প্রতিহিংসা

সমরেশ মজুমদার

ত্র্যহস্পর্শ ঘটে তিথির যোগাযোগে, তিন পুরোনো বন্ধুর মিলন ঘটল রেলের যোগাযোগে। তিনবন্ধু—সীতেশ সিংহ, ব্রজদুলাল বাগ, আর হলধর হাতি। অন্য সবাই এই পাশবিক পদবি নিয়ে ওঁদের ঠাট্টা বিদ্রূপ করাতে ওদের মধ্যে এক ধরনের বাধ্যতামূলক বন্ধুত্ব ঘটেছিল এককালে। কিন্তু সে কাল কতদিন হল পার হয়ে গেছে।

দশ-পনেরো বছর পরস্পর দেখা নেই। দুজন সপরিবার হাওয়া বদল থেকে ফিরছিলেন, একজন শ্বশুরবাড়ি থেকে। মিলন হল নাগপুরে লাইনের গাড়িতে।

গাড়িতে বসে বসেই পুরোনো দিনের কত কথা, কত স্মৃতির রোমন্থন চলছিল। তবু প্রত্যেকেরই মনে হল, আগের মতন আর জমছে না। সবই এখন বৈষয়িক কথা, পারিবারিক কথা, জমির কথা—হিসাব আছে, রস নেই। পরস্পরের প্রতি অনিচ্ছা সত্বেও কেমন যেন একটা ঈর্ষার ভাব। গুমোর রেখে কথা। হৃদয় খুলল না কারোই, যদিও দেখা হবার পর মেয়েদের একপাশে সরিয়ে দিয়ে তিনবন্ধু একটুখানি নিবিড় হয়ে কাছাকাছি বসেছিল।

গাড়ি ঘাটশিলা ছেড়ে চলেছে।

এতক্ষণ পরে সীতেশ সিংহ একটা নতুন প্রসঙ্গ উত্থাপন করলেন। বললেন, 'একটা কথা মনে এল। এইখানে কোথায় যেন বছর তিন-চার আগে একটা বড় রেল কলিশন হয়েছিল না? জায়গাটা ঠিক কোথায় মনে করতে পারছি না।'

কিন্তু জায়গাটা কারোরই মনে পড়ল না।

বাগ বললেন, 'উ:, কত লোক মারা পড়ল সেদিন, এবং অকারণে।'

প্রসঙ্গটা নিজেদের ছেড়ে অন্যদের দিকে সম্প্রসারিত হওয়াতেই প্রত্যেকেই মনে মনে একটা আরাম অনুভব করলেন।

সিংহ বললেন, 'আরও একটা কথা এই প্রসঙ্গেই মনে দপ করে জ্বলে উঠল কেন বুঝি না। কথাটা বলেছিল অ্যারিস্টটল।'

হাতি প্রশ্ন করলেন 'কথাটা কি? খুব দামি নিশ্চয়?'

সিংহ সে কথার উত্তর না দিয়ে কিছু লজ্জিত ভাবে আগের কথার জের টেনে বললেন, 'না, না, আমার ভুল হয়েছে। অ্যারিস্টটল নয়, কথাটা বলেছেন আমাদের তালতলার দ্বিজু মুনসী। তিনিও বিজ্ঞ লোক।'

অ্যারিস্টটলের নামে যদি বা কাজ হত, দ্বিজু মুনসী নামক অজ্ঞাত পরিচয় লোকের নামে অপর দুজনের উৎসাহ নিভে গেল। তবু বাগ জিজ্ঞাসা করলেন, 'কথাটা কি, তা তো বললে না?'

সিংহ এ প্রশ্নে মনে মনে একটু গর্বিত হয়ে উঠলেন। যেন তাঁরা প্রার্থী, তিনি দাতা।

বললেন, 'দ্বিজু মুনসীর মতে—যে যেমন মরণ চায়, তার তেমনই মরণ ঘটে।'

বাগ তো এ কথা শুনে যেন একেবারে আকাশ থেকে পড়লেন। এত বড় একটা বাজে কথা শোনার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি জানালার বাইরে মাথা বার করে প্রকৃতির শোভা দেখতে লাগলেন।

হাতির মনেও অবিশ্বাস। তিনি বললেন, 'এও আবার হয় না কি? ধর, যাকে বাঘে খেল, সে কি বাঘের হাতে মৃত্যু চেয়েছিল?'

হাতি সম্ভবত বাঘের দৃষ্টান্তটা বাগকে লক্ষ্য করে বলেননি। কিন্তু কথাটা বাগের কাছে বড়ই সন্দেহজনক একটি ইঙ্গিত বলে বোধ হয়। তাঁর মাথাটা বাইরে থাকলেও কথাটা ঠিক কানে প্রবেশ করেছে। তিনি মাথাটা আরও খানিকটা বাইরে মেলে ধরলেন।

সিংহ বললেন, 'অবচেতন মনে কে কি চায় বা না চায়, বাইরে থেকে তার বিচার করা চলে না।'

বাগের কান যথেষ্ট বাইরে থাকা সত্বেও এ কথাটাও তাঁর কানে প্রবেশ করল। তখন তিনি মাথাটা ভিতরে টেনে এনে মহা বিরক্তির সুরে বললেন, 'ওই এক কথা হয়েছে আজকাল, ওই অবচেতন মন। ওটা স্রেফ ধোঁয়া। ওই ধোঁয়ার আড়ালে আসল সত্যটা চাপা পড়ে।'

সিংহ এ কথাটার খোঁচাটা অনুভব করলেন, কিন্তু তবু একটু হেসে বললেন, 'বিজ্ঞানের অনেক কথা ও-রকম মনে হয় সত্যিই, কারণ এ-সব কথা বুঝতে হলে একটুখানি ধৈর্য দরকার—' বলে তির্যক দৃষ্টিতে বাগের দিকে একবার চাইলেন। দেখলেন ঝড়ের মেঘের আভাস ফুটে উঠেছে। তাই পরিস্থিতিটা একটু সরল করার জন্যে একটুখানি জোরের সঙ্গে বললেন, 'এই যে সেদিন আমাদের বৈকুণ্ঠ বোস মারা গেলেন, তাতেও তো দ্বিজু মুনসীর কথাই প্রমাণ হচ্ছে। হচ্ছে কি না?'

কিন্তু বৈকুণ্ঠ বোস কে এবং কিসেই বা তিনি মারা গিয়ে দ্বিজু মুনসীর কথা প্রমাণ করলো, তা ওঁরা দুজন বুঝতে পারল না।

হাতিই প্রথম বলে উঠলেন, 'বৈকুণ্ঠ বোস? তিনি আবার কে? না জেনে উত্তর দেবো কি করে?'

সিংহ একটু নিশ্চিন্ত হলেন। তিনি শান্তভাবে বললেন, 'নাম না জানা আশ্চর্য নয়। তিনি পড়াশুনা নিয়েই ঘরে বন্ধ থাকতেন। তাঁর ঘরে বই আর বই।'

বাগের একটু ব্যাকরণ-প্রীতি ছিল এককালে। তিনি বলে উঠলেন, 'বই নিয়ে থাকতেন অথচ তার নাম বৈকুণ্ঠ? এমন মানুষের তো বইতেই সব চেয়ে বেশি কুণ্ঠা থাকা উচিত—' বলে নিজেই খানিকটা হাসলেন।

হাতি বিরক্ত হলেন। বললেন, 'তোমার ওই ভাষাতত্ব এখন কিছুক্ষণ একটু সিকেয় তুলে রেখে তারপর কি হল শোন।'

সিংহ বলতে লাগলেন, 'বৈকুণ্ঠবাবু অবিবাহিত ছিলেন। মৃত্যুর সময় বয়স ষাট বছর পার হয়েছিল।'

হাতি প্রশ্ন করলেন, 'বিয়ে করেননি কেন? সাধক ছিলেন বুঝি?'

'না, স্বাধীনতা ভালোবাসত খুব।'

'ও! বুঝেছি ইংরেজদের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে বোধহয়? ও: সে কি দিনই গিয়েছে! সেই বারীন ঘোষের যুগ থেকে—'

'না, সে সব কিছু না। তিনি বলতেন—বিয়ে না করার সুবিধা কি জান? যখন যেমন ইচ্ছা, বিছানার যে কোনও পাশ দিয়ে নীচে নামা যায়। এত বড় স্বাধীনতা আমি বিয়ে করে হারাতে চাই না।'

বাগ বললেন, 'কথাটা তো খুব ভালো বলেছেন তিনি। আর হাতি, তোমার তো এটা অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা উচিত ছিল, তোমার তৃতীয়পক্ষ চলছে। প্রত্যেক দুটি বিয়ের মধ্যে তুমি ইন্টারভ্যাল পেয়েছ, তাতেও বিষয়টা সিরিয়াসলি নাওনি শুনে তাজ্জব বনে গিয়েছি।'

সিংহ হেসে বললেন, 'কেন, বিয়ের আগের দিনগুলি?'

'সে আর ভেবে দেখার মতো বুদ্ধি ও পাবে কোথায়? আমার মনে হয় প্রথম জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই হাতি বিয়ে করে আসছে।'

হাতি একথা শুনে একটু উত্তেজিত। কিন্তু কোনও প্রতিবাদ না করে নাকটা একটুখানি বাঁয়ের দিকে বেঁকিয়ে ছেড়ে দিলেন। মনে হল যেন শুঁড় বেঁকালেন। তারপর ঘোঁত ঘোঁত করতে-করতে চাপা গলায় বললেন 'পক্ষ দিয়ে কথা বল না, যা শুনতে বসেছ তাই মন দিয়ে শোন! বিয়ের কথা নয়, মৃত্যুর কথা হচ্ছিল—বুঝলে?'

'আচ্ছা বেশ, বেশ! যদিও দুটির মধ্যে তফাত দেখি না কিছুই তবু বিয়ের কথা থাক, মৃত্যুর কথাই শোনা যাক, বলে বাগ পরিস্থিতিটা হালকা করে দিলেন। 'আর শুধু মৃত্যুর কথা নয়—হচ্ছিল বৈকুণ্ঠ বোসের মৃত্যুর কথা।'

সিংহ এ সভায় লায়নস শেয়ারটি পেয়েছেন সেটি বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পেরে দুজন শ্রোতাকে নিয়ে মাঝে মাঝে একটু খেলা করছেন। বাগের কথা শেষ হলে তাই একটা মাত্র কথা বললেন, 'ও:! সে কথা ভাবতে গেলেও মনের মধ্যে কেমন যেন গোলমাল হয়ে যায়।'

হাতি ও বাগের কৌতূহল আরও খানিকটা চড়ে গেল। ওঁরা দুজনেই আরও একটু ঘনিয়ে বসলেন সিংহের কাছে।

সিংহ বলতে লাগলেন, 'আরও একটা বড় স্বাধীনতা তিনি ভালোবাসতেন—অসুস্থ হওয়ার স্বাধীনতা।'

হাতি বলে উঠল, 'মানে, ইচ্ছে করে অসুখ বানিয়ে নিতেন?'

বাগ যোগ করলেন 'ইচ্ছা-মৃত্যুর কথা শুনেছি বটে, কিন্তু ইচ্ছা-অসুখ তো শুনিনি।'

সিংহ বললেন, 'সে এক অদ্ভুত কাণ্ড। আগেই তো বলেছি, বই নিয়ে দিন কাটাতেন, বিয়ে করেননি, শৌখিন ছিলেন—অথচ দেখ মৃত্যুটা ঠিক তাঁর এই সময়েই জরুরি দরকার ছিল না। অবিবাহিত, সে আর মরতে চাইবে কেন?'

হাতি এ কথার প্রতিবাদ করলেন, 'বিয়ে করলে মরাটা জরুরি হয় না কি?'

বাগ বললেন, 'তা হতে পারে। সংসার ত্যাগ করার পক্ষে ওটা একটা মস্ত প্রেরণা।'

সিংহ বললেন, 'আমার কথাগুলো চুপ করে শোন। বৈকুণ্ঠ ছবিও আঁকতেন। অয়েল পেন্টিং শিখেছিলেন এক মাস্টার রেখে।'

হাতি বলে উঠলেন, 'এরপর যা যা বলবে তা বুঝতে পেরেছি। বলবে, ফ্লাইং ক্লাবের মেম্বার ছিলেন তিনি, রাইফেল শুটিংয়ে ওস্তাদ ছিলেন তিনি, শিকার করতেন, রেস খেলতেন। একে একে না বলে এক সঙ্গে বললেই ভালো হত। বোঝা যাচ্ছে ভদ্রলোকের পৈতৃক টাকা ছিল অনেক। এই কথাটা আগে বললেই ল্যাঠা চুকে যেত। টাকা থাকলে সবরকম শখই থাকে।'

সিংহ বললেন, 'না, ও-সব শখ ছিল না। কোনও একদিন তাঁর খেয়াল হল তিনি আমার ছবি আঁকবেন। আমাকে সেজন্য তাঁর সামনে কয়েকদিন বসতে হবে। মানে, ওঁদের ভাষায় সিটিং দিতে হবে। আমার রাজি না হয়ে উপায় ছিল না। আমি সদ্য কলেজ থেকে বেরিয়েছি, তিনি আমার থেকে বয়সে অনেক বড়, তাই তাঁর মন জোগানো আমার পক্ষে অসুবিধাজনক ছিল না। তা ছাড়া ছবি ভালোই আঁকতেন, লোভও হয়েছিল। কিন্তু দুদিন সিটিং দেবার পর একটা ঘটনা ঘটল। তিনি দ্বিতীয় দিন আঁকার শেষে বললেন—হাতে একটু ব্যথা অনুভব করছি। বলেই বাঁ হাত দিয়ে ডান হাতখানা একটু টিপতে লাগলেন। তারপর বললেন—সীতেশ, ডাক্তার ডাক।'

বাগ এই সময় জিজ্ঞাসা করে বসলেন, 'তোমার সঙ্গে বৈকুণ্ঠবাবুর পরিচয়টা কি সূত্রে?'

—'সে কথা এখন থাক। তাঁর অনেক বই ছিল, পাড়ার লোক বই পড়তে যেতেন এবং—কিন্তু সে কথাও থাক। যা বলছিলাম—ডাক্তার ডাকার কথায় আমি ভ্রান্তিবশত বলে ফেলেছিলাম, ও কিছু না, একটুখানির জন্য আবার ডাক্তারের হাঙ্গামা কেন?'—এইটুকু বলে তাঁর চোখের দিকে চেয়েই বুঝলাম ভুল করেছি। এতটা জানতাম না। কথায় কথায় অসুখ হওয়া এবং ডাক্তার ডাকা যে তিনি পছন্দ করেন, এটা জানা থাকলেও এ বিষয়ে আমার খুব স্পষ্ট ধারণা ছিল না। কিন্তু তবু ঝোঁকের মাথায় আরও বলে ফেললাম, 'আমি মাসাজ করে সারিয়ে দিচ্ছি, হাতটা এগিয়ে দিন তো।'

'তারপর?' প্রশ্ন করলেন বাগ।

'তারপরের ঘটনাগুলো এত সহজ তা আমি কল্পনাও করতে পারি না। বৈকুণ্ঠবাবু তুলিতে অনেকখানি নীল রং মাখিয়ে তড়িৎ গতিতে সমস্ত ছবিখানার উপর এলোমেলোভাবে টানতে লাগলেন। আমার ছবির মুখে সে যে কী করলেন! তারপর দাঁড়িয়ে উঠে ইজেলখানা হাতের ধাক্কায় কাত করে ফেললেন। সেখানা সশব্দে মেঝের উপর লুটিয়ে পড়ল।'

হাতি প্রশ্ন করলেন, 'ডান হাতে?'

সিংহ বললে, 'ডান হাতে। কী শক্তি দেখলাম সে হাতে! এবং সেই হাতের জন্য ডাক্তার জরুরি দরকার ছিল। তারপর সেই ডান হাতেই টেলিফোন তুলে এক ডাক্তারকে ফোন করলেন। শুনলেন—নেই। অন্য আর একজনকে ডাকলেন। জরুরি ডাক। আমি বললাম—উঠি তাহলে? বৈকুণ্ঠবাবু বললেন—না। কথাটা এমন জোরের সঙ্গে বললেন যে, আমি চমকে উঠলাম। আমার আর ওঠা হল না। ওইরকম আদেশের সুরে কথা বলতেন এক-এক সময়।'

বাগ বললেন 'তোমার উপর বিরূপ হয়েছিলেন যখন, তখন উঠতে বললেও তো পারতেন।'

'হ্যাঁ, তা পারতেন, কিন্তু বললেন না। বোধহয় উত্তেজনার মুখে ছবিখানা নষ্ট করে মনে কিছু অনুতাপ হয়েছিল! কিন্তু এ আমার অনুমান মাত্র।'

'তারপর?'

'তারপর যা ঘটল, তা বললে বিশ্বাস করবে না।'

'তবু বল, আর বলবে বলেই তো ভূমিকা ফেঁদেছ!'

হাতিও চেপে ধরলেন—না, বলতেই হবে। সব বিশ্বাস করব। আর বিশ্বাস করব বলেই তো এতটা শোনা।

সিংহ বললেন 'বেশ, আমার দোষ দিও না! আমি যা ঘটেছে বলছি।'

সিংহ বলতে লাগলেন, 'যে ডাক্তার এল, সে তাঁর পরিচিত নয় বলেই মনে হল। হয়তো তাঁর নোটবইতে ডাইরেকটরি দেখে অনেক ডাক্তারের নাম লিখে রেখেছেন, তাই যখন যাকে ইচ্ছে ডাকতেন। কিন্তু এও আমার অনুমানমাত্র। কিন্তু চুলোয় যাক সে কথা। তারপর যা ঘটল, ও:! তা আমার কল্পনার বাইরে ছিল। আমার মনে হয় তা আর নাই বা শুনলে!'

সিংহের এইভাবে খেলানোয় খুব আনন্দ। কারণ, এর পরেই ওঁরা দুজনেই প্রায় এক সঙ্গে বলে উঠলেন 'না, না—সে কি কথা?'

সিংহ একটু তির্যক হাসি হেসে বললেন 'হাতির না হয় সহ্য করার অভ্যাস আছে, কিন্তু বাগ, তুমি কি পারবে তা সহ্য করতে? তোমার আবার শুনলাম ব্লাড প্রেশার বেশি।'

হাতি বললেন 'আমাকে একটু খোঁচা না দিয়ে তোমরা কেউ কথা বলছ না দেখছি। আমার ওতে কিছুই হয় না।'

বাগ হঠাৎ উৎসাহিত হয়ে ডানহাতের তর্জনী বাঁ-হাতের তর্জনীর মাথা থেকে শুরু করে মধ্যমা ও অনমিকার মাথা পর্যন্ত ছুঁয়ে ছুঁয়ে হাত নামালো।

হাতির তৃতীয় পক্ষের প্রতি স্পষ্ট কটাক্ষ। তিনি বললেন, 'কেন, বারবার রসভঙ্গ করছ? সিংহকে একটানা বলতে দাও।'

সিংহ মৃদু হেসে বলতে লাগলেন, 'শোন। ডাক্তার যুবক। সে নানাভাবে পরীক্ষা করে বলল, আমি তো কিছু পাচ্ছি না। সবই ঠিক আছে। আর ঠিক তখনই—'

'কি হল? '

বৈকুণ্ঠবাবু গর্জন করে উঠলেন। ডাক্তারের মুখে ওই কথা শুনে ক্ষেপে উঠলেন।

'কেন ক্ষেপে উঠলেন?'

'বোঝা উচিত। তবে কারণ কেউ জানে না।'

'অথচ ক্ষেপলেন?'

'অথচ ক্ষেপলেন। বললেন কি জান? বললেন, 'ডাক্তার, তোমার স্কুল মাস্টার হওয়া উচিত ছিল। এ লাইন তোমার নয়।' ডাক্তার তার প্রথম ডাক্তারি জীবনে এমন অপমানকর কথা কারও কাছে শোনেনি। সে তো লজ্জায় কোনওরকমে একখানা প্রেসক্রিপশন লিখে ফি নিয়ে পালিয়ে গেল। আর বৈকুণ্ঠবাবু প্রেসক্রিপশনখানা টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে হাওয়ায় উড়িয়ে দিলেন। বললেন, 'অজ মূর্খ!—তারপর ক্লান্তভাবে চেয়ারের উপর শিখিলভাবে দেহটা এলিয়ে দিলেন।'

'একসঙ্গে সাতটি পণ্ডিতকে কল দিয়েছি, একটু মজা সৃষ্টি হবে, এই আর কি।'

আমি প্রশ্নার্ত চোখে তার দিকে চেয়ে রইলাম। তিনি বললেন, 'সাতটা ডাক্তার কখনও একমত হয়? ওরা ঝগড়া করবে, তর্ক করবে, সেইটে একটু উপভোগ করতে চাই।'

'তা কেন?' আমি প্রশ্ন করি। 'সাতজন সাত রকম অসুখের নাম করলে কি আপনি খুশি হবেন?'

'খুশি হব, সেজন্য নয়। এতদিনের একটা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করব। ওরা কেউ কিছু জানে না, কিন্তু সব সময় আমার টাকা খেয়ে চলে যায়, বলে বিশেষ কিছুই হয়নি। তার আজ মজাটা টের পাওয়াব। আজ ওরা ঝগড়া করবে, আমার মজা বোধ হবে। একটুখানি নতুনত্ব, বিছানায় পড়ে থেকে থেকে বাইরের জীবন থেকে একেবারে কাটা পড়ে গিয়েছি। এক-এক সময় ঘরকুনো হয়ে থাকার বিরুদ্ধে মন বিদ্রোহ করে ওঠে। মনে হয় অদূরের পৃথিবীটা উপভোগ করি সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে, আগেও বাইরে যেতাম না, কিন্তু তখন না যাবার স্বাধীনতা ছিল। এখন সে স্বাধীনতা নেই বলে মনে মনে ভীষণ হিংস্র হয়ে উঠেছি। আমার মারাত্মক অসুখ। এমন সময় এক এক সময় মনে বড় অদ্ভুত খেয়াল জাগে, মনে হয় ম্যাটাডোর হয়ে ষাঁড়ের সঙ্গে লড়াই করি। কিন্তু শোবার ঘরে ষাঁড় ঢোকাতে পারি না। নিজেরও কোনও ক্ষমতা নেই, তাই সাতটি ষাঁড় ঢুকিয়েছি যারা ডাক্তার নামে পরিচিত। বুদ্ধি খুলে গেল, তাই অতগুলো ডাক্তারকে একসঙ্গে কল দিয়ে ফাইটের মজাটা ঘরে শুয়ে অনুভব করবো। ঠিক করেছি ওদের মত না মিললে কাউকে ফি দেব না।'

'আমি কোনও কথারই প্রতিবাদ করলাম না। বরং সায় দিয়ে বললাম, 'সে বেশ হবে।' বললাম, 'ডাক্তাররা আর মুনিরা এক জাতের! সবাই ভিন্ন মতের।'

বাগ বলল, 'তুমি এতে সায় দিলে? এ যুগে অসুখ চেনাও তো যান্ত্রিক ব্যাপার, সব ডাক্তারেরই মত মেলে এ-যুগে।'

'আমার সায় না দিলে চলত না বলেই দিয়েছিলাম। নইলে প্রলয় কাণ্ড হত। সায় দিলাম বটে কিন্তু দেখলাম বৈকুণ্ঠবাবুর চোখ দুটি লাল। কথা বলার সময় যে আবেগ দেখলাম, তাও অস্বাভাবিক। স্নায়ু আর সচল নেই বোঝা গেল। মাথায় বেশ বিকার দেখা দিয়াছে বোঝা গেল। ভয় হল তাঁর এই অস্বাভাবিক আচরণ দেখে, এর পর মানসিক চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যেতে না হয়।'

'এইসব ভাবছি এমন সময় সেই মারাত্মক মুহূর্তটির মুখোমুখি হলাম।'

হাতি কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু সিংহ বাধা দিয়ে বললেন, 'আর কোনও কথা নয়, এ বারে শোন। সে যে কি করুণ একটি মুহূর্ত, কি ভয়ংকর তা প্রকাশ করার ভাষা নেই। পাশের ঘরে সাতজন বড় ডাক্তার বৈকুণ্ঠবাবুর যাবতীয় ল্যাবরেটারি রিপোর্ট নিয়ে এতক্ষণ আলোচনায় ব্যস্ত ছিলেন, রোগীর ঘরের আত্মীয়রা উদ্বেগের সঙ্গে মিনিট গুনছে, এমন সময়—

'এমন সময় কি হল?' বাগ চুপ করে থাকতে পারলেন না।

সিংহ বললেন, 'মনোযোগ দিয়ে শোন।'

শ্রোতাযুগলের বুক ওঠাপড়া করছে, কী ভয়ঙ্কর কথা শুনতে হবে তার জন্য উদ্বিগ্ন প্রতীক্ষা।

কিন্তু সিংহের কথায় সব যেন চুপসে গেল। তিনি বললেন, 'সেই ক্রান্তি মুহূর্তটিতে এত আকস্মিক, অথচ ব্যাপারটা তার তুলনায় এত সহজ যে তোমরা হাসবে কিনা তাই ভাবছি।'

হাতি বললেন, 'এত সহজ যদি, তবে এমন কঠিন ভূমিকা ফাঁদলে কেন?'

বাগ বললেন, 'যা কিছু অতর্কিত, যা কিছু সহজ, তারই ভূমিকা সব সময় কঠিন হয়, তার জন্য দুশ্চিন্তা কি? তোমার ভূমিকা দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম ব্যাপারটা সহজ হবে।'

সিংহ বললেন, 'ঠিক কথা। কিন্তু হতাশ হবার কারণ নেই। ডাক্তাররা প্রায় একঘণ্টা আলোচনা করে রোগীর ঘরে এসে বললেন, 'আপনার কিছুই হয়নি,—এ বিষয়ে আমরা একমত যে আপনার কোনও রিপোর্টে কোনও দোষ নেই—'

এর পর তাদের আর একটি কথাও বলা হল না। কারণ এর পর একটা বজ্রপাত ঘটল। কি বিকট চিৎকার। কি অমানুষিক সে চিৎকার, সমস্ত বাড়ি যেন কেঁপে উঠল।

সিংহ চুপ করলেন। শ্রোতারাও চুপ, দু-মিনিট পর বাগ প্রশ্ন করলেন, 'কি ব্যাপার বল তো?'

'ব্যাপার খুব সহজ আগেই বলেছি, বৈকুণ্ঠবাবু মারা গেলেন।'

'অ্যাঁ!'—দুজনে প্রায় একসঙ্গে বলে উঠলেন। হাতি বললেন, 'তবে যে বললে খুব সহজ ব্যাপার?'

'মরার মতন সহজ আর কি আছে? যে সব বড় বড় ডাক্তারের ভিন্ন মতের উপর ভরসা করে তিনি এতক্ষণ কৌতুক সৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করেছিলেন, সেই সাতজন ডাক্তার—তার মধ্যে দুজন ইউরোপীয়—তাঁকে ষড়যন্ত্র করে ঠকালেন!'

'বৈকুণ্ঠবাবুর ''কিছুই হয় নি'' এ বিষয়ে অপ্রত্যাশিত ভাবে একমত হলেন, এটা তাঁর হিসাবের সম্পূর্ণ বাইরে ছিল।'

হাতি বিভ্রান্তভাবে বললেন, 'তারপর?'

সিংহ বললেন, 'তারপর আর কথা নেই। হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে গেল কি না!'

'কেন, তিনি কি এ মৃত্যু চেয়েছিলেন?'

সিংহ বললেন, 'অবচেতন মনে নিশ্চয় চেয়েছিলেন।'

হাতি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হলেন এ কথায়। তিনি শুধু একটুখানি শুঁড় বেঁকালেন।

বাগ ছাড়বার পাত্র নন, তিনি বললেন, 'মৃত্যুর কথা শোচনীয় অবশ্যই, কিন্তু তোমার কাহিনিতে ঝর্না কাব্যের উপেক্ষিতা হয়ে রইল, এও কম শোচনীয় নয়। ভেবেছিলাম কিছু ঘটবে।'

'ঘটেছে বইকি।'

'অ্যাঁ—ঘটেছে?'

'ওই যে'—সিংহ মুখ সেদিকে ফিরিয়ে বললেন—'ওই যে, ওখানে, আমারই দুটি সন্তানের জননী হয়ে বসে দোক্তা খাচ্ছেন তিনি।'

বাগ হতাশ হয়ে আপনমনে উচ্চারণ করলেন, 'ছি, ছি, গল্পটা মাটি করলে?'

সকল অধ্যায়
১.
স্ত্রীর পত্র
২.
অবনীভূষণের সাধনা ও সিদ্ধি
৩.
রসময়ীর রসিকতা
৪.
মহেশ
৫.
ভরতের ঝুমঝুমি
৬.
ঝড়
৭.
কলঙ্কিত সম্পর্ক
৮.
কবির মেয়ে
৯.
এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা
১০.
পথের কাঁটা
১১.
শহুরে
১২.
পুঁইমাচা
১৩.
প্রতিহিংসা
১৪.
বেদেনী
১৫.
আঙটি
১৬.
কসাই
১৭.
অতি সাধারণ ঘটনা
১৮.
রাজা
১৯.
বদলি মঞ্জুর
২০.
প্রেমের বি-চিত্র গতি
২১.
হ্যাংম্যান
২২.
নিবারণের মৃত্যু
২৩.
রুদ্রের আবির্ভাব
২৪.
তেলেনাপোতা আবিষ্কার
২৫.
নেড়ে
২৬.
দুকান কাটা
২৭.
তৃতীয় রিপু
২৮.
বৈয়াকরণ
২৯.
অতসী মামি
৩০.
পোস্টার
৩১.
ফেরিওলা
৩২.
জ্যোতিষী
৩৩.
পাশের বাড়ির মেয়ে
৩৪.
ফসিল
৩৫.
আদিম
৩৬.
আজ কোথায় যাবেন
৩৭.
ঘরন্তী
৩৮.
নিম অন্নপূর্ণা
৩৯.
বাঈজী
৪০.
রস
৪১.
টোপ
৪২.
ইঁদুর
৪৩.
বাঁদী
৪৪.
সুখ
৪৫.
পিকুর ডাইরি
৪৬.
ভারতবর্ষ
৪৭.
সাগিনা মাহাতো
৪৮.
আদাব
৪৯.
চোলি কা পিছে
৫০.
রানীরঘাটের বৃত্তান্ত
৫১.
ঘরবাড়ি
৫২.
নিশীথে সুকুমার
৫৩.
অশ্বমেধের ঘোড়া
৫৪.
রাজা যায় রাজা আসে
৫৫.
গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প
৫৬.
রাজার টুপি
৫৭.
খানাতল্লাস
৫৮.
শ্বেতপাথরের টেবিল
৫৯.
উদ্বাস্তু
৬০.
মঁসিয়ে হুলোর হলিডে
৬১.
আত্মজা
৬২.
বড় পাপ হে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%