চঞ্চলকুমার ঘোষ
এক যে ছিল চাষি। চাষির দুই বউ। বড়োবউ সংসারের সব কাজ করে, ধান ঝাড়ে। রূপের দেমাকে ছোটোবউ-এর মাটিতে পা পড়ে না। সারা দিন শুধু খায় দায় আর ঘুরে বেড়ায়।
একদিন চাষির শরীর খারাপ। বড়োবউ বলল, ‘ছোটো, আজ তুই মাঠে গিয়ে গোরুগুলোকে ঘাস খাইয়ে নিয়ে আয়।’
ছোটোবউ মুখ বেঁকিয়ে বলল, ‘ও আমি পারব না দিদি। রোদে ঘুরলে আমার শরীর কেমন করে।’
বড়োবউ আর কী করে, সব কাজ সেরে গোরু নিয়ে গেল মাঠে। সঙ্গে পোঁটলায় বেঁধে নিল গুড় আর মুড়ি। গ্রাম ছাড়িয়ে মাঠ, সেখানে গোরু ছেড়ে দিয়ে গাছতলায় এসে বসল বড়োবউ। সেই কোন সকালে দুটো পান্তাভাত খেয়েছিল। পোঁটলা থেকে গুড় মুড়ি বের করে খেতে আরম্ভ করল। গাছের ঠাণ্ডা হাওয়ায় গুড় মুড়ি খেতে খেতে, সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ল বড়োবউ।
এমন সময় সেইখান দিয়ে যাচ্ছিল এক নেংটি ইঁদুর। বড়োবউ-এর মুখে গুড় মুড়ি লেগে রয়েছে দেখে আস্তে আস্তে তার মুখের ওপর উঠে পড়ল। তার ছোটো ছোটো দাঁত দিয়ে গুড় মুড়ি খেতে আরম্ভ করল। বড়োবউ কিছুই জানতে পারল না। এর আগে কোনোদিন গুড় মুড়ি খায়নি ইঁদুর। কী যে খুশি হল তা বলার নয়।
হঠাৎ ইঁদুর দেখতে পেল বড়োবউ-এর মুখ ফোকলা। সামনে দুটো দাঁত নেই। সঙ্গে সঙ্গে ইঁদুর সুড়ুৎ করে ঢুকে পড়ল তার গর্তে। যেখানে যত লোক দাঁত ফেলে দিত, সব কুড়িয়ে এনে সেই গর্তে জড়ো করত ইঁদুর। তার থেকে দুটো দাঁত নিয়ে বড়োবউয়ের ফোকলা দাঁতে লাগিয়ে দিল।

বিকেলবেলায় বড়োবউ গোরু নিয়ে বাড়ি ফিরতেই ছোটোবউ জিজ্ঞেস করল, ‘দিদি, এত সুন্দর দাঁত তুমি কোথায় পেলে?’
বড়োবউ তো অবাক! সত্যিই তো এত সুন্দর দাঁত কোথা থেকে এল। ছোটোবউকে বলল, ‘কী জানি আমি তো গুড় মুড়ি খেতে খেতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভাঙতেই গোরু নিয়ে বাড়ি চলে এলাম। তবে আমি যেখানে ঘুমিয়েছিলাম, সেখানে ইঁদুরের গর্ত ছিল। মনে হয়, ইঁদুর এসে গুড় মুড়ি খেয়ে আমায় দাঁত দিয়ে গেছে।’
ছোটোবউ কোনো কথা বলল না। হিংসেতে তার বুকটা জ্বলে গেল। বড়োবউয়ের কী সুন্দর দাঁত আর আমার দাঁতগুলি কি বিচ্ছিরি। একটা কিছু করতেই হবে। ভেবে ভেবে মুখের সবকটা দাঁত পট পট করে তুলে ফেলল। তার সে-যে কী যন্ত্রণা তা বলার নয়।
পরদিন দুপুরে ছোটবউ বড়োবউকে বলল, ‘দিদি, আজ তুমি ঘরের কাজ করো, আমি মাঠে যাব গোরু চরাতে।’
বড়োবউ মাথা নেড়ে বলল, ‘ঠিক আছে সাবধানে যাস।’
ছোটোবউ পোঁটলায় গুড় মুড়ি বেঁধে গোরু নিয়ে চলল মাঠে। ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুর। মাঠে গোরু ছেড়ে দিয়ে গাছতলায় এসে বসল। তার আর দেরি সইছিল না। তাড়াতাড়ি পোঁটলা খুলে গুড় মুড়ি বের করে সারা মুখে মেখে চোখ বুজে শুয়ে পড়ল।
একটু পরেই গর্ত থেকে বেরিয়ে এল ইঁদুর। ছোটোবউয়ের মুখের ওপর উঠে গুড় মুড়ি খেতে আরম্ভ করল। খেতে খেতে ইঁদুর দেখল ছোটোবউয়ের মুখ ফোকলা, একটাও দাঁত নেই। সুড়ুৎ করে ইঁদুর চলে গেল তার গর্তে। ভালো দেখে একটা দাঁত এনে বসাতেই ছোটোবউ ভাবল এইবার বড়োবউয়ের চাইতেও ভালো দাঁত হবে আমার। ওদিকে ইঁদুর আরেকটা দাঁত আনতে যেতেই ছোটোবউ বলে উঠল, ‘আমার জন্যে ভালো দেখে দাঁত নিয়ে আসবি।’
যেই না বলা ভয় পেয়ে ইঁদুর একছুটে পালিয়ে গেল তার গর্তে।
ছোটোবউ অনেকক্ষণ শুয়ে রইল, গর্তের কাছে গিয়ে কত ডাকাডাকি করল। ইঁদুর আর এল না। এক দাঁত ফোকলা হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে গেল ছোটবউ।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন