সমরেশ মজুমদার

প্রথম পরিচ্ছেদ
ক্ষেত্রমোহনবাবুর অষ্টাদশবর্ষব্যাপী দাম্পত্যজীবন স্ত্রীর সহিত যুদ্ধবিগ্রহ ও সন্ধি করিতে করিতেই কাটিয়াছে। এমন রণরঙ্গিণী স্ত্রী বঙ্গদেশে প্রায়ই দেখা যায় না।
ক্ষেত্রমোহনের বয়স এখন চল্লিশ বৎসর। স্ত্রী রসময়ীর বয়স ত্রিশ। 'রসময়ী!'—এ নাম যে রাখিয়াছিল, বলিহারি তাহার প্রতিভা! তবে রসও ত অনেকগুলি আছে কি না—এ ক্ষেত্রে রৌদ্ররস!
ক্ষেত্রমোহন একজন বাঙ্গলানবীস মোক্তার; হুগলিতে থাকিয়া বেশ দুই পয়সা উপার্জ্জন করেন। বাড়ি তাঁহার হুগলিতে নহে—জেলার মধ্যে কোন এক পল্লীগ্রামে। তবে কয়েক বৎসর হুগলিতে নিজ বাটি নির্মাণ করিয়া বাস করিতেছেন।
দু:খের বিষয় এ পর্যন্ত ক্ষেত্রমোহনের সন্তানাদি কিছুই হয় নাই—স্ত্রীর যেরূপ বয়স আর হইবার ভরসাও নাই। অনেকদিন তাঁহার মাসি পিসি প্রভৃতি পুনর্ব্বার বিবাহ করিবার জন্য তাঁহাকে অনুরোধ করিতেছেন। ক্ষেত্রমোহনের আন্তরিক বাসনাও তাহাই। কিন্তু রসময়ীর ভয়ে এ-পর্যন্ত এ-বিষয়ে কোনোরূপ চেষ্টাচরিত্র করিতে সাহস করেন নাই।
ইতিমধ্যে সামান্য একটা ঘটনা উপলক্ষে রসময়ী ভয়ানক বিপ্লবের সৃষ্টি করিয়া ক্ষেত্রমোহনকে দুই দিন গৃহছাড়া করিল। অবশেষে নিজে তাহার পিত্রালয় হালিশহরে চলিয়া গেল। ক্ষেত্রমোহন তখন সাহসে ভর করিয়া গৃহে ফিরিয়া আসিলেন এবং প্রতিজ্ঞা করিলেন, রসময়ীর আর মুখদর্শন করিবেন না—অন্যত্র বিবাহ করিবেন। এ বাড়িতে রসময়ীকে আর ঢুকিতে দিবেন না—এই শেষ।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
হালিশহর গ্রামটি হুগলিরই অপর পারে—মধ্যে গঙ্গা প্রবাহিতা। চৌধুরী পাড়ায় রসময়ীর পিত্রালয়। অনেক দিন হইল তাহার পিতামাতার কাল হইয়াছে। এখন সে বাড়িতে রসময়ীর বিধবা দিদি বিনোদিনী এবং তাহার দুইটি ছোট ভাই নবীন ও সুবোধ বাস করে। নবীন কাঁচড়াপাড়ার কারখানায় কর্ম করে; সুবোধ স্কুল ছাড়িয়া এখন বাড়িতেই বসিয়া আছে— এখনও কিছু জুটে নাই।
মাসাধিক কাল রসময়ী হালিশহরে বাস করিতেছে। পূর্ব্বে পূর্ব্বে এরূপ স্থলে দুই চারিদিন বা বড় জোর এক সপ্তাহ পরে, দন্তে তৃণ করিয়া ক্ষেত্রমোহন আসিয়া উপস্থিত হইতেন এবং কত সাধ্যসাধনা করিয়া স্ত্রীকে গৃহে ফিরাইয়া লইয়া যাইতেন। কিন্তু এবার সে নিয়মের ব্যতিক্রম দেখিয়া রসময়ী কিছু চিন্তিত হইয়া পড়িয়াছে।
পাড়ার একজন বালক প্রত্যহ নৌকাযোগে গঙ্গাপার হইয়া হুগলি ব্রাঞ্চ স্কুলে পড়িতে যাইত। সে ছেলেটি গ্রামে প্রচার করিয়া দিল—ক্ষেত্রমোহনবাবুর বিবাহ; দিনস্থির হইয়া গিয়াছে।
এই কথা শুনিয়া রসময়ীর দিদি বিনোদিনী একদিন বৈকালে ছেলেটিকে বাড়িতে ডাকিয়া আনিলেন। তাহাকে সন্দেশ ও রসগোল্লা খাইতে দিয়া বলিলেন, 'বাবা, শুনলাম নাকি আমাদের ক্ষেত্তর আবার বিয়ে করছে? এ কথা কি সত্যি?'
বালক বলিল—'হ্যাঁ সত্যি বৈকি! আমাদের ক্লাশে সুরেশ বলে একটি ছেলে পড়ে, চুচঁড়োয় তার মামার বাড়ি। তারই মামাতো বোনের সঙ্গে বিয়ে।'
'ঠিক জান?'
'জানি বৈকি। সুরেশই ত আমাকে বলেছে। দিনস্থির পর্যন্ত হয়ে গেছে।'
'তার মামার নাম কি?'
'নাম হরিশচন্দ্র চাটুয্যে। জজ আদালতে কাজ করেন।'
'তাদের বাড়িটি তুমি চেন বাবা?'
'হাঁ চিনি বৈকি। সুরেশের সঙ্গে কতবার গিয়েছি!'
'কত বড় মেয়ে?'
'এই আমাদের বয়সীই হবে।'—বালকটির বয়স ত্রয়োদশ বৎসর!
'কেমন দেখতে?'
'তা—বেশ সুন্দর।'
বিনোদিনী কিয়ৎক্ষণ চিন্তা করিলেন। শেষে বলিলেন,—'আচ্ছা, কাল একবার আমাদের দু'বোনকে সে বাড়িতে নিয়ে যেতে পারো বাবা?'
'কেন?'
'তাদের একবার মিনতি করে বলে দেখি। বিয়ে হলে আমার বোনটিরও সুখ হবে না— তার মেয়েও জলে পড়বে। কাল একবার আমাদের নিয়ে চল।'
'কখন?'
'এই—খাওয়া দাওয়ার পরে?'
'আমার ইস্কুল কামাই হবে যে?'
'একদিনের জন্যে মাস্টারের কাছে ছুটি নিও এখন? আমি বরং তোমায় একটি টাকা দেব—ঘুড়ি, নাটাই এ সব কিনো।'
বালকটি ব্যগ্রভাবে নিজ সম্মতি জানাইল।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
পরদিন বেলা এগারোটার সময় দুই ভগিনীকে লইয়া বালকটি চুচঁড়ো যাত্রা করিল। গঙ্গাপার হইয়া, ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করিয়া, মাধবীতলায় হরিশবাবুর গৃহে গিয়া উপস্থিত হইল। খিড়কি দরজার সম্মুখে দাঁড়াইল।
রসময়ী বলিল—'এই বাড়ি?'
'হ্যাঁ।'
'আচ্ছা, তুমি গাড়ির ভিতর বসে থাক। আমরা চট করে ওঁদের সঙ্গে দেখাটা করে আসি'। —বলিয়া দুইজনেই অবতরণ করিয়া বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করিল।
সে বাড়ির মেয়েরা কেহ তখন স্নান করিতেছে, কেহ খাইতে বসিয়াছে, কেহ বা আহারান্তে উঠানে বসিয়া চুল শুকাইতেছে। হঠাৎ দুইজন ভদ্রঘরের অপরিচিতা স্ত্রীলোককে প্রবেশ করিতে দেখিয়া একজন সবিস্ময়ে বলিল—'তোমরা কারা গা?'
বিনোদিনী বলিল—'আমরা হালিশহর থেকে তোমাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।'
স্ত্রীলোকটি সন্দিগ্ধভাবে বলিল—'এস—বস।'
দুইজনে বারান্দায় উঠিয়া উপবেশন করিয়া বলিল—'বাড়ির গিন্নী কোনটি?'
একজন প্রৌঢ়াকে দেখাইয়া সকলে বলিল—'ইনি গিন্নী।'
গৃহিণী বলিলেন—'তোমরা কি মনে করে এসেছ বাছা?'
বিনোদিনী বলিল—'তোমাদের মেয়ের নাকি বিয়ে?'
গৃহিণী বলিলেন, 'হ্যাঁ—আমার ছোট মেয়েটির বিয়ে।'
'কবে?'
'এই বিশে মাঘ দিনস্থির হয়েছে।'
'পাত্রটি কে?'
'ক্ষেত্রমোহন চক্রবর্তী—হুগলিতে মোক্তারি করেন।'
'সতীনের উপর মেয়ে দিচ্ছ বাছা?'
গৃহিণীর বিস্ময় প্রতি কথায় বাড়িয়া চলিয়াছিল। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন,—'তোমরা চেন নাকি?'
বিনোদিনী বলিল—'চিনিনে আবার—খুব চিনি! আমাদের গ্রামেই ত বিয়ে করেছে।'
গৃহিণী বলিলেন—'হ্যাঁ—সতীন আছে বটে—কিন্তু সে স্ত্রীকে পরিত্যাগ করেছে।'
রসময়ী এতক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়া শুনিতেছিল, তাহার মনের রাগ ক্রমশই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইতেছিল। এই কথা শুনিয়া হস্তপদ ঠক-ঠক করিয়া কাঁপিতে লাগিল—চক্ষু দুইটি লাল হইয়া উঠিল।
বিনোদিনী জিজ্ঞাসা করিল—'কেন পরিত্যাগ করেছে কিছু শুনেছ গা?'
'শুনেছি সে নাকি বড় দজ্জাল!'
শ্রবণমাত্র রসময়ী তড়াক করিয়া লাফাইয়া উঠিল। বারান্দার কোণে ছিল একগাছা ঝাঁটা। নিমেষ মধ্যে সেইটা দুই হস্তে ধরিয়া গৃহিণীর উপর সপাসপ মারিতে আরম্ভ করিল। সঙ্গে সঙ্গে বলিতে লাগিল— 'কেন?—কেন?—আর কি মরবার জায়গা পেলে না?—জায়গা পেলে না—আমার সোয়ামি ছাড়া কি তোমার মেয়ের অন্য পাত্তর জুটলো না? জুটলো না?—'
এই অভাবনীয় ঘটনায় বাড়ির লোকে ক্ষণকালের জন্য হতবুদ্ধি হইয়া গেল। তাহার পর মহা গণ্ডগোল আরম্ভ হইল। অল্পবয়স্কা বালিকারা কাঁদিয়া ছুটিয়া কেহ খাটের নিচে, কেহ সিন্দুকের আড়ালে লুকাইল। বাড়ির ঝি বসিয়া বাসন মাজিতেছিল, সে বাসন ফেলিয়া—'ওরে খুন কল্লে রে—খুন কল্লে রে—সেপাই—এ সেপাই—এ পাহারাওয়ালা'—বলিয়া ঊর্ধশ্বাসে ছুটিয়া রাস্তায় বাহির হইয়া পড়িল।
বাড়ির অপর মেয়েরা আসিয়া রসময়ীকে ধরিয়া ফেলিল। রসময়ী তখন গৃহিণীকে ছাড়িয়া তাহাদের উপর কিল চড় ও নিষ্ঠীবন-বৃষ্টি করিতে লাগল। কাহারও কাপড় ছিঁড়িয়া দিল, কাহারও চুল ছিঁড়িয়া দিল, কাহাকেও খামচাইয়া দিল, কাহাকেও কামড়াইয়া দিল। হাঁফাইতে-হাঁফাইতে বলিতে লাগিল—'কনেটি গেল কোথা? তাকে একবার বের কর না। চোখ দুটো গেলে দিয়ে যাই! নাকটা কেটে দিয়ে যাই! দাঁতগুলো ভেঙ্গে দিয়ে যাই।'
বিনোদিনী এতক্ষণ চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া ছিল। ক্রমে সদর দরজার লোক হৈ-হৈ করিতে লাগিল। তখন সে বলিল—'রসময়ী—থাম থাম ক্ষ্যামা দে বোন—খুব হয়েছে। চল বাড়ি চল।'
ঝি ছুটিয়া বাড়িতে প্রবেশ করিয়া বলিল—'ওগো যেতে দিওনি—থানায় খবর দিয়ে এসেছি, দারোগা আসছে।'
পুলিশের নাম শুনিয়া রসময়ী বলিল—'চল দিদি, চল।'
'যাবে কোথা—দারোগা আসুক তবে যেও।'—বলিয়া দুই তিনটি স্ত্রীলোক রসময়ীকে ধরিতে অগ্রসর হইল।
রসময়ী এক লম্ভে উঠানের কোণ হইতে আঁশবঁটিখানা সংগ্রহ করিয়া মাথার উপর সবেগে ঘুরাইয়া বলিল—'খুন চেপেছে—আমার খুন চেপেছে—সবাইকে খুন করে ফাঁসি যাব!'
ইহা দেখিয়া সমস্ত স্ত্রীলোক 'মা গো:' বলিয়া ছুটিয়া ঘরে ঢুকিয়া দুয়ার বন্ধ করিয়া দিল। 'পাহারাওয়ালা—এ পাহারাওয়ালা—আসামী পালায়'—বলিয়া চিৎকার করিতে-করিতে ঝি পুনশ্চ রাস্তায় বাহির হইয়া পড়িল।
রসময়ী তখন দিদির সহিত খিড়কি দরজা দিয়া বাহির হইয়া গাড়িতে উঠিয়া বলিল—'পারঘাটে চল।'
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
বলাবাহুল্য, হরিশ্চন্দ্রবাবু ক্ষেত্রমোহনকে কন্যাদান করিলেন না। তাঁহার গৃহিণী বলিলেন—'সে খুনে মেয়েমানুষ, বিয়ে দিলে আমার মেয়েকে খুন করে ফেলবে। তুমি অন্যত্র চেষ্টা দেখ।'
পরদিন কাছারিতে গিয়া হরিশবাবুর মুখে ক্ষেত্রমোহন সকল কথাই শ্রবণ করিলেন। রাগে তাঁহার সর্বশরীর জ্বলিতে লাগিল।
কাছারি হইতে বাড়ি ফিরিয়া, হাত মুখ ধুইয়া, অন্ত:পুরে বসিয়া ক্ষেত্রবাবু তামাক খাইতেছিলেন, এমন সময় হঠাৎ ঝড়ের মত রসময়ী আসিয়া প্রবেশ করিল। কয়েক মুহূর্ত নির্বাক হইয়া ক্ষেত্রমোহনের পানে দৃষ্টিপাত করিল—সেই প্রকার দৃষ্টিপাত, যে দৃষ্টিপাতে পূর্বে মুনিঋষিরা লোককে ভস্ম করিয়া ফেলিতেন।
ক্ষেত্রবাবু বলিলেন—'কী মনে করে?'
রসময়ী অসম্ভব সংযমের সহিত উত্তর করিল—'একটা শ্রাদ্ধের যোগাড় করতে।' তাহার ওষ্ঠযুগল ক্রোধে কম্পিত হইতে লাগিল।
তামাক টানিতে-টানিতে ক্ষেত্রমোহনবাবু বলিলেন—'শ্রাদ্ধটা কার?'
'হরিশ চাটুয্যের মেয়ের—আর মেয়ের মার।'
'তা হলে দুটো শ্রাদ্ধ বল। সঙ্গে সঙ্গে অমনি নিজেরটাও সেরে নিলে হয় না?'
'সেইটি হবে না এখন। বুড়ো বয়সে বিয়ে করছ নাকি শুনলাম?'
হুঁকা নামাইয়া, একটু উত্তেজিতভাবে ক্ষেত্রমোহন বলিলেন—'করছিই ত। করব না কেন? তোমার ভয়ে না কি?'
রসময়ী চিৎকার করিয়া হাত নাড়িয়া বলিল—'কর না, করে একবার মজাটাই দেখ না!'
'কী করবে তুমি?'
'এই এমন কিছু না। আঁশবঁটিটি দিয়ে সে মেয়ের নাক কেটে দেব—আর বুকে একখানা দশমুণে পাথর চাপিয়ে দেব।'
'আর তোমার নাকটা যদি কেউ কেটে দেয়?'
'এস না! কাট না। তুমি কাট না হয়!' —বলিয়া রসময়ী নিজে কোমরে দুই হাত দিয়া, ঝুঁকিয়া, নিজের মুখ ক্ষেত্রমোহনের অতি নিকটে সরাইয়া দিল।
স্ত্রীর এতাদৃশ বিনয় দেখিয়া ক্ষেত্রমোহন আবার হুঁকা উঠাইয়া লইয়া আপন মনে টানিতে লাগিলেন। ঝুঁকিয়া থাকিয়া যখন ক্লান্তি বোধ হইল, রসময়ী তখন নিজের মুখ সরাইয়া লইয়া আবার সোজা হইয়া দাঁড়াইল। বলিল—'তা হলে আঁশবঁটিতে শান দিয়ে রাখিগে? সম্বন্ধ পাকা হলে খবরটা দিও—চুপি-চুপি যেন শুভকম্মটা সেরে ফেল না!'
ক্ষেত্রমোহন বলিলেন—'তুমি না মরলে আর বিয়ে করছিনে। মরবে কবে?'
এই কথা শুনিয়া রসময়ী বিদ্রূপের স্বরে হা: হা: করিয়া হাসিয়া উঠিল। বলিল—'আমি মরব কবে জিজ্ঞাসা করছ? রসি বামনি এমনি মরছে না। তার এখনও অনেক দেরি—বিস্তর বিলম্ব। তোমার বিয়ে করবার বয়স যাবে—বুড়ো থুড়থুড়ো হবে—ভুঁয়ে মুয়ে হয়ে যাবে—যখন আর কেউ মেয়ে তোমায় দিতে রাজি হবে না—তখন আমি মরব।'
দাম্পত্য রসালাপ এই পর্যন্ত অগ্রসর হইলে বাহিরে একখানি গাড়ি থামিবার শব্দ হইল। রসময়ী বলিল—'তবে সেই কথাই রইল। এখন তবে আসি। দিদি ওপাড়ায় তার জায়ের বাড়ি গিয়েছিল—ভাবলাম তার সঙ্গে এসে তোমার সঙ্গে দুটো মনের কথা কয়ে যাই।' বলিয়া রসময়ী প্রস্থান করিল।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
উক্ত কথোপকথনের পর ছয় মাস কাটিয়া গিয়াছে। রসময়ীর গর্ব সফল হইল না। সে এখন মৃত্যু-শয্যায় শায়িত।
সংবাদ পাইয়া ক্ষেত্রমোহনবাবু হালিশহরে গেলেন। চিকিৎসাদির কিছুই ত্রুটি হইল না।
কিন্তু রসময়ী বাঁচিল না।
গঙ্গাতীরে লইয়া গিয়া ক্ষেত্রমোহন স্ত্রীর মুখাগ্নি করিলেন। আশ্চর্য সংসারের মায়া—যে এত কষ্ট দিয়াছে, তাহার জন্যও ক্ষেত্রমোহন ঝর ঝর করিয়া অশ্রুপাত করিতে লাগিলেন।
আরও মাস ছয় কাটিল। ক্ষেত্রমোহনের পার্শ্বচর বন্ধুবান্ধবগণ নানা স্থানে পাত্রী অন্বেষণে ব্যস্ত হইলেন। অবশেষে হুগলির নিকটবর্তী একটি গ্রামে সুযোগ্য পাত্রীর সন্ধান পাওয়া গেল। ক্ষেত্রমোহন স্বয়ং গিয়া দেখিয়া আসিলেন। মেয়েটি ডাগর—দেখিতেও ভালো। বিশেষ, মেয়ের পিতা একটি বড় জমিদারের নায়েব—ওদিককার মামলা মোকর্দ্দমাগুলিও এই সূত্রে ক্ষেত্রমোহনবাবুর করায়ত্ত হইবে। কন্যার পিতা রজনীকান্ত ঘোষাল ইংরাজি লেখাপড়া জানা ব্যক্তি।
বিবাহের কথাবার্তা পাকা হইল। বরের খুড়ামহাশয় গ্রাম হইতে আসিয়াছেন—কল্য আশীর্ব্বাদ। প্রভাতে অফিসকক্ষে বসিয়া দুই চারিজন মক্কেলের সঙ্গে মোক্তারবাবু কথাবার্তা কহিতেছিলেন—খুড়া মহাশয় একখানি 'বঙ্গবাসি' হস্তে ঘরের কোণে বসিয়া তামুক সেবন করিতেছিলেন। এমন সময় ডাকপিয়ন আসিল, ক্ষেত্রমোহনবাবুর হস্তে একখানি পত্র দিয়া গেল।
খামের উপর হস্তাক্ষরের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া ক্ষেত্রমোহনের মাথা ঘুরিয়া গেল। দুই-চারিবার চক্ষু রগড়াইয়া বারম্বার খামখানির শিরোনামা পরীক্ষা করিতে লাগিলেন। কাছে আনিয়া, দূরে সরাইয়া নানা প্রকার দেখিলেন।
অবশেষে কম্পিত হস্তে পত্রখানি খুলিলেন। পড়িয়া তাঁহার মুখ বিবর্ণ হইয়া গেল। মক্কেলকে বলিলেন—'আচ্ছা এখন তোমরা যাও—আজ সকাল সকালই কাছারি যাব—সেইখানেই বাকি কথাবার্তা হবে এখন।'
মক্কেলগণ চলিয়া গেলে খুড়ামহাশয় বলিলেন—'চিঠি এল ক্ষেত্তর?'
জড়িতস্বরে ক্ষেত্রমোহন বলিলেন—'আজ্ঞে হ্যাঁ।'
'কোথাকার চিঠি?'
'তাই ত ভাবছি।'
ক্ষেত্রমোহনের মুখভাব এবং কন্ঠস্বরের বিকৃতি লক্ষ্য করিয়া খুড়ামহাশয় উঠিয়া নিকটে আসিলেন। তখন ক্ষেত্রমোহন পত্রখানি দ্বিতীয়বার পাঠ করিতেছেন। তাঁহার নিশ্বাস বন্ধ হইবার উপক্রম হইয়াছে, চক্ষু কপালে উঠিয়াছে।
খুড়ামহাশয় দ্রুতভাবে বলিলেন—'কি? ব্যাপার কী? কোন দু:সংবাদ নয় ত?'
ক্ষেত্রমোহনবাবু নীরবে পত্রখানি খুড়ামহাশয়ের হাতে দিলেন। তিনি পত্র লইয়া চশমার অনুসন্ধান করিয়া চক্ষে পরিলেন। জানালার কাছে দাঁড়াইয়া খুড়ামহাশয় পত্রখানি পড়িতে লাগিলেন। সাধারণ পাতলা চিঠির কাগজে, বেগুনি রঙের ম্যাজেন্টা কালি দিয়া লেখা—উপরে স্থানের নাম নাই, তারিখ নাই—নিম্নপ্রকার লিখিত :—
শ্রী শ্রী দুর্গা
সহায়
প্রণামপূর্ব্বক নিবেদনঞ্চ বিসেস—
তোমার মোতিশ্চন্য ধরি আছে। মোনে করিয়াছ রসমই মরিআছে আপোদ গিআছে। এইবার বিবাহ করি। আমি মরিআছি বটে কিন্তু তাই বলিয়া তুমি নিষ্কিতি পাইআছ তাহা মোনে করিও না। বাড়ির সনমুখে যে বটগাচ আছে তাতেই আমি আজ কাল বাস করিতেছি। তুমি কিকর কোতায় যাও সমস্থই আমি সেখানে বসিয়া দেখিতেছি। রাত্তিরে গাচ হইতে নামিয়া মাজে-মাজে তোমার শয়ন ঘরে যাই। তোমার খাটের চারিদিকে ঘুরিয়া বেড়াই। এক একবার ইচ্ছা করে গলাটা টিপিয়া দিয়া তোমাকে আমার সঙ্গি করি। আমার একানে বডডো একলা বোধ হয়। আমার চেহারা একন অতিশয় খারাপ হইয়া গিআছে। আমার গাএর মাংসো চামড়া আর কিছুই নাই। খালি হাড় আছে তাও সাদা নয়। গংগাস্তিরে আমাকে জে পোড়াইআছিলে তাইতে হাড়গুনো কালো কালো হইয়া গিয়াছে। যাহা হউক নিজের রূপ বন্ননা নিজের মুখে শোভা পায় না। বিবাহ করিও না। করিলে তোমার নলাটে অসেস দুগগতি নেকা আছে।
রসমই।
পত্র পড়িয়া খুড়ামহাশয়েরও মুখ কালিকাময় হইয়া গেল। ভীতস্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন—'এ হাতের লেখা কার চিনতে পারছ?'
'খুব চিনি। তারই হাতের লেখা।'
'অন্য কেউ জাল করে নি ত?'
'ভগবান জানেন।'
খুড়ামহাশয় নিকটস্থ চেয়ারে বসিয়া পড়িলেন। কিয়ৎক্ষণ ছাদের কড়িকাঠের পানে চাহিয়া বলিয়া উঠিলেন—'জয়রাম—সীতারাম—রাম-রাঘব—রাবণারি—রাম—রাম—রাম।'
খুড়ামহাশয়কে এতদবস্থায় দেখিয়া, ক্ষেত্রমোহনের আরও ভয় হইল। বলিলেন—'আচ্ছা খুড়ো মশায়—ভূতে কখন চিঠি লেখে?'
খুড়ামহাশয় বলিয়া উঠিলেন—'ভূত বলতে নেই—ভূত বলতে নেই—উপদেবতা বল। জয় রাঘব রামচন্দ্র।'
দুইজনেই নির্ব্বাক। অবশেষে খুড়ামহাশয় বলিলেন—'দেখ—কারুর বদমাইসি নয় ত? এমনটাই কি হতে পারে? অনেক রকম ভৌতিক উপদ্রবের কথা শুনেছি বটে—কিন্তু এ রকমটা—কখনও ত শোনা যায় নি। আচ্ছা—বউমার হাতের লেখা আগেকার চিঠিপত্র কিছু আছে কি? লেখাটা মিলিয়ে দেখলে হয়?'
ক্ষেত্রমোহন বলিলেন—'পুরানো চিঠি আছে বৈ কি।'—বলিয়া বাটির মধ্যে প্রবেশ করিয়া চারি পাঁচখানা বাহির করিয়া আনিলেন।
খুড়ামহাশয় চশমার কাচ দুইখানি কোঁচার কাপড়ে ভাল করিয়া মার্জনা করিয়া লইলেন। পরে পত্রগুলি লইয়া অত্যন্ত সাবধানে হস্তাক্ষর মিলাইতে লাগিলেন। অবশেষে সেগুলি টেবিলের উপর ফেলিয়া, দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া বলিলেন—'একই হাতের লেখা ত দেখছি।' খামখানা উলটিয়া পালটিয়া দেখিতে লাগিলেন। এক পয়সার ছয়খানওয়ালা শাদা খাম। তাহাতে একখানি দুই পয়সার টিকিট আঁটা আছে। ক্ষেত্রমোহনের হাতে খামখানি দিয়া বলিলেন—'কোথাকার ছাপ দেখ ত?'
ক্ষেত্রবাবু বাঙ্গলানবীশ মোক্তার হইলেও ইংরেজি ছাপার অক্ষর পড়িতে পারিতেন। ছাপ পরীক্ষা করিয়া বলিলেন—'হুগলির ছাপ। কালকের তারিখ।'
খুড়ামহাশয় চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন। মাঝে-মাঝে কেবল অস্ফুটস্বরে বলিতে লাগিলেন—'জয় রাম—শ্রীরাম—সীতারাম।'
কাছারির বেলা হয় দেখিয়া মোক্তারবাবু স্নান করিয়া আহারে বসিলেন—কিন্তু কিছুই খাইতে পারিলেন না। রান্নাঘরের বারান্দায় যেখানে বসিয়া তিনি আহার করিতেছিলেন, সেখান হইতে বটগাছটার অগ্রভাগ দেখা যায়। খান, আর মাঝে-মাঝে সেই গাছটার পানে চাহেন। এক সময় একটা গাছের ডাল খড়-খড় করিয়া নড়িয়া উঠিল। কাহার যেন হাসির শব্দ শোনা গেল। ক্ষেত্রমোহনবাবুর আর খাওয়া হইল না। উঠিয়া পড়িলেন। মুখ প্রক্ষালন করিয়া বাহিরে আসিয়া বটগাছের পানে চাহিয়া রহিলেন। দুই তিনটা কাঠবিড়ালী ডালে ডালে পরস্পরকে তাড়া করিয়া ফিরিতেছে। গোটাকতক কাক উচ্চশাখায় বসিয়া জাতীয় সঙ্গীত গাহিতেছে। ইহা ভিন্ন আর কিছুই দেখিতে পাইলেন না।
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
সেই দিন সন্ধ্যাবেলা ক্ষেত্রমোহনের শয়নকক্ষে খুড়া-ভাইপো বসিয়া কথোপকথন করিতেছিলেন। দিবসে খুড়ামহাশয় কপাটের বাহিরে এবং ভিতরে দেওয়ালময় রামনাম লিখিয়া দিয়াছেন। অদ্য দুইজনেই এক শয্যায় শয়ন করিলেন। বালিসের তলায় একখানি কৃত্তিবাসী রামায়ণ রক্ষিত হইবে এবং ঘরে সমস্ত রাত্রি আলো জ্বলিবে বন্দোবস্ত হইয়া গিয়াছে।
ক্ষেত্রমোহন বলিলেন—'তা হলে খুড়ো কি করা যায়? বিবাহটা বন্ধ করে দেওয়া যাবে?'
খুড়ামহাশয় বলিলেন—'আমি ত তার দরকার দেখছিনে।'
'যদি কোন উপদ্রব অত্যাচার হয়?'
খুড়া মহাশয় কিয়ৎকাল চিন্তা করিলেন। শেষে বলিলেন—'ভয়ের কোনও কারণ দেখিনে।'
'ওই যে বলেছে 'ইচ্ছা করে তোমার গলাটা টিপে দিই?'
'না:—তা পারবে না। হাজার হোক স্বামী ত বটে।'
'আর যে বলেছে ''বিয়ে কোরো না, করলে তোমার অশেষ দুর্গতি হবে''।'
'অশেষ দুর্গতি হবে, তার মানে এ নাও হতে পারে যে আমি তোমার অশেষ দুর্গতি করব। ওর মানে বোধ হয় এই যে, অধিক বয়সে বিবাহ করলে যে সমস্ত সাংসারিক অশান্তি উপস্থিত হয়, তাই তোমারও অদৃষ্টে ঘটবে।'
ক্ষেত্রমোহনবাবু চুপ করিয়া রহিলেন। মনে ভয়ও যথেষ্ট আছে—অথচ বিবাহ করিবার লোভটিও সম্বরণ করা তাঁহার পক্ষে অসাধ্য।
পরদিন আশীর্ব্বাদ হইয়া গেল। কিন্তু ক্ষেত্রমোহন যে ভৌতিক পত্র পাইয়াছেন সে কথাও রাষ্ট্র হইতে বিলম্ব হইল না। নায়েব রজনীবাবুরও কানে ক্রমে এ কথা পৌঁছিল। বলিয়াছি—তিনি ইংরাজি জানা ব্যক্তি—শুনিয়া হা: হা: করিয়া হাসিয়া উঠিলেন! বলিলেন—'ভূত! এই বিংশ শতাব্দীতে ভূত বিশ্বাস করতে হবে?'
বিবাহের দিনস্থির হইয়াছে ৮ই ফাল্গুন। আর পাঁচ দিন মাত্র বাকি আছে। উভয় পক্ষ হইতে সমস্ত আয়োজনাদি হইতেছে। বিকালে বৈঠকখানায় ক্ষেত্রবাবু জনকয়েক বন্ধু-বান্ধব সহ বসিয়াছিলেন। ইহাদের মধ্যে একজন সরকারী উকিল—নাম মনোহরবাবু। লোকটির বয়স চল্লিশ পার হইয়াছে। চোখে সোনার চশমা। মাথায় ঝাঁকড়া চুল— মুখমণ্ডল প্রচুর গোঁফদাড়িতে আবৃত—হাতে বড় বড় নখ—এক কথায়, লোকটি থিয়জফিস্ট। ক্ষেত্রবাবুর ভৌতিক পত্র প্রাপ্তির সমাচার অবগত হইয়া অবধি, মনোহরবাবু ইহার সঙ্গে একটু ঘনিষ্ঠতা স্থাপন করিয়া লইয়াছেন।—অপর একজন মধ্য যুবক—নাম সুরেন্দ্রনাথ। ইনি এল-এ ফেল করা শিক্ষিত মোক্তার। বিস্তর ইংরাজি উপন্যাস পাঠ করিয়াছেন।
সুরেন্দ্রনাথ বলিলেন—'ক্ষেত্রবাবু, একটা কথা আমার মনে হচ্ছিল। অনেক উপন্যাসে পড়া গেছে, একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল, যেমন রেলে কলিশন বা নৌকাডুবি বা আর কিছু, সকলেই মনে করেছে, অমুক লোকটা মরে গেছে, মৃত্যুর চাক্ষুষ সাক্ষীরও অভাব নেই, কিন্তু শেষ দিকটায় দেখা গেল সে বেঁচে আছে। তাই আমার মনে হয়, হয় আপনার স্ত্রী এখনও বেঁচে আছেন, নয় এ চিঠি জাল। কিন্তু আপনার দৃঢ় বিশ্বাস এ চিঠি তাঁরই হাতের লেখা—জাল নয়। সুতরাং আপনার স্ত্রী বেঁচে আছেন বিশ্বাস করা ছাড়া আর উপায়ান্তর নেই। কারণ, এ বিংশ শতাব্দীতে, ভূতের অস্তিত্ব কোনমতেই বিশ্বাস করতে পারা যায় না।
থিয়জফিস্ট উকিলবাবুটি ইহা শুনিয়া বলিলেন—'কেন মশাই—বিংশ শতাব্দীতে ভূতের অস্তিত্ব কোনমতেই বিশ্বাস করতে পারেন না কেন?'
নবীন মোক্তারবাবু বলিলেন—'কারণ আমি কখনও দেখিনি।'
শুনিয়া মনোহরবাবু বিজ্ঞভাবে হাস্য করিয়া বলিলেন—'সম্রাট সপ্তম এডোয়ার্ডকে কখনও দেখেছেন?'
'না, দেখিনি।'
'তিনি আছেন বলে বিশ্বাস করেন?'
'করি। তার কারণ, আমি না দেখলেও, হাজার-হাজার লোক তাঁকে দেখেছে। তাঁর দশ বিশখানা ছবিও দেখেছি। কিন্তু 'ভূত আমি নিজে দেখেছি' এমন কথা আজ পর্যন্ত কাউকে বলতে শুনলাম না। সবাই বলে, খুব বিশ্বস্ত লোকের মুখে শুনেছে যে তারা স্বয়ং ভূত দেখেছে।'
মনোহরবাবু তাঁহার সুঘন দাড়ির মধ্যে দীর্ঘনখ-অঙ্গুলিগুলি চালনা করিতে করিতে বলিলেন—'আপনি বললেন, হাজার হাজার লোক সম্রাটকে দেখেছে। তেমনি হাজার হাজার লোক অশরীরী আত্মাকেও প্রত্যক্ষ করেছে। আপনি বললেন যে সম্রাটের দশ বিশখানা ছবি দেখেছেন। তেমনি দশ বিশখানা ভূতেরও ছবি আপনাকে আমি দেখাতে পারি। যদি দেখতে চান, একদিন আমার বাড়িতে যাবেন। আমার একখানা বইয়ে কেটি কিং-এর ছবি আছে। প্রথম চার্লসের সময় কেটি কিং নামে একটি মেয়ে জীবিত ছিলেন। ষোল বৎসর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। গত শতাব্দীর মধ্যভাগে আমেরিকা ও ইউরোপের নানা স্থানে অনেক সেয়াঁসে, কেটি কিং স্থূলশরীর ধারণ করে আর্বিভূত হয়েছিলেন। তাঁর নাড়ি পরীক্ষা করা হয়েছে, তাঁর শরীরে ছুরি ফুটিয়ে দিয়ে দেখা হয়েছে ঠিক মানুষের মত রক্তপাত হয়, তাঁর ফটোগ্রাফ পর্যন্ত তোলা হয়েছে; ফটোগ্রাফ থেকে ছবি আমার বইয়ে আছে—আসবেন, দেখাব।'
সুরেন্দ্রবাবু মৃদু মৃদু হাস্য করিয়া বলিলেন—'আপনারাও যেমন ভাল মানুষ! ওই সব বিশ্বাস করেন? ভূতবাদীদের কত জোচ্চুরি ধরা পড়েছে তার সংখ্যা নেই। কেটি কিং-এর দেহে ছুরি ফুটিয়ে রক্তপাত হয়েছে, ঐটে আপনি বিশ্বাসযোগ্যতার প্রমাণ বলে উল্লেখ করলেন। আমার ত ঠিক উল্টো মনে হয়। ছুরি ফোটালে রক্ত না পড়ত—অথচ শরীরী মানুষ একটা দাঁড়িয়ে রয়েছে দেখছি —তা হলে বরং বিশ্বাস হত এটা বাস্তবিক মানুষ নয়। এ ক্ষেত্রে দেখুন, ভূত, তিনি বাড়ির সামনেই বটগাছে থাকেন। চিঠি যখন লিখতে পারেন, তখন অনায়াসেই মূর্তি গ্রহণ করে নিজের বক্তব্য বলে যেতে পারতেন। কিন্তু তা না করে খাম, কাগজ, কালি সংগ্রহ করবার কষ্ট স্বীকার করলেন। এইটুকু থেকে এইটুকু— চিঠিখানি টেবিলের উপর রেখে গেলেই হত, তা না করে এক মাইল দূরে পোস্ট অপিসে গেলেন, তাকে পোস্ট করতে। আবার দুটো পয়সা খরচ করে টিকিট কিনতে হল। মশায়, ভৌতিক জগতে পয়সা যদি বাস্তবিকই এত সস্তা হয়, তা হলে না হয় সেইখানে গিয়েই প্র্যাকটিস শুরু করি।'
মনোহরবাবু একটু বিরক্তির সহিত বলিলেন—'মশায়, জিনিসটা হাসি তামাসার নয়। এ সব গভীর বিষয়। অনেক চর্চা, অনেক অলোচনা না করে এ বিষয়ে মতামত প্রকাশ করা উচিত নয়। ভৌতিক জগৎ থেকে ডাকে চিঠি আসা এই প্রথম নয়। হিমালয় থেকে মহাত্মারাও মাঝে মাঝে ডাকে চিঠিপত্র লিখে থাকেন। কুটুম্বিলাল নামক এক মহাত্মা এরকম অনেক চিঠি আমাদের মাদাম ব্লাভাটস্কিকে লিখেছিলেন। তাঁরাও মনে করলে সাক্ষাৎ আবির্ভাব হয়ে বক্তব্য বলে যেতে পারতেন কিম্বা চিঠি উড়িয়ে টেবিলের উপর ফেলে যেতে পারতেন—কিন্তু ডাকেই তাঁরা চিঠিপত্র পাঠাতেন।'
ইহা শুনিয়া শিক্ষিত মোক্তারবাবু মৃদু মৃদু হাস্য করিতে লাগিলেন। বলিলেন—'কুটুম্বিলালের চিঠি ত কোন কালে জাল বলে সাব্যস্ত হয়ে গেছে। ডাক্তার হজসন বলে একজন বৈজ্ঞানিক নিজে ভারতবর্ষে এসে এ বিষয়ে অনুসন্ধান করে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, মাদাম ব্লাভাটস্কি আর দামোদর বলে এক ব্যক্তি সব চিঠি জাল করেছিলেন।'
একথা শুনিয়া থিয়জফিস্ট বাবুটি ভ্রূকুঞ্চিত করিয়া বিরক্তির স্বরে বলিলেন—
'ও সব ঈর্ষাপরায়ণ লেখকের বই পড়বেন না। আমার কাছে আসবেন, ভাল ভাল বই সব আপনাকে পড়তে দেব। তা পড়লে আপনার সমস্ত অবিশ্বাস দূর হয়ে যাবে। মাদাম ব্লাভাটস্কি যে কত বড় লোক তা তাঁর 'আইসিস আনভেল্ড' বইটে পড়লেই বুঝতে পারবেন।'
সুরেন্দ্রবাবু মুচকিয়া হাসিয়া বলিলেন—'সে বইটে পড়িনি বটে, তবে এডমন্ড গ্যারেট প্রণীত 'আইসিস ভেরি মচ আনভেল্ড—অর দি স্টোরি অব দি মাহাৎমা হোক্স' বইটে পড়েছি। লাইব্রেরিতে আছে। দেখতে চান ত এনে দিতে পারি।'
এ কথায় মনোহরবাবু রাগিয়া আগুন হইয়া উঠিলেন। বলিলেন—'ওই আপনারা এক কথা শিখে রেখেছেন। গাল দেওয়া যায় না এমন ভাল জিনিসই নেই। যত সব কুচক্রী বদমায়েস লোক মিছামিছি মাদামের অপরাধ রটনা করেছে।'
এমন সময় বাইরে শব্দ উত্থিত হইল—'বাবু—চিঠি আছে।'
পরমুহূর্তে ডাকপিয়ন প্রবেশ করিয়া ক্ষেত্রবাবুর হাতে একখানি পত্র দিল। পত্রখানি হাতে লইয়াই ক্ষেত্রমোহনবাবুর চক্ষুস্থির হইয়া গেল। বলিলেন—'মশাই—আবার সেই।'
পত্র খুলিয়া পাঠ করিয়া সেখানি সকলের সন্মুখে ফেলিয়া দিলেন। থিয়জফিস্ট বাবুটি অতি আগ্রহের সহিত সেখানি কুড়াইয়া লইয়া পাঠ করিলেন। শেষে নবীন মোক্তারবাবুর হাতে সেখানি দিলেন।
পত্রখানি এইরূপ—
শ্রীশ্রী দুর্গা
সহায়
প্রণাম পূর্বক নীবেদনঞ্চ বিসেস
এত সাহস তোমার? আসিব্বাদ পজন্ত হইয়া গিআছে। তুমি মোনে করিআছ আমি তোমায় জে পত্র লিখিয়াছিলাম তাহা ফাকা আওয়াজ। রসি বামনি তেমন মেয়ে নয়। আমি মানা করা সত্যেও বিবাহ করিবে। একনও সাবধান হও। এ দুরমোতি পরিত্যাগ কর। নহিলে একদিন গভীর রাত্তিরে তুমি যকন ঘুমাইয়া থাকিবে বটগাচ হইতে নামিয়া বুকে একখান দসমুণে পাতর চাপাইয়া দিব। ঘুম আর ভাঁগিবে না।
রসমই।
একে একে সকলেই পত্রখানি পড়িলেন। পড়িয়া স্তম্ভিত হইয়া বসিয়া রহিলেন। শিক্ষিত মোক্তারবাবুরও মুখ শুকাইয়া গেল। তথাপি মন হইতে সংশয় দূরে নিক্ষেপ করিয়া বলিলেন—'আচ্ছা ক্ষেত্রবাবু—আর একবার বেশ করে লেখাটা পরীক্ষা করে দেখুন দেখি। আপনার স্ত্রীর হাতের লেখাই বটে ত? না কোন জায়গায় কোন সন্দেহজনক তফাৎ আছে?'
ক্ষেত্রবাবু বলিলেন—'কোন সন্দেহ নেই। শুধু হাতের লেখার মিল হলেও বা সন্দেহ করতাম। তার যেখানে-যেখানে যে যে বানান ভুল চিরকাল হত এ চিঠিতেও তাই। সে চিরকালই শ্রীশ্রী এক জায়গায় দুর্গা একটু তফাতে লিখত—এ দুখানা চিঠিতেও তাই। তা ছাড়া চিঠিতে এমন সব কথাবার্তা রয়েছে যা সে জীবিত কালেও মুখে সর্বদা ব্যবহার করত।'
সকলে নিস্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিলেন। কিয়ৎপরে সুরেন্দ্রবাবু গলা ঝাড়িয়া জিজ্ঞাসা করিলেন—'তার মৃত্যুর সময় আপনি উপস্থিত ছিলেন?'
ক্ষেত্রবাবু বলিলেন—'ছিলাম বৈকি।'
'সঙ্গে সঙ্গে ঘাটে গিয়েছিলেন?'
'গিয়েছিলাম।'
'চিতার উপর তাঁর দেহ রাখবার পর তাঁর মুখ আপনি আর দেখেছিলেন?'
'দেখিনি আবার? আমি নিজেই ত মুখাগ্নি করেছি। ওহে তুমি যা ভাবছ তা নয়। কোনও ভুল হয়নি।'
নব্য মোক্তারবাবু তখন ঘাড় হেঁট করিয়া বসিয়া রহিলেন।
একজন বলিল—'There are more things in heaven and earth. Horatio. Than are dreamt of in your philosophy.'
(হে হোরেশিও—স্বর্গে ও মর্ত্যে এমন অনেক জিনিস আছে, যাহার বিষয় তোমার দর্শনবিজ্ঞান স্বপ্নেও অবগত নহে)।
অপর একজন বলিলেন—'তা ত বটেই, তা ত বটেই। ধরুন আমাদের দেশে, শুধু আমাদের দেশই বা বলি কেন—সকল দেশেই আদিকাল থেকে যে একটা বিশ্বাস প্রচলিত আছে যে, ভূত বলে একটা জিনিস আছে, তার কি কিছুই ভিত্তি নেই?'
সরকারী উকিলবাবুটি বলিলেন—'শুধু অন্ধ বিশ্বাসের কথা নয়। গত পঞ্চাশ বৎসরের মধ্যে ইউরোপে ও আমেরিকায় ভূতের অস্তিত্ব নি:সংশয়িতভাবে প্রমাণ হয়ে গেছে। এক সময় বৈজ্ঞানিকশ্রেষ্ঠ টিন্ডাল পর্যন্ত ভূতকে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। এখন আর শিক্ষিত সমাজে সে ভাব নেই। বিখ্যাত সম্পাদক স্টেড সাহেব তাঁর এক গ্রন্থে লিখেছেন—of all the vulgar superstitions of the half educated, none dies harder than the absurd delusion than there are no such things as ghosts. (অর্ধশিক্ষিত ব্যক্তিগণের মনে যতগুলি ইতরজনোচিত কুসংস্কার আছে, তাহার মধ্যে 'ভূত নাই' এই অদ্ভুত ভ্রমটিই সর্বপেক্ষা প্রবল)।'—বলিয়া বিজয়ী বীরের মত তিনি সুরেন্দ্রবাবুর প্রতি কটাক্ষপাত করিলেন।
সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছিল—সেদিনকার মত সভাভঙ্গ হইল। সেই বটগাছের তলা দিয়া যাইতে সুরেন্দ্রবাবুরও গাটা যেন ছম ছম করিতে লাগিল।
সপ্তম পরিচ্ছেদ
খুড়ামহাশয় কোথায় বেড়াইতে গিয়াছিলেন। সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরিয়া আসিয়া, দ্বিতীয় পত্রের কথা শুনিয়া বলিলেন—'দেখ ক্ষেত্তর, ব্যাপারটা ক্রমে গুরুতর হয়ে দাঁড়াল। বিবাহটা এখন না হয় বন্ধই রাখা যাক। আমার মতে বৎসর পূর্ণ হলেই, গয়ায় গিয়ে একটা পিণ্ড দিয়ে এস, উদ্ধার হয়ে যাবেন। বৎসর পূর্ণ হতে ত আর বেশি দেরি নেই—আর মাসখানেক হলেই হয়। তখন নির্বিঘ্নে শুভকর্ম্ম শেষ করা যাবে।'
ক্ষেত্রবাবু বলিলেন—'তা বেশ—সেই ভালো কথা।'
কন্যার পিতাকে বলিয়া কহিয়া বিবাহের দিন পিছাইয়া দেওয়া হইল। নিমন্ত্রণ পত্র সমস্ত প্রত্যাহৃত হইল। গয়া-শ্রাদ্ধ সারিয়া আসিয়া ক্ষেত্রবাবু বিবাহ করিবেন ইহা সকলেই জানিতে পারিল।
ক্ষেত্রবাবুর হস্তে একটা বড় জালিয়াতির মোকর্দ্দমার তদ্বিরের ভার রহিয়াছে। মোকর্দ্দমাটা দায়রা-সোপর্দ্দ হইয়াছে। সেটা শেষ না হইলে ক্ষেত্রবাবু গয়া যাইতে পারিতেছেন না। ফরিয়াদী পক্ষের সাক্ষীদিগকে সমস্তদিন ধরিয়া তালিম দিতে হইতেছে।
মোকর্দ্দমার পূর্বদিন সন্ধ্যাবেলা কাছারি হইতে ফিরিবার সময় 'রসময়ী'র তৃতীয় পত্র ক্ষেত্রবাবুর হস্তগত হইল। তাহাতে অন্যান্য কথার সঙ্গে লেখা আছে—
'শুনিলাম না কি গয়ায় আমার পিণ্ডি দিতে যাইতেছ। ভাবিআছ বুঝি পিণ্ডি দিলে আমি উধার হইয়া যাইব তকন সচন্দে বিবাহ করিবে। গয়ায় যদি যাও তবে চোরের বেস ধরিয়া রেলগাড়িতে প্রবেশ করিয়া তোমার বুকে ছোরা বসাইয়া দিব।'
ক্ষেত্রবাবুর আর বাড়ি যাওয়া হইল না। কাছারির পোষাকেই মনোহরবাবুর বাড়ি গিয়া তাঁহাকে পত্র দেখাইলেন।
মনোহরবাবু পত্র পড়িয়া বলিলেন—'এ যে বড় বিপদ দেখছি। বিবাহ করবার কল্পনা আপনাকে পরিত্যাগ করতে হল।'
ক্ষেত্রবাবু বলিলেন—'আচ্ছা মশায়, অশরীরী আত্মা মানুষের বুকে ছুরি বসিয়ে দিতে পারে? আপনার থিয়জফি শাস্ত্রে কী বলে?'
মনোহরবাবু একখানি মোটা বহি আলমারি হইতে পাড়িয়া এক স্থান খুলিয়া বলিলেন—'এ সম্বন্ধে থিয়জফি শাস্ত্রের মত এই—মুক্তাত্মাগণ সাধারণত অশরীরী। কিন্তু কখনও-কখনও তাঁরা নিজেকে মেটেরিয়েলাইজ অর্থাৎ জড়দেহ সম্পন্ন করে থাকেন। তাঁদের এমন ক্ষমতা আছে যে বায়ু থেকে, গাছপালা থেকে, ভূমি থেকে,—এমন কি কাছাকাছি মানুষের দেহ থেকে আবশ্যক পদার্থগুলি সংগ্রহ করে নিজ দেহ ধারণ করেন। সুতরাং সে অবস্থায় বুকে ছুরি বসিয়ে দিতে পারা কিছুই আশ্চর্য্য নয়। আর এও বিবেচনা করুন না, যে হস্ত কলম ধরে চিঠি লিখতে সক্ষম, সে হস্ত ছুরি ধরতে পারবে না কেন?'
ক্ষেত্রমোহনবাবু কিয়ৎক্ষণ চিন্তা করিলেন। শেষে বলিলেন—'দেখুন, এ পত্রগুলো জাল কিনা সেটা একবার ভালো করে তদন্ত করতে হচ্ছে। আমি বলি কি, এই যে কলকাতা থেকে হস্তলিপি বৈজ্ঞানিক আমাদের দায়রার মোকর্দ্দমায় সাক্ষী দিতে আসছেন, তাঁকে দিয়ে এ চিঠিগুলো পরীক্ষা করালে হয় না?'
থিয়জফিস্ট বাবুটি ক্ষেত্রমোহনের এ সন্দেহবাদে মনে মনে বিরক্ত হইলেন। প্রকাশ্যে বলিলেন—'তা—যদি আপনার ইচ্ছে হয়, পরীক্ষা করাতে পারেন।'
পরদিন দায়রার জালের মোকর্দ্দমাটির বিচার আরম্ভ হইল। হস্তলিপি-বৈজ্ঞানিক সফটমোর সাহেব সাক্ষ্য প্রদান করিলেন। দিনশেষে কাছারির পর, ক্ষেত্রমোহন ডাক-বাঙ্গলায় গিয়া সফটমোর সাহেবকে ভৌতিক পত্র তিনখানি দিলেন। তুলনার জন্য রসময়ীর কয়েকখানি পুরাতন আসল পত্রও দিয়া আসিলেন। সাহেব বলিলেন—'কল্য প্রাতে পরীক্ষার ফলাফল জানাইব।'
পরদিন প্রাত:কালে সরকারী উকীল মনোহরবাবুকে সঙ্গে লইয়া ক্ষেত্রমোহন আবার ডাক-বাঙ্গলায় উপস্থিত হইলেন। সাহেব বলিলেন—'পরীক্ষাধীন পত্র তিনখানি এবং আসল পত্রগুলি সমস্তই এক হস্তের লেখা।'
ইহা শুনিয়া ক্ষেত্রবাবুর মুখখানি ছোট হইয়া গেল। মনোহরবাবু বলিলেন—'সাহেব, অনুগ্রহ করিয়া একখানি সার্টিফিকেট দিতে পারেন?'
সাহেব মনে করিলেন—নিশ্চয়ই এ পত্র লইয়া একটা মামলা মোকর্দ্দমা হইবে। আবার সাক্ষী দিতে আসিয়া ফী পাওয়া যাইবে। সুতরাং আহ্লাদের সহিত তিনি সার্টিফিকেট লিখিয়া দিলেন।
বাসায় যাইতে যাইতে মনোহরবাবু ক্ষেত্রবাবুকে বলিলেন—'এই চিঠিগুলির নকল আর সায়েবের সার্টিফিকেট যদি আমাদের ''থিয়জফিক্যাল রিভিউ'' নামক মাসিক পত্রে ছাপাতে পাঠাই তাতে আপনার কোনও আপত্তি আছে কি?—আমরা যাকে স্পিরিট-রাইটিং বলি, তার সুন্দর অকাট্য প্রমাণ হবে।'
ক্ষেত্রবাবু বলিলেন—'তাতে আমার আপত্তি নেই।'
পরবর্ত্তী সংখ্যা 'থিয়জফিক্যাল রিভিউ' পত্রে সার্টিফিকেট সহ চিঠিগুলি ছাপা হইয়া গেল। নানাস্থান হইতে বড় বড় থিয়জফিস্টগণ ক্ষেত্রমোহনবাবুকে পত্র লিখিতে আরম্ভ করিলেন। কেহ কেহ হুগলিতে আসিয়া পত্রগুলি স্বচক্ষে দেখিয়া বিস্ময়ে অভিভূত হইতে লাগিলেন।
অষ্টম পরিচ্ছেদ
থিওজফিস্ট মহলে ক্ষেত্রবাবুর পসারের আর সীমা নাই—কিন্তু ইহাতে তিনি কিছুমাত্র সান্ত্বনা লাভ করিলেন না। পত্রগুলি জাল প্রমাণ হইলে তিনি বিবাহ করিয়া সুখী হইতে পারিতেন। ভয়ে গয়ায় গিয়া পিণ্ডদান করিতেও পারিলেন না। তাহার অদৃষ্টে বুঝি বিবাহ আর নাই।
চৈত্র মাস আসিল—বসন্তের বাতাস বহিতেছে। দোল উপলক্ষে কাছারি বন্ধ। ক্ষেত্রমোহন বাড়িতে বসিয়া নিজ দুরদৃষ্টের বিষয় চিন্তা করিতেছিলেন, এমন সময় একজন আসিয়া সংবাদ দিল, হালিশহরে তাহার শ্বশুরবাড়িতে মহা বিপদ উপস্থিত। দোল উপলক্ষে বাজি পোড়াইতে গিয়া একটা বোম ফুটিয়া তাঁহার ছোট সম্বন্ধি সুবোধ বিশেষ আঘাতপ্রাপ্ত হইয়াছে। তাহাকে হুগলির হাসপাতালে আনা হইয়াছে।
শুনিয়া ক্ষেত্রবাবু থাকিতে পারিলেন না— গাড়ি ভাড়া করিয়া হাসপাতাল অভিমুখে ছুটিলেন। সেখানে গিয়া দেখিলেন, ছেলেটির অবস্থা সঙ্কটাপন্ন—বিছানার নিচে মেঝের উপর বসিয়া বিধবা বিনোদিনী রোদন করিতেছেন। ক্ষেত্রমোহনকে দেখিয়া তিনি আরও রোদন করিতে লাগিলেন।
সমস্ত দিন ঔষধ-প্রয়োগ ও শুশ্রূষা চলিল। সন্ধ্যার দিকে ডাক্তারেরা বলিলেন আর প্রাণের আশঙ্কা নাই।
ক্ষেত্রমোহন শ্যালিকাকে বলিলেন—'ঠাকুরঝি, সন্ধ্যা হল—এইবার বাড়ি চল।'
বিনোদিনী বলিলেন—'আমি সুবোধকে ছেড়ে বাড়ি যেতে পারব না।'
'সমস্ত দিন অনাহারে আছ—স্নানাহার পর্যন্ত হল না!'
'তা না হোক! আমি যেতে পারব না।'
অবস্থা বুঝিয়া হাসপাতালের ডাক্তারেরা বলিলেন—'আপনাকে বাড়ি যেতে হবে। এখানে ত রাত্রে থাকতে পারবেন না। কাল সকালে আবার আসবেন এখন। আর কোন ভয় নেই। বিপদ যা, তা কেটে গেছে। আমরা সেবা শুশ্রূষা করব—আপনার কোন চিন্তা নেই—আপনি বাড়ি যান।'
অনেক বুঝাইতে, বিনোদিনী সম্মত হইলেন। ক্ষেত্রমোহনকে বলিলেন—'তুমি তবে আমায় হালিশহরে নিয়ে চল। রাত্রে সেখানে থাকব। কাল ভোরে আবার এখানে আমায় পৌঁছে দিতে হবে।'
ক্ষেত্রমোহন তাহাই করিলেন। হালিশহরে রাত্রি কাটিল।
ভোরে উঠিয়া স্বহস্তে এক ছিলিম তামাক সাজিয়া ক্ষেত্রমোহন ধূমপান আরম্ভ করিয়াছেন, এমন সময় বাড়ির বাহিরে মহা গণ্ডগোল উপস্থিত হইল। তাড়াতাড়ি হুঁকা রাখিয়া বাহিরে গিয়া দেখিলেন, লালপাগড়িতে বাড়ি ঘেরাও করিয়া ফেলিয়াছে। অশ্বপৃষ্ঠে স্বয়ং পুলিশের সুপারিন্টেন্ডেণ্ট সাহেব দুয়ারে দাঁড়াইয়া। সঙ্গে কয়েকজন দারোগা ও হেড কনস্টেবলও আছে।
পুলিশ সাহেবের সঙ্গে ক্ষেত্রবাবুর পরিচয় ছিল। নত হইয়া সাহেবকে সেলাম করিলেন। সাহেব চুরুট মুখে বলিলেন—'হেল্লো মুখটিয়ার, টুমি হেখানে খি খড়িতেছে?'
ক্ষেত্রবাবু বলিলেন—'হুজুর এই আমার শ্বশুড়বাড়ি।'
'ইহা টোমার শ্বশুরবাড়ি আছে? উটম, হামি তোমার শ্বশুরবাড়ি সার্চ্চ খড়িবে।'
'কেন হুজুর?'
'হেখানে বোমা টেয়াড়ি হয় কিনা ডেখিবে। ইহা সার্চ্চ-ওয়ারেন্ট আছে'—বলিয়া সাহেব সার্চ্চ ওয়ারেন্টখানি ক্ষেত্রবাবুর হস্তে প্রদান করিলেন।
ক্ষেত্রবাবু সেখানি উলটিয়া পালটিয়া দেখিয়া, সাহেবের হাতে ফিরাইয়া দিলেন, বলিলেন—'হুজুর মালেক—যা ইচ্ছা করতে পারেন।'
সাহেব বলিলেন—'স্ট্রীলোক ঘনকে লুকাইয়া রাখ।'
পুলিশ গৃহমধ্যে প্রবেশ করিল। স্ত্রীলোকগণের মধ্যে কেবল বিনোদিনী। তিনি পুলিশের ভয়ে কোথাও লুকাইবার প্রয়োজন দেখিলেন না। হরিনামের মালাটি হাতে করিয়া উঠানে তুলসীতলায় বসিয়া রহিলেন।
খানাতল্লাসি আরম্ভ হইল। বন্দুক বারুদ, ডিনমাইট, বোমা বর্তমান, রণনীতি, যুগান্তর, গীতা, দেশের কথা, রিভিউ অব রিভিউজ প্রভৃতি কিছুই বাহির হইল না। বাহির হইল—হিন্দু সৎকর্ম্মমালা, গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা, কাশিদাসী মহাভারত এবং একখানা বটতলার ছেঁড়া উপন্যাস। ক্ষুদ্র বা বৃহৎ কোনও দেশনায়কের কোন ছবি বাহির হইল না—বাহির হইল কেবল খানকতক কালীঘাটের পট এবং একখানা আর্ট স্টুডিওর গণেশ মূর্তি। জমিদারের খানকতক পুরাতন দাখিলা এবং একটা ধূলিমলিন চিঠির ফাইল বাহির হইল। বিনোদিনীর বাক্স হইতে বাহির হইল এক বান্ডিল চিঠি এবং খানকতক ঠিকানা লেখা শাদা খাম।
সমস্ত জিনিস উঠানে আনিয়া জমা করা হইল। একজন দারোগা কাগজপত্রগুলির ফিরিস্তি প্রস্তুত করিতে লাগিলেন। ক্ষেত্রমোহনও সেইখানে বসিয়াছিলেন। তিনি দেখিলেন, শাদা খামগুলির প্রত্যেক খানিতে তাঁহারই শিরোনামা লেখা এবং রসময়ীর হস্তাক্ষর! পুলিশ সাহেবের অনুমতি লইয়া খাম ও চিঠিগুলি ক্ষেত্রবাবু পরীক্ষা করিতে লাগিলেন। খানকুড়ি চিঠি রহিয়াছে। সমস্তই বেগুনি রঙের ম্যাজেন্টা কালিতে রসময়ীর হস্তাক্ষরে লিখিত। কয়েকখানি চিঠি খুলিয়া ক্ষেত্রবাবু পাঠও করিলেন। নানা অবস্থা কল্পনা করিয়া অনুমানে পত্রগুলি লিখিত। কোন কোনটাতে বটগাছে বাসস্থানেরও উল্লেখ আছে। একখানাতে আছে—'গয়ায় পিণ্ডদান করিয়া আসিয়াছ বলিয়া মনে করিও না আর তোমার অনিষ্ট করিতে পারি না। এখনও রসি বামনী তোমার ঘাড় মটকাইতে পারে।' একখানাতে রহিয়াছে—'শুনিলাম বিবাহের দিনস্থির হইয়াছে, এখনও সাবধান।' একখানাতে আছে—'কল্য তোমার বিবাহ। এত মানা করিলাম, কিছুতেই শুনিলে না। আচ্ছা বাসরঘরে আগুন জ্বালাইয়া তোমাকে ও তোমার বধূকে পোড়াইয়া মারিব।'
সমস্ত ব্যাপারটা দিনের আলোর মতো তখন ক্ষেত্রমোহনের নিকট পরিষ্কার হইয়া গেল।
বিনোদিনী তুলসীতলায় বসিয়া সমস্ত দেখিতেছিলেন। ক্ষেত্রমোহন বলিলেন—'ঠাকুরঝি, এসব কী?'
ঠাকুরঝি আপন মনে মালা জপ করিয়া যাইতে লাগিলেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন