা দিয়ে ঢুকে পড়, সব শেষে আমি ঢুকব।’

মোটাসোটা একটা শেয়াল বলল, ‘আমিই আগে ঢুকব।’

যেই না শেয়াল জানালা দিয়ে ভেতরে মাথা গলিয়েছে সঙ্গে সঙ্গে বুড়ো জোরসে কাস্তের কোপ বসিয়ে দিল শেয়ালের গলায়। অর্ধেক গলাকাটা হয়ে শেয়াল চিৎকার করে বেরিয়ে এল। তাই দেখে আর-সব শেয়াল এমন ভয় পেয়ে গেল যে ঊর্ধ্বশ্বাসে জঙ্গলের দিকে ছুটতে শুরু করে দিল। একেবারে জঙ্গলের মধ্যে এসে তবে থামল।

বুড়ো মুরগির ঘর থেকে ফিরতেই বুড়ি বলল, ‘আমার কিন্তু ভীষণ ভয় লাগছে।’

বুড়ো বলল, ‘কীসের ভয়, আমি তো আছি।’

বুড়ি বলল, ‘যখন আমি তোমাকে খাবার দিতে যাই, তখন তো কেউ থাকে না। পেছন থেকে যদি সব শেয়াল একসঙ্গে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন কী হবে?’

বুড়ো ভাবল বুড়ি ঠিক কথাই বলেছে। শেয়ালরা ভীষণ রেগে আছে। সুযোগ পেলেই তারা শোধ নেবে। অনেক ভাবনা-চিন্তা করে বুড়ো বলল, ‘আমি একটা বুদ্ধি করেছি, তুমি সেই মতো কাজ করবে তাহলে তোমার আর কোনো ভয় থাকবে না।’

পরদিন শেষরাতে বুড়ো বুড়িকে নিয়ে মাঠে গেল। সঙ্গে নিল লোহার হাতুড়ি আর মোটা দড়ি। মাঠে গিয়ে বুড়ো একটা গাছতলায় শুয়ে পড়ল আর বুড়ি বুড়োকে চাদর দিয়ে ভালো করে ঢেকে দিয়ে হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিল। বুড়ির কান্না শুনে জঙ্গল থেকে সব শেয়াল এসে হাজির। শেয়াল সর্দার জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে বুড়িমা?’

বুড়ি কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘তোমাদের বুড়ো দাদু মারা গিয়েছে।’

বুড়ির কথা শুনে শেয়ালরা সবাই আনন্দে চিৎকার করে উঠল, ‘বুড়ো আমাদের খুব জব্দ করেছে, এবার বুড়োর মাংস খেয়ে তার শোধ নেব।’

সবাই মিলে মারামারি শুরু করে দিল। কে আগে বুড়োর মাংস খাবে। বুড়ি কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘তোমরা এভাবে মারামারি করলে কাউকেই মাংস খেতে দেব না, এক-এক করে সবাই সার বেঁধে দাঁড়াও তারপর মাংস খাবে।’

শেয়াল সর্দার বলল, ‘বুড়িমা ঠিক বলেছে।’ সবাই সার বেঁধে দাঁড়াও। সবাই যতবারই সার বেঁধে দাঁড়ায় বুড়ি বলে, ‘ঠিক করে দাঁড়াতে পারনি।’ শেষে শেয়াল সর্দার বলল, ‘বুড়িমা, তুমি আমাদের দাঁড় করিয়ে দাও।’

মাঠের ধারে পড়ে ছিল বিরাট একটা গাছের গুঁড়ি। বুড়ি তাতে দড়ির একটা মাথা শক্ত করে বেঁধে নিয়ে বলল, ‘এবার তোমরা এক-একজন করে এসো, আমি দড়ি দিয়ে তোমাদের বঁাধি তাহলে কেউ আর এদিক ওদিক যেতে পারবে না। এরপর সবাই বুড়োর মাংস খেতে পারবে।’

বুড়ির কথায় সব শেয়ালেরা রাজি হয়ে গেল। বুড়ি এক এক করে সব শেয়ালকে বেঁধে ফেলল। সব শেষে শেয়াল সর্দারকে বঁাধা হতেই বুড়ি বুড়োকে ডাক দিল। সঙ্গে সঙ্গে চাদর ফেলে হাতুড়ি নিয়ে উঠে পড়ল বুড়ো। দমাদম শেয়ালের মাথায় হাতুড়ির বাড়ি মারতে শুরু করে দিল।

এক-একটা বাড়ি মারে আর এক-একটা করে শেয়াল মারা পড়ে। সব শেয়ালকে মেরে সর্দারের কাছে আসতেই শেয়াল সর্দার প্রাণপণে মারল এক লাফ আর পটাং করে দড়ি ছিঁড়ে গেল। বুড়ি চিৎকার করে উঠল, ‘শেয়াল পালাল, শেয়াল পালাল।’

বুড়ো হাতুড়ি নিয়ে তাকে তাড়া করল, তার আগেই শেয়াল দৌড়ে পালিয়ে গেল অনেক দূরে। কোনোদিন আর গ্রামে ফিরে এল না।

বুড়ি আবার আগের মতোই বুড়োর জন্য খাবার নিয়ে যেতে লাগল।

সকল অধ্যায়
১.
ওঝা ও পাহাড়ি ভূত
২.
দুই সূর্য
৩.
মহিষ ও রাখালছেলে
৪.
তিন বন্ধু
৫.
বাঘ মামার কথা
৬.
কুঁজো আর অন্ধ
৭.
দেবতার অভিশাপ
৮.
সাতবোকা
৯.
বাহাদুর আর এক-পা-ওলা দৈত্য
১০.
সাধু ও মহাজন
১১.
চালাক ভোলানাথ
১২.
বামুন আর শেয়াল
১৩.
আকাশপুরীর রাজকন্যা
১৪.
অতি চালাকের গলায় দড়ি
১৫.
তিন জামাই
১৬.
শেয়ালবউ-এর বুদ্ধি
১৭.
শেয়াল আর বোকা বাঘ
১৮.
বুদ্ধিমান চোর
১৯.
শুয়োরের শিং
২০.
রাখালছেলে ও পরির দেশের রাজকন্যা
২১.
তাঁতির কুঁজ
২২.
চার চোর
২৩.
কাঠুরে নাপিত আর রাজকন্যা
২৪.
মহেশ্বর
২৫.
আয়না
২৬.
শেয়াল ও বুড়োবুড়ি
২৭.
এক দাঁত ফোকলা
২৮.
বুদ্ধি থাকলেই উপায় হয়
২৯.
ভীম আর জলদৈত্য
৩০.
চার ভাই
৩১.
সুরের জাদু
৩২.
ভূত ও ভূতনাথ
৩৩.
রসিক রাজু

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%