চঞ্চলকুমার ঘোষ
কোথা থেকে এক চোর এসেছে প্রতাপপুরে। রোজ রাতেই কোনো-না-কোনো ধনী লোকের বাড়িতে চুরি করে সে। যাওয়ার সময় বাড়ির দরজায় লিখে রেখে যায় ‘আমি এসেছিলাম।’
চোরের উপদ্রবে নগরে কারও ঘুম নেই। টাকাপয়সা, গয়নাগাটি যে-যেখানে পারে লুকিয়ে রাখে। অনেকে রাত জেগে পাহারা দেয়। তবুও চোর যে কেমন করে চুরি করে কেউ বুঝে উঠতে পারে না। সবাই নগরকোটালের কাছে গিয়ে নালিশ করল, এভাবে আর থাকা যায় না। চোর যে আমাদের সর্বস্ব নিয়ে গেল।
নগরকোটাল পাহারাদারদের বলল, ‘তিন দিনের মধ্যে চোরকে ধরা চাই।’ পাহারাদার সারা রাত ধরে নগরের অলিগলিতে পাহারা দিতে লাগল। চোর ধরা পড়ল না, চুরিও বন্ধ হল না। প্রতি বাড়িতে চুরি করে ফিরে যাওয়ার সময় চোর লিখে রাখে ‘আমি এসেছিলাম।’
শেষে নগরের সব লোকজন গিয়ে হাজির হল রাজপ্রাসাদে। রাজার কাছে গিয়ে বলল, ‘মহারাজ, আপনি আমাদের চোরের হাত থেকে বঁাচান।’
রাজা কিছুই জানেন না। নগরকোটালকে জিজ্ঞেস করতেই সেবলল, ‘হ্যাঁ মহারাজ, নগরে কোথা থেকে এক চোর এসেছে, আমরা অনেক চেষ্টা করেও তাকে ধরতে পারিনি।’
নগরকোটালের কথা শুনে ভীষণ রেগে গেলেন রাজা, ‘এত লোকজন নিয়ে একটা সাধারণ চোরকে তোমরা ধরতে পারলে না?’
নগরকোটাল মাথা নীচু করে বলল, ‘না মহারাজ, এ সাধারণ চোর নয়, এ জাদুমন্ত্র জানে।’
রাজা আরও রেগে গেলেন। বললেন, ‘আমি কোনো কথা শুনতে চাই না, তিনদিনের মধ্যে যদি চোর ধরতে না পারো তবে তোমার জায়গায় নতুন নগরপাল নিযুক্ত করব।’
নগরপাল মহাভাবনায় পড়ে গেল। কেমন করে চোর ধরবে। সারা রাত জেগে ঘুরে বেড়াতে লাগল কিন্তু চোর ধরতে পারল না। একদিন, দুদিন কেটে গেল। নগরপালের খাওয়া নেই, ঘুম নেই। যেমন করেই হোক আজ রাতের মধ্যে চোরকে ধরতে হবে।

সন্ধে হতে-না-হতেই নগরপাল বেরিয়ে পড়ল। ঘুরতে ঘুরতে এক বটগাছতলায় গিয়ে বসে পড়ল। পা দুটো টন টন করছে। ভাবল একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়বে।
চারদিক নি:ঝুম, কোত্থাও কোনো লোকজন নেই। হঠাৎ নগরকোটালের চোখে পড়ল একটা লোক গুটিগুটি পায়ে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল নগরকোটাল। লোকটার পেছনে হাঁটতে শুরু করে দিল। খানিক দূর গিয়ে একটা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল লোকটা। বাড়ির চারদিকে উঁচু পাঁচিল। লোকটা যেই-না পাঁচিল টপকে ভেতরে ঢুকতে যাবে নগরকোটাল গিয়ে তাকে জাপটে ধরল। লোকটা যতই ছাড়াবার চেষ্টা করে, ততই নগরকোটাল তাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার শুরু করে দিল।
নগরকোটালের চিৎকার শুনে চারদিক থেকে প্রহরীরা ছুটে এল। সবাই মিলে লোকটাকে বেঁধে নিয়ে চলল কয়েদখানায়। চারদিকে হইচই পড়ে গেল। চোর ধরা পড়েছে। রাজসভায় চোরকে নিয়ে আসা হল। চোরকে দেখে সবাই অবাক। সাদাসিধে রোগা হাড়জিরজিরে চেহারা। কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না এই সেই চোর।
রাজার সামনে যেতেই লোকটা হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল, ‘মহারাজ, আমি চোর নই। নগরপাল শুধু শুধু আমাকে ধরে নিয়ে এসেছে।’
নগরপাল তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘এঁর কথায় বিশ্বাস করবেন না মহারাজ। এই সেই চোর, ধরা পড়ে এখন কান্নাকাটি করছে।’
লোকটা রাজার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘আমি চোর নই মহারাজ।’
তার কান্নাকাটি শুনে আর চেহারা দেখে রাজার কেমন সন্দেহ হল। বললেন, ‘ঠিক আছে একে দশদিন কয়েদখানায় আটকে রাখো। তারপর এর বিচার করব।’
প্রহরীরা তাকে নিয়ে গেল। কয়েদখানায় আলাদা ঘরে আটকে রাখা হল। কয়েদখানার দেখাশুনার ভার কোতোয়ালের ওপর। কোতোয়াল ঘরে তালা দিয়ে নিজের কাছে চাবি রেখে দিল। সকালে-বিকেলে কোতোয়াল এসে তাকে দেখে যায়। শান্তশিষ্টের মতো বসে থাকে সে।
দেখতে দেখতে পাঁচদিন কেটে গেল। এই পাঁচদিন নগরে কোথাও কোনো চুরি হয়নি। নগরকোটাল বলল, ‘দেখলেন তো মহারাজ ওই লোকটাই চোর। এখন আর কোথাও চুরি হচ্ছে না।’
রাজা বললেন, ‘তুমি ঠিকই বলেছ, তবু আর পাঁচটা দিন দেখি তারপর ওকে শূলে চড়াব।’
ওদিকে কোতোয়াল রোজ কয়েদখানায় এসে চোরকে দেখে যায়। চোর কোনো কথা বলে না। ছয়দিনের দিন সকালবেলায় কোতোয়াল আসতেই চোর বলল, ‘হুজুর, আপনার সঙ্গে একটা গোপন কথা আছে।’
কোতোয়াল প্রহরীদের সরিয়ে দিয়ে বলল, ‘কী কথা বলো?’
চোর বলল, ‘হুজুর, সারা জীবন চুরি করে অনেক ধনসম্পত্তি পেয়েছি। এইবার রাজার আদেশে আমাকে মরতে হবে। আমার কেউ নেই, তাই মরবার আগে এইসব ধনসম্পত্তিও কাউকে দিয়ে যেতে চাই। আপনাকে দেখে আমার এত ভালো লেগেছে, আমি ঠিক করেছি আমার সব সম্পত্তি আপনাকেই দিয়ে যাব।’
ধনসম্পত্তির কথা শুনে কোতোয়ালের চোখ দুটো লোভে চক চক করে উঠল। সেবলল, ‘কোথায় আছে তোমার ধনসম্পত্তি?’
চোর বলল, ‘নগরের উত্তর দিকে যে ঝরনা আছে, সেই ঝরনার ধারে যে বটগাছ আছে, তার গোড়ায় একটা পাথর পড়ে আছে। পাথরটা সরিয়ে মাটি খুঁড়লেই সব সোনা পেয়ে যাবেন।’
কোতোয়ালের আর দেরি সয় না। তাড়াতাড়ি ঝরনার ধারে বটগাছতলায় গিয়ে মাটি খুঁড়তেই দ্যাখে ছোট্ট একটা পোঁটলা। পোঁটলা খুলতেই কোতোয়ালের চোখ ছানাবড়া। পোঁটলা-ভরতি সোনা রোদের আলোর মতো চকচক করছে। তাড়াতাড়ি জামার মধ্যে পোঁটলাটা লুকিয়ে নিয়ে বাড়িতে চলে গেল।
বিকেলবেলায় কয়েদখানায় যেতেই চোর বলল, ‘হুজুর সোনা পেয়েছেন?’
কোতোয়াল মহাখুশি। বলল, ‘তোমার আর কোথাও কিছু আছে না কি?’
চোর ফিসফিস করে বলল, ‘নগরের দক্ষিণ দিকে যে শিবমন্দির আছে তার পেছনে একটা নারকেল গাছ আছে, সেই গাছের গোড়ায় দেখবেন রূপোর গয়না আছে?’
রাতের অন্ধকারে সেখানে গিয়ে সব রূপো তুলে নিয়ে এল কোতোয়াল। পরদিন সকালে কোতোয়াল কয়েদখানায় আসতেই চোর বলল, ‘হুজুর, এবার পূর্ব দিকে চলে যান সেখানে একটা ভাঙা বাড়ি দেখবেন, সেই বাড়ির ঠিক মাঝখানে আমার সব মুক্তো পোঁতা আছে।’
মুক্তোর নাম শুনেই কোতোয়াল আর দাঁড়াল না। সব মুক্তো তুলে থলেয় পুরে বাড়িতে নিয়ে গেল। সন্ধে হতে-না-হতেই কোতোয়াল আবার কয়েদখানায় এসে চোরকে বলল, ‘আর কিছু আছে নাকি?’
চোর হেসে বলল, ‘এ আর কী পেয়েছেন হুজুর, আমার আসল জিনিসই তো আপনি পাননি।’
কোতোয়াল বলল, ‘সেসব কোথায় আছে?’
চোর হেসে বলল, ‘সব আপনাকে দিয়ে যাব, আমার আর কিছুই থাকবে না শুধু একটা ইচ্ছে বাকি রয়ে গেল।’
কোতোয়াল বলল, ‘কী ইচ্ছে বলো আমি তোমার ইচ্ছে পূর্ণ করব।’
চোর বলল, ‘আর তিনদিন পরেই আমাকে শূলে যেতে হবে। এই কয়দিন যদি মন্দিরে গিয়ে পুজো দিয়ে আসতে পারতাম, তবে এ জীবনে যত পাপ করেছি সব ক্ষয় হয়ে যেত।’
কোতোয়াল বলল, ‘তোমাকে আমি কয়েদখানা থেকে বাইরে নিয়ে যেতে পারব না। অন্য যা কিছু চাও আমি এনে দেব।’
চোর হাতজোড় করে বলল, ‘আমি আর কিছু চাই না হুজুর। শুধু একটিবার মন্দিরে গিয়ে পুজো দিয়ে আসব।’
কোতোয়াল বলল, ‘যদি তুমি পালিয়ে যাও তখন রাজা আমাকে শূলে চড়াবে।’
চোর বলল, ‘না হুজুর, আমি পালাব না, যদি আমার পালাবার ইচ্ছে থাকত তবে কি আমার সব সম্পত্তি আপনাকে দিয়ে যেতাম?’
কোতোয়ালের মনে হল চোর ঠিক কথাই বলেছে, তা ছাড়া যেতে না দিলে যদি চোর তার আসল ধনদৌলতের খবর না দেয়। সেবলল, ‘আমি এসে তোমাকে কয়েদখানার বাইরে নিয়ে যাব। রাত শেষ হওয়ার আগেই তুমি ফিরে আসবে।’
চোর বলল, ‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন হুজুর, আমি কোথাও পালাব না। আর ফিরে এসেই আমার বাকি সব ধনদৌলতের কথা বলব।’
রাত হতেই কোতোয়াল এসে চোরকে জেলখানার বাইরে নিয়ে গেল। চোর বলল, ‘আপনি এখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন আমি যাব আর আসব।’
চোর চলে গেলে কোতোয়াল একা বসে রইল। রাত শেষ হওয়ার আগেই চোর ফিরে এল। কোতোয়াল তাকে কয়েদখানায় পুরে চাবি নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল।
পরদিন সকাল হতেই চারদিকে হইচই। আবার নগরে চুরি হয়েছে। এবারও চোর সব সোনাদানা নিয়ে গিয়েছে। যাওয়ার সময় দরজার ওপরে লিখে গেছে ‘আমি এসেছিলাম।’
নগরপাল কয়েদখানায় ছুটে এল। দ্যাখে কয়েদখানার ঘরে চুপচাপ বসে আছে চোর। মুখ চুন করে ফিরে গেল নগরপাল। খানিক পরেই কোতোয়াল এসে হাজির। চোর বলল, ‘হুজুর, আজ আমি দুর্গামন্দিরে গিয়ে পুজো দিয়ে আসব। আর কাল সকালে সব কিছু বলে দেব।’
কোতোয়াল বলল, ‘রাত শেষ হওয়ার আগেই কিন্তু ফিরে আসবে।’
সেদিন রাতে মন্ত্রীর বাড়িতে চুরি হল। যাবার সময় চোর আগের মতোই দরজার ওপরে লিখে গেল, ‘আমি এসেছিলাম।’
সকাল হতেই মন্ত্রী গিয়ে নালিশ করল রাজার কাছে। রাজা নগরকোটালকে ডেকে বলল, ‘আবার নগরে চুরি শুরু হয়েছে। চোর কি কয়েদখানা থেকে পালিয়েছে?’
নগরকোটাল বলল, ‘না, হুজুর, সে-লোকটা তো কয়েদখানাতেই আছে, আমি কাল নিজে গিয়ে দেখে এসেছি।
মন্ত্রী বলল, ‘হুজুর, নগরকোটাল যাকে ধরেছে সেচোর নয়। চোর বাইরেই আছে।’
রাজা বললেন, ‘তুমি ঠিক বলেছ মন্ত্রী। শুধু শুধু একটা লোককে কয়েদখানায় রাখা হয়েছে। নগরকোটাল, তুমি এখনি গিয়ে তাকে ছেড়ে দাও। আর কালকের মধ্যে যেখান থেকে পারো চোরকে ধরে নিয়ে এসো।’
নগরকোটাল মাথা নীচু করে বেরিয়ে গেল। সোজা কয়েদখানায় গিয়ে কোতোয়ালকে বলল, ‘যাকে চোর বলে ধরে এনেছিলাম, তাকে এখনি ছেড়ে দাও।’
কোতোয়াল গিয়ে দরজা খুলে দিয়ে বলল, ‘তোমার ছুটি, আর তোমাকে কয়েদখানায় থাকতে হবে না।’
চোর চলে গেল। কোতোয়ালের খুব আনন্দ। কত সহজে চোরের ধনসম্পত্তি পাওয়া গেল। রাতেরবেলায় তার সেকী ঘুম। সকালবেলায় ঘুম ভাঙতেই দেখে ঘরের দরজা খোলা, তাড়াতাড়ি ভেতরের ঘরে গিয়ে সিন্দুক খুলতেই মাথায় হাত। সারাজীবন ধরে যা কিছু আয় করেছিল সব নিয়ে সিন্দুক খালি করে দিয়ে গেছে চোর। যাওয়ার আগে সিন্দুকের ওপর বড়ো বড়ো করে লিখে দিয়ে গেছে ‘আমি এসেছিলাম।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন