চঞ্চলকুমার ঘোষ
তিন বন্ধু—শেয়াল, কাক আর খরগোশ। ভারি ভাব তিনজনে। একসঙ্গে ঘোরে-ফেরে, যা পায় ভাগ করে খায়। কখনো ঝগড়া-বিবাদ হয় না।
একদিন পাহাড়ের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল এক লামা। বুড়োমানুষ যেতে যেতে হঠাৎ পথের মাঝে পড়ে মারা গেল। কারোর চোখে পড়বার আগেই কাকের চোখ পড়ল তার দিকে। তাড়াতাড়ি কাক উড়ে গিয়ে খবর দিল খরগোশ আর শেয়ালকে। তিনজন এসে দেখে মাটিতে পড়ে রয়েছে লামার মরা দেহ। তার পাশে রয়েছে একটা পোঁটলা, একখানা চশমা আর একজোড়া জুতো।
শেয়াল ও কাক ভেবে পেল না কে কী নেবে। তারা খরগোশকে বলল, সব কিছু ভাগ করে দিতে।
খরগোশ খানিক চিন্তাভাবনা করে বলল, ‘শেয়াল, তুমি লামার জুতো দুটো নাও। আমাদের মধ্যে তোমাকেই সবচেয়ে কষ্ট করে শিকার করতে হয়। বর্ষাকালে কত জল-কাদা পার হতে হয়। শীতকালে বরফে পা জমে যায়। পাথরে হোঁচট খেয়ে ব্যথা হয়। তুমি যদি এই জুতো দুটো পরে শিকার করতে যাও তাহলে তোমার আর কোনো কষ্ট হবে না।’
খরগোশের কথা মনে ধরল শেয়ালের। লামার পড়ে-থাকা জুতো দু-খানা নিজের ঝোলায় তুলে নিল। তারপর কাকের দিকে চেয়ে খরগোশ বলল, ‘তোমাকে তো উড়ে উড়ে শিকার করতে হয়, ঝোপজঙ্গলে কোথায় খাবার পড়ে থাকে সব সময় দেখতে পাও না, তুমি এই চশমাটা নাও। চোখে পরে থাকলে অনেক দূরের জিনিস দেখতে পাবে। খাবার খুঁজে পেতে আর একটুও কষ্ট হবে না।’
খরগোশের কথায় কাকের খুব আনন্দ হল। চশমা চোখে পরতেই চেঁচিয়ে উঠল, ‘সত্যিই তো কত দূরের জিনিস দেখতে পাচ্ছি।’
খরগোশ তখন কাপড়ের পোঁটলা দেখিয়ে বলল, ‘তোমাদের সব কিছু দিয়ে দিলাম, এই পোঁটলাটা আমার থাক।’
কাক আর শেয়াল বলল, ‘ওটা আমাদের কোনো কাজে লাগবে না, ওটা তুমি নাও।’
তিনজনে যে-যার মতো জিনিস নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। খরগোশ পোঁটলাটা টানতে টানতে নিজের ঘরে গিয়ে দ্যাখে তার ভেতরে কত খাবার। এত খাবার কোনোদিন দেখেনি খরগোশ। মজা করে কিছুটা খাবার খেল আর বাকিটা পরে খাবে বলে এক কোণে লুকিয়ে রাখল।
কয়েকদিন বাদেই জঙ্গলে বৃষ্টি নামল। কাদায় আর পথেঘাটে চলা যায় না। শেয়ালের মহা মুশকিল। ঘর থেকে বেরোতে না পারলে শিকার পাওয়া যাবে না। হঠাৎ মনে পড়ল জুতোর কথা। ভাবল ভাগ্যিস খরগোশ জুতোটা দিয়েছিল। তাড়াতাড়ি দুটো জুতো দুই পায়ে পরে শিকার করতে বেরিয়ে পড়ল।
পায়ে আর একটুও কাদা লাগছে না শেয়ালের। এ-পথ সে-পথ ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ চোখে পড়ল ঝোপের আড়ালে একটা মোটাসোটা ছাগলছানা। জিভে জল এসে গেল শেয়ালের।
কপাল খারাপ শেয়ালের। লাফ মারতেই কাদায় জুতো পিছলে ছিটকে পড়ল গাছের গোড়ায়। ভয় পেয়ে ছাগল ছুটে পালাল। শেয়াল কোনোরকমে উঠে দাঁড়াল। পা মুচকে আর হাঁটতেই পারে না। রাগের চোটে জুতো দুটো ছুড়ে ফেলে দিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে বাড়ি ফিরে গেল। ভাবল এ খরগোশের শয়তানি, তাকে বিপদে ফেলবার জন্যেই লামার জুতো দুটো দিয়েছিল।
ওদিকে কাক চারদিকে তাকায়, কোথায় খাবার পাওয়া যায়। বৃষ্টিতে কিছুই দেখতে পায় না। হঠাৎ মনে পড়ে গেল দূরের জিনিস দেখবার জন্য খরগোশ তাকে একখানা চশমা দিয়েছিল। তাড়াতাড়ি বাসা থেকে চশমাটা বের করে চোখে এঁটে নিল। সবকিছু কত বড়ো বড়ো দেখা যাচ্ছে। সামনের একটা ডালে কী যেন নড়ছে। কাক উড়ে গিয়ে ডালে বসতেই মচমচ করে ডাল কাত হয়ে পড়ল। আচমকা গাছের ডাল যে এভাবে কাত হবে বুঝতে পারেনি কাক। সোজা গিয়ে পড়ল নীচে কাঁটাঝোপের মধ্যে। ঝোঁপ থেকে বেরোতে সারা শরীর কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল। চশমা ছিটকে গিয়ে পড়ল কাদার মধ্যে।
এ-রকম কেন হল? মাথা তুলে কাক উপরের দিকে তাকাতেই দেখে সরু এক ডালে সেবসে ছিল। তাহলে ওই চশমা পরেই সরু ডালকে মোটা দেখাচ্ছিল। রাগে কা কা করে ডেকে উঠল কাক। তাকে বিপদে ফেলবার জন্যেই এ খরগোশের শয়তানি।
কাক উড়ে গেল শেয়ালের কাছে। দু-জনেই বলল, ‘খরগোশের জন্যেই আমাদের এই দুরবস্থা, এর একটা বিহিত করতে হবে।’
নিজের ঘরে বসে খাবার খাচ্ছিল খরগোশ। দূর থেকে শেয়াল আর কাককে আসতে দেখেই খরগোশ অনুমান করতে পারল খারাপ কিছু একটা ঘটেছে। তাড়াতাড়ি মাটিতে নাক ঘষে খানিকটা ছাল-চামড়া তুলে চিৎপাত হয়ে শুয়ে রইল।
কাক আর শেয়াল খরগোশের ঘরে ঢুকতেই দেখে খরগোশ মাটিতে শুয়ে ছটফট করছে। শেয়াল জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে তোমার?’

খরগোশ কাঁদো-কাঁদো গলায় বলল, ‘কী আর বলব, লামার কাছে যে পোঁটলাটা ছিল সেটা খুলতে গিয়েই আমার নাকে এমন লাগল যে এখনো যন্ত্রণা কমেনি।’
খরগোশের কথা শুনে শেয়াল বলল, ‘তবে তো দেখছি লামার জিনিস নিয়ে আমাদের তিন জনেরই মহা অনর্থ হয়েছে। নিশ্চয়ই ওতে জাদু করা ছিল।’
খরগোশকে সান্ত্বনা দিয়ে শেয়াল আর কাক চলে গেল। দু-জনে চলে যেতেই খরগোশ পোঁটলা খুলে খাবার বের করে আবার খেতে শুরু করে দিল।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন