রসিক রাজু

চঞ্চলকুমার ঘোষ

এক গাঁয়ে ছিল এক নাপিত। নাম রাজু ওয়াংখুড়ু। রাজু ছিল যেমন বুদ্ধিমান তেমনি চালাক। লোকের কোনো অসুবিধে হলেই, রাজুর কাছে আসত পরামর্শ নিতে। কাউকে ফেরাত না রাজু। একটু একটু করে রাজুর নাম ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে।

সেই দেশের রাজার কানে গিয়েও পৌঁছেছিল রাজুর কথা। রাজা ডেকে পাঠালেন রাজুকে।

রাজু কোনো গ্রামের বাইরে যায়নি। এই প্রথম রাজদরবারে এসে দাঁড়াল। যা কিছু দ্যাখে সব নতুন তার কাছে। সেএকটুও ঘাবড়াল না। রাজাও তার সঙ্গে কথা বলে খুব খুশি। রাজুকে রাজসভার সভাসদ করে নিল। কিছুদিন যেতেই রাজু রাজসভার সকলের প্রিয় হয়ে উঠল। শুধু একজনের ব্যাপারটা ভালো লাগল না। সেরাজার শালা বীরভূজ। সব সময় সুযোগ খুঁজতে লাগল কি করে রাজুকে ঠকানো যায়।

একদিন রাজা শিবের মন্দিরে গিয়েছেন পুজো দিতে। সঙ্গে রাজু আর বীরভূজ। পাহাড়ের গায়ে মন্দির। চারদিকে সুন্দর দৃশ্য। হঠাৎ বীরভূজ দেখতে পেল, এক নাক-কাটা সাধু মন্দিরের একটু দূরে পথের পাশে বসে ভিক্ষে করছে। সাথে সাথে তার মাথায় দুষ্টুবুদ্ধি জাগল। রাজার দিকে চেয়ে বলল, ‘ওই দেখুন মহারাজ এক নাক কাটা সাধু।’

রাজা বললেন, ‘নাক-কাটা সাধু তো আগে কোনোদিন দেখিনি।’

বীরভূজ বলল, ‘আমিও দেখিনি, রাজু নিশ্চয়ই দেখেছে।’

রাজু কিছু না ভেবেই বলল, ‘হ্যাঁ মহারাজ কত দেখেছি।’

‘তাদের সবার নাক-কাটা?’

বীরভূজ বলল, ‘হ্যাঁ মহারাজ নাক-কাটা সাধুদের সকলের নাক-কাটা।’

‘সবার নাক-কাটা কেন?’

বীরভূজ মনে মনে ভাবল, এইবার রাজুকে জব্দ করব। বলল, ‘রাজু নিশ্চয়ই জানে মহারাজ।’

রাজু বুঝতে পারল, এ সবই বীরভূজের চালাকি, হাসতে হাসতে বলল, ‘সেএক মজার গল্প মহারাজ। এক ব্রাহ্মণ হিমালয়ে গিয়েছিল তীর্থ করতে। পথে এক ডাকাতের গ্রাম। ব্রাহ্মণ সেকথা জানত না। গ্রামের পাশ দিয়ে যাবার সময় ডাকাতরা তাকে ধরে ফেলল। ব্রাহ্মণ খুব গরিব। তার কাছে কিছু ছিল না। কিছু না-পেয়ে ডাকাতরা ব্রাহ্মণের নাক কেটে ছেড়ে দিল। কাটা নাক নিয়ে ব্রাহ্মণ আর লোকজনের কাছে যেতে পারে না। যে দেখে সেই ভেঙায়। ওই দ্যাখ নাক কাটা ব্রাহ্মণ।

লজ্জায় দুঃখে ব্রাহ্মণ আর বাড়ি ফিরে গেল না। জঙ্গলের ধারে ঘর বেঁধে রয়ে গেল। কাঠুরেরা জঙ্গলে কাঠ কাটতে যায়। তারা নাক-কাটা ব্রাহ্মণকে দেখে ভাবল নিশ্চই কোনো মস্ত বড়ো সাধু জঙ্গলে তপস্যা করতে এসেছে। রোজ তারা ব্রাহ্মণকে খাবার দিয়ে যেত। পাছে কেউ কিছু বলে, সেই লজ্জায় ব্রাহ্মণ কারও সঙ্গে কথা বলত না।

দেখতে দেখতে কিছুদিনের মধ্যেই ব্রাহ্মণের নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন আসতে আরম্ভ করল। একদিন এক চাষির ছেলে এসে বলল, প্রভু আমি আপনার শিষ্য হতে চাই।

ব্রাহ্মণ বলল, ‘ঠিক আছে তুমি আমার আশ্রমে থাকো, তিন দিন পর তোমাকে দীক্ষা দেব।’

চাষির ছেলের খুব আনন্দ। সেব্রাহ্মণের কাছে রয়ে গেল। তিন দিন পর ব্রাহ্মণ তাকে ডেকে বলল, ‘এসো আজ তোমাকে দীক্ষা দেব।’

চাষির ছেলে সামনে এসে বসতেই ব্রাহ্মণ বলল, ‘এইবার চোখ বোজো।’

চাষির ছেলে চোখ বুজতেই ব্রাহ্মণ এক কোপে তার নাকটা কেটে দিল। চাষির ছেলে যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল, ‘এ কী করলেন প্রভু?’

ব্রাহ্মণ বলল, ‘তোমাকে দীক্ষা দিলাম। এরপর তুমি যখন কাউকে দীক্ষা দেবে তুমিও তার নাক কেটে দেবে। সেই থেকে নাক-কাটা সাধুর দল তৈরি হল।’

রাজুর কথা শুনে রাজা খুব খুশি। আর বীরভূজ—তার মুখে কোনো কথা নেই।

ব্রাহ্মণভোজন

একদিন রাজু তার গ্রামে চলেছে। পাহাড়ের গা বেয়ে রাস্তা। মাঝে মাঝে ছোটো ছোটো গ্রাম। আপন মনে হাঁটছিল রাজু। হঠাৎ কান্নার আওয়াজ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। এদিক ওদিক তাকাতেই চোখে পড়ল অল্পবয়সি একটা ছেলে আপন মনে কেঁদে চলেছে।

রাজুর কেমন মায়া হল। কাছে গিয়ে বলল, ‘খোকা কী হয়েছে, তুমি এখানে বসে কাঁদছ কেন?’

ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘বাবা পাহাড়ে মহিষ চরাত। হঠাৎ একটা মহিষ খেপে গিয়ে শিং দিয়ে বাবার পেট ফুটো করে মেরে ফেলল।’

এইটুকু ছেলের বাবা মারা গিয়েছে। খারাপ লাগছিল রাজুর। তার পিঠে হাত দিয়ে বলল, ‘কাঁদিস না। তোর বাবা স্বর্গে চলে গিয়েছে। কাঁদলে তার আত্মার কষ্ট হবে।’

ছেলেটা তবু কান্না থামায় না। কাঁদতে কাঁদতেই বলল, ‘আমি বাবার জন্যে কাঁদছি না।’

অবাক গলায় রাজু বলল, ‘তাহলে কাঁদছিস কেন?’

আমাদের গ্রামের পুরোহিতরা বলেছে, ‘তোর বাবা মহিষের গুঁতোয় মারা গিয়েছে। শাস্ত্রে আছে মহিষের হাতে কেউ মারা পড়লে যে যা যা খেতে ভালোবাসত, গ্রামের সব লোককে তাই খাওয়াতে হবে। নয়তো তোর বাবার আত্মা শান্তি পাবে না। আমরা গরিব মানুষ। মা ছাড়া আমার কেউ নেই। গাঁয়ের সব মানুষকে খাওয়ার কী করে।’

রাজু বুঝতে পারল, এ সব গ্রামের পুরোহিত আর ব্রাহ্মণদের চালাকি। কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বলল, ‘আমি যা বলব সেই মতো কাজ করতে পারবি?’

ছেলেটা বলল, ‘পারব।’

রাজু বলল, ‘কী নাম তোর?’

‘দীনু।’

রাজু বলল, ‘তুই কিছু চিন্তা করিস না দিনু। আজ বাড়ি ফিরে গ্রামের সব ব্রাহ্মণ আর লোকজনকে নেমন্তন্ন করবি। তারপর কী করতে হবে ঠিক সময়ে বলে দেব।’

দিনুর মন থেকে সব সন্দেহ যায় না। বলল, ‘বাবার শ্রাদ্ধের দিন যখন সব লোক আসবে, তখন আমি কী করব?’

রাজু বলল, ‘তোর বাবার শ্রাদ্ধের দিন ভোরবেলায় আমি তোদের বাড়িতে পৌঁছে যাব। তারপর আর কিছু চিন্তা করতে হবে না।’

দিনু এবার নিশ্চিন্ত মনে বাড়ি ফিরে গেল। দেখতে দেখতে দিনুর বাবার শ্রাদ্ধের দিন এসে পড়ল। সকাল থেকে দলে দলে ব্রাহ্মণ এসে হাজির। আগে ব্রাহ্মণরা খাবে, তারপর গ্রামের লোকজন খাবে।

দিনু সব ব্রাহ্মণকে বাড়ির ভেতরে এক জায়গায় নিয়ে গেল। পর পর আসন পাতা। সামনে পাতার থালা। গেলাসে জল। ভেতর থেকে খাবারের গন্ধ ভেসে আসছে। ব্রাহ্মণদের আর দেরি সয় না, তাড়াতাড়ি সবাই আসনে বসে পড়ল।

দিনু হাতজোড় করে বলল, ‘আপনারা একটু বসুন আমি খাবার নিয়ে আসছি।’

ব্রাহ্মণরা সবাই বসে আছে। খাবার আর আসে না। খানিক পর একজন বলল, ‘কী রে দিনু খাবার কোথায়? খিদেতে পেট চো-চো করছে।’

দিনু তাড়াতাড়ি বলল, ‘খাবার হয়ে গেছে এখনই নিয়ে আসছি।’

দিনুর বাড়ির পাশেই ছিল মহিষের ঘর। দিনু এক দৌড়ে সেখানে গিয়ে এক ঝুড়ি ঘাসপাতা নিয়ে এল। তার সঙ্গে রাজু।

দিনু এক-একজন ব্রাহ্মণের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় আর রাজু লম্বা হাতায় করে ঘাসপাতা তুলে ব্রাহ্মণের পাতে দেয়।

রাগে ব্রাহ্মণরা চেঁচিয়ে ওঠে, ‘এ কি পাতে ঘাসপাতা কেন?’

দিনু বলে, ‘আপনারা খাবেন বলে।’

এক বুড়ো ব্রাহ্মণ বলে, ‘তোর কি মাথা খারাপ আমরা ঘাস পাতা খাব।’

দিনু বলল, ‘কেন আপনারাই তো বলেছেন, বাবা যা খেতে ভালোবাসেন তাই ব্রাহ্মণদের খাওয়াতে হবে।’

‘তোর বাবা কি মহিষ, যে ঘাসপাতা খেতে ভালোবাসত।’

দিনু বলল, ‘আপনারা ঠিকই বলেছেন বাবা তো এখন মহিষ।’

সকলে এ-ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। একজন বলল, ‘কে বলেছে এখন তোর বাবা মহিষ।’

দিনু হাতজোড় করে বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখেছি। বাবা মারা যাবার পর মহিষ হয়ে জন্মেছেন। মাঠে ঘাসপাতা খাচ্ছেন। কাছে যেতেই বললেন এখন আমি আর আগের মতো ভাত-ডাল খাই না। ঘাসপাতা খাই। এইসব খেতেই আমার ভালো লাগে। তুই ব্রাহ্মণদের এই খাবার দিস। তাহলেই আমার আত্মা শান্তি পাবে। সেই জন্যে ঘাসপাতা দিয়েছি। আপনারা না-খেলে বাবা খুব কষ্ট পাবেন।’

ব্রাহ্মণদের মুখে আর কোনো কথা নেই। সবাই উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আজ আমাদের খিদে নেই পরে একদিন খাব।’

আর দাঁড়াল না কেউ। তাড়াতাড়ি যে-যার আসন ছেড়ে উঠে বাড়ির দিকে হাঁটতে আরম্ভ করল।

অধ্যায় ৩৩ / ৩৩
সকল অধ্যায়
১.
ওঝা ও পাহাড়ি ভূত
২.
দুই সূর্য
৩.
মহিষ ও রাখালছেলে
৪.
তিন বন্ধু
৫.
বাঘ মামার কথা
৬.
কুঁজো আর অন্ধ
৭.
দেবতার অভিশাপ
৮.
সাতবোকা
৯.
বাহাদুর আর এক-পা-ওলা দৈত্য
১০.
সাধু ও মহাজন
১১.
চালাক ভোলানাথ
১২.
বামুন আর শেয়াল
১৩.
আকাশপুরীর রাজকন্যা
১৪.
অতি চালাকের গলায় দড়ি
১৫.
তিন জামাই
১৬.
শেয়ালবউ-এর বুদ্ধি
১৭.
শেয়াল আর বোকা বাঘ
১৮.
বুদ্ধিমান চোর
১৯.
শুয়োরের শিং
২০.
রাখালছেলে ও পরির দেশের রাজকন্যা
২১.
তাঁতির কুঁজ
২২.
চার চোর
২৩.
কাঠুরে নাপিত আর রাজকন্যা
২৪.
মহেশ্বর
২৫.
আয়না
২৬.
শেয়াল ও বুড়োবুড়ি
২৭.
এক দাঁত ফোকলা
২৮.
বুদ্ধি থাকলেই উপায় হয়
২৯.
ভীম আর জলদৈত্য
৩০.
চার ভাই
৩১.
সুরের জাদু
৩২.
ভূত ও ভূতনাথ
৩৩.
রসিক রাজু

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%