সাতবোকা

চঞ্চলকুমার ঘোষ

এক বুড়ির সাত ছেলে, সাত ছেলেই ভীষণ বোকা। কেউ কোনো কাজ দিলেই তারা তা পন্ড করে ছাড়ত। সেই ভয়ে গ্রামের কেউ তাদের কোনো কাজ দিত না। বুড়ি সারাদিন খেটে খুটে যা পেত তাই নিয়ে আসত। সাতভাই তাই খেত আর পড়ে পড়ে ঘুমাত, বুড়ি কত দুঃখ করত তারা গায়েই মাখত না।

একদিন বুড়ি মরে গেল। সাত ছেলে ভাবল এখানেই বুড়িকে পোড়াব, কষ্ট করে কেন শ্মশানে নিয়ে যাব। বুড়ি যে-খাটের ওপর শুয়ে ছিল তার ওপর লেপ-কাঁথা চাপা দিয়ে আগুন লাগিয়ে দিল। সেই আগুন হু হু করে বেড়ে প্রথমে লাগল খড়ের চালে তারপর অন্য সব জিনিসে। দেখতে দেখতে বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেল।

সাতভাই কপাল চাপড়ে কাঁদতে শুরু করে দিল। মা আমাদের ওপর রাগ করে সব পুড়িয়ে দিল।

গাঁয়ের লোক এসে তাদের বলল, ‘তোরা কী বোকা, ঘরের মধ্যে আগুন লাগালে তো ঘর পুড়বেই। তোরা আবার নতুন করে ঘর তৈরি কর।’

সাতভাই মাথা নেড়ে বলল, ‘আমরা আর এই গাঁয়ে থাকব না। কাজ করতে অন্য জায়গায় যাব।’

সাতখানা লাঠি নিয়ে সাতভাই বেরিয়ে পড়ল। সারাদিন চলতে চলতে সন্ধেবেলায় তারা এসে পৌঁছাল এক গাঁয়ে। গাঁয়ের মোড়ল তখন চাষবাস দেখাশুনা করে সব গোরু ছাগল নিয়ে বাড়ি ফিরছিল। মোড়লকে দেখে সাতভাই তার কাছে গিয়ে বলল, ‘আমরা অনেক দূর থেকে আসছি, সারাদিন কিছু খাইনি, আমাদের কিছু খেতে দেবে?’

মোড়ল বলল, ‘তোমাদের এমন সুন্দর চেহারা তোমরা কাজ করে খেতে পারো না?’

সাতভাই বলল, ‘আমরা তো কাজ খুঁজতেই বেরিয়েছি।’

মোড়ল বলল, ‘তোমরা যদি আমার কাছে কাজকর্ম করো, তাহলে তোমাদের খেতে দেব।’

মোড়লের কথা শুনে সাতভাই খুব খুশি। বলল, ‘আমরা তোমার বাড়িতে থাকব, তোমার কাজ করব।’

মোড়ল তাদের নিজের বাড়িতে নিয়ে গেল। সাতভাইকে খাইয়ে-দাইয়ে বলল, ‘এবার কাজ করবে চলো।’

মোড়লের ছিল তেলের ঘানি। বড়ো বড়ো গামলায় তেল ভরা ছিল। সাতভাইকে সেখানে নিয়ে এসে মোড়ল বলল, ‘তোমরা আমার তেল পাহারা দেবে, দেখবে কোনো চোর যেন তেল নিয়ে যেতে না পারে।’

সাতভাই মাথা নেড়ে বলল, ‘ঠিক আছে আমরা তেল পাহারা দিচ্ছি।’

তারা তা লাঠি নিয়ে পাহারা দিতে লাগল। ঘুরতে ঘুরতে তারা গামলার সামনে এসে দাঁড়াতেই তাদের ছায়া পড়ল তেলের মধ্যে। নিজেদের ছায়া তেলের মধ্যে দেখে সাতভাই ভাবল নিশ্চয়ই চোর এসে গামলার মধ্যে লুকিয়েছে। বেটাদের এমন শিক্ষা দেব কোনোদিন আর ভুলবে না।

যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। সঙ্গে সঙ্গে সাতভাই তাদের লাঠি তুলে নিয়ে সজোরে মারল তেলের গামলায়। গামলা ভেঙে চৌচির। সব তেল মাটিতে গড়িয়ে পড়ল।

সাতভাই ছুটে গিয়ে খবর দিল মোড়লকে। সব দেখে তো মোড়লের মাথায় হাত। কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে বলল, ‘তোদের আর তেল পাহারা দিয়ে দরকার নেই, তোরা অন্য কাজ করবি।’

পরদিন সকালে মোড়ল সাতভাইকে নিয়ে গেল তার ধানের খেতে। বিরাট খেত, চারদিকে শুধু ধান আর ধান। সব ধান পেকে লাল হয়ে আছে।

মোড়ল বলল, ‘তোরা এবার থেকে ধান পাহারা দিবি। কাউকে ধান নিয়ে যেতে দিবি না।’

মোড়ল চলে যেতেই সাতভাই খেতের চারধারে দাঁড়িয়ে পাহারা দিতে লাগল। একটু পরেই একঝাঁক চড়ুই পাখি এসে ধান খেতে শুরু করে দিল। একভাই চেঁচিয়ে উঠল, ‘চুরি করে খাচ্ছে।’

সঙ্গে সঙ্গে লাঠি নিয়ে সাত ভাই ঝাঁপিয়ে পড়ল। চড়ুই ফুড়ুৎ করে ওঠে তারাও ঝপাং করে লাঠির বাড়ি মারে। খানিকক্ষণ পর চড়ুই পাখি খেত থেকে উড়ে পালিয়ে গেল। ততক্ষণে সব ধান মাটিতে পড়ে গেছে।

দুপুরবেলায় মোড়ল ধানের খেতে আসতেই মাথায় হাত। রাগে মোড়ল চেঁচিয়ে উঠল, ‘বুদ্ধির ঢেঁকির দল তোদের আর ধান পাহারা দিতে হবে না, কাঠ কাটবি চল।’

মোড়ল তাদের আমবাগানে নিয়ে এল। অনেক শুকনো ডালপালা পড়ে ছিল চারধারে। সাতভাইকে সাতখানা কুড়ুল দিয়ে মোড়ল বলল, ‘এইসব শুকনো ডালপালাগুলো এক জায়গায় জড়ো করে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেল।’

সাতভাই সঙ্গে সঙ্গে শুকনো কাঠ জড়ো করতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সব কাঠ একজায়গায় করে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলল। বড়োভাই বলল, ‘এবার কী করব?’

ছোটোভাই বলল, চারদিকে এতো বড়ো বড়ো গাছ রয়েছে। এইবার এইগুলো কাটি। সবাই ঘাড় নেড়ে বলল, ‘ঠিক, ঠিক, ঠিক।’

সঙ্গে সঙ্গে সাতভাই বড়ো বড়ো আমগাছ কাটতে আরম্ভ করল। বিকেলবেলায় মোড়ল এসে দেখল তার বাগানে আর একটাও আমগাছ নেই। সব কেটে টুকরো টুকরো হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে আছে। দুঃখে হাত-পা চাপড়াতে আরম্ভ করল মোড়ল। বলল, ‘আমার সব আমগাছ কেটে ফেলেছিস! যা হতভাগারা সব কাঠ বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আয়।’

সাতভাই মাথায় করে কাঠ নিয়ে চলল মোড়লের বাড়ি। তখন মোড়লের মা মোড়লের বউ-এর সঙ্গে ঝগড়া করে চুপচাপ বারান্দায় বসেছিল। সাতভাই জিজ্ঞেস করল, ‘এইসব কাঠ কোথায় রাখব বুড়িমা?’

মোড়লের মা রেগে গিয়ে বলল, ‘আমার মাথায় রাখ।’

সাতভাই ভাবল, বুড়ি বোধহয় সত্যি সত্যিই মাথায় কাঠ রাখতে বলছে। তারা সব কাঠ বুড়ির মাথায় চাপিয়ে দিল। কাঠের তলায় চাপা পড়ে ছটফট করতে লাগল বুড়ি।

মোড়ল এসে দ্যাখে কাঠের তলায় চাপা পড়ে আছে তার মা। তাই দেখে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিল মোড়ল। সবাই মিলে যখন কাঠের তলা থেকে বুড়িকে বের করল তখন বুড়ি মরে কাঠ হয়ে গেছে।

মোড়লের মন খারাপ হয়ে গেল। সবাই তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, ‘যা হবার তা তো হবেই, এবার তোমার মাকে শ্মশানে নিয়ে যেতে হবে।’

সাতভাই খাটে করে বুড়িকে শ্মশানে নিয়ে চলল। গ্রামের সকলে তাদের পেছনে হাঁটতে থাকল। বেলা শেষ হয়ে এসেছিল, সাতভাই-এর একজন বলল, ‘রাত হয়ে গেলে অন্ধকারে বুড়ি রাস্তা চিনে স্বর্গে যেতে পারবে না।’ অন্যসব ভাইরা বলল, ‘ঠিক, ঠিক, ঠিক।’

সঙ্গে সঙ্গে সবাই প্রচন্ড জোরে দৌড়োতে আরম্ভ করল। দৌড়োতে দৌড়োতে কখন যে বুড়ি খাট থেকে পড়ে গেছে কেউ তা জানতেও পারেনি। শ্মশানে গিয়ে দেখল খাট খালি, তাতে বুড়ি নেই।

সবাই বলল, ‘এখন কী হবে?’

ঠিক সেই সময় এক বুড়ি শ্মশানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সাতভাই ভাবল মোড়লের মা বেঁচে উঠেছে। চারদিক অন্ধকার হয়ে এসেছিল। সাতভাই বুড়িকে ধরে এনে চিতায় শুইয়ে দিল। বুড়ির গায়ে আগুন লাগতেই বুড়ি চিৎকার করে চিতা থেকে উঠে পড়ল। তখনি সাতভাই বঁাশ পেটা করে তাকে আবার চিতায় শুইয়ে দিল। বুড়ি চিৎকার করতে করতে আগুনে পুড়ে মরে গেল।

এদিকে মোড়ল শ্মশানে আসতে গিয়ে দেখে রাস্তার ওপর তার মা পড়ে আছে। তখন লোকজনদের নিয়ে মোড়ল তার মাকে শ্মশানে নিয়ে চলল।

সাতভাই তখন বুড়িকে পুড়িয়ে ঘরে ফিরছিল। পথে মোড়লের সঙ্গে দেখা হতেই সব বলল। তাদের কথা শুনে মোড়ল বলল, ‘তোমাদের মতো বোকা আমি জীবনে কখনো দেখিনি। তোমরা যেখানে খুশি সেখানে যাও। তোমাদের মতো লোক আমার দরকার নেই।’

সকল অধ্যায়
১.
ওঝা ও পাহাড়ি ভূত
২.
দুই সূর্য
৩.
মহিষ ও রাখালছেলে
৪.
তিন বন্ধু
৫.
বাঘ মামার কথা
৬.
কুঁজো আর অন্ধ
৭.
দেবতার অভিশাপ
৮.
সাতবোকা
৯.
বাহাদুর আর এক-পা-ওলা দৈত্য
১০.
সাধু ও মহাজন
১১.
চালাক ভোলানাথ
১২.
বামুন আর শেয়াল
১৩.
আকাশপুরীর রাজকন্যা
১৪.
অতি চালাকের গলায় দড়ি
১৫.
তিন জামাই
১৬.
শেয়ালবউ-এর বুদ্ধি
১৭.
শেয়াল আর বোকা বাঘ
১৮.
বুদ্ধিমান চোর
১৯.
শুয়োরের শিং
২০.
রাখালছেলে ও পরির দেশের রাজকন্যা
২১.
তাঁতির কুঁজ
২২.
চার চোর
২৩.
কাঠুরে নাপিত আর রাজকন্যা
২৪.
মহেশ্বর
২৫.
আয়না
২৬.
শেয়াল ও বুড়োবুড়ি
২৭.
এক দাঁত ফোকলা
২৮.
বুদ্ধি থাকলেই উপায় হয়
২৯.
ভীম আর জলদৈত্য
৩০.
চার ভাই
৩১.
সুরের জাদু
৩২.
ভূত ও ভূতনাথ
৩৩.
রসিক রাজু

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%