সাগিনা মাহাতো

সমরেশ মজুমদার

বসন্দা, দিন্দা, করবীদি, শরৎদা—এদের কাহিনি তো দিব্যি বলতে পেরেছি। একটুও বাধেনি। তবে সাগিনার কথা বলতে গিয়ে বার বার হোঁচট খাচ্ছি কেন?

তিনবছর ধরে চেষ্টা করেছি সাগিনার কাহিনি বলবার কিন্তু কিছুতেই মনের মতো করে বলতে পারছিনে। অথচ সাগিনাকে বাদ দিলে চেনামুখের উজ্জ্বল মুখটাই বাদ পড়ে যায়।

সাগিনার কথা মনে হলেই ১৯৪৪ সালের ডিসেম্বর মাসের সেই হাড়কাঁপানো সকালটার কথা আমার মনে পড়ে।

জমাট কুয়াশায় হিমালয়ের পাদ স্টেশনটা ঢেকে গিয়েছিল সেদিন। দার্জিলিং মেলের শার্সি তোলা ভ্যাপসা থার্ড ক্লাস কামরা থেকে প্ল্যাটফরমে নামার সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে হয়েছিল, ঠান্ডা করাত দিয়ে পা দুটো কে বুঝি কেটে নিল। শীত যে এমনভাবে কামড়ায় সে ধারণা আগে কখনো ছিল না।

জিনিসপত্র সামান্যই। সে গুলো হাতে নিয়ে সামনেই যে পাহাড়ি কুলিটাকে পেলাম তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, সাগিনাকে চেনো?

সে আমাকে বেশ করে দেখে নিলে, তারপর কথার জবাব না দিয়েই চলে গেল।

পকেটে পয়সাকড়ি প্রায় নেই। কাল দুপুরের পর থেকে পেটেও বিশেষ কিছু পড়েনি। সারা রাত ট্রেনে তো প্রায় দাঁড়িয়েই কেটেছে। তার উপর সকালের শীতের এই অসহ্য বোঝা। মনে হচ্ছিল, এক্ষুনি যদি গরম কিছু পেটে না পড়ে, যদি আগুনের তাতে হাত-পা সেঁকতে না পারি তো মরে যাব।

এই অচেনা নির্বান্ধব পুরীতে দুজন লোককে জানি। এক কমরেড কাজিমন। সে আমার বন্ধু। আর যার কাছে এসেছি, সেই সাগিনা। এই বছরই এপ্রিল মাসে তাকে প্রথম দেখি। ঝরিয়ার শ্রমিক সম্মেলনে। কাজিমনই তাকে এনেছিল।

কাজিমনকে এখানে পাবার কোনও সম্ভাবনাই নেই। সে থাকে খার্সাং-এ। এখানে এক সাগিনাই আমার ভরসা।

কিন্তু কোথায় সাগিনা? যাকে শুধাই, সেই মুখ ফিরিয়ে চলে যায়। স্টেশন ঘরে ঢুকে দু'একজন রেলবাবুকেও জিজ্ঞাসা করলাম। তাতে তাঁরা খেঁকিয়ে উঠলেন। কে সাগিনা? ও সাগিনা-ফাগিনা কাউকে চিনি না মশাই।

অগত্যা স্টেশন থেকে বেরিয়ে বাজারে এলাম। সেখানে একটা ছোট চা-খানায় ঢুকে চা খেতে খেতে একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, পাহাড়ি রেলের লোকোশেডটি কোথায়?

লোকটির কথায় জানলাম, একটু দুরেই হবে জায়গাটা। পাহাড়ি রেলের এই ছোট লাইন ধরে এগিয়ে যেতে হবে। একটা ছোট স্টেশন পড়বে। সেখান থেকে ডানহাতি মোড় ঘুরে একটা ছোট বাজার। বাজারের ভিতর আরো খানিকটা এগিয়ে গেলেই লোকো শেড মিলবে। মহানন্দার কাছ বরাবর।

আকাশের গতিক দেখে মনে হল, যে কোনও সময় বৃষ্টি নামবে। হাওয়া দিচ্ছে এলোমেলো। পথ ধরে হাঁটছি। ধকস ধকস করতে করতে দুটো ইঞ্জিন খানকয়েক গাড়ি ঠেলতে ঠেলতে বেরিয়ে গেল পাশ দিয়ে। শৈলবাসে চলেছে। সামনের ইঞ্জিনের বাফারের উপর দুটো পাহাড়ি বালি হাতে বসে। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কি বলছে তারা। কমলালেবুর পাহাড় তৈরি হয়েছে এখানে-ওখানে। চেঁচামেচি চলেছে বেজায়। গোটা কয়েক বাস এক জায়গায় দাঁড়িয়ে যাত্রী ঠুসছে পেটে। হুস-হাস ট্রাক, মোটর কার চালিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ি ড্রাইভার। আমার মন কাউকেই তেমন করে দেখছে না। যদি সাগিনাকে না পাই?

অনেকখানি হেঁটেছি। হাঁটতে ভালো লাগছে। ভিতরটা একটু গরমও হয়েছে। এই তো সেই স্টেশন। ওই বুঝি সেই রাস্তা। হ্যাঁ, এই যে বাজারটা।

দু-চার পা সেদিকে এগিয়ে যেতেই দেখি এক চা-খানার সামনে তুমুল হাঙ্গামা বেধে গেছে। একটা পাহাড়ি মেয়ে ঝাঁটা দিয়ে একটি লোককে দমাদম পিটছে। সেও মেয়েটাকে কিল ঘুষি লাথি চালাচ্ছে। লোক জমে গেছে চারিদিকে। মজা দেখছে সবাই। আমি তো ঘাবড়ে গেলাম। হঠাৎ হই-হই বেড়ে গেল। সিটি পড়তে লাগল সুঁই-সুঁই। কি হল, দেখতে গিয়েই আমি থ। ঝাঁটার ঘায়ে অস্থির হয়ে লোকটা মেয়েটার কাপড় ধরে মেরেছে এক টান। সেই টানে বিবস্ত্রা হয়ে বেকুব বনে গেছে মেয়েটা। বিনা পয়সায় এমন জমাটি খেল দেখে জনতা আহ্লাদে সিটি বাজিয়ে চলেছে।

হঠাৎ কোত্থেকে সাগিনার আবির্ভাব হল। মুহূর্তের মধ্যে সব তছনচ হয়ে গেল।

'শালে কুত্তাকে বাচ্চা' বলে সাগিনা লোকটার ঘাড় ধরে শূন্যে তুলে ফেলল। মনে হলো একটা বাঘের থাবায় নেংটি ইঁদুর ঝুলছে। আরেকটা থাবা দিয়ে সাগিনা তার গালে মারলে চড়। লোকটার কশ বেয়ে কয়েক ফোঁটা রক্ত বেরিয়ে পড়ল। তারপর সাগিনা তাকে ছেঁড়া বস্তার মতো ছুঁড়ে ফেলে দিল। জটলার দিকে চেয়ে খ্যাপা গোরিলার মতো হুঙ্কার ছাড়ল, ভাগো শালা সব।

মুহূর্তের মধ্যে তামাসা মাটি। জায়গা ফাঁকা হয়ে গেল।

চা-খানায় ঢুকে মেয়েটা কাপড় পরে নিল। সাগিনা তার পাশে গিয়ে বসল। লোকটাও গা ঝাড়া দিয়ে উঠে এল। আমিও এক পাশে বসে পড়লাম। আমার মনে হলো, বাহাদুর মার্কা ইংরাজি সিনেমার একটা দৃশ্য যেন এইমাত্র দেখলাম।

সাগিনা আমার দিকে ভ্রূকুটি করে চাইতেই বললাম, কমরেড সাগিনা, আমি কলকাতা থেকে আসছি।

সাগিনা একবার শুধু বলল, কলকাত্তেকে কামরেড? আচ্ছা, ঠিক হ্যায়, পিছু বাত হোগা।

তারপর আমাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে পাহাড়ি মেয়েটিকে মোলায়েম ভাবে জিজ্ঞাসা করল, তুই কে?

মেয়েটি একটু হেসে বললে, ললিতা।

এতক্ষণ পরে সাগিনার স্বভাব-রুক্ষ বিরাট চাকার মতো মুখখানা একটু যেন কোমল হয়ে উঠল। খপ করে ললিতার থুতনিটা ধরে ওর মুখটা একটু তুলে ধরলে, কিছুক্ষণ মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকলে।

তারপর বলল, 'বা: তুই তো বেশ খুবসুরত।'

মেয়েটি খিলখিল করে হেসে উঠল। সত্যি ভাল করে চেয়ে দেখলাম, ললিতা সুন্দরী বটে।

সাগিনা বলল, 'ও তোর কে হয়?'

ললিতা বলল, 'দুশমন।'

তারপর আবার খিলখিল করে গড়িয়ে পড়ল হেসে।

লোকটা এতক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল।

গর্জন করে বলে উঠল, 'ও আমার আওরাত। পালিয়ে এসেছে ঘর থেকে।'

ললিতার দিকে চেয়ে বলল, 'চল ঘরে। দুশমনি বার করব। জিন্দা পুঁতে ফেলব।'

রাগে অপমানে সেই পাহাড়ি মুখ আগুনের মতো লাল হয়ে উঠল। ললিতা সাগিনার কাছ ঘেঁষে সরে বসল। তারপর লোকটার দিকে অবহেলার থুথু ছুঁড়ল। থু:।

সাগিনা-ললিতার একটা হাত আলতোভাবে চেপে ধরল।

লোকটার দিকে কটমট করে চেয়ে বলল, 'আগর জান কি পরোয়া হ্যায় তো ভাগ হিঁয়াসে। জান থাকলে বহুৎ আওরৎ মিলবে।'

লোকটা বাঘের মতো চোখে একবার ললিতাকে, আরেকবার সাগিনাকে দেখে নিল। তারপর কোনও কথা না বলে চলে গেল।

সাগিনা ললিতার দিকে চেয়ে হাসতে হাসতে বললে, 'নে হয়েছে? গিয়েছে তোর দুশমন? আখুন তুই কোথায় যাবি বল?'

ললিতা খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসি থামিয়ে বলল, 'আমি কি জানি? '

মিটমিট করে হেসে সাগিনা বলল, 'তো যা তোর দুশমন তো ভেগেছে, এবার কোথায় যাবি চলে যা।'

ললিতা একটু অবাক হয়ে সাগিনার দিকে চাইল। কিন্তু সে একটুক্ষণ, তারপরেই তার মুখে কেমন এক দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। হাসতে হাসতেই উঠে পড়ল। পোশাকটা ঠিকঠাক করে নিল। তারপর দরজার দিকে পা বাড়াল।

সাগিনা খপ করে হাতটা ধরে বলল, 'বহুৎ আচ্ছা। খুব আচ্ছা জবাব দিয়েছিস। চল, তোর একটা ঠিকানা করে দিই।

সাগিনা উঠে পড়ে দেখে আমি ওকে বললাম, 'কমরেড সাগিনা, আমি কলকাতা থেকে আসছি। কমরেড মিত্র আমাকে পাঠিয়েছেন তোমার কাছে।'

এতক্ষণ আমার কথা ওর মনেই ছিল না। যেন এই মাত্র আমাকে দেখল।

বলল, 'হাঁ হাঁ' কলকাতার কমরেড, ঠিক হ্যায়। হবে, তোমার সঙ্গে বাতচিত হবে। পিছে হবে। দেখছ তো, আখুন ব্যস্ত আছি। কাল পরশু দেখা হবে।

বলেই দরজার দিকে পা বাড়াল। আমি মরিয়া হয়ে উঠলাম। খিদেয় তখন আমার পেটে পাক দিচ্ছে। ওকে খুঁজে বার করতেই তো দম বেরিয়ে গেছে। এখন বেলা দুপুর। দুপুরের পর বিকাল হবে। রাত আসবে। থাকব কোথায়? ওকে ছেড়ে দিলে আর কি ওর পাত্তা পাব?

একটু বিরক্ত হয়ে বললাম, দেখ কমরেড, ব্যাপারটা জরুরি, ইউনিয়নের কাজে এসেছি। এসেছি তোমার কাছে, থাকব কোথায়?

সাগিনা এবার আমাকে আপাদমস্তক দেখে নিল। তারপর হো হো করে হেসে উঠল।

'আরে বাহবা বাহবা। এর মতুন তুমারো ঠিকানা নেই। তো ঠিক হ্যায়, তুমভি চল হামারা সাথ। ফয়সালা একটা হবেই হবে।'

এতক্ষণে বুঝতে শুরু করলাম, যে পাল্লায় পড়েছি, সেটি নিতান্ত সোজা নয়। পার্টির নির্দেশ, এরই সঙ্গে আমাকে এখন কাজ করতে হবে। কাজিমন রিপোর্ট দিয়েছিল, সাগিনা এ অঞ্চলে এক বিরাট শক্তি। ওর ক্ষমতা যদি আমরা কাজে লাগাতে পারি, তবে এ অঞ্চলে আমাদের পার্টির হবে একাধিপত্য অধিকার।

এখন সেই শক্তির খানিকটা নমুনা দেখলাম। আর দেখে আমার আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল।

অথচ সাগিনাকে দেখবার আগে আমি মনে মনে কত খুশি হয়েছিলাম। এই প্রথম আমি সত্যিকার একজন শ্রমিকের আজ্ঞাবহ হতে চলেছি।

আমরা এদেশে যতই শ্রমিকের নেতৃত্ব বলে চেঁচাই না কেন, বরাবর দেখেছি, নেতৃত্বটি মধ্যজীবীদেরই হাতের মুঠোয় শেষ পর্যন্ত থেকে যায়। আর মজদুর ভাইরা কলে কারখানায় যেমন মনিববাবুর হুকুম তামিল করে, তেমনি ইউনিয়নে তামিল করে কমরেডবাবুর হুকুম।

বই পড়ে কত কি শিখেছিলাম। সর্বহারাই পারে বিপ্লবকে ডেকে আনতে, কারণ সে মরিয়া, তার হারাবার কিছু নেই। শ্রেণি-সংগ্রামের সেরা সৈনিক তাই মজদুর। ওদের নেতৃত্বেই একদিন সারা দুনিয়ার পতপত উড়বে লাল-ঝান্ডা।

কিন্তু লেবর-ফ্রন্টে কাজ-করতে এসে দেখি নেতৃত্বের উপর একচেটিয়া অধিকার রয়েছে শুধু মধ্যবিত্তের। যে পাতি বুর্জোয়া শ্রেণির উপর আস্থা না রাখবারই তালিম পেয়ে এসেছি পার্টি সাহিত্যে—কারণ পাতি বুর্জোয়া নাকি সব চেয়ে সুবিধাবাদী, শিবির বদলাতে তারা মুহূর্তের বেশি সময় নেয় না, বিপ্লবকালে এরাই দল ত্যাগ করে মালিকের পা-চাটা গোলাম বনে যায়—যাদেরকে ঘৃণা করতে শিখেছি, এখন দেখি লেবর মুভমেন্টের তাবৎ লিডার তারাই।

আমি জন্মেছি মধ্যবিত্ত ঘরে। জন্মসূত্রে আমি সেই সুবিধাবাদী পাতি বুর্জোয়াদের শরিক। আর তাই আমার লজ্জা রাখার জায়গা ছিল না। মহাপবিত্র শ্রমিকবংশে কেন আমার জন্ম হয়নি, সে আফসোসে আমি মরমে মরে থাকতুম।

তাই তো প্রথম সুযোগেই আমি চলে এসেছিলাম সাগিনার কাছে। আমার নিজের জায়গায়। আমার আপন ঘরে। মনে মনে ভেবেছিলাম আমার জন্মের ত্রুটি শুধরে নেব সাগিনার কাছ থেকে তালিম নিয়ে।

আর সেই সাগিনার কি এই রূপ? আমার মধ্যবিত্ত মন বলছিল, শেষে কি একটা লম্পটের পাল্লায় পড়লে।

এ-বস্তি সে-বস্তি পার হয়ে আমরা তিনজন চলেছিলেম। আগে আগে সাগিনা আর ললিতা। পিছু পিছু আমি। পিছন থেকে সাগিনাকে এক বিরাট দৈত্যবিশেষ লাগছিল।

সাগিনার চেহারাটি বিরাট। যেমন লম্বা, তেমনি চওড়া। মাংসের একটা প্রকাণ্ড স্তূপ যেন চলেছে। ময়লা তেল-কালি মাখা ছেড়া এক রেলের কুর্তি গায়, পরনে টাইট পাহাড়ি প্যান্ট। পাশে ললিতার সুন্দর ছিপছিপে চেহারা। দুজনে অনর্গল কথা বলছে, হাসছে। এ-ওর গায়ে ঢলে পড়ছে মাঝে মাঝে।

লোকো শেড পেরিয়ে একটা জীর্ণ খোলার বাড়ির সামনে এসে ওরা দাঁড়াল।

সাগিনা কর্কশ গলায় হাঁক পাড়ল, 'গুরুং, এ গুরুং।'

একটা বুড়ো পাহাড়ি বেরিয়ে এল।

সাগিনা বলল, 'দাইবুড়ি কো বোলাও।'

গুরুং ভেতরে গিয়ে এক বুড়িকে পাঠিয়ে দিল।

সাগিনা তাকে বলল, 'এ বুঢ়িয়া, তুই এই ললিতাকে তোর কাছে রেখে দে। ডাগদারবাবুকে বলে হাসপাতালে ওকে একটা কাজ জুটিয়ে দিব।

ললিতাকে বললে, 'থাক আখুন তুই এখানে। পরে দুসরি ব্যবস্থা হবে।'

ললিতা হাসতে হাসতে বুড়ির সঙ্গে ভেতরে চলে গেল।

ললিতার ব্যবস্থা হল, এখন আমার একটা হিল্লে হয়তো করবে সাগিনা। এর মধ্যে আমি মনস্থির করে ফেলেছি। আজ রাতটা কাটিয়ে কাল সকালেই রওনা দেব খার্সাং-এ। এ লোকের সঙ্গে পোষাবে বলে মনে হচ্ছে না। কাজিমনের সঙ্গে পরামর্শ দরকার।

সাগিনা আমার দিকে চেয়ে বলল, 'এসো, আমার বস্তিতে যাই।'

সেটা আবার কোথায়? খিদে-পেটে কাঁহাতক ছোটাছুটি করা যায়? বললাম, 'কমরেড কাজিমনকে ফোনে একটা খবর দিলে হয় না!'

সাগিনা আমার দিকে চেয়ে বলল, 'তুমি কাজিমনকে চিনো?'

বললাম, 'হ্যাঁ, সে আমার দোস্ত।'

'আচ্ছা!' সাগিনা বলল, 'তবে চল টিশন। টেলিফুঁ আখুনই হয়ে যাবে।'

এতক্ষণে দেখি সগিনা একটু নজর ফেলল আমার উপর। স্টেশনে যেতে যেতে জিজ্ঞাসা করল দু-চারজন বড় বড় নেতার কথা।

'কামরেড মিত্রাকে জান?'

বললাম হ্যাঁ, জানি।

'আচ্ছা, কামরেড মুকুর্জি, ব্যানার্জী, সেন, মহম্মদ হুসেন—সবাইকে চিনো?'

বললাম, 'চিনি।'

সাগিনা আমার দিকে বেশ করে চেয়ে থাকল কিছুক্ষণ। যেন ভালো করে আপাদমস্তক দেখে নিল আবার।

বলল, 'তব তো ঠিক আছে।'

স্টেশনে ঢুকতে সাগিনার যার সঙ্গে দেখা হয় এখন, সেই দেখি খানিকক্ষণ মাইডিয়ারি আলাপ করে নেয়। অথচ এইখানে জনে জনে জিজ্ঞাসা করেছি সাগিনার খবর। কেউ হদিস দেয়নি। বড় তাজ্জব ব্যাপার! কন্ট্রোল রুমে ঢুকতেই আধঘণ্টা কাবার হয়ে গেল।

দু-একজন স্টেশনবাবু সাগিনাকে দেখে গম্ভীর হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। সাগিনা গ্রাহ্যও করল না। সটান এক ফিরিঙ্গি সাহেবের কাছে এগিয়ে গেল।

বললে, 'আন্টুনি সাহাব, সালাম।'

সাহেব বিরক্তি হয়ে বললে, 'ক্যায়া মতলব সাগিনা।'

সাগিনা হেসে বললে, 'সালাম দিচ্ছি সাহেব, তব ভি গোঁসা করছ কেন? তবিয়ত গড়বড় হয়নি তো।'

সাহেব আরো চটে গেল, 'দিক কর না সাগিনা। মতলব কি তাই বলো।'

সাগিনা এবার গম্ভীর হয়ে গেল।

বলল, 'টেলিফুঁ করতে চাই। খার্সাং-এর লোকো অফিসের নম্বর লাগিয়ে দাও।

সাহেব বললে, 'আবি ভাগো। হোগা নেই।'

পেছন থেকে কে মন্তব্য করলে, 'অ্যাঁ ব্যাটার রোয়াব দ্যাখ। বাপের জমিদারি পেয়েছে যেন।'

সাগিনা বললে, সাহেব, 'টাইম আমারও কমতি আছে। কাম ভি জরুরি। হুজ্জৎ যদি না চাও, লাইন দাও জলদি।'

এবার ঘরশুদ্ধ বাবুরা চটে গেল। কেউ বললে বেরিয়ে যাও, কেউ বললে নিকালো, কেউ বা বললে গেট আউট। একটা মিনিয়েল বাবুদের কাছে চোখ গরম করবে। ইয়ার্কি। রিপোর্ট কর উপরে। কোম্পানিও হয়েছে এমনি এইসব গুন্ডাদের জেলে না পাঠিয়ে লাই দিয়ে মাথায় তুলছে।

এক বাবু আমাকে খিঁচিয়ে উঠলেন, 'এই ছোকরা, ভাগ এখান থেকে।'

সাগিনা সব গালাগাল নির্বিবাদে শুনল। ও সব কথায় সে একটুও বিচলিত হয়েছে বলে মনে হলো না। এগিয়ে গেল এন্টনি সাহেবের কাছে।

তারপর বললে, 'সাহাব, তোমরা ভারী অফসার আছো। তাই চটপট পুরানো বাত ভুলে যাও। বস্তিবাজার কা মামলা এতনা জলদি ভুলে গেলে? থাক, আমিও সে সব কথা তুলতে চাইনে।'

হঠাৎ বাইরে কাকে দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে ডাকল, 'এ বাহাদুর ইধার আও।'

জানালা দিয়ে একটা পাহাড়ি মুখ উঁকি মারল।

সাগিনা বললে, 'তুমকো আদমি লোগ সব তৈয়ার হ্যায়?'

পাহাড়ি মুখ জবাব দিলে, 'বিলকুল তৈয়ার। কিউ ভাই?'

সাগিনা বললে, 'এক সাহাব আর তিন বাংগালি বাবুকো দুরস্ত করনে পড়েগা।'

পাহাড়িটা একগাল হেসে বললে, 'বহুৎ আচ্ছা। কব।'

সাগিনা এবার গোটা ঘরটায় চোখ বুলিয়ে বললো, 'সামকো আ যাও বস্তিবাজারমে। বাতা দুঙ্গা।

'বহোৎ আচ্ছা।'

সাগিনা যেন নিজের মনেই বলে উঠল, 'আব কুছ কাম হোগা মালুম পড়তা হ্যায়। কিউ সাহাব?'

ঘরের লোকগুলো সব যেন বোবা হয়ে গেছে। এন্টনি সাহেব সাগিনার দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন।

সাগিনা বললে, 'এবার তো লাইন মিলবে সাহাব?'

দ্বিতীয় কথা না খসিয়ে সাহেব ফোনটি তুললেন। একটু পরে 'হ্যালে খার্সাং, লোকো অফিস প্লিজ' বলেই ফোনটি সাগিনার হাতে তুলে দিলেন।

সাগিনা ফোন ধরে চেঁচাতে লাগল, 'হ্যালো কাজিমন সাহাব। হাঁ হাঁ সাগিনা। আরে কলকাত্তাকে চিড়িয়া আয়া। বোলছে কি তুমাকে চিনে। হাঁ হাঁ বাত করো না।'

ফোনটি আমাকে দিয়ে বললে, 'বাত করো।'

আমার গলা পেয়ে কাজিমন খুব খুশি। বললে, আপাতত সাগিনার ওখানে থাকো। পরশু আমি যাব। তখন কামকাজের বন্দোবস্ত হবে। তুমি এখন সাগিনাকে ফোনটি দাও।

সাগিনাকে বলতে শুনলাম, 'ঠিক হ্যায়! ওর জনো তুমি ভেবো না পরশু রোজ তুম আ যাও, জরুর। আচ্ছা আচ্ছা। হা: হা: হা:। ফিকির মতো করো ভাই। কৌন? জানরল ম্যানেজার। হা: হা: হা:। বড়ি আচ্ছি বাত। আরে দুনিয়া বদল জায়েগি। উয়ো বড়া সাহাব, ছোটা সাহাব—সব শালে কো রং জ্বল জায়গা। শরমায়দারি চলেগা নেহি। আচ্ছা আচ্ছা, উয়ো সব বাত পিছে হোগা। কেয়া? আওরাত? কৌন? ও হো হো। ভুখন কি বেওয়া? আরে ভাই, উয়ো তো ভাগ গায়ি। মেরা কলিজা কাটকে চলি গয়ি। দো মাহিনা হো চুকা। হাঁ। নেহি, নেহি, কসুর-উসুর কুছ নেহি থা। মাতোয়ালা হোকে এক রোজ ঘর পহুঁচা। সামনে পড় গিয়া উও বেচারি, মারা দো চার ঝাপড়। তো সুবে উঠকে দেখা কি পিঞ্জরা খালি। হায় হায়। ক্যা আফসোস! ক্যা দুসরি কো বাত? আরে ভাই, আরে ভাই শুনো তো। ম্যয় ক্যা মরদ নেহি হুঁ? তো? তো আওরাত ভি মিল জায়গা! ও হা: হা: হা:। কামাল কিয়া ভাই, তুমনে কামাল কিয়া। আচ্ছা আচ্ছা। ঠিক হ্যায়।'

খটাস করে ফোনটি রেখে দিল সাগিনা। খুশিতে চোখ মুখ ভরে উঠেছে।

'গুড মনিং সাহাব, হা গুড মনিং। চলো কামরেড।'

আমার পিঠে গব্দা হাতের একখানা থাপড় মেরে ঠেলতে ঠেলতে বাইরে নিয়ে এল।

সাগিনার সঙ্গে ওর কোয়ার্টারের দিকে যেতে যেতে নানা কথা ভাবছিলাম। সাগিনা দেখলাম, সোজা পথের মানুষ। সাহেব যদি ফোন করতে না দিতে চায় তো বিচলিত হবার কিছু নেই। ধরে পিটে দাও। মরদ হয়ে সে যখন জন্মেছে, তখন তার আওরাত একজন চাই। একজন যদি চলে যায়, দু:খ নেই, আরো কেউ জুটে যাবে।

যাবে কেন বলছি, জুটে তো গেছেই এর মধ্যে। সকালের ঘটনা মনে পড়ল। ললিতার স্বামীকে তাড়িয়ে সাগিনা তাকে রেখে এসেছে এক বুড়ির বাড়িতে।

এই লোককে নিয়ে পার্টি গড়তে হবে। বই-এ লেখা নীতিকথায় আমার কখনো বিশ্বাস ছিল না। সুনীতি দুনীতির মার্কসীয় ব্যাখ্যাই আমি জানি। কিন্তু তবুও এই লোকাটার সংস্পর্শে এসে অবধি তার যা ক্রিয়াকাণ্ড সব দেখলাম তাতে আমার মনটা কেন যেন খচখচ করতে লাগল।

সাগিনা একগাল হেসে বললে, 'কামরেড, এবার খানপিনা কিছু করা যাক। তুমি যে এসেছ সেটা খুব খুশির কথা আছে।'

ঘর বলতে সাগিনার একটাই। কিন্তু সেটা এত কদর্য, আগে বুঝতে পারিনি। আমার বিছানাপত্র কিছু ছিল না। সাগিনার বিছানাতেই শুয়েছিলাম, সাগিনার পাশেই। ওরই বোঁটকা কম্বল মুড়ি দিয়ে।

শীতের ভয়ে সেই ছোট্ট ইঁটের খুপরির একটামাত্র দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আর অন্য কোনো ফাঁক ফোঁকর নেই। আমরা জনা পাঁচেক লোক সেই ঘরে। ঘরটি গরম রাখতে এক কোণে একটা আগুনের মালসা জ্বলছে।

প্রচুর মদ খেয়েছে সাগিনা। ভক ভক করে তার প্রশ্বাসের গন্ধ আমার নাকের উপর আছড়ে পড়ছে। এইসব গন্ধ, মালসার ধোঁয়া, আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস—কোনোটাই বেরুতে না পেরে সেই বন্ধ ঘরে ঘুরপাক খেয়ে বেড়াচ্ছে। ভ্যাপসা চরম পীড়াদায়ক সেই আবহাওয়ায় আমার মনে হলো, আমি দম বন্ধ হয়ে মারাই পড়ব বুঝি।

এ ও বুঝতে পারছিলাম, আমার এ অস্বস্তি অন্যায়। পাতিবুর্জোয়া রক্তের নাক-উঁচু সংস্কার। যতবার কথাটা মনে হচ্ছিল ততবারই যেন মরমে মরে যাচ্ছিলাম। এই আমার আপন ঘর। খাঁটি এক মজুরের আস্তানা। এমন জায়গায় থাকবার সুযোগ পাব বলেই না এখানে এসেছি। তবে কেন এই অস্বস্তি? তবে কেন আমি এত ছটফট করছি? ঘুমোতে পারছি না কেন ওই সাগিনাদের মতো নির্বিকার ভাবে। ছি:? মনকে ধমক দিলাম। একটু ঘুমোতে চেষ্টা করলাম।

হঠাৎ সেই আবছা অন্ধকারে দেখি সাগিনা উঠে বসল। তারপর দুই ধাক্কায় আমাকে ঠেলে তুলল।

'কামরেড,' আমার হাত দুখানা চেপে ধরল সাগিনা। 'কামরেড আমাকে মাফ করে দাও। ম্যায় পাপী হুঁ।'

বুঝলাম, রাতদুপুরে মাতলামো চেপেছে সাগিনার। সেরেছে!

'সচ বলছি কামরেড একটা বুরা কাম করতে গিয়েছিলাম। মাফ করে দাও।'

এতক্ষণে বিরক্ত হয়ে উঠেছি।

বললাম, 'কমরেড, কথা কাল হবে। আজ ঘুমাও।'

'ঠিক হ্যায়। লেকিন শোনো কামরেড,' সাগিনা বললে, 'তোমাকে যখুন প্রথম দেখি তখুন মনে করেছিলাম কি শালা টিকটিকি আছে। তখুন তয় করলাম কি শালাকে জানে মেরে ইঞ্জিনের বয়লাটে ফেলে দিব।'

সর্বনাশ! আমার গা দিয়ে ঘাম ঝরে পড়ল। আঁতকে উঠলাম সাগিনার কথা শুনে।

'তারপর!'

'তারপর' সাগিনা বলল, দেখলাম তুমি কাজিমনের সাথে বাতচিত করলে। দেখলাম, হাঁ তোমাদের বেরাদরি পাক্কা। তখন আফসোস হল কি তোমাকে আমি বিশোয়াস করিনি। তুমি আমাকে মাফ করে দাও কামরেড।'

সত্যি বলছি, সে রাতটা খুব ভয়ে ভয়ে কাটিয়েছি। যে সাগিনাকে চরম ভরসা বলে প্রথম রাত্তিরে নিশ্চিন্তে তার কাছ ঘেঁষে শুয়েছিলাম, এখন তাকেই সাক্ষাৎ শমন বলে মনে হতে লাগল।

সাগিনা ততক্ষণে ভোঁস ভোঁস ঘুম দিতে লেগেছে। যদিও ঘুমানোর আগে বার বার ভরসা দিয়েছে যে তার ভুল ভেঙেছে। সে আমাকে কমরেড বলে মেনে নিয়েছে। তবু আমার ভয় যায়নি। সারারাত যেন খাটের নীচে সাপ নিয়ে শুয়ে কাটালাম।

তারপর পুরো একটি বছর সাগিনার সঙ্গে কাটল। কাজিমন কিছু বাড়িয়ে বলেনি। সাগিনার প্রতাপ সে অঞ্চলে ছিল অপ্রতিহত। পাহাড়ি রেলের মজদুররা সাগিনা ছাড়া আর কাউকে চেনে না। আর কাউকে মানে না।

বিদেশি মালিকের বহু অত্যাচার এই রেলপথের শ্রমিকদের সইতে হয়েছে। শীতের দেশ। বর্ষার দেশ। কিন্তু কি সব ভাঙাচোরা কোয়ার্টার। বর্ষায় ফুটো চাল দিয়ে জল পড়ছে প্রতি বছর, শীতে কনকনে বাতাস ঢুকছে। রোগে ভুগে কত মজদুর মারা গেছে। তবু কোম্পানির মালিকরা কোনও প্রতিকার করেনি। আবেদন-নিবেদন দরবার অজস্র বার করা হয়েছে। প্রতিবারই কোম্পানি তা নাকচ করে দিয়েছে।

এমনি অবিচারের রাজত্ব বহুদিন যাবত চলেছিল। তারপর আবির্ভাব হলো সাগিনা। মজদুরের নিয়ে দল পাকাল। গোরা অফিসার, ফিরিঙ্গি অফিসারদের দাপট আর বাঙালী ক্লর্ক বাবুদের শয়তানি সাগিনার দলকে দিনের পর দিন শক্ত করে তুলল।

এসব খবর শুনেছিলাম সাগিনার বিভিন্ন আড্ডায়। বিভিন্ন লোকের মুখ থেকেই। সাগিনার আড্ডাগুলোর বেশির ভাগই ছিল মদের আড্ডা। ওগুলো যেন সাগিনার এই বিস্তীর্ণ সাম্রাজ্যের রাজধানী। ওখানে বসে সাগিনার মুখ থেকে যে হুকুম বেরোবে, পৃথিবীর কারও সাধ্য ছিল না তা রদ করে। চন্দ্র সূর্য ওঠার মতোই সেগুলো তামিল হতো।

'আরে সাথী, কত বলব! ওসব শরম কি বাত আছে—শালে গোরা লোগ হবুত লাথ মেরেছে।'

বুড়ো গুরং পুরোনো ইতিহাস শোনাত। মদে ঢুলু ঢুলু হয়ে অন্তরঙ্গভাবে জড়িয়ে ধরত আমার গলা। আদর করে গেলাসে মদ ঢেলে বলত, লো পিয়ো। তারপর গুরুং-এর মুখ ছুটত।

'হাঁ লাথ মারত। মর্দনাকে মারত। জেনানকো ভি মারত। কসুর থাকলে মারত, না থাকলেও মারত। শালে লোগ দনাদ্দন দনাদ্দন জুতি চালাত। হাঁ। বহোত সাথী ঘায়েল হয়েছে। তো কি করব। খালি লাথ খেয়েছি। আর শালা অফসার লোগ বিবি বেটি সব বাংলোয় লিয়ে তুলেছে। ছোট ছোট অফসার—এই নিসপেক্টর, টি টি সি লোগও ওই সে হারামি। ওরাও লিয়েছে। তো কি করব। শালা লোগ গোরা আছে। রিপোর্ট করবে তো নোকরি থিকে ফৌরণ বরখাস্ত। তো কি করব। আচ্ছা বাবা, লাথ মারো, লে যাও বিবি, বহিন। নোকরি খেয়ো না। তো কি করব। কোনও লিডার তো ছিল না। ডরকে মারে কেউ বাবা কোনও কথা বলতো না। হাঁ। গরিব আছি, মজদুর আছি, কুলি আছি। খালি লাথ মারছে। তো গোরা হতাম কি ফিরিঙ্গি, আমিও লাথ মারতাম। আর বাঙালি ক্লর্কবাবু হতাম তো জেব ভরতাম গরিবের পাকিট মেরে। আচ্ছা বাবা মারো। কোনও সংগঠন তো ছিল না, লিডার ভি না। তো কি করব। আজ আমাকে লাথ মারছে সাহাব, তো উ শালা হাসি করছে। কাল ওকে মারছে তো আমি হাসি করছি। হাঁ সচ বাত। বিলকুল সচ। তো কি করব। আমি একলা কিছু বলব সাহাবকে তো সব শালা ভাগবে। কেউ মদত দিবে না। আমি শালাকে পাকড়াবে, সাহাব। দনাদ্দন দনাদ্দন পিটবে। নোকরি ভি ফৌরণ খতম।'

যখন ওদের এই রকম অবস্থা সেই সময় সাগিনা ওদের মধ্যে এল। এল একেবারে লিডার হয়ে। আর এসেই পিটতে শুরু করল। প্রথম দিকে মজদুরদেরই পিটেছিল।

'শালে কুত্তা কি বাচ্চে।'

এই ছিল সাগিনার প্রথম দিকের শ্লোগান। যে শালা সংগঠনে না আসবে, সাহেবদের মার মুখ বুজে খাবে। সেই শালাকে আচ্ছা করে পেটো। আর যে শালা চুকলি খাবে তাকে জানে মেরে দাও। যে শালা তার বিবি, বেটি কি বহিনকে সাহেবের ঘরে যেতে দেবে, ফ্যালো সে শালাকে পাহাড়ের ওপর থেকে।

এইভাবে ঢুকল সাগিনা। বছর দুয়েকের মধ্যে সব মজদুর সাগিনার দলে ভিড়ে গেল। আর তারপর শুরু হলো উলটা খেল। 'হাঁ, সাথী,' গুরুং গেলাস উপুড় করে মদ ঢেলে দিল গলায়। একটু দম নিলে।

তারপর বলতে শুরু করল, 'হাঁ, সাথী, বিলকুল উলটা খেল। সাহাব যদি লাথ মারবে তো আমিও মারব। তো কি করব, লিডারের হুকুম। মার শালে কো, মার শালে কো। তো কি করবে সাহাব। নোকরি খাবে? হা:, আমার নোকরি যাবে তো সব মজদুর কাম বন্ধ করবে, তো কী করব, লিডারের হুকুম। আর চাক্কা বন্ধ তো কোম্পানি ভি ফুট। হা: হা: হা:। চাকা বন্ধ তো কোম্পানি ভি ফুট! শালা লোগ চার দফে নোকরি নিল আমার, বরখাস্ত করল, তো কি হল? চাক্কা বন্ধ। আর কি হলো? ফিন আমাকে নোকরি দিতে হল। আর কি হল? শালা মারপিট একদম বন্ধ হয়ে গেল। আর এসব কারোয়াই সাগিনার। সাগিনা লিডার আছে। সর্দার।'

সঙ্গে সঙ্গে ক'জন সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে সাগিনা হইহই করে ঢুকল সেই দোকানে।

গুরুং উঠে দাঁড়িয়ে চেঁচাতে লাগল, 'আও আও আও, সাথী, পিয়ো পিয়ো পিয়ো।'

সাগিনা তার বিরাট দেহটা আমার পাশে দুম করে যেন আছড়ে ফেলল। আমার পিঠে মারল এক থাপ্পড়।

বলল, 'আ কামরেড। পিতা হ্যায়। হা: হা:। ইতো আব ঠিক সাথী বনে গিয়েছে। লেকিন এক আফসোস। কামরেডের জন্য একটা তো আওরাত চাই। মর্দানা হো, ইয়া নেহি? আচ্ছা, ফিকির নেহি। উও ভি মিলে যাবে।'

আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে এক পাহাড়িকে ডেকে বলল, 'এ বাহাদুর হ্যায় কোই, আচ্ছা চীজ? কামরেডের জন্য দিতে পারিস।'

বাহাদুরের ভোঁতা মুখ আমার দিকে হেসে উঠল।

বলল, 'কাম তো কিচ্ছু মুশকিলের না আছে।'

'তো ঠিক হ্যায়,' সাগিনা হুকুম দিল, কামরেডের লিয়ে এবার পিয়ে নিই, আও।

আগে যা ছিল 'সাগিনার গ্যাং,' এই এক বছরে আমরা তাকে মজদুর ইউনিয়নে পরিণত করেছি। অফিস হয়েছে আমাদের। আমি অফিস সেক্রেটারি। সাগিনা ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট, কাজিমন সেক্রেটারি। একটা একজিকিউটিভ কমিটিও আছে। কিন্তু কার্যত সাগিনাই সব।

অতি কষ্টে কিছুটা শৃঙ্খলা আনা গেছে। ইউনিয়নকে কোম্পানি স্বীকৃতি দিয়েছে। মারপিট কমেছে। কথায় কথায় চাকা বন্ধও হচ্ছে না। প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারি আর অফিস সেক্রেটারিকে ফার্স্ট ক্লাস পাশ দিয়েছে কোম্পানি। হেডকোয়ার্টারে কোনও সিটিং হলে কোম্পানি হলটিং এলাউন্সও দিচ্ছে। সরকারিভাবে খাতির দেখাচ্ছে সাগিনাকে। সাগিনার মাইনে বাড়াতে চেয়েছিল। সাগিনা মুখের উপর না বলে দিয়েছে।

বলেছে, আমার একার মাইনে বাড়িয়ে তো ফায়দা কিছু হবে না, সকলের মাইনে বাড়াও।

আমরা দু-মাস আগে একটা দাবি সনদ পেশ করেছি কোম্পানির কাছে। তাতে অবিলম্বে মজুরদের জন্য নতুন কোয়ার্টার করতে বলেছি। বলেছি, পুরোনো কোয়ার্টার সংস্কার করো। অবিলম্বে শতকরা পাঁচ টাকা মূল বেতন ও মুল বেতনের অর্ধেক মহার্ঘ ভাতা বৃদ্ধি, ওভারটাইম, ছুটি, বদলি, পাশ, চিকিৎসার ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রভৃতি দাবিও করা হয়েছে।

কোম্পানি এই ব্যাপারে নানা অছিলায় টালবাহানা করছে। খালি চিঠিপত্র চালাচালি হচ্ছে দুপক্ষে। আমাদের অফিসে চিঠির পাহাড় দাঁড়িয়ে গেছে।

সাগিনা তা দেখে আর আমাদের ঠাট্টা করে। সে এইসব ব্যাপারে আদৌ বিশ্বাসী নয়।

বলে, 'বাঘকে যতই দুধ পিলাও খুন সে চুষবে। ও শালাদের দাওয়াই না দিলে ওরা আমাদের বাপ বলবে কেন?'

আমি ওকে ট্রেড ইউনিয়নের মূল তত্ব বোঝাতে চেষ্টা করলে সাগিনা হা: হা: করে হাসে।

বলে, 'এই তো ছ'মাহিনা কাবার হলো। আমরা খেতে চেয়েছি কোম্পানির কাছে। লেকিন মিলল কি? চিঠঠি এইসব!'

অবজ্ঞাভরে চিঠিপত্রের ফাইলগুলো উলটে দিলে।

বলল, 'দেখ কামরেড, এই পড়া লিখা খেলায় কাম চলবে না। ছ'মাস ধরে খুটখুট চিঠি লিখছ, ভেজছ। ও শালারাও খুটখুট চিঠি লিখছে ভেজছে। লেকিন ফায়দা কি হচ্ছে। তোমাদের এই নয়া তরিকায় এদের কাছ থেকে কাজ আদায় করা যাবে না। পুরোনো রাস্তা ধরতে হবে। পিটতে হবে শালাদের, চাকা বন্ধ করতে হবে। তখন দেখবে, শালারা এসে বাপ বলছে। মিটিং বোলাও।'

প্রথমে একজিকিউটিভ মিটিং, পরে জেনারেল মিটিং। দুটো মিটিং-এই ঠিক হলো, একটা চরমপত্র দেওয়া হোক কোম্পানিকে। এক মাসের মধ্যে আমাদের দাবিগুলো যদি না মিটায় তো চরম পন্থা গ্রহণ করা হবে।

আমরা যেদিন চরমপত্র পাঠালাম সেদিন কি উল্লাস সকলের মধ্যে। ভাটিখানাটা ভরে গেল সাগিনার সাঙ্গোপাঙ্গয়। অনেক রাত পর্যন্ত মদ খাওয়া চলল! হই-হুলোড়। ফুর্তি।

হঠাৎ সাগিনা আমাকে নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে পড়ল। আমি ইউনিয়নের অফিস হওয়া ইস্তক সেখানেই থাকতাম।

সাগিনা বলল, 'দেখ কামরেড, যার ঘরে খানাপিনার দানাপানি আছে তারা দেরি করতে পারে, ধৈর্যও ধরতে পারে। কিন্তু ভুখা নাঙ্গা মজদুর ধৈর্য পাবে কোথায়। খেতে দাও, পরতে দাও, কাজ নাও। গোলমাল কেউ করবে না। কিন্তু দানাপানি দেবে না, খালি বাত, খালি ওয়াদা, ওতে কাম চলে না। এবার আখেরি লড়াই হবে। পিছু ফায়সালা। দোসরা রাস্তা আর নেই।'

বলতে বলতে অফিসে এলাম। দুটো ঘর। একটা অফিস আর একটা আমার শোবার ঘর। দেখি শোবার ঘরে আলো জ্বলছে।

সাগিনা আমাকে নিয়ে সেই ঘরে ঢুকেই বললে, 'লো, ক্যায়া পছন্দ আসছে?'

উনিশ-কুড়ি বছরের একটা মেয়েকে নিয়ে দেখি বাহাদুর আমার বিছানায় বসে আছে। মেয়েটি বেশ দেখতে! অনেকটা ললিতার মতো। মিচকি মিচকি আমার দিকে চেয়ে হাসছে। দেখেই আমার নেশা কেটে গেল? বুক ধড়ফড় করতে লাগল। কান মুখ গরম হয়ে উঠল।

বাহাদুর চোখ টিপে বললে, 'আচ্ছা হ্যায়।'

আমার হতভম্ব ভাব দেখে সাগিনা আর বাহাদুর হা: হা: করে হেসে ঘর যেন ফাটিয়ে ফেলতে লাগল। সে হাসির ছোঁয়াচ মেয়েটিরও লাগল। রিনরিনে গলায় হাসতে হাসতে সে যেন ঘরময় গান ছড়িয়ে দিতে লাগল।

মুহূর্তে সংবিৎ ফিরে পেলাম। আমার গায়ে এক বছরে সর্বহারার যে পালিশটা পড়েছিল তা ভেতরকার সেই পাতিবুর্জোয়া ভূতটার গুঁতোয় ছিঁড়ে খানখান হয়ে গেল। ভালো করে কিছু বোঝাবার আগেই দেখি রাস্তা ধরে প্রাণপণে ছুটতে শুরু করেছি। একবার মনে হলো পিছনে সাগিনা আর বাহাদুর হা: হা: করে হাসতে হাসতে তাড়া করেছে। মনে হলো, সেই মেয়েটির রিনরিনে হাসির সঙ্গীতও যেন আমাকে তাড়া করেছে, কামরেড, কামরেড—কারা যেন চেঁচিয়ে ডাকলও কয়েকবার।

সেই যে ছুটেছিলাম আর থামলাম এসে মহানন্দার বিজ্রের উপর। রেলিং ধরে হাঁফাতে লাগলাম। ঠান্ডা বাতাস চোখ-মুখ কানকে অনেকটা আরাম দিল। দূরে জমাট বাঁধা অন্ধকারের এক উত্তুঙ্গ পিণ্ড। হিমালয়। সামনেও ঘন অন্ধকার। শুকনার ফরেষ্ট। নীচে মহানন্দার রুপালি রেখা। উপরে তারাভরা আকাশ। আর অজস্র জোনাকি। ঝিঁঝির অফুরান সঙ্গীত। তার মধ্যে পাহাড়ি মেয়ের সেই সুন্দর সরল মুখখানি বারবার আমার চোখে ফুটে উঠতে লাগল।

হঠাৎ আমার মনে হলো, তাই তো, আমি এমনভাবে পালিয়ে এলাম কেন? মেয়েটার মুখ, তার সেই মিঠে হাসি আমাকে টানতে লাগল। সেই টানে ঘরের দিকে আবার যখন পা বাড়ালাম, তখন রাত শেষ হতে আর বাকি বিশেষ নেই। ঘরের দরজায় এসেও অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। বুক যেন ফেটে যাবে, ধকধক এমন উত্তেজনা। তারপর সাহস করে, আলতো ভাবে দরজা খুলে দেখি ভেতরে কেউ নেই। হতাশা যেন বুকের মধ্যে মট করে কামড় বসাল ইঁদুরের মতো। আমি বোকা, আমি ভীতু, আমি পাতিবুর্জেয়া।

মনে পড়ল, আরেকবার এইরকম ব্যবহার করেছিলাম বলে সাগিনা আমাকে ধমকেছিল। বলেছিল, তুমাকে দিয়ে কুচ্ছু হবে না। তুমি আওরাত দেখেই ভাগো, কোম্পানির জাঁদরেল সাহেবদের মহড়া কি করে নেবে।

পরদিন বিকালেই খার্সাং থেকে কাজিমন এসে হাজির। আমাদের পাটির ওই অঞ্চলের হেড কোয়ার্টার তখন খার্সাং-এ। কাজিমন স্থানীয় শাখার কর্তা।

কাজিমন বললে, 'একটু পরেই কলকাতার মেল, আর দেরি নয়, চটপট তৈরি হয়ে নাও, কলকাতায় যেতে হবে। জরুরি তলব।'

কাজিমনকে নিয়ে তক্ষুনি সাগিনার খোঁজে বের হলাম। সেই ভাটিখানায় গিয়ে দেখি তুমুল উত্তেজনা।

খার্সাং-এর ইউনিট সেক্রেটারি ওয়াংদি এসে গেছে। সে উত্তেজিতভাবে কি বলছে আর মন দিয়ে শুনছে সাগিনা।

ওয়াংদির কথা বুঝলাম, ঘটনা এবার পাকিয়ে উঠল। বার্ন বলে একটা বদমায়েশ অফিসারের বিরুদ্ধে আমরা অনেকদিন থেকে নালিশ পাচ্ছিলাম। ব্যাটা ক্যারেজ শপের অ্যাসিস্ট্যান্ট ফোরম্যান। ঘুষ নেয়, মজুরদের যতরকমে পারে জ্বালায়, মেয়েদেরকে উৎপাত করে। ওর বিরুদ্ধে আমাদের ইউনিয়নের পক্ষ থেকে নালিশ গেছে কোম্পানির কাছে। কোনও সুরাহা হয়নি। বদলি করার দাবি তুলেছি আমরা। পুন: পুন: বলেছি, লোকটার জন্যে হয়তো অশান্তি ঘনিয়ে উঠতে পারে। কোনও ভ্রূক্ষেপ করেনি কোম্পানি। তাই লোকটার স্পর্ধাও দিন দিন বেড়ে উঠেছে।

কাল রাতে নামগিল বলে একটা মজুরের নাইট ডিউটির সুযোগ নিয়ে বার্ন তার ঘরে ঢুকেছিল। নামগিল জানতে পেরে বাসায় ফিরে আসে। তারপর বৌয়ের বিছানায় সাহেবকে উলঙ্গ হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে বেদম ধোলাই দিয়েছে। প্রাণটা কোনোমতে আছে তার! তবে হাড়গোড় ভেঙে একেবারে দ হয়ে গেছে বার্ন সাহেব।

ওয়াংদি বললে, 'উসকে বাদ পুলিশ আয়া। নামগিল কো পাকাড় লিয়া, ফাটকমে ডালা। আব হামিলোগ কেয়া করে?'

'হরতাল করো। কাম বন্ধ করো। আউর কেয়া করেগা?'

সবাই সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল। সাগিনাও।

বলল, 'কাম বন্ধ করো! পিছু দেখা যায়েগা।'

কাজিমন বললে, 'কাজটা একটু বে-আইনি হচ্ছে সাগিনা। আমার মনে হয়, জেনারেল ম্যানেজারের কাছে ব্যাপারটা জানিয়ে তার ভেজে দিই। বলে দিই, তদন্ত সাপেক্ষ নামগিলের উপর থেকে কেস উঠিয়ে নেওয়া হোক। ওকে এখন খালাস দেওয়া হোক।'

সাগিনা কাজিমনকে ধমকে উঠল।

বললে, 'রাখ সাথী, তুমি আদমি আচ্ছা আছ, পড়িলিখি ভি আছ, লেকিন বেওকুফ। জানরল মানজার কা পাস হামলোগকা যানে হোগা, কিউ? কি কসুর আমাদের! এক জানোয়ার আমার ঘরের ইজ্জৎ নষ্ট করেছে, আমি তাকে পিটেছি। কসুরটা কোথায়? তোমার শালা পুলিশ আছে, তুমি আমাকে পাকড়ালে। আখুন আমাদেরও কিছু তাকত দেখাতে হবে। কাল কাম বন্ধ হবে তো জানরল মানজার নিজে আমাদের বাপও বলবে, ফায়সালাও করবে।'

কাজিমন সাগিনাকে অনেকভাবে বোঝালে। বললে, 'গায়ের জোরের দিন আজ আর নেই কামরেড। হয়তো একটা দুটো লড়াই এভাবে জিততেও পার। কিন্তু আখেরি মামলা এভাবে জেতা যাবে না। তোমাকে ট্রেড ইউনিয়নের রীতিনীতি মেনেই লড়াই জিততে হবে।'

সাগিনা বিদ্রুপ করল কাজিমনকে।

'ইয়ার, লড়াই কাগজ-কালিতে হয় না। হাতিয়ার লাগে। ছ'মাহিনা ধরে তোমার কাগজ কালির লড়াই দেখেছি। তার নাতিজাও দেখেছি। আখুন তুমি আমার হাতিয়ারের লড়াই দেখো। আর তার নাতিজাও দেখো।'

সাগিনা তারপর টেবিল চাপড়ে বললে, 'সাথীও পেট ঔর ইজ্জৎ যে শালা কাটবে, তাকেও কাটতে হবে। কাল কারেজ ডিপার্টকে কাম বন্ধ থাকবে। ফায়সালা যদি তাতেও না হয় পরশু থেকে পুরা লাইন বন্ধ হয়ে যাবে।

সাগিনার কথা শুনে সবাই উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠল। চকচক করে জ্বলে উঠল ওদের চোখ।

কাজিমন আর আমি বেরিয়ে এলাম। কাজিমন কিছুক্ষণ কথা বলল না। মুখ বুজে হাঁটতে লাগল।

তারপর বলল, 'এ অবস্থায় এখান থেকে কোথাও যাওয়া ঠিক হবে না। চল, কলকাতায় তার করে দিই।'

শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা খুবই ঘোরাল হয়ে উঠল। গোটা লাইনেই ধর্মঘট ছড়িয়ে পড়ল।

তখন পুরো যুদ্ধের সময়। শৈলাবাস গোরা সৈন্যদের ছুটি কাটাবার একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। কোম্পানি প্রথমদিকে তারই সুযোগ নেবার চেষ্টা করল। সাগিনা-সমস্যার চির সমাধান করবার জন্য দমন নীতির আশ্রয় নিল। ইউনিয়ন বেআইনি ঘোষিত হলো। আমাদের নামে হুলিয়া বেরুল। সাগিনা আমাকে কলকাতায় পাঠিয়ে তার অনুচরদের নিয়ে গা ঢাকা দিল।

কিন্তু আশ্চর্য তার সংগঠনী প্রতিভা। আড়াল থেকে সে ধর্মঘট চালাতে লাগল। একটি মজদুরও কাজে যোগ দিলে না। কোম্পানি একখানি গাড়িও চালাতে পারল না।

এই ব্যাপার নিয়ে আমাদের পার্টির উচ্চ মহলে ঘন ঘন বৈঠক বসল। সাগিনার এই আকস্মিক ধর্মঘট আমাদের পার্টিকে একটু অসুবিধায় ফেলেছিল। আমাদের শাসকবর্গ ফ্যাসিস্টবিরোধী সংগ্রামে লিপ্ত হওয়ায় আমরা তাদের সমর্থন করার নীতি নিয়েছিলাম। শ্রমিক আন্দোলনকেও আমরা সেই পথে পরিচালিত করছিলাম। গভর্নমেন্টকে চাপ দিচ্ছিলাম একটা প্রগতিশীল শ্রমিকনীতি গ্রহণ করার জন্য।

ঠিক সেই মুহূর্তে সাগিনা এই গণ্ডগোলটা পাকিয়ে তুললে। যদিও সাগিনা আমাদের পাটি মেম্বার ছিল না, পাটি-ফার্টি ও বুঝতে না, বুঝতে চাইতও না, তবু কার্যত ওর ইউনিয়নকে আমরা আমাদের ইউনিয়ন বলেই চালাতাম।

সাগিনার এই কাজের জন্য পার্টি আমার আর কাজিমনের কাছে কৈফিয়ত তলব করল। আমরা এ ব্যাপারটা ঘটতে দিয়েছি বলে গালাগাল খেলাম নেতাদের কাছ থেকে। জবাব আর কি দেব। আমি তবুও বলেছিলাম, এই বিশৃঙ্খলার জন্য প্রধানত কোম্পানিই দায়ী। ছ'মাস কঠোর পরিশ্রম করে আমি আর কাজিমন একটা সুস্থ ট্রেড ইউনিয়নের পরিবেশ গড়ে তুলেছিলাম। কিন্তু কোম্পানি সেটা বজায় রাখার কোনও চেষ্টা করেনি। যে অমানুষিক দুর্দশার মধ্যে ওখানকার মজদুররা দিন কাটায় সে অবস্থার উন্নতি না হলে এরকম বিশৃঙ্খলা আসা স্বাভাবিক। মজদুররা খেতে চায়, তাদের খাবার সংস্থান করতে হবে। ভুখা মজদুর ধৈর্য পাবে কোথায়?

বুঝতে পারলাম, সাগিনার কথাই আবৃত্তি করে চলেছি। এও বুঝলাম নেতারা আদৌ সন্তুষ্ট হলেন না। দুনিয়ার মজদুরের স্বাধীনতা যেখানে ফ্যাসিস্ট হামলায় বিপন্ন সেখানে সাগিনার অনুচররা খাচ্ছে কি না-খাচ্ছে সেটা তাঁদের চোখে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারই নয়। আমরা আদর্শ নিয়ে লড়ছি। আর সাগিনারা সেখানে খিদে, ইজ্জত এই সমস্ত স্থূল ব্যাপারে বড্ড বেশি মাথা ঘামাচ্ছে। নেতারা ক্রুদ্ধ হতেই পারেন।

আমাদের পার্টির গোপন মিটিং-এ ঠিক হল, ওই ইউনিয়নের উপর পার্টির কর্তৃত্ব স্থাপন করতে হবে। তা না হলে পার্টির পলিসি অনুসারে ওটাকে চালানো যাবে না। সিদ্ধান্তটা আমাকে যখন শোনানো হলো, আমি মনে মনে হাসলাম। সাগিনা ছাড়া ওখানে আর কাউকে দাঁত ফোটাতে হবে না।

কিন্তু পার্টি সত্যিই অসাধ্য সাধন করল। কোম্পনি যখন শত চেষ্টাতেও গাড়ি চালাতে পারলে না তখন আমাদের পার্টির শরণ নিল। পার্টি আর কোম্পানি উচ্চ মহলে ঘন ঘন বৈঠকে বসল। চুক্তিনামা তৈরি হল। পার্টির পরামর্শে কোম্পানি সব মামলা তুলে নিল। ইউনিয়নকে আবার স্বীকৃতি দিল।

তবে তার চেয়েও তাজ্জাব ব্যাপার, বড় মাইনের একজন লেবার ওয়েলফেয়ার অফিসারের পদ সৃষ্টি হল। আর এই প্রথম কোনও সাহেব নয়, কোনো বাবু নয়, মজুরদের আস্থাভাজন একজন সত্যিকারের মজদুরকে সেই পদে বসাতে কোম্পানি স্বীকৃত হল। মজদুরদের জয়জয়কার পড়ে গেল।

আমার বুক ফুলে উঠল জয়ের আনন্দে। সমস্ত শ্রদ্ধা লুটিয়ে পড়ল ব্যারিস্টার কমরেড বিজন দত্তের পায়ে। তিনিই এই চুক্তিনামার খসড়া তৈরি করেছেন।

শ্রমিকদের যা কিছু কল্যাণ তা কোম্পানিকে করতে হবে লেবার ওয়েলফেরার অফিসারের পরামর্শমতো। মজদুররা ভোট দিয়ে যাকে পাঠাবে সেই পাবে এই পদ। কোম্পানির কোনো কারচুপি এতে চলবে না।

বস্তিবাজারের ময়দানে মজদুরদের বিরাট সম্মেলন হয়েছিল। আমার চোখে সেদিনটি উজ্জ্বল হয়ে আছে। কমরেড দত্ত ছিলেন এই সম্মেলনের সভাপতি। তাঁর সঙ্গে এসেছিলেন তাঁর বোন কমরেড বিশাখা দত্ত। আমাদের পার্টিতে এমন সুন্দরী কমরেড আর দ্বিতীয় ছিল না। মঞ্চ আলো করে তিনি বসেছিলেন। আর তাঁর পাশে ছিল সাগিনা। বিজয়ী বীরের মতো মাথা উঁচু করে বসে ছিল সে। আর তার দিকে ঝুঁকে বিশাখা সারাক্ষণ ফিসফিস করে কথা বলছিলেন। সাগিনার স্ফুর্তি যেন উথলে পড়ছিল।

কমরেড দত্ত সভাপতির ভাষণ দিলেন দেড়ঘণ্টা ধরে। মজদুরদের অনমনীয় দৃঢ়তার ভূয়সী প্রশংসা করলেন। বার বার সাগিনার নেতৃত্ব, ব্যক্তিত্ব তাঁর কৌশল, তাঁর স্বার্থত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন। উল্লাসে, হাততালিতে মজদুরেরা মণ্ডপ ফাটিয়ে দিতে লাগল। 'কমরেড সাগিনা জিন্দাবাদ' 'কমরেড সাগিনা কি জয়।' শুনতে শুনতে কানে তালা লেগে গেল আমাদের।

কমরেড দত্ত বললেন, 'এ জয় শুধু সাগিনার একার জয় নয়। এটা মজদুরদের সংঘ-শক্তিরই জয়। এই রেলের মজদুর তার সংগঠন শক্তির জোরে যা মালিকদের কাছ থেকে আদায় করেছে ভারতের কোনো জায়গার মজদুরই তা পারেনি। লেবার ওয়েলফেয়ার অফিসার আর কোথায় এমন মজদুরদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছে? আর কোথায় একজন সাচ্চা মজদুরকে সেই পদে বসানো হয়েছে? কমরেডস, সেই পদের জন্য এইবার আপনারা একজন আপনার লোক ঠিক করুন।'

কমরেড দত্ত বসতে না বসতে সব হই-চই মুহূর্তে বন্ধ হয়ে গেল। সুঁচ পড়লে শোনা যায় এমন স্তব্ধতা নেমে এল। মনে হল কথাটা কেউ যেন ধরতে পারেনি। অমনি বিশাখা মঞ্চের উপর উঠে দাঁড়ালেন। একটা জ্বলন্ত আলো যেন ঠিকরে পড়ল।

তাঁর মিহি সঙ্গীতময় কণ্ঠ থেকে স্বর বেরুল, 'সাগিনা। কমরেড সাগিনাই আমার মতে এই পদের সব থেকে যোগ্য।'

'সাগিনা। হাঁ-হাঁ সাগিনা।'

সেই উত্তাল কলরোলে আবার বার বার ধ্বনিত হলো। 'কমরেড সাগিনা কি জয়।'

কমরেড বিশাখা দত্ত টেবিলের উপর থেকে এক বিরাট মালা তুলে সাগিনার গলায় পরিয়ে দিলেন। হুড়মুড় করে বাহাদুর, ওয়াংদি, নামগিল, গুরুং আরও যেন কারা কারা মঞ্চের উপর উঠে গেল। সাগিনাকে নামিয়ে এনে কাঁধে তুলে নাচতে লাগল।

সারাদিন হুল্লোড় চলল। সন্ধের দিকে কমরেড বিজন দত্ত আর বিশাখা দত্ত খার্সাং চলে গেলেন। যাবার আগে সাগিনা আর আমাকে বলে গেলেন, পরদিন সকালেই যেন সেখানে চলে যাই। কাজিমন ওঁদের সঙ্গেই গেল।

খার্সাং-এ আমরা কমরেড দত্তদের বাড়িতেই উঠলাম। বিশাখা সাগিনাকে খুব খাতির করেই ভিতরে নিয়ে গেলেন। দুপুরে কাজিমনও এল। খাবার নেমন্তন্ন করেছিলেন দত্তরা।

খাবার টেবিলে কাজের কথা উঠল। কমরেড দত্ত সাগিনাকে তার পদের গুরুত্বের কথা বোঝাতে লাগলেন। খুব দায়িত্বপূর্ণ কাজ এটা। মজদুরদের তাবৎ মঙ্গল, কল্যাণ এখন সাগিনার হাতে। সাগিনা বিরাট কোয়ার্টার পাবে। সাহেবদের মতো কোয়ার্টার। মজদুররা সাহেবদের তুলনায় কোনো অংশেই যে ছোট নয়, সেটা যেন সাগিনা একবার কোম্পানিকে বুঝিয়ে দেয়। সাগিনাকে একটি অফিসও চালাতে হবে। তবে তার জন্য সাগিনা যেন না ঘাবড়ায়, কমরেড দত্ত কলকাতা থেকে একটা ভাল সেক্রেটারি পাঠিয়ে দেবেন।

খাওয়া-দাওয়ার পর দেখি সাগিনা খুব গম্ভীর হয়ে গেছে। ভাবছে খুব। আমাদের সঙ্গে কাথাবার্তা বিশেষ বলল না।

জেনারেল ম্যানেজারের বেয়ারা এসে কমরেড দত্তকে একটা চিঠি দিল। চিঠিখানা পড়ে তিনি সাগিনাকে ডাকলেন।

বললেন, 'কমরেড, কাল বিকালে বড়সাহেবের কাছে যেতে হবে। তোমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট হবে।'

সাগিনা অন্যমনস্কভাবে মাথা নেড়ে বলল, 'আচ্ছি বাত।'

কমরেড বিশাখা সেজেগুজে বেরোলেন তাঁর ঘর থেকে।

জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমাদের কাজ চুকেছে? আমি একবার শৈলবাসে যাব।'

কমরেড দত্ত বললেন, 'যাও।'

কমরেড বিশাখা অমনি সাগিনাকে বললেন, 'কমরেড, যাবে আমার সঙ্গে?'

দেখলাম সাগিনার মুখটা এতক্ষণে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

হেসে বলল, 'জরুর।'

রাত প্রায় ন'টা নাগাদ সাগিনারা ফিরে এল। আমি দেখে তো অবাক। সাগিনাকে সত্যিই চিনতে পারিনি। পরিষ্কার স্যুট পরেছে। টাই বেঁধেছে। নতুন জুতো দিয়েছে পায়ে। ওকে যে এত ভালো দেখতে তা এই এক বছরে কখনও তো টের পাইনি। কমরেড বিশাখার এক নতুন সৃষ্টি বলেই সাগিনাকে মনে হলো। দেখলাম দুপুরের সেই গুমোট ভাবটা কেটেছে সাগিনার। একটা নতুন ফুর্তির উদয় হয়েছে ওর মনে। চোখ-মুখ টলটল করছে।

বিশাখা বললে, 'দ্যাখো দাদা, আমাদের বীর কমরেড সাগিনাকে এইগুলো আমি প্রেজেন্ট করেছি। কাল যেন সাহেবের সামনে সমানভাবে দাঁড়াতে পারি।'

কমরেড দত্তও অবাক হয়েছিলেন একটু, কিন্তু তিনিও খুব খুশি হলেন সাগিনার এই পরিবর্তনে।

বললেন, 'সত্যিই কমরেডকে ভাল মানিয়েছে।'

বিশাখা উচ্ছাসিত হয়ে উঠলেন, সাগিনার অনভ্যস্ত টাইটা একটু টেনে ঠিক করে দিলেন।

খুশি হয়ে বললেন, 'একেবারে নতুন মানুষ। তাই না!'

হা: হা: হা: হা: করে এই নতুন সাগিনা সেই পুরোনো হাসি ছাড়ল। সেই তার ঘর কাঁপানো হাসি।

সাগিনা লেবার ওয়েলফেয়ার অফিসার হবার পর দু-মাস আমি শিলিগুড়িতে ছিলাম। প্রথমদিকে ঘন ঘন শিলিগুড়িতে আসত সে। সঙ্গে আনত কমরেড বিশাখাকে। বিশাখা তারপর থেকে কিছুদিন খার্সাং-এই থেকে গিয়েছিলেন। এতে সাগিনার লাভ হয়েছিল। উনিই তার সেক্রেটারির কাজ করে দিতেন। বোধকরি সহবতও শেখাতেন। তারপর শিলিগুড়ি আসা তার কমতে লাগল। কাজ হয়তো বেড়ে যাচ্ছিল।

আমাকে হঠাৎ শিলিগুড়ি থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হল লালমণিরহাটে । আমি আসবার আগেই মজদুরদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার উপর ভিত্তি করে এক স্মারকলিপি সাগিনার অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। সাগিনা সেই দাবিগুলো উশুল করবে বলে জানিয়েছিল।

তবে ভালভাবে কোনো কাজে মন দেবার আগেই সাগিনার ডাক পড়ল বিভিন্ন জায়গা থেকে। মুখে মুখে সর্বত্রই সাগিনার নাম ছড়িয়ে পড়েছিল। নানা কাহিনীও প্রচারিত হয়েছিল। আজ মাদ্রাজ, কাল গুজরাট, পরশু বিহার—এমনি করে তাকে ঘোরানো হচ্ছিল। কানপুর, ঝরিয়া, টাটানগর, আমেদাবাদে ঘটা করে সংবর্ধনা জানানো হল ওকে। শুনেছি প্রায় প্রত্যেকটি জায়গাতেই বিশাখা ওর সঙ্গে ছিলেন। আমাদের নিখিল ভারত মজদুর ইউনিয়নের ভাইস-প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হলো সাগিনাকে।

দেড়টি বছর সাগিনা শিলিগুড়ি-ছাড়া।

আর এই দেড় বছরের মধ্যে শিলিগুড়ির ইউনিয়নে দলাদলি শুরু হয়ে গেল। কাজিমনের কাছ থেকে মাঝে মাঝে চিঠিপত্র পেতাম। কাজিমন বড় বিব্রত বোধ করছিল। সবাই জানত ওয়েলফেয়ার অফিসার আমাদের লোক। মজদুরদের অভিযোগ পুঞ্জীভূত জমে উঠেছিল। কোম্পানিকে কিছু বলার উপায় নেই। সে সাগিনার অফিস দেখিয়ে দেয়। কিন্তু কোথায় সাগিনা?

কাজিমন পার্টি অফিসে এ সম্পর্কে লিখে লিখে হদ্দ হয়ে গেল। পার্টি অফিস থেকে জবাব আসে, কমরেড সাগিনাকে পাটিরই বৃহত্তর স্বার্থে নিয়োগ করা হয়েছে। সে সারা ভারতের মজদুরকে সংগঠন করেছে।

শেষে এক ইউনিয়ন তিন ইউনিয়ন হয়ে গেল। তার একটা ইউনিয়ন অবশ্য কাজিমনের দখলে থাকল। আর সেটা পুরোপুরি আমাদের পার্টিরই লেবার ফ্রন্ট হয়ে দাঁড়াল। আর দুটো অংশ অন্য দুটি পার্টির কবলে চলে গেল।

সাগিনার নামে নানা বদনাম বেরুতে লাগল। গুরুং, দলবাহাদুর, ওয়াংদিরা পর্যন্ত সাগিনার শত্রু হয়ে উঠল।

এদিকে ইউনিয়নে ইউনিয়নে বেশ মারামারি দাঙ্গা চলতে লাগল।

অবস্থা ওখানে যখন এমনি চরম, তখন পার্টি আমাকে নির্দেশ দিল, শিলিগুড়ি যাও। কাজিমন পার্টি ছেড়ে দিয়েছে। ইউনিয়নে ফিফথ কলাম ঢুকেছে। ধর্মঘট করাতে চায়। সেটি প্রতিরোধ করতে হবে।

শিলিগুড়ি ফিরে এসে ব্যাপার দেখে আমার তো চক্ষুস্থির। অফিস উঠে গেছে। আমাদের সমর্থক বলতে কেউই প্রায় নেই। খার্সাং গেলাম। দেখি কাজিমন ভেঙে পড়েছে।

কাজিমন বলল, 'এখানকার কাম খতম। বিলকুল খতম। সব টুকরো টুকরো হয়ে গেছে ভাই। জোড়া দিবে কি দিয়ে?'

বললাম, 'কেন, সাগিনা আছে। তাকে আনব। পারলে সে-ই পারবে।'

কাজিমন হতাশ হয়ে বলল, 'একদিন সে পারত। আজ সে ও পারবে না। আমরা তাকে খতম করে দিয়েছি।'

কাজিমনের কথা বুঝতে পারলাম না। আমরা খতম করেছি মানে কি?

মানে কাজিমন নিজেই বলল।

'দেড় বছর আগে শিলিগুড়িতে যে সম্মেলন হয়, সেইখানেই খতম করেছি সাগিনাকে। কমরেড, তখন আমার একটা খটকা লেগেছিল। কোম্পানি এত সহজে এ-রকম একটা দাবি মেনে নিচ্ছে, ব্যাপার কি? তারপর ভাবলাম, যুদ্ধের সময় আছে। সরকার হয়তো চাপ দিয়েছে তাই কোম্পানি মেনেছে এই দাবি। কিন্তু ক'মাস পরেই আমার ভুল ভাঙল। তুমিও এখান থেকে চলে গেলে আর পার্টি আমাকে চাপ দিতে লাগল ইউনিয়নকে পার্টির উইং করে ফেল। ইউনিয়নের মেম্বারদের পার্টি মেম্বার কর। ওখানে পার্টির শক্ত ঘাঁটি চাই—যত বলি—ইউনিয়নকে পার্টি করা যাবে না, ভেঙে যাবে ইউনিয়ন—মজদুরের সংহতিতে ফাটল ধরবে—মজদুরের তাকত দুবলা হয়ে পড়বে—কিন্তু কে শোনে! একদিন কলকাতা থেকে তলব এল। গেলাম। কমরেড দত্ত কথায় কথায় জিজ্ঞাসা করলেন, সাগিনার প্রভাব কমেছে না বেড়েছে! আমি তাঁর কথা ধরতে পারিনি। সরলভাবে বললাম, সাগিনাকে শিলিগুড়ি থেকে এতদিন বাইরে রাখা ঠিক হয়নি। সাগিনার বিরুদ্ধে নানা প্রচার চলেছে। তার ফলে প্রভাব তো কমবেই।'

কাজিমন বলল, 'কমরেড দত্ত কি বললেন জানো?'

আমার পালটা প্রশ্ন শোনবার জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল কাজিমন।

তারপর বলল, 'কমরেড দত্ত বললেন, সাগিনা নয়, ওখানে থাকবে পার্টি। সেইটেই গড়ে তুলুন।'

কাজিমন আবার চুপ করল।

তারপর আপন মনে বলল, 'জেলে পাঠিয়ে যা না করা যেত, সাগিনাকে হিরো বানিয়ে তা করা গেল। কিন্তু ফায়দাটা হল কি?'

কাজিমন আমার বন্ধু। খুব সত্যনিষ্ঠ কর্মী। কিন্তু সত্যি বলছি, সেদিন ওর কথা আমি বিশ্বাস করিনি। এ কি হতে পারে?

পাঁচদিন ধরে শিলিগুড়িতে ঘুরলাম। পুরনো বন্ধুরা সব জড় হলো সেই ভাটিখানায়, শুধু সাগিনা নেই। খবর পেয়েছি সে এখন বোম্বাইতে। তাকে আন্তর্জাতিক শ্রম সমাবেশে পাঠানো হয়েছে।

গুরুংকে বললাম, 'সাথী, সবাই একাঠঠা না হয়ে ধর্মঘট করলে তো মরবে। তোমাদের ইউনিয়ন তো ভাঙা। লিডার কই?

গুরং মদ খেয়ে টুং হয়ে ছিল।

বলল, 'তো কি করব? লিডার শালা তো ছিল, তো শালা দালাল বনে গেল। শালা সাহেব হয়ে গিয়েছে। বড় মকানে থাকে। বিবি নিয়ে রংবাজি করে। তো কি করব। ভুখা মরব। জরুর চাক্কা বন্ধ হবে।'

'হাঁ-হাঁ, হবে হবে।'

মাতালগুলো হিংস্র আক্রোশে চিৎকার করতে লাগল।

পরদিন সকালে স্টেশনে গিয়েছি। দেখি সাগিনা। পুরোদস্তুর সাহেব।

আমাকে দেখে ডাকল, 'আরে কামরেড, তুমি? তুমি কোথা থেকে?'

বললাম, 'লালমণিরহাট থেকে। এখানে এসেছি দিন দশ—বারো।'

রেস্টুরেন্ট ঘরে নিয়ে গেল আমাকে। সাগিনাকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'খবর কি, কমরেড?'

ওকে এমন সময় এখানে দেখব আশা করিনি। মনে হল যেন বিধি-প্রেরিত।

সাগিনা বলল, সে পালিয়ে এসেছে বোম্বাই থেকে।

বলল, 'ভালো লাগে না। কি মিটিন-ফিটিন। ফালতু ঝামেলা। এত বাত করে কি কাম হবে? আরে সংগঠন বানাও। আপনা হাতমে পাওয়ার লে লো। তব শালা মালিক মজদুরকো বাপ বলবে। হ্যাঁ?'

'তারপর,' সাগিনা জিজ্ঞাসা করল, 'তোমার কি কাম এখানে?'

বললাম, 'তোমাদের রেলে স্ট্রাইক হবে, জান না?'

স্ট্রাইক হবে। সাগিনা বিস্মিত হল। 'কবে?'

'আজ বিকালে তো বস্তিবাজারে মিটিং আছে। ঠিক হবে।'

'আচ্ছা?' অবাক হয়ে গেল সাগিনা।

জিজ্ঞাসা করলাম, 'কেন, তুমি জান না কিছু?'

সাগিনা কি যেন ভাবছে।

আবার জিজ্ঞাস করলাম, 'তুমি জান না?'

এবার সে বলল, 'এখানে কি থাকি যে জানব। ঘুরতে ঘুরতে সত্যনাশ হয়ে গেছে। তবে কারোয়াই ঠিক হচ্ছে। চাক্কা বন্ধ আর একবার হওয়া দরকার। শালা কোম্পানি এক নম্বর দাগাবাজ আছে। দেড় সাল পুরা হয়ে গেল শালার সিমিন্ট মিলছে না। কোয়ার্টার করবে কুলিদের, কন্টাক্টর মিলছে না। খালি ঘুরাচ্ছে। শালা ঝুট।'

সাগিনা ঝুঁকে পড়ল আমার সামনে।

বলল, 'দেখো কামরেড, আমার মালুম হচ্ছে কি, এইসব ওয়েলফেয়ার উয়েলফেয়ার এসব বিলকুল ধোঁকাবাজি আছে। আমাকে দিয়ে এ কাম আর চলবে না সাথী। আরে আমি ভাল কোয়ার্টারে থাকব তো তামাম মজুরদের ভালাই হবে? ধুর। সব গলত বাত। আমার নতুন কোয়ার্টার সব কো দো, আচ্ছা খানা দো। পুরা কাম লো। কোই শালা হুজ্জৎ করবে না। আমি খাটতে খাটতে খুন পাসিনা ঢেলে দিব আর উসকে বদলা তুমি শালা দিবে শুখা বাত আর ঝুঠা ওয়াদা। ইসব তো জিন্দগী ভর চলে না। ঠিক হ্যায়, চাক্কা বন্ধ করনা ঠিক হ্যায়। লেকিন করবে কে?'

সাগিনাকে বোঝালাম তখন অবস্থাটা। বিশদ বিবরণ দিলাম। বললাম, ইউনিয়ন নেই। নিজেদের মধ্যে মারামারি। এই অবস্থায় পাগলের মতো ওরা স্ট্রাইক করতে যাচ্ছে। সব খবর ওকে দিলাম। শুধু বললাম না কাজিমন যা বলেছিল, আর বললাম না গুরুংরা ওর সম্পর্কে কি ধারণা পোষণ করে।

সব শুনে সাগিনা বলল, 'তবে, তো আখুন চাক্কা বন্ধ চলবে না। আগে সংগঠন পাক্কা করতে হবে। ঠিক হ্যায় কামরেড, তুম ফিন হিঁয়া আ যাও। ঐসি ইউনিয়ন ফিন বানাতে হবে। আমিও আসব। এ শালার নোকরি হাম সে নেই চলেগা।'

শুনে খুব ভালো লাগল আমার।

বললাম, 'তবে চল, বস্তিবাজারে যাই, সেখানে মিটিং আছে। তুমি বলবে চল। তোমাকে পেলে আবার সব ঠিক হবে।'

'হাঁ হাঁ।'

জিজ্ঞাসা করলাম, 'তোমার সে কমরেড কোথায় গেল?'

'কৌন?'

বললাম, 'কমরেড বিশাখা।'

হা: হা: হা: করে হেসে সাগিনা বলল, 'আরে উও তো আউর জেন্টিলম্যান আছে। মজদুরের সাথে আর কতদিন থাকবে। উও ভি ছুট গিয়েছে। যেতে দাও। জিন্দগি থাকবে তো আউর ভি আওরাত মিলবে।'

কিন্তু সেইদিনই যে সাগিনার জীবন যাবে বুঝতে পারিনি।

বস্তিবাজারের সভায় গিয়ে বুঝলাম, কাজিমনের কথা কত সত্যি।

সাগিনা আমাকে বলেছিল, সে ঠিক সময়ে হাজির থাকবে মিটিং-এ। কিন্তু আমি সন্ধের মুখোমুখি মিটিং-এ গিয়ে যখন হাজির হলাম, তখনও সাগিনা সেখানে যায়নি। আমার মনে নতুন করে আশা জন্ম নিচ্ছিল। সাগিনা বুঝতে পেরেছে যখন, তার মোহ ভেঙেছে যখন, তখন আর ভয় নেই। সাগিনার ব্যক্তিত্ব সমস্ত বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটাবে। এই টুটুা-ফুটা সংগঠনকে আবার সে জোড়াতালি দিয়ে দাঁড় করাবে।

জানি, আমার এ মনোভাব পার্টি বরদাস্ত করবে না। কিন্তু পার্টির নেতারা এই জায়গা চেনেন না, এই লোকগুলোকে জানেন না। তাই সাগিনাকে সরিয়ে নিয়ে একটা ভুল করেছেন। আমি সেই ভুল শুধরে দেব।

মিটিং শুরু হবার পর থেকেই একটা হট্টগোল চলছিল। উত্তেজনা বাড়ছিল। কোনও বিষয়েই নিজেরা একমত হতে পারছিল না। আর পারছিল না বলেই রাগ চড়ছিল ওদের। খালি গালাগালি করছিল ওরা।

হঠাৎ সাগিনা এসে পড়ল। প্যান্ট কোর্ট টাই পরা সাগিনা। তবে ওর পোশাকের জলুস অনেক চটে গেছে। চোখমুখ দেখে মনে হল, টেনে এসেছে বেশ। মাথার চুল এলোমেলো। বোধ হয় খুব ঘুরেছে সারাদিন।

আমি ওকে দেখে ওর দিকে এগিয়ে যাবার আগেই সাগিনা বক্তাদের টেবিলের কাছে এগিয়ে গেল।

ওকে দেখে হট্টগোল থেমে গেল। সভাস্থল নিশ্চুপ।

সাগিনা গলা চড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল, 'কেয়া মামলা হ্যায়, সাথী?'

সবাই চুপ।

'কিসকা মিটিং?'

হঠাৎ বাহাদুর চেঁচিয়ে উঠল, 'নিকলো শালে গদ্দার। ভাগো হিয়াসে।'

কী সুতীব্র বিদ্বেষের জ্বালায় যে বাহাদুরের চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল, না দেখলে বিশ্বাস হয় না। ও দুটো যেন ঘৃণার লিকলিকে ছুরি। আমি শিউরে উঠলাম। এই সেই বাহাদুর। সাগিনার সব থেকে অনুগত অনুচর। সাগিনার কথায় আমার ঘরে একদিন একটা মেয়ে এনে হাজির করেছিল।

বাহাদুরের কথা থামতে না থামতে ঘৃণা, বিদ্বেষ চারিদিক থেকে যেন মুঠো মুঠো করে সবাই সাগিনার মুখে ছুঁড়ে মারতে লাগল। দেখলাম সাগিনা ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে।

বুঝলাম, যা দেখছে তা যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। আমিও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।

'ভাগো ভাগো ভাগো। শালা দালাল। কুত্তিকা বাচ্চা আব সাহাব বন গিয়া হ্যায়।'

'দেখ শালে,' গুরুং কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে এল সাগিনার দিকে। বলল, 'দেখ শালে ক্যায়া হালত হুয়া হামলোগকা। না খানা মিলা না পহেননা। আউর তু বড়ে সাহাব বন গ্যয়া। শালে কো মুহমে থুক ডাল।'

থু: করে থুথু ছুঁড়ল গুরুং।

সাগিনা চেঁচিয়ে উঠল, 'ভাইও, সাথীও—'

তার গলা ডুবে গেল তুমুল কোলাহলে।

'মার ডাল শালাকো। পিটো।'

কে যেন চেঁচিয়ে উঠল। তারপর মুহূর্তের মধ্যে উন্মত্ত জনতা ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপর। কিল ঘুঁষি লাথির উত্তাল তরঙ্গে সাগিনা খাবি খেতে লাগল। কতবার উঠতে চেষ্টা করল, কতবার চেষ্টা করল কথা বলতে। কিন্তু বৃথা। সেই প্রচণ্ড মারের বেগ ঠেলে সাগিনা না পারল মাথা তুলতে, না পারল টুঁ শব্দ করতে।

ভয়ে আমার রক্ত শুকিয়ে উঠল যেন। ক্রোধের, ঘৃণার এমন উন্মত্ত রূপ আমি আর কখনো চোখে দেখিনি। আমি থরথর করে কাঁপছি তখন। সাগিনা হঠাৎ নিদারুণ আর্তনাদ করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে আমার মনের ভিতর কে যেন বলে উঠল, পালাও। আমি দিগ্বিদিক হারিয়ে দিলাম দৌড়।

ভাটিখানার মালিক নাকছেদি সাগিনার অন্তরঙ্গ বন্ধু। সে আমি আর পাঁচ-সাত জন আমাদের দলের লোক নিয়ে যখন ফিরে এলাম বস্তিবাজারে, তখন রাত প্রায় নটা বেজেছে। হিমালয়ের পাদদেশের রাত, তাই মনে হচ্ছে যেন বারোটা। খোলা মাঠে চিত হয়ে পড়ে ছিল সাগিনা। একা। তার স্যুট টাই ছিঁড়ে ফালা ফালা হয়ে গেছে। নাক-মুখ ফুলে উঠেছে। মাথা ও কপাল ফাটা। রক্ত চাপ চাপ হয়ে রয়েছে সারা গায়ে।

না, মরেনি। ধরাধরি করে ভাটিখানায় এনে তোলা হলো ওকে। দু-তিন ঘণ্টা পরে জ্ঞান হলো। উ: আ: কিচ্ছু করল না সাগিনা।

নাকছেদি ওকে মদ খেতে দিলে। ঢক-ঢক বোতলটা শেষ করে ফেলল। তারপর বসে বসে হাঁপাতে লাগল।

একটু পরে বলল, থেমে থেমে বলে চলল, 'আমাকে পিটেছে। খুব পিটেছে। কিন্তু ঠিক করেছে। বুঝতে পারছি, বেইমানি আমি করেছি। পুরা সমঝ গিয়া হ্যায় হাম।'

'লেকিন কামরেড,' আমার হাত চেপে ধরল সাগিনা। বলল, 'এক ধোঁকাবাজিতে আমি ফেঁসে গিয়েছিলাম। আমি তা বুঝতে পারিনি। হাঁ, মজদুরের ভালো করার নাম করে আমি খালি মজা করে কাটিয়েছি। খালি বান্দরনাচ নেচেছি। কি আফসোস!'

সেই সাগিনার শেষ কথা। পরদিন শুকনা ফরেস্টে তার রেলে কাটা দেহটা পাওয়া যায়। রেললাইনের পাশেই উপুড় হয়ে পড়ে ছিল। কেউ বলে—সে খুন হয়েছে; কেউ বলে—আত্মহত্যা করেছে।

সকল অধ্যায়
১.
স্ত্রীর পত্র
২.
অবনীভূষণের সাধনা ও সিদ্ধি
৩.
রসময়ীর রসিকতা
৪.
মহেশ
৫.
ভরতের ঝুমঝুমি
৬.
ঝড়
৭.
কলঙ্কিত সম্পর্ক
৮.
কবির মেয়ে
৯.
এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা
১০.
পথের কাঁটা
১১.
শহুরে
১২.
পুঁইমাচা
১৩.
প্রতিহিংসা
১৪.
বেদেনী
১৫.
আঙটি
১৬.
কসাই
১৭.
অতি সাধারণ ঘটনা
১৮.
রাজা
১৯.
বদলি মঞ্জুর
২০.
প্রেমের বি-চিত্র গতি
২১.
হ্যাংম্যান
২২.
নিবারণের মৃত্যু
২৩.
রুদ্রের আবির্ভাব
২৪.
তেলেনাপোতা আবিষ্কার
২৫.
নেড়ে
২৬.
দুকান কাটা
২৭.
তৃতীয় রিপু
২৮.
বৈয়াকরণ
২৯.
অতসী মামি
৩০.
পোস্টার
৩১.
ফেরিওলা
৩২.
জ্যোতিষী
৩৩.
পাশের বাড়ির মেয়ে
৩৪.
ফসিল
৩৫.
আদিম
৩৬.
আজ কোথায় যাবেন
৩৭.
ঘরন্তী
৩৮.
নিম অন্নপূর্ণা
৩৯.
বাঈজী
৪০.
রস
৪১.
টোপ
৪২.
ইঁদুর
৪৩.
বাঁদী
৪৪.
সুখ
৪৫.
পিকুর ডাইরি
৪৬.
ভারতবর্ষ
৪৭.
সাগিনা মাহাতো
৪৮.
আদাব
৪৯.
চোলি কা পিছে
৫০.
রানীরঘাটের বৃত্তান্ত
৫১.
ঘরবাড়ি
৫২.
নিশীথে সুকুমার
৫৩.
অশ্বমেধের ঘোড়া
৫৪.
রাজা যায় রাজা আসে
৫৫.
গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প
৫৬.
রাজার টুপি
৫৭.
খানাতল্লাস
৫৮.
শ্বেতপাথরের টেবিল
৫৯.
উদ্বাস্তু
৬০.
মঁসিয়ে হুলোর হলিডে
৬১.
আত্মজা
৬২.
বড় পাপ হে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%